মাগো, সকলকে ভাল রাখিস মা, বিজুকে ভাল রাখিস। আমি দূর বিদেশ
চললাম, আর কোনোদিন বোধহয় ফেরা হবে না। তবে বিজু তো বলল ওদেশেও নাকি পুজো হয়, এয়ো
মেয়েরা ভাসানের দিন সিঁদুরও খেলে। বিজুটা ভাসানের দিন গঙ্গার ঘাট থেকে ভাসান দেখে
সন্ধ্যে-সন্ধ্যে ফিরে পাড়ার বাড়ি-বাড়ি বিজয়া করতে ঘুরত; একা নয়, দস্যিগুলোর
পাঁচ-সাতজনের দলই ছিল একটা। কত আর হবে, সব ক’টার বয়েস সাত থেকে দশ, সব ক’টার হাতে
প্লাস্টিকের থলি। বাড়ি বাড়ি ঢুকে বড়দের ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম ঠুকেই বিজয়ার
কদমা-বাতাসা-বীরখন্ডি আর নাড়ু সটান চালান সেই থলিতে। চৌধুরীবাড়িতে অবশ্য লুচি হত,
বিজু তো তাও একবার গোটা দু’য়েক পাকিয়ে রোলের মত করে সেই প্লাস্টিকের থলি ভরে বাড়ি
নিয়ে এসেছিল, বলে কি – ‘মা, কাল সক্কালে তোমার ঘুগনি দিয়ে খাব’। আর ওই ঘুগনি,
যেখানে যাই হোক, যে বাড়িতে যাই খেয়ে আসুক, বিজয়ার দিন বিজুর বাড়িতে মায়ের বানানো
ঘুগনি চাই-ই চাই। আগে থেকে তোড়জোড় করে নারকেল পাড়িয়ে রাখতে হত, ছোটবেলা থেকেই ওনার
আবার জিভে স্বাদ আছে, যেমনতেমন হলে মুখে তোলেন না বাবু। সে অবশ্য ওর বাপেরই ধারা।
রাত আটটায় অফিসফেরতা এক কাঁড়ি আমোদি মাছ নিয়ে এসে লজ্জা লজ্জা মুখ করে অজুহাত দিত
না বিজুর বাবা ? – ‘রেলবাজারের নিরঞ্জন জোর করে গছালো, এক কাজ কর জয়া, তুমি একটু
ধুয়ে রাখো আমি জামাকাপড় ছেড়ে এসেই কুটে দিচ্ছি। জমিয়ে ঝাল কর দেখি, কাল তো রোববার,
একটু রাত করে খেলে কিচ্ছু হবে না’। আর ইলিশ ? সে তো ছিল এক পরব। আজকাল তো ঘটা করে
কিসব ইলিশ উৎসব হয়টয় শুনেছি, বিনয়ের ইলিশ কেনা মানেই ছিল উৎসব। মাছওয়ালাকে কাটতে
দিতেন না, বাড়ি ফিরে ছেলে-বৌকে দেখিয়ে বাহাদুরি নিতে হবে না ? গামছা পরে চাতালে
বঁটি আর ছাই নিয়ে বসে পরিপাটি সে মাছ কোটা দেখে কাজের মিনতি পর্যন্ত মুখে আঁচল
চাপা দিয়ে হাসত, বলত – ‘বৌদি, দাদা গত জন্মে মেয়েছেলে ছিল গো !’ বাপ-কা-বেটা
বিজুটাও হোমটাস্ক চুলোয় দিয়ে সামনে উবু হয়ে বসে বাপের ইলিশ কোটা দেখত। একেকদিন রাগ
দেখাতাম –‘আক্কেল বটে তোমার, কাজের লোকের সামনে বাইরের চাতালে বসে পুরুষমানুষ মাছ
কুটছো!’ ইলিশে মগ্ন বিনয় মুখ না তুলেই হাসতেন, বিজুটা আবার জিজ্ঞেস করত – ‘মা, মাছ
কি খালি মেয়েরাই কাটে, ছেলেদের কাটতে নেই ?’ এইবার ধরতাই পেয়ে বিনয় বলে উঠতেন –‘নাও,
এইবার উত্তর দাও দিকি ?’ আর বিজু যেদিন জয়েন্টে ইঞ্জিনীয়ারিং-এ চান্স পেয়ে যাদবপুর
হোস্টেলে চলে যাবে তার আগের দিন ? মনটা কেমন ভার-ভার আনন্দে ভরে ছিল, চোখে জল
আসছিল বারবার। সেকি শুধু বিজুটা বুক খালি করে বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে চলে যাবে সেইজন্য নাকি,
সরষের ঝাঁঝেও তো বার বার চোখ মুছতে হচ্ছিল। ওফ, সেদিনটা বিনয় ইলিশের ধুন্দুমার
বাঁধিয়ে ছেড়েছিলেন, প্রথমে ইলিশের তেল দিয়ে গরম ভাত মেখে সঙ্গে ইলিশভাজা, তারপর
ভাপা, তারপর দইইলিশ, আর শেষপাতে ইলিশের ডিম দিয়ে টক! বিজুটা অত পারেনি একবারে
খেতে, দু’ বেলা ধরে খেয়েছিল। বলেছিল, -‘কাল থেকে হোস্টেলে ট্যালট্যালে ঝোলভাত খাবো
বলে মা একদিনে ছ’ মাসের খাওয়া খাইয়ে দিল! আরে আমি প্রতি শনি-রোববার বাড়ি আসবো তো
নাকি?’ রাতে শোবার পর অন্ধকারে বিনয়কে না ছুঁয়েই বুঝেছিলাম, ওর বুকটা স্বাভাবিক
শ্বাসপ্রশ্বাসের চেয়ে অন্যরকম কেমন একটা আটকে-আটকে যাওয়া ছন্দে ওঠানামা করছে ।
এমনিতে ও খুব লম্বা আর গভীর করে শ্বাস নিত, ও ঘুমিয়ে পড়লে আমি চেষ্টা করে দেখেছি,
ওর শ্বাসের সঙ্গে তাল মেলাতে পারতাম না। এত ধীরে আর এত লম্বা ওর শ্বাস যে আমার দম
আটকে আসত। তাই সেদিন ওর গালের কাছটাতে আলতো আঙুল বুলোতেই, যা ভেবেছি তাই, কাল ছেলে
চলে যাবে বলে বাপের বুক রাতের একলা অন্ধকারের আড়ালে জানালার শার্সির মত ফাটছে।
সারাটাদিন হৈ হৈ ছেলেমানুষি ফূর্তি দিয়ে সেই ব্যথা মাটি চাপা দিয়ে রাখা খালি! সেই
থরথরানো বুকে হাত রাখতেই বুঁজে আসা গলায় মানুষটা বলেছিল, -‘নাড়ি পুরোপুরি ছিঁড়ে
গেল জয়া, এইবার ছেলেটা সত্যিসত্যি বড় হয়ে গেল গো’। জুলাই মাসের গরমে সেদিন রাতে
হঠাৎ হঠাৎ দখিনা দমকা বাতাস দিচ্ছিল, পাশের ঘরে খুব চাপা আওয়াজে বিজু ডেক-এ গান
শুনছিল, কি গানটা যেন ? আর অন্ধকারে আমায় আঁকড়ে ধরে কানের কাছে বিজুর বাবা ফিসফিসে
মন্ত্র পড়বার মত করে গাইছিল – বাজে অসীম নভ মাঝে অনাদি রব, জাগে অনন্য
রবিচন্দ্রতারা, বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা, আর তার ভাঙা সুর দমকা বাতাসের সঙ্গে
মিলেমিশে ভাললাগার বেড়া দেওয়া সেই বুকভাঙ্গা কষ্টটাকে মশারির বাইরে রাখতে চেষ্টা
করছিল প্রাণপণ। আমি বললাম –‘কেন, তুমিই তো ছেলেকে বলতে, তুই আমার ঘড়ি, তুই যত বড়
হ’বি, আমরা তত বুড়ো হ’ব !’ এইবার হেসে ফেলে বিজুর বাবা বলেছিল, -‘তা এরপর তো দেখতে
দেখতে ছেলের পাত্রীটাত্রী দেখবার সময়ও হয়ে যাবে, কি বল ?’ আমিও হেসে বললাম –
‘হ্যাঁ, ওই আশাতেই থাকো, এখনকার ছেলে, দেখো ফাইন্যাল ইয়ারের আগেই এসে বলবে, মা
আমার ওই মেয়েকে পছন্দ, বাপিকে বলে রেখো’। ও মাঝে মাঝেই এক একটা এমন কথা বলত যে
বুকে কাঁপন ধরত আমার, কিন্তু কথাগুলো ভাল লাগুক না লাগুক, ফেলতেও পারতাম না।
সেদিনও আমার ওইকথায় বড় করে একটা শ্বাস ফেলে ও বলল –‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, বড় করে পাত
পেতে বসে রইলেই তো হয়না, যে দেয় সে তার মাপ মতই দেয়!’
তবু তারপর বাড়িটা খালিই হয়ে গেল। বিজুর বাবা অফিস চলে গেলে ওই
খালি বাড়িতে প্রথম প্রথম সারাটাদিন এ ঘর ও ঘর করে অযথাই ঘর গোছাতাম, বিজুর ঘরটা
গুছিয়ে রাখতাম। ভারি এলোমেলো করে রাখত সব, এই ব্যাপারে ব্যাটা বাপের উল্টো। তিনটে
লোকের রান্নাতে আর কত সময়ই বা লাগতো, শ্বাশুড়ি তো বেশিরভাগ দিনই রাতে দুধ-খই
খেতেন। ওঁর লাগানো লাউগাছ, আমার লাগানো লঙ্কা আর পাতিলেবু গাছগুলোয় নিয়ম করে জল
দিতাম। সন্ধ্যেবেলায় শাশুড়িমায়ের সঙ্গে বসে টিভিতে ‘উড়নচন্ডী’ সিরিয়ালটা দেখতাম,
ওর নায়ক ছেলেটা নাকি পরে মারা গেছে শুনেছি, আহা ভারী মিষ্টি দেখতে ছিল ছেলেটাকে। শ্বাশুড়ি
টিভির সামনে সারা সন্ধ্যেই বসে থাকতেন, কোনো কাজ নেই তাই আমিও, যতক্ষণ বিনয় বাড়ি
না ফিরতো। বিনয় ফিরলে ওকে চা করে দিয়ে সংসারের টুকিটাকি এ-কথা সে-কথা, তখন আর অতটা
একলা লাগতো না। সেকেন্ড ইয়ার থেকেই বিজুটা প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসা বন্ধ করে দিল,
ওর বাবা বলল, -‘পড়ার চাপ বাড়ছে বুঝলে, এ তো আর তোমার পাসকোর্সে আর্টস পড়া নয়’। কি
এমন পড়ার চাপ রে বাবা, যার জন্যে সপ্তাহে একটা দিন বাড়ি আসা যায় না ? একবার পর-পর
দু’ সপ্তাহ বাড়ি এলো না ছেলে, তখন পাড়ায় টেলিফোন ছিল কেবল চৌধুরীবাড়িতে। ওখানে ফোন
করে বলে দিল, -‘মা’কে বলে দিও ফোর্থ সেম-এর প্রোজেক্টের কাজে ভীষণ ব্যস্ত তাই বাড়ি
যেতে পারছি না’। বিজুর বাবা তার মধ্যে একদিন অফিসফেরতা ওর হোস্টেলে গিয়েছিল, গিয়ে
দেখে ছেলে ঘরেই নেই। পরের রোববার বাড়ি এলে জিজ্ঞেস করতেই বিজুটা কেমন তেড়িয়া হয়ে
বলল,-‘কেন আমায় না জানিয়ে হোস্টেলে গিয়েছিল কেন বাপি ? আমার উপর স্পাইং করতে ?
পড়ছি কিনা দেখতে ?’ আমি বললাম, অত রেগে যাচ্ছিস কেন বিজু, তুই দশ-বারোদিন বাড়ি
আসিসনি, বাপির তো তোকে দেখতেও ইচ্ছে করে, নাকি ? তক্ষুনি ব্যাটা আবার গলে জল, আমায়
জড়িয়ে ধরে বলে কি, -‘খালি বাপির কেন, তোমার আমায় দেখতে ইচ্ছে করেনা বুঝি ?’ দেখতে
ইচ্ছে করলেই কি চলে রে বাবা, তুই এখন বড় হয়ে গেছিস, কত পড়ার চাপ, প্রোজেক্টের চাপ,
তাই চেপেচুপে থাকি। বিজু বলেছিল, - ‘ফোর্থ সেমটা দিয়ে একবার দু’-তিনদিনের জন্য
বেড়াতে যাবে মা ? তুমি, বাপি আর আমি, সেই মাধ্যমিকের পর আর একসাথে কোত্থাও তো যাইনি,
এরপর তো আরোই যাওয়া হবে না’। এই পনেরোদিনের মধ্যে কোথায় যাওয়া ঠিক করা যাবে বল ?
এখন তো ষাট দিন আগে ট্রেনের টিকিট কাটতে হয় বলে শুনি। -‘আরে ধুর, ও রকম না, চল
একটা গাড়ি ভাড়া করে মুকুটমণিপুর বা ওইরকম কোনোখানে দু’রাতের জন্য ঘুরে আসি, তার
বেশি থাকাও যাবে না, ফিফথ সেমের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে’। কিন্তু সে যাওয়া আর হয়নি।
বিজুর সেমেস্টারের পরীক্ষা চলছে তখন, আরো একটা না দু’টো পেপার বাকি, ভোররাতে বিজুর
ঠাকুমা বাথরুমে পড়ে গেলেন। কি অসম্ভব জল ঘাঁটার বাতিক ছিল মহিলার ! আগে চাতালের
টাইমের কলে জল আসতে না আসতে শীত নেই গ্রীষ্ম নেই বর্ষা নেই, তিনবেলা গামছা পরে চান
করতেন। বিজুর বাবা কতবার বকেছে, উনি কানে তুললে তো ? তখন তো ঘরের মধ্যেই বাথরুম
হয়েছে অ্যাটাচড, সেখানেও সেই একই জিনিস। ভোর পাঁচটায় জল আসতে পারত না, উনি স্নান
করা শুরু করে দিতেন। পই পই করে বারণ করেছি, মা এই বয়সে পড়েটড়ে গিয়ে হাত-পা বা কোমর
ভাঙ্গলে কি হবে, কে শোনে কার কথা। সেই পড়া পড়লেন, আমি রোজকার মত সাড়ে পাঁচটায় উঠে
চা করতে করতে শুনি বাথরুমে ছড়ছড় করে কল থেকে জল পড়েই যাচ্ছে। সন্দেহ হতে ছুটে গিয়ে
দেখি, মাথাটা বাইরে, শরীর তখনো বাথরুমের ভেতরে, পড়ে আছেন, মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে।
বিজুর বাবাকে ডাকলাম দৌড়ে গিয়ে। তারপর হাসপাতাল, পরের টানা তিনটে দিন উনি কোমায়,
মানুষ চিনতে পারছিলেন না। চারদিনের মাথায় যেদিন বিজুর বাবা অফিস গেল, আর্নলিভগুলো
সব খরচ হয়ে যাচ্ছিল, আর দেড় বছরের মধ্যেই তো রিটায়ার, তাই বলল সই করেই চলে আসবে,
বিজুর বাবাও অফিসে বেরোলো আর সেইদিনই সকাল দশটায় উনি চলে গেলেন।
তার পর-পরই গেলেন শ্যামলবাবু। শ্যামলদার যাওয়াটা বিনয়ের খুব
লেগেছিল। শ্যামলদা বিনয়ের ইশকুলের বন্ধু ছিল, এক সঙ্গে ওপারের খুলনা থেকে এসেছিল
দু’টো পরিবার, একসাথে এই বাদা জঙ্গলে ভর্তি হালিসহরে জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন শ্বশুরমশাই
আর শ্যামলদার বাবা। সেই সাতষট্টি-আটষট্টিতে বেহালাও তখন প্রায় এঁদো গাঁ-ই বলা চলে,
তবুও বিয়ের পরে পরে, এদের বাড়ির বাইরে পুকুরপাড়ের দিকে কোনোমতে নীচু দর্মার
দেওয়ালে আবডাল-করা চৌবাচ্চা, চানের জায়গা আর পায়খানা, তার পাশে কয়লা আর চেলাকাঠের
ঢিপি, মাটি-নিকোনো উনুনে চেলাকাঠ আর ঘুঁটেতে রান্না, সন্ধ্যে হলেই চারদিকে ভুতুড়ে
অন্ধকারে টিমটিমে হ্যারিকেনের আলো, বাড়িতে একটা রেডিও অবধি নেই – কেমন দম আটকে
আসতো যেন। বিনয় অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি করেনি, সপ্তাহ-ভর ওভারটাইম করে এসেও ছুটির
একটা দিন রোববার, নতুন বিয়ে-করা বউকে কি করে একটু আনন্দ দেওয়া যায়, চেষ্টার ত্রুটি
রাখেনি কোনোদিন। যখন একটা সিনেমা দেখতে গেলেও ট্রেন ধরে নৈহাটি, সেই সময় বিনয় আমায়
নিয়ে কোলকাতায় শম্ভু মিত্রর রাজা অয়দিপাউস দেখিয়েছে, নিউ মার্কেট ঘুরিয়েছে কত।
ঝলমলে দোকানপাট ঘুরে ঘুরে দেখতাম দু’জনে, কিছু কেনবার ক্ষমতা ছিল না, শুদ্ধু দেখে
যাওয়া। কিছু না হলে অন্তত হালিসহরের গঙ্গার পাড়, নদী দেখতে বিনয় ভারী ভালোবাসতো।
ওর দেখাদেখি আমারও নদী দেখার অভ্যেস হয়ে গেছিল, ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ তুলে বয়ে যেত
গঙ্গা, মাছধরা ডিঙিগুলো ভেসে যেত ভাটির টানে আর আস্তে আস্তে দক্ষিণ-পশ্চিমে আকাশটাকে
পলাশের মত লাল রঙে রাঙিয়ে সুর্য অস্ত যেত, আমি আর বিনয় পাশাপাশি পাড়ে বসে সেই
অস্ত-যাওয়ার রঙের মায়ায় মুগ্ধ হতাম। সেইখানেও মাঝে মাঝে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে
ফেলতো ও। একদিন দেখি সুর্য ডুবছে আর ওর দু’চোখ ভরে জল। আমি তাড়াতাড়ি বলতে গেছি কি
হ’ল, কি হ’ল, ও বলল, -‘আরেকটা দিন চলে গেল জয়া, নদীর যে জলের কণা দেখো ঘাট ছুঁয়ে
চলে গেল সাগরের দিকে সে যেমন আর কোনোদিন ফিরবে না, তেমনই এইদিনটা আমাদের জীবনে আর
কোনোদিন ফিরে আসবে না’। এক-একদিন বিনয় গান ধরতো নীচু গলায়, নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ
তো বড় বা দিনের শেষে ঘুমের দেশে। কি ভরাট গলা ছিল ওর, অথচ অভাবের সংসারে কোনোদিন
গান শিখতে পারেনি। বিজু হ’বার পরে অবশ্য বেরোনোটা বলতে গেলে বন্ধই হয়ে গেল,
শ্বাশুড়িমা বাচ্চা রাখতে পারবেন না। তারপর চারদিক খোলা বাড়ি, সন্ধ্যে হতে না হতে
শেয়াল ঘুরছে, মাগো ! বিনয় তাও দু’একদিন বলতো, -‘নৈহাটিতে দাদার কীর্তি এসেছে, যাবে
নাকি ? ম্যাটিনিতেই চল না, সন্ধ্যে আগেই ফিরে আসা যাবে’। ততদিনে আমি নতুন খেলনা
পেয়ে গেছি, বিজুটা ছিল গোলগাল ফর্সা তুলতুলে পুতুলের মত, যে দেখতো সে-ই বলতো, আহা
যেন সাহেবের বাচ্চা। লম্বা চুল ছিল বিজুর, বিনুনী বেঁধে দিতাম। সেই চুল কাটা হলো
তো অন্নপ্রাশনেরও পরে, একটা বিনুনী-ওয়ালা ছবি ছিল বিজুর, সাদাকালো, মুখ তুলে
ব্যাটা হাঁ করে ফোকলা হাসি হাসছে। সেই বাড়ি, কত পরে বিজু তখন সবে মাধ্যমিক দিল,
বিজুর বাবা পিএফ থেকে লোন তুলে আর পুকুরের ওপারের ছ’ কাঠা জমি বেচে দিয়ে পেছনে আরো
দু’টো ঘর, রান্নাঘর আর অ্যাটাচড বাথরুম বানালো। মেঝেতে মোজাইক, বাথরুমে শাওয়ার
লাগালো আর ছেলেটার পড়ার একটা আলাদা ঘর হল এতদিন পরে। মাধ্যমিক অবধি একটা ঘরে সব
কিছু, লোকজন কেউ এলে পড়া নষ্ট, একটা টিচার অবধি রাখতে পারিনি, তাও তো ছেলেটা স্টার
পেল। সেই বাড়ি, লাউগাছ দড়ি দিয়ে তুলে দিয়েছি ছাদে, ফনফনিয়ে বেড়ে গিয়ে কি সুন্দর
গোলগোল লাউ হলো, বিজুর বাবা একটু ঘ্যানঘ্যান যে করেনি তা নয়, নতুন ছাদ ড্যাম্প পড়ে
নষ্ট হ’বার ভয়। বিনয়ের তো পাড়াবেড়ানো ছিল না কোনোকালে, ওই শ্যামলদার মত দু’ একজন
ছাড়া কারুর সঙ্গে মিশতেই পারতো না মানুষটা। শুধু অফিস আর বাড়ি। আর বাড়ি মানে ছেলে।
শ্যামলদা ছিল ভারী মজাদার লোক, আমায় বৌঠান বলে ডাকতো। কোনোদিন সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে
আসলে বেড়ার বাইরে থেকেই হাঁক – “আরে বিনুবাবু-উ-উ-উ বাড়ি আছেন নিকি, অ বৌঠান গুড়
দিয়া চা কইর্যা ফ্যালেন দেখি” আর সঙ্গে সেই খি-খি-খি করে হাসিটা যেন এখনো কানে
বাজে। স্থানীয় সঙ্ঘের পুজো প্যান্ডেলে প্রতিবার অষ্টমীর রাতে তার সে কি ধুনুচি
নাচ, একবার ঢাকি তাল কাটায় তেড়ে ধমক দিল – অরে অসুর, এই বাজনে কি নাচন যায় ?
শ্যামলদার কথায় হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত। রোগা লিকপিকে, গায়ের রঙ ছিল বেশ
কালো, একবার রেলের টিকিট কাটার লাইনে ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে, আমি বিজুকে নিয়ে বেহালা
যাচ্ছি শ্যামলদার সঙ্গ ধরে, শ্যামলদার অফিস ছিল নিজাম প্যালেসে, বিজুর বাবা যেতে
পারেনি, শ্যামলদা আমাদের শিয়ালদা থেকে বেহালার বাসে তুলে দেবে। লাইনে ধাক্কা খেয়ে
সপাটে ঘুরে দাঁড়িয়ে শ্যামলদা পেছনের ভদ্রলোককে বলে কি – ইউ ডাঁর্টি নিগার ! সে
ভদ্রলোকও সঙ্গে সঙ্গে মুখ বেঁকিয়ে বললেন, - ‘ইঃ, আমি ডাঁর্টি নিগার ? বাড়ি গিয়ে
আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন একবার!’ শুনে শ্যামলদার সেই খি-খি করে হাসি, আমি হাসবো না
কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই রকম মজার মানুষ ছিল শ্যামলদা, হাঁপানি তো
কতলোকেরই থাকে, কিন্তু শ্যামলদা হঠাৎ করেই চলে গেল, অকালেই। আর অফিসের খুব বন্ধু
ছিল অজয়দা, কিন্তু সেও তো দিল্লী ট্রান্সফার হয়ে গেল বিজু তখন সিক্সে না সেভেনে
যেন। আর ছিল মানসদা, মানসদা যখন যাদবপুর এইট বি-র কাছে ফ্ল্যাট নিল, আমায় কতবার
ধরেছিল, -‘জয়া বি.কে-কে বলো আমাদের
হাউসিং-এ একটা ফ্ল্যাট নিয়ে রাখতে, জানি ও এখন হালিসহর ছেড়ে নড়বে না, অন্তত মাসীমা
যতদিন আছেন। কিন্তু মাসীমা চলে গেলে বা রিটায়ারের পরে বি.কে হালিসহরে টিঁকতে পারবে না
বলে দিলাম’। আমিও বেশ কয়েকবার বলেছিলাম ওকে, মানসদা এত করে বলছে, নিয়ে রাখো না।
ফ্ল্যাট নিলেই তো এক্ষুণি উঠে যেতে হচ্ছে না, ছেলেটা নাইনে উঠলো সবে, ও বড় হলে ওরও
তো লাগতে পারে, না লাগলে তখন না হয় বেচে দেবে। তুমি তো এখানে কোথাও মেলামেশাই করতে
পারো না, রিটায়ার করে ওখানে তবু মানসদাদের মত সমমনস্ক দু’-চারজনকে আশেপাশে পাবে
কথা বলবার জন্য। প্রথম-প্রথম তো এক্কেবারে পাত্তাই দিত না, আমি কিছুদিন ঘ্যানঘ্যান
করাতে তারপর তুলতো টাকার কথা, -‘আর তো ছ’-সাত বছর মাত্র চাকরি আছে, লোন শোধ করবো
কি করে ?’ সেই লোক শ্যামলদার শ্মশান থেকে ফিরে এসে নিমপাতা মুখে নিয়ে লোহা-আগুন
ছুঁয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই আমায় কেমন ধরে-আসা গলায় বলল, - ‘আমাদের জেনারেশানেও হাত
পড়ে গেল জয়া’। বুকটা দুলে উঠেছিল ওর অচেনা গলার স্বরে। রাতে মানুষটাকে বললাম, কেন
আজেবাজে চিন্তা করো বলো তো, শ্যামলদার তো কবে থেকেই অ্যাজমা ছিল। গত তিন-চারমাস
বাড়ি থেকেই বেরোতে পারতো না। উত্তরে বিনয় ওর গভীর আর লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল,
-‘বাড়িটা এবার তাহলে বেচেই দি’, কি বলো ?’ সেই বেচা বেচলো, শ্যামলদা চলে যাবার ছয়
মাসের মধ্যে। সাড়ে চার কাঠার উপর দোতলা বাড়ি মাত্র বারো লাখে। বিজুর ফিফথ সেম চলছে
তখন, তার মধ্যেই হালিসহরের পাট তুলে সেলিমপুরের তিন-কামরার ফ্ল্যাটে উঠে এলাম।
মানসদাই দেখে দিয়েছিল ফ্ল্যাটটা, গলির একটু ভেতরের দিকে, কিন্তু পূব আর উত্তর
দু’দিকে দু’টো ব্যালকনি, তিনটের মধ্যে দু’টো ঘর তো বেশ বড়, আর দু’টো বাথরুম। আমার
তো বেশ পছন্দ হয়েছিল। তবে বাড়ি-বেচা টাকার সঙ্গে বিনয়ের বাকি পিএফ আর গ্রাচুইটির
প্রায় পুরোটাই চলে গেল কোলকাতায় নতুন করে সংসার পাততে। পাকাপাকিভাবে চলে যাবার
আগের রাতে, খাট-তোষক সব ফ্ল্যাটে চলে গেছে, আমরা দু’জন কোনোরকমে শতরঞ্চি পেতে আর
করুণাবৌদিদের থেকে দু’টো বালিশ আর মশারি চেয়ে এনে রাতে শোব, বিজু তো হোস্টেলে। রাত
ক’টা হবে, এগারোটা সাড়ে এগারোটা, করুণাবৌদির কাছে রাতের খাওয়াদাওয়া করে ছাদে উঠল
বিনয়, আমায় বলল এসো। গেলাম, কি যে হচ্ছিল বুকের মধ্যে বলে বোঝানো যাবে না। খারাপ
লাগছিল ? না তো, আমি তো এসব ছেড়েছুড়ে আমাদের শেষজীবনটা কলকাতায় বিজু আর বিনয়কে
দেখাশোনা করে জীবনে প্রথমবার নিজেদের মত করে থাকতেই চেয়েছিলাম। তাহলে কেন চোখ বেয়ে
অঝোরে জল পড়েছিল সে দিন সেই রাতে ? আশ্চর্য, সেদিন বিনয় হাসছিল, -‘কাঁদছ জয়া ?
কিন্তু কেন কাঁদছ জানো ? আকাশে ডানা মেলতে কার না ভালো লাগে বলো, তবু গভীরের শিকড়
উপড়ে উড়ে যেতে ব্যথা যে লাগেই’। একফালি চাঁদের আলোয় সুপুরি আর নারকেলগাছের
ছায়ামাখা ছাদে তখন কি হাওয়ার মাতামাতি, ওরা নাকি আমাদের উজানগাঙ্গে নৌকার পালে
হাওয়া দিচ্ছে, বিনয় বলেছিল।
কি অদ্ভুত কাল রাতটা ! নিজের বাড়ি থেকে নয়, নিজের শহরের
নবমীর রাত হোটেলের চারতলার জানলা দিয়ে কেমন লাগে, দেখলাম। এই প্রথম, আর এই শেষবার।
ফুটপাতে আনন্দে উচ্ছল মানুষের স্রোত বাঁশের বেড়া দিয়ে বাঁধা, আর রাস্তার মাঝখানে
গাড়িগুলো যেন নতুন বৌয়ের প্রথম শ্বশুরবাড়িতে ঢোকার মত লাজুক এক পা, দু’ পা করে
এগোচ্ছে। আগেও, বিজু যখন ছোট, পুজোয় দু’-একবার বেহালায় থেকে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছি,
ভীড় তখনো ছিল। বিনয় এমনিতে ভীড়ভাট্টা সহ্য করতে পারত না এক্কেবারে, কিন্তু পুজোর
চারটে দিন ঐ ভীড় ঠেলে আমাদের প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরাতো, আমি কতবার জিজ্ঞেস
করেছি, তুমি তো এই হুড়ুমধুড়ুম ভীড় পছন্দ করো না, তাও বেরোও কেন ? ও বলতো, -‘জয়া,
এই ক’টা দিন বাঙালীদের সব্বাইকে কেমন সুন্দর দেখায়, সব্বাই কেমন সেজেগুজে হৈ হৈ
করে বেরিয়ে পড়ে, যেন কোত্থাও কোনো শোকদুঃখ রোগতাপ কিচ্ছু নেই – সারাটা বছরের মধ্যে
এই চারটে দিন আমার এই আনন্দিত ভীড় ভীষণ ভালো লাগে গো’। আমার মামাবাড়ি মোমিনপুরে
পুজো হত, সে কি ধুমধাম। রাস্তার একপাশে মামাবাড়ি, উল্টোদিকে মাসীর বাড়ি, দু’
বাড়িতেই পুজো হত, মাসীর বাড়িতে তো নবমীতে বলির চল ছিল, মেসোমশাই মারা যাবার পর সব
বন্ধ হয়ে গেল। ওই দু’টো বাড়িতেই আমার ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে, কত স্মৃতি। সেই
দু’টো বাড়িরই আজ ভূতের দশা, দেখলে কান্না পায়। বড়মামার মেজ-সেজ ছেলে দু’জনেই
বিদেশে, থাকার মধ্যে বড় কানুদা খালি সেই বিরাট চারতলা বাড়ির একতলায় টিমটিম করে
টিঁকে আছে। মাসীর মেয়ে রান্তুদি হোসুরে সেটেলড, বাকি মিন্তু বিয়ের পর থেকেই
ক্যানাডায় আর বোকনদা অ্যামেরিকায়। বোকনদার ছেলে অপু আর বিজুর জন্ম পনেরোদিন
এদিকওদিক, বহুকাল দেশে আসেনা ওরা, যোগাযোগও নেই। মাসীর বাড়িটা তো শুনি প্রোমোটারকে
দিয়েই দিয়েছে, ফ্ল্যাট উঠে গেছে, কত বছর হয়ে গেল ও পাড়ায় পা রাখিনি।
গতবার ষষ্ঠীতেই তো। বিকেলে ভারতের ক্রিকেটখেলা টিভিতে দেখতে
দেখতে বিনয়, কথা নেই বার্তা নেই, হঠাৎ
সোফা থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল। ওরই অর্ডারি চা নিয়ে আসছিলাম, বুকটা ভীষণ কেঁপে উঠল। হাত
থেকে ছিটকে গেল চায়ের কাপ। পড়িমড়ি ওর কাছে এসে দেখি, ঠোঁটটা বাঁ দিকে বেঁকে গেছে,
বাঁ হাতের আঙুলগুলো সোজা করা যাচ্ছে না ! অসাড় মুখ থেকে লালা গড়িয়ে গেঞ্জির কাঁধের
কাছটা ভিজে যাচ্ছে, আর একটা অস্ফুট গোঙানি – আমি দৌড়ে বেরিয়ে পাশের ফ্ল্যাটের
জয়সোয়ালদের ডাকলাম। ওর দুই ছেলেই বাড়ি ছিল, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেগুলো অ্যাম্বুলেন্সের
ব্যবস্থা করে নিয়ে গেল ‘আমরি’তে। এমারজেন্সির ডাক্তার বলল – সেরিব্রাল। খুব সময়ে
নিয়ে এসেছেন, আরেকটু দেরি হলেই হয়েছিল আরকি। তবে বাহাত্তর ঘন্টা না কাটলে কিছু বলা
যাবে না। স্থানুর মত বসে রইলাম আইসিসিইউর বাইরে। জয়সোয়ালদের ছেলে দু’টো বারবার
বলেছিল, ‘আন্টি, ঘর ওয়াপস চলিয়ে, ইধার ঠ্যাহরনেসে কোই ফয়দা নেহি। হম হ্যায় না,
আপকা কোই চিন্তা নেহি’। যাওয়া যায় ? বিনয়কে এখানে, ওই যন্ত্রপাতীতে ভর্তি মরণমাখা
সাদা ঘরটায় রেখে ঘরে ফিরে যাওয়া যায় ? পুজোটা আইসিসিইউতে কাটল। বিজু খবর পেয়ে
গিয়েছিল সেইদিনই। আমিই তৎক্ষণাৎ আসতে বারণ করেছিলাম, এপাড়া ওপাড়া বা দিল্লী-বোম্বে
তো নয়, সে-ই লন্ডন। তবু চারদিনের মাথাতেই বিজুকে আসতে হল, বাপের মুখাগ্নি একমাত্র
ছেলে ছাড়া আর কে করবে, প্রায় বাইশ ঘন্টা বিনয় বিনা বাক্যব্যয়ে পিসহাভেনে শুয়ে
ছেলের অপেক্ষা করল। নবমী পুরে দশমী পড়তে না পড়তে রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিটে বিনয়
কোনোদিন যা করেনি, জীবনে প্রথম আর শেষবার তাই করেছিল যে - আমায় ভীড়ের মধ্যে একা
ফেলে রেখে চিরকালের মত পাড়ি দিল কোনোদিন-না-ফেরার দেশে। বিজু কাজ করলো, বিনয়ের
অফিসের সব বন্ধুই কাজের দিন এসেছিল, যারা বেঁচে আছে সব্বাই - মানসদা, অজয়দা,
কাজলদা; অজয়দার অবস্থা তো সবচেয়ে সঙ্গীন দেখলাম, একটামাত্র মেয়ে নিজের পছন্দে বিয়ে
করে আহমেদাবাদে আছে, বুড়ো বাপ-মা’র দিকে ফিরেও দেখেনা। অজয়দাই বিজুকে বললো,
-‘মা’কে এবার তোমার সঙ্গে করে লন্ডন নিয়েই যাও। বি.কে চলে গেল, আমরাও তো যাবার পথে এক পা বাড়িয়েই আছি, বুড়ো
বয়েসে কে কাকে দ্যাখে, বল ?’ বিজু তখন সবে বাবার কাজ করে উঠেছে, বললো, - ‘হ্যাঁ
কাকু, বাপি থাকতে অনেকবার দু’জনকেই নিয়ে যাব ভেবেছি, কিন্তু বাপি তো এখান থেকে
নড়তেই চাইত না। একটা বার পনের-কুড়িদিনের জন্যে বেড়াতে অবধি নিয়ে যেতে পারলাম না
আমার ওখানে। আমি এবার যে চার-পাঁচদিন আছি, তার মধ্যেই এই ফ্ল্যাটের বিক্রির
বন্দোবস্ত দেখছি, তোমরাও একটু হেলপ কোরো, দ্যাখো তোমাদের চেনাজানার মধ্যে কেউ
কিনতে চায় কিনা। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মা’কে নিয়ে যাব আমার কাছে’। হ্যাঁ, আমায়
নিয়েই চল বিজু, আর কি পড়ে রইল এখানে ? আমার তো লতার মত জড়ানো জীবন, তোকে আর তোর
বাপিকে আঁকড়ে জড়িয়ে কেমন করে যে কেটে গেল, কবে যে বুড়ি হ’লাম টেরও পেলাম না। প্রায়
বারোটা বছর এই ফ্ল্যাটে কাটলো, তার আগে পঁয়ত্রিশ বছর হালিসহরে, শেষটা না হয় তোর
কাছে বিদেশেই হবে, মায়ের কাছে ছেলের ঘর কি বিদেশ হয় কোনোদিন ? সেই বিক্রি ঠিক হল
মাসখানেক আগে, ফার্নিচারটার শুদ্ধু মোটামুটি ভাল দামই পেল বিজু – প্রায় তিরিশ
লাখের মত পেয়েছে বলল, ফ্ল্যাটটা কিনল আরেক মাড়োয়াড়ি, কি শ্রীবাস্তব না কি যেন নাম।
বিজু এসেছিল প্রায় কুড়িদিন আগে, ফ্ল্যাটের হাতবদল আরো কি কি সব আইন-টাইনের কাজ
মেটালো একাই। তরশু আবার মানসদারা সবাই এসেছিল আমাদের গুডবাই করতে, বিনয়ের সঙ্গে
যাদের অত হৈ হুল্লোড় করতে দেখেছি এককালে, সব্বাই কেমন টাকফাক পড়ে থুতনি-ঝুলে যাওয়া
নেতিয়ে পড়া থুত্থুড়ে বুড়ো হয়ে গেছে এখন। বিনয় কিন্তু যাবার আগের দিনও টানটান ছিল,
চুল সব সাদা হয়ে গেছিল ঠিকই, কিন্তু একটা চুলও পড়েনি, ঝকঝকে দাঁত সব অটুট, মানসদা
তো ইয়ার্কি করে প্রায়ই বলতো, বি.কে চাইলে আরেকটা বিয়েও করতে পারে। গতকাল ব্যাগট্যাগ সব
গুছিয়ে চাবি শ্রীবাস্তবদের দিয়ে হোটেলে এসে উঠলাম বিজুর সঙ্গে। এয়ারপোর্টের
কাছাকাছি একটা হোটেল, এসি ঘর। জামাকাপড় বিশেষ কিছু আর নিলাম না, দু’টো সোয়েটার আর
শাল, বিজু বলল, ওখানে যা ঠান্ডা পড়ে এসবে শানাবে না। পৌঁছে গরমজামাটামা কিনে দেবে।
আর শাড়িকাপড় যা ছিল, সব দিয়ে দিয়েছি স্বপ্নার মা’কে, বিনয় যাবার পর থেকে
রান্নাবাড়া, বাসনমাজা, ঘরদোর মোছা একা হাতে সামলেছে মেয়েটা গত একটা বচ্ছর। বিজুকে
বলিনি, কেবল বিনয়ের একটা মাংকিক্যাপ ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছি। আর নিয়েছি ওর চশমাটা,
আর হাতে লেখা একটা মাসকাবারি হিসেবের খাতা, আহা মুক্তোর মত হাতের লেখা ছিল ওর,
বিজুটারও হাতের লেখা ভাল, কিন্তু বাপের ছাঁদ পায়নি। আরেকটা জিনিসও নিয়েছি, ওখানে
গিয়ে আমার ঘরের দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখব আমার শেষদিন অবধি - বিজুর সেই বিনুনী-করা
হাঁ করে ফোকলা হাসি-হাসা সাদাকালো ছবিটা, অন্নপ্রাশনের দিন যেটা শ্যামলদা তুলে
দিয়েছিল।
- মে আই হেলপ ইউ ম্যা’ম ? ইউ আর সিটিং হেয়ার অ্যালোন ফর
লঙ...
কিসের হেলপ ?...‘লঙ’...মানে ?
- আস্ক ইন বেঙ্গলি না !
- ম্যাডাম, আপনি অনেকক্ষণ একা বসে আছেন, কোথায় যাবেন ?
আপনার ফ্লাইট কখন, সঙ্গে কে আছে ?
অ্যাঁ...অনেকক্ষণ...মানে ? কতক্ষণ ?
হাতঘড়িতে নজর করে স্তম্ভিত হয়ে যাই, সব্বোনাশ! সত্যিই তো –
বিজুটা যে গেছে তো গেছেই। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যে প্রায় তিনঘন্টা হতে চলল! বিজুই
তো তাড়া দিল, বলল, দশমীর ভীড়ে রাস্তাঘাট জ্যাম হয়ে গেলে মুশকিল হবে। তা কাল নবমীর
সন্ধ্যেরাতেই রাস্তায় যা ভীড় দেখেছি, দশমীতে যে লোকে পাগল হয়ে যাবে সে আর আশ্চর্য
কথা কি। তাই সন্ধ্যে হতে না হতে হালকা কিছু মুখে দিয়েই বেরিয়ে পড়া হয়েছিল।
স্টেডিয়াম-লাগোয়া হোটেলটা থেকে এয়ারপোর্ট কতটাই বা, জোর তিন-চার কিলোমিটার। সেটুকু
পেরোতেই তো একঘন্টা লেগে গেল, এয়ারপোর্টে পৌঁছে ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে হাঁফ ছেড়ে
বিজু বলল, - ‘যাক পৌঁছে গেছি বাবা। এখন সবে সাতটা বাজছে, প্লেন ন’টায়, হাতে ভাল
সময় আছে’। আমি বলেছিলাম, - ‘তা এত আগে এলি কেন রে ?’ - ‘অনেক কাজ আছে মা, এ তো আর
দিল্লী-বোম্বে যাওয়া নয়, একেবারে হিথরো, লন্ডন। প্রায় তেরো ঘন্টা, মাঝে শুধু
আবুধাবিতে স্টপ-ওভার। ইমিগ্রেশানে ভিসা-পাসপোর্ট চেক, লাগেজ তোলা – হাজার ঝামেলা’,
বিজু বলেছিল। লাগেজ বলতে আমার হাতব্যাগ
ছাড়া একটা সুটকেস আর একটা বড় ব্যাগ, আর বিজু দেশে এসেছিল যে স্যুটকেসটা নিয়ে,
সেটা। আমার লাগেজসহ আমায় এইখানটায় বসিয়ে বিজু উল্টোদিকের স্টল থেকে কাগজের গ্লাসে
কোকাকোলা নিয়ে এল, খেলাম। তারপর বিজু ওর সুটকেসটা নিয়ে উঠল, বলল যে কাউন্টারে
পাসপোর্ট-ভিসা দেখিয়ে বোর্ডিং পাস তুলে এসে তারপর লাগেজ চেকে পাঠাবে।
- হুইচ ফ্লাইট, স্যরি, কোন ফ্লাইটে যাবার কথা আপনাদের
ম্যাডাম ?
- ফ্লাইট ? কোন ফ্লাইট...মানে লন্ডনে যাবার যে
প্লেন...ন’টায় ছাড়বার কথা ছিল...
- আ, মোস্ট প্রোব্যাবলি সি ইজ ইন্ডিকেটিং দ্যাট ইতিহাদ
ফ্লাইট অ্যাট এইট ফর্টি...আচ্ছা ম্যাডাম আপনার ছেলের নাম কি ?
- ছেলের নাম ?...বিজিত...বিজিত বসু...
কি বলল মেয়েটা ? প্লেন আটটা চল্লিশে ছিল ? না, না বিজু তো
বলেছিল প্লেন ন’টায়...
- এগজ্যাক্টলি ন’টায় তো লন্ডনের কোনো ফ্লাইট নেই ম্যাডাম।
একটা ছিল আটটা চল্লিশে, সেটা তো প্রায় আধ ঘন্টা হ’ল বেরিয়ে গেছে ইন টাইম। আবার
আরেকটা আছে রাত বারোটা কুড়িতে বৃটিশ এয়ারওয়েজের...এই স্মিতা, চেক দ্য
প্যাসেঞ্জার্স লিস্ট অফ ইতিহাদ ফ্লাইট না...চেক ফর বিজিত বাসু...
কে বিজিত ? বিজিত বসু কে ? বিজিতই কি আমার বিজু ? বিজু
কোথায় ? ও তো বলে গেল, পাসপোর্ট-টোট টিকিট কাউন্টারে দেখিয়ে আসছে...তারপর লাগেজ
তুলে দেবে...আমি আবার বললাম, রাত্তিরে খাবি কি ? ও বলল, কেন শুকনো কিছু কিনে
এখানেই খেয়ে নিয়ে প্লেনে উঠবো, মাঝরাতে আবুধাবি এয়ারপোর্টে নেমে আরো কিছু কিনে
নেবো’খন...প্লেনে ফ্রুটজুস পাওয়া যায় আর চকলেট, তোমার তো সুগার নেই...সকাল দশটার
মধ্যে লন্ডনে নেমে দুপুরে খাওয়ার আগেই তো বাড়ি পৌঁছে যাব...
- ইয়াহ, দেয়ার ইজ দ্য নেম বিজিত বাসু, বোর্ডিং পাস ইস্যুড
সিট নাম্বার ই-টোয়েন্টিওয়ান ডাব্লিউ, বোয়িং সেভেন ফর্টি সেভেন ইতিহাদ...বাট ওহ মাই
গুডনেস, দেয়ার ইজ নো জয়া বাসু ইন দ্য লিস্ট...উনি কি আপনার টিকেট কাটেননি ম্যাডাম
? প্যাসেঞ্জার্স লিস্টে তো কোনো জয়া বাসু নেই...আপনার টিকেট কোথায় ?
টিকিট ?...আমার টিকিট ? সে সবই তো বিজুর কাছে, আমায় যে বলল
জানালার ধারের সিট, প্লেন ওড়ার সময় তুলো গুটলি পাকিয়ে কানে দিয়ে রাখলে কানে ব্যথা
হবে না...বিজুর মাধ্যমিকের পরে নেপাল বেড়াতে গিয়ে ফেরবার সময় প্লেনে আমার কানে কি
ব্যথা...কাল দিনের বেলা সমুদ্র দেখা যাবে...
- ইউ টেল হার, আই সিম্পলি কান্ট...বিলিভ মি আমার কেমন সিক
লাগছে, নিজের মা’কে এখানে বসিয়ে রেখে ছেলে বেমালুম লান্ডান হাওয়া হয়ে গেল ! হি
সিম্পলি অ্যাবানডন্ড হার !!
- বল, ডাম্পট হার ! শুনলি না, ফ্ল্যাট-ট্যাট বেচে দিয়ে
টাকাপয়সা সব নিয়ে হাওয়া...আর মা আজ রাতে কোথায় যাবে তার ঠিক নেই, ফিউচারের কথা তো
ছেড়েই দিলাম...
- ইয়ে ম্যাডাম...মাসীমা, মাসীমা...
কি বলবে আমায় তোমরা ? কি সুন্দর ফুটফুটে মেয়েগুলো, কি বলবে
আমায় তোমরা ? এয়ারপোর্টটা অনেকটা ভিতরে, এখানে সব কিছু কাঁচে ঢাকা। বাইরের শব্দ
আসেনা। আমাদের হালিসহরের বাড়ির পাশে স্থানীয় সঙ্ঘের ঢাকের আওয়াজ পাওয়া যেত পঞ্চমী
থেকেই। আর সেলিমপুরের ফ্ল্যাটবাড়িটার পূব-দেওয়াল ঘেঁষেই তো প্যান্ডেল, ওখানে গত
ক’বছর হয়ে গেল ঢাকি আনেনা, ক্যানেস্তারা পেটানোর মত ক্যাটর ক্যাটর করে কি যে বাজায়
লোকগুলো। বিজুর তখন কতই বা বয়েস, প্রাইমারি পেরিয়েছে কেবল। গঙ্গার ঘাট থেকে ভাসান
দেখে রিক্সা চেপে ফেরবার সময় স্থানীয় সঙ্ঘের অন্ধকার শূণ্য প্যান্ডেলে জ্বলছিল
একটামাত্র প্রদীপ। দূরে শোনা যাচ্ছিল বিসর্জনের ঢাকের বোল। ও মা, ছেলেটা দেখি
হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর মাথাটা তাড়াতাড়ি বুকে চেপে ধরলাম, আর বিজু বলল, -
ভাসানের ঢাকের অমন কান্না কান্না আওয়াজ কেন হয় মা ?
- কাকে কল করছিস ? পুলিশ ?
- আমার কাকাকে। আমাদের ওখানে পাটুলিতে একটা ওল্ড এন্ড
ডিসেবেলদের ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আছে, কাকা তার সেক্রেটারি। ওরা যদি কোনো ব্যবস্থা
করতে পারে ভদ্রমহিলার...দেখ আমার হাত-পা কাঁপছে, ইটস নো লেস দ্যান এ
মার্ডার...দ্যাট গাই ইজ এ ব্রুট...
- কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ স্মিতা...কন্ট্রোল...সোসাইটিতে এরকম কত
হোয়াইট ক্রিমিন্যাল ঘুরে বেড়াচ্ছে তুই জানিস ?
- লুক অ্যাট হার, সি ইজ ইন অ্যাবসোলিউট স্টুপর, উনি কথা
বলবার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন...
ঢাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছ না তোমরা, তাই না ? বিসর্জনের সেই
কান্নাকান্না বোল ? আজ যে বিজয়া...বিজু ওর মা’কে ভাসান দিয়ে গেছে গো মেয়েরা...
বিজু, কি করছিস এখন ? খেয়েছিলি তো ? এখানকার ডাক্তার যে বলল
লিভারটা বেড়েছে তোর, সেই প্রাইমারিতে পড়বার সময় হেপাটাইটিস হয়েছিল, মাসখানেক কি
যমে-মানুষে টানাটানি। তোর বাবা পাগলের মত এ ডাক্তার সে ডাক্তার...সেই থেকেই
লিভারটা দুর্বল তোর। ওষুধটা নিয়ম করে খাস কিন্তু। আর, ভাল থাকিস বাবা।
*****
চোখ বুঁজে আরামের শেষ চুমুকে কফিটা শেষ করে কান থেকে হেডফোন
নামিয়ে ল্যাপটপটা খুললেন বিজিত বাসু। সেলিমপুরের ফ্ল্যাট বিক্রির পুরো চল্লিশ লাখ
টাকার এনআরও অ্যাকাউন্ট ট্রানজ্যাকশান সাকসেসফুল দেখিয়েছে সকালেই আইসিআইসিআই
গোলপার্ক। মেইলটার পিডিএফ সেভ করে রাখতে হচ্ছে। কাল হিথরো নেমে ডাভডেল অ্যাাভেনিউর
অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়ার আগে একবার ঘুরে অক্সফোর্ড স্ট্রীটে হ্যালিফ্যাক্স ব্যাঙ্ক
হয়ে যেতেই হবে, একটু রাউন্ড-অ্যাবাউট হয়ে যাবে, যাক। কিন্তু পাউন্ড কনভার্সানে কত
চার্জ কাটবে কে জানে, ফাইন্যাল অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সটা একেবারে আপডেট করে নিয়ে
গেলে ঝামেলা মিটে যায়, শান্তি।
(পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন
সম্পাদিত “ট্রৈনিক” শারদ সংখ্যা ১৪২২ এ প্রকাশিত)


No comments:
Post a Comment