Wednesday, 14 December 2011

সকল তোমার ইচ্ছা
জানিনা আর এ ই ব্লগ লিখতে পারবো কিনাসরকারবাহাদুর বলেছেন, এ ই সমস্ত সামাজিক কূটকাচাল ই-ক্ষেত্রগুলোতে বিনিপয়সায় প্রবল সম্মাননীয় ও প্রাতঃবন্দনীয় রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের নিয়ে ই ফাজলামি বন্ধ করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। শুধু একটা যেমনতেমন ই পরিচয় দিয়ে, একটা ই খাতা খুলে যে কেউ যা-খুশি-তাই লিখে যাবে, এর মুণ্ডু তার ঘাড়ে আর ওনার হাত তেনার কাঁধে মার্কা ছ্যাবলছবিতে (তামাশাচিত্র) ই গাত্র ভরিয়ে তুলবে, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাকেই সার্কাসের জোকারদের আখড়া হিসেবে প্রতিপন্ন করবে, কেলোর কীর্তিগুলোকে সোজাসাপ্টা কেলোর ই কর্ম বলে ই প্রচার করবে আর সংগে সংগে আরো লক্ষ জনা শিয়ালের মত তার ই পোঁ ধরবে, এবং এতাদৃশ কুকাজে প্রভূত আমোদ ও ই বন্ধুজনপ্রসাদ লাভ করবে, এ সিমপ্ল ই চলতে দেওয়া যায় না। এ ই হচ্ছে যাকে বলে ভুশুণ্ডীর মাঠে ভূতের কীর্তন। সব থেকে বড় কথা হোল, বহু গর্বের জনমতাদেশভিত্তিক এই বৃহত্তম গনতন্ত্রের নাটবল্টু-কলকব্জা যাঁরা, তাঁরা হলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং তাঁরা যে সকল ক্লেদের ঊর্ধে তা তাঁদের শুভ্রবসনেই প্রতিভাত (এঁরা মূলতঃ শ্বেত বস্ত্র/ভেক পরিধানে আসক্ত যদিচ ইদানীং কালে, যে কিছু নিখাদ শিল্পী নির্ভেজাল দেশপ্রেম নামক পৌরাণিক (ভিন্টেজ) সুরা যা কর্মাভাবে পেয়, তার প্রভাবে দেশদশকর্মে আত্মদান কবুল করেছেন, তাঁরা কিছু রঙ পরিধানে ব্যবহার করছেন; তবে এ বিচ্যুতি ধর্তব্য নয়, কারণ এঁদের অনেকেই পাদুকাতেও শ্বেতাসক্তি প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে থাকেন)এঁদের সৎ-চেতনা ও সদিচ্ছার ওপর বিশ্বাস যখন একবার সংখ্যাধিক্যে প্রমাণিত হয়েছে তখন সংবিধান মতে অন্তত পাঁচ বছরকাল সে বিশ্বাসের ভিতে ফাটল ধরাবার যে কোন ই প্রচেষ্টা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, তা অবশ্য নিবারণীয়।   
অর্থাৎ অতঃপর সরপঞ্চ কোনও শিক্ষিকার কপোলে চপেটাঘাত করলে, অথবা কোন জোয়ান-অব-আর্ক ভূমিকম্পের তীব্রতা ২০ পয়েন্টে মাপলে অথবা কোন ভূমিপুত্রী তাঁর দীক্ষাগুরুর স্মৃতিকানন স্থাপনে মাত্র একশো কোটি টাকা ব্যয় করলে; সবার উপরে পুঁজি সত্য বলে শ্রমিকনেতা নেত্য জুড়লে; কোন হাসপাতাল অসহায় রোগীর শেষ সম্বলটুকু চিকিৎসার নামে লুটে নিয়ে বিনিময়ে কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পের গ্যাসচেম্বারের মত বীভৎস মৃত্যু উপহার দিলে অথবা বাজারধর্মী কোন সংবাদমাধ্যম ঘোলাজলে মাছ (মুনাফা) ধরা ভিন্ন বকধর্মে উদ্যোগী হয়েছে দেখলে কোন “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর” ই মন্তব্য/চিত্র সাধারণ্যে চালাচালি করা চলবে না। সাধারণ্যে উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তালাভ করা সামাজিক কূটকাচালির ই-ক্ষেত্রগুলোকে এই মর্মে সরকারের তরফে এক বরিষ্ঠ বাহাদুর সতর্কবার্তা জারি করেছেন। বেশ করেছেন, কারণ রটনা এ ই যে, উক্ত বাহাদুর বর্তমান সরকারের প্রথম দফাতেই (যা এই সরকারের আলোকদশা নামে পরিচিত) তিনশো-গুণ ধনী হয়ে উঠেছেন যা তাঁর এই পর্বের আইন  সিদ্ধ কর্মলব্ধ বলে ঈষৎ আলোকপ্রাপ্তরা মেনে নিতে নাও পারেন। এবং কে না জানেন, আলোকদশার পরে আসে আঁধারদশা, আর সে দশায় কার-কার “রাশি রাশি ভারা ভারা, ধানকাটা হল সারা” তা ঘনায়মান অন্ধকারে ফসলশূণ্য মাঠ আবছা দেখলেও অনুমান করবার জন্য গান্ধীবাদী বা মার্ক্সবাদী হওয়ার কোন আশু প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না। তবে কোন মন্তব্য “আপত্তিকর” বা “প্ররোচনামূলক”, অথবা কোন চিত্র “অবমাননাকর” সে বিষয়ে সরকারের উক্ত বাহাদুর স্পষ্ট করে কিছু বলেননি, এবং সেই কারণেই জলবৎ স্পষ্ট যে, সমস্ত বিষয়ে একমাত্র সরকারি দৃষ্টিভঙ্গীর সমার্থক কার্যকলাপই কেবল গ্রহণীয় ও সেই কারণে অনুমোদনযোগ্য, বাকি সমস্ত মত ও পথই “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর”। (এহেন অনুসিদ্ধান্তে আপত্তি করা “আপত্তিকর” বা “প্ররোচনামূলক”।
অথচ, পাব্লিকের হাতে কোন ব্যাপারে তাৎক্ষণিক মতামত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আছেটা কি? না পেন, না পেন্সিল; কারণ শ্লেটটা যে বড্ড দামী। দু-চারজন ইয়ারবক্স জুটে বড়জোর চা-য়ের কাপে তুফান তুলতে পারেন, যদিও পরিবর্তিত সমাজজীবনের উর্ধ্বশ্বাসগতির কারণে বারোইয়ারি আড্ডা প্রায় বিলুপ্ত বললেই চলে। যদি মতামত ছাপার হরফে প্রকাশ করতে চান তো সেক্ষেত্রে মনে রাখতেই হয় যে, জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকার জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হল বিক্রির মাত্রা। কোন কোন বৃহৎ পত্রিকাগোষ্ঠীর উচ্চাকাঙ্খা বিক্রয়সঞ্জাত মুনাফা ছাপিয়ে আরও বেশি। তাঁরা তাঁদের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ-বিষয়-রচনাভঙ্গি-চিত্রাবলী-টীকা ইত্যাদি মারফত সামগ্রিক জনমানস ও জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে সততঃ প্রয়াসী, কারণ তাতে তাঁদের বিনিয়োগের দীর্ঘকালীন মুনাফাযোগ্যতা (profitability) সুনিশ্চিত হয়। ফলে এই কৌশলের পরিপন্থী কোন মতামত কখনো-সখনো তাঁদের প্রকাশনায় স্থান পেলে স্বভাবতঃই বোঝা যায়, বাজারে নিরপেক্ষতার মুখোসের দর ও কদর (বারে বারে ‘মুনাফা’ শব্দে দূষণ বাড়ছে, তাই অগত্যা) বেড়েছে। ঠিক এই বিষয়ে অবশ্য বৈদ্যুতিন মাধ্যমের কালোয়াতি তারিফযোগ্য। অ্যান্টেনায় কাক বসতে না বসতেই “মোহরকুঞ্জ থেকে সরাসরি”, অথবা, “নেশান-ওয়াইড” বিতর্ক (লাইভ)। কোন কোন চ্যানেলমালিক আবার টেলি-দর্শকের মেধার উপর পূর্ণ আস্থা না রাখতে পেরে প্রচারিত অনুষ্ঠানের নামকরণ করেছেন “প্রতিপক্ষ” – তবে যদি তাঁদের নিরপেক্ষতার সাধনা জনপ্রসাদলাভে সমর্থ হয় !! এতেও যদি হাসি না পায় তবে হাসি (জন্তুরা হাসতে পারেনা, হায়নার হাসি আদতে ডাক) বস্তুটি আছে কি করতে ?
তা এই বাজারে ই-ক্ষেত্রগুলো পাব্লিকের বেশ মনে ধরেছে। যৎসামান্য খরচে দু-চার কথা নিজের মতো করে বলবার এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে শেয়ার করবার একটা মঞ্চ পাওয়া গেছে। কোন বিষয়ে সক্কলে যে এককাট্টা হবেই তার কোন নিশ্চয়তা নেই, বরং চুড়ান্ত মতপার্থক্যেও টেবিল না চাপড়ে, খেউড়ে একে অন্যকে থামিয়ে না দিয়ে, অল্প কথায় নিজের মতামত জানাবার এর চেয়ে সুলভ ও শোভন আর কিছু সরকার সাধারণের জন্য ফেলে রাখেননি। সকলেই ঝান্ডা কাঁখে মেট্রো চ্যানেলে জনসাগরে সাঁতার দিতে নাও চাইতে পারেন, অথবা চুল-টুল বেঁধে, ফেস পাউডার মেখে হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে (প্রতিবাদেও ঈষৎ সাজগোজের প্রয়োজন আছে বৈ কি – ফেস-ভ্যালু বলে একটা ব্যাপার আছে না ? আজকাল আবার জ্বলন্ত মোম-মিছিল দিনের বেলাতেও সংগঠিত হয় দেখা যাচ্ছে, বোধকরি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের আবদারে। কে যেন কতকাল আগে বলেছিলেন, যে জন দিবসে, মনের হরষে (হুতাশে), জ্বালায় মোমের বাতি...) মূকমিছিলে পায়চারি করতে নাও চাইতে পারেন; কিন্তু তবুও কিছু বলতে চান, নিজের অনুভূতি সকলের সংগে বেঁটে নিতে চান। আজ যে ঘটনাটি তাঁকে নাড়া দিলো, তাঁর  মানসসরোবরে ঢেউ তুললো, বৃহৎ প্রেক্ষাপটে সেই দুলুনির কম্পাঙ্ক যতোই সামান্য হোক, তিনি তাঁর বন্ধুবর্গে সেই আলোড়ন ভাগ করে নিতে চাইতেই পারেন। এ এক নির্ভেজাল স্বার্থশূণ্য মানবিক বিনিময়। এক অন্য আনন্দ বাজার,  যেখানে কারুর চেয়ে পেছিয়ে পড়বার ভয় নেই। দু-এক দশক আগে চৌমাথার চা’য়ের দোকান, পার্কের বেঞ্চি আর কোন সহৃদয় বন্ধুর (আসলে, সহৃদয়া স্ত্রী-যুক্ত বন্ধু, বন্ধুর মান এখানে ধর্তব্য নয়) বৈঠকখানায় রোববারের সকাল যে কারণে প্রসিদ্ধ ছিলো। আজকের এই ই-দেওয়ালে বহুপাক্ষিক মতামতের ঠোকাঠুকিতে জব্বর জটলা চলে, কুৎসিত অসভ্যতা বা ভীতিপ্রদর্শন ছাড়াই যুক্তির তলোয়ারে যুক্তি কাটাকাটি চলে। এ এক এমন মঞ্চ যেখানে প্রকৃত অর্থেই সমাজতান্ত্রিক সাম্য বিরাজ করে। সমস্যা যে এদেশে এ মঞ্চের প্রসার এখনও অতি সীমিত। নীচে একটা তালিকা পেশ করা গেল যা বিশ্লেষণ করতে যাওয়া নেহাতই বাহুল্যমাত্র –
India : Internet Users Population Statistics
2011 (estm)
Population
1,189 Millions
Internet Users
1,12, Millions
% of Population
9.3%
%  of Urban Users in total internet users
79%
% of At least Once-in-a-month Users
90%
% of frequent users (at least for 10 days a month)
2.2%
% of internet users on mobile phones
8%
PCs in use
58.6 Millions
Internet Connections
14.7 Millions
Broadband Connections
11.9 Millions
যদিও এ ই-ব্যবহারকারীদের সংখ্যাবৃদ্ধির হার অতি সন্তোষজনক, গত বছরের সাপেক্ষে প্রায় ১৩% এবং এঁদের সংখ্যা ২০১৪-র মধ্যে তিনগুণ হয়ে যাবে বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। এর সংগে যদি হাতফোন-ব্যবহারকারীদের সংখ্যায় প্রতিমুহূর্তে কচুরিপানার মতো উল্কাগতির বৃদ্ধি যোগ করা যায়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে দুনিয়ার তাবৎ মুনাফাতাড়িত ই-পরিষেবাপ্রদানকারী বহুজাতিকের ঠিকানা যে ভারত (এবং চীন) সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলে তা “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর”।
তবে আজকের ই-পরিষেবার এই ২ .২ শতাংশ মোটামুটি নিয়মিত ও প্রধানতঃ নাগরিক ব্যবহারকারীদের ব্যবহারে সরকার উত্যক্ত হচ্ছেন কেন ? ঈশানকোণে বুঝি সিঁদুরে মেঘ দেখা যাচ্ছে ? ই-দেওয়ালে “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর” বস্তু দেখলে সরকারের তরফে মামলা ঠুকে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। নাকি সেখানে কিঞ্চিত অসুবিধা আছে, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোতে পারে এমত ভীতি বোধকরি অমূলক নয় ? তাই সহজতর পথ নেওয়া ? ক্রমবর্ধমান ই-বাজারের লোভনীয়তাকে সামনে রেখে ই-পরিষেবা সংস্থাগুলোকে তাঁদের নিজ-নিজ দেওয়াল নিজ দায়িত্বে “পরিচ্ছন্ন” রাখবার হুঁশিয়ারি দেওয়া যে “হুয়ারগুলান হারাদিন ঘোঁৎলায়” (মাননীয় তপন রায়চৌধুরী মশায় এসকল ভাষার অনুবাদ করতে মানা করেছেন, যাঁর বোঝার বুঝে নেবেন) তাদের নিবৃত্ত করুন, নচেৎ এ দেশে ব্যবসা করতে দেবো না। “হারাদিন” ঘোঁৎলানোর অধিকার এই বৃহত্তম গনতন্ত্রে একমাত্র জনপ্রতিনিধিকুলের। (দুরাচারী কেহ বা কাহারা গণতন্ত্রের মন্দির পার্লামেন্টকে “হুয়ারের খোঁয়াড়” বলেছিলো না? “তাগো হোগায়...” অনুবাদ নিষিদ্ধ)।    
মনে রাখতে অনুরোধ করি, জনপ্রতিনিধি মাত্রেই পেশায় রাজনীতিক নাও হতে পারেন, এঁদের অনেকেরই “সুপারি”-র বা অন্যতর ব্যবসা  আছে; কারও আছে উত্তরাধিকার; মোটকথা হোল, দেশের ও দশের মঙ্গলচিন্তা নামক নেশার বশে এঁরা আছাড়িবিছাড়ি খাচ্ছেন এবং নেহাতই বাকি নয়জনা চাইছে তাই বাধ্য হয়ে মঙ্গলকর্মপ্রসাদলাভে একনম্বরে নিজের নাম রেখেছেন। এই জনপ্রতিনিধিকুলের অনেকেই আলাদিনের দৈত্যের প্রভুও বটেন। অথবা টিনের তলোয়ারের পাটের দালাল ও গ্রেট বেংগল অপেরার স্বত্বাধিকারী বীরকৃষ্ণ দাঁ-র মতো, যিনি তাঁর দু-হাতে পরা আংটিগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটা দিয়ে “সাহিত্য-ফাহিত্য” সব কিনে নিতে পারেন বলে বেণীমাধব চাটুজ্জে ওরফে কাপ্তেনবাবুকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। দু-একটি মুদ্রণ/বৈদ্যুতিন মাধ্যম খরিদ করে ফেলা এঁদের অপ(বাম)হস্তামলকের কাজ। ভাত ছড়ালে মানুষ (অতীতে এদেরই ‘কাক’ বলা হ’ত; পঞ্চাশের মন্বন্তরের পর, এদের মেটামরফোসিস ঘটে) তো কোন ছার, সাংবাদিকেরও অভাব হয় না। এবং বাবু যা বলিবেন তার শতগুণ বলিবার জন্যই পোষ্য যে পোষিত হয় তা তর্কাতীত। তাহলে, পরিশেষে ব্যাপার কি দাঁড়ালো ? বাবু বা বিবি, দাদা বা দিদি যখন যেমন চাইবেন, যখন যেমন বলবেন, পোষ্যকুলের প্রবল ও সমস্বর সংকীর্তনের মাধ্যমে তাই পরম সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হবে। 
অতএব, সাধু সাবধান। সকল-ই “তোমার”-ই-ই-ই ইচ্ছা...।

Saturday, 8 October 2011

আমার দুর্গাপূজো

আমাদের ছোটকালের বেশিরভাগ আমোদই টেলিফোন-টেলিভিশনের ই-যুগে হারিয়ে গিয়েছে।  আজ আর আমার চেনা শহরের কোনো বাচ্চাকে তার বাবা একঘেঁয়েমি থেকে একটুকরো মুক্তি দিতে একচিলতে রেলব্রিজের ওপর থেকে অন্ধকার দক্ষিণদিক থেকে ধেয়ে আসা ৬।১৫-এর আপ মেল  লালগোলার আলো দেখায় না। ঝড়ের মতো সে ট্রেন কানে-তালা-লাগানো সিটি বাজিয়ে অকিঞ্চিতকর স্টেশনটাকে চমকে দিয়ে দুর্ধর্ষ তাতার দস্যুদলের ভঙ্গিতে উত্তরে উধাও হতো।  থর-থর কাঁপতে থাকা দুবলা রেলব্রিজে উৎসুক পিতা-পুত্রের মুখে উড়ে এসে পড়তো ধূলোবালি, শুকনো পাতা, খড়কুটো। চাপড় মেরে চুল থেকে ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে বাবা বলতো – “দেখলি ?” (অর্থাৎ, কেমন দেখালাম বল ?); ছেলের শিরায় রোমাঞ্চ, চোখে ঘোর। গাছে-গাছে ছাওয়া শহরতলিতে (আসলে, নিপাট গ্রাম) অন্ধকার তখন বেশ ঘন হয়ে উঠেছে। ব্রিজ থেকে নেমে একনম্বর প্লাটফর্মের একমাত্র স্টলে টিমটিমে আলোয় ছানার জিলিপি খাওয়া। এবং অবাক, বাবা জানতে চাইতো, “আরেকটা খাবি ?”; এখানে সংযোজনা - যাদের মনে নেই, তাদের জন্য ঃ আমাদের ছোটবেলায় বড়রা কেউ আমাদের কাছে কৈফিয়ত ছাড়া কিছু জানতে চাইতো না, পছন্দ-অপছন্দ বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারে তো নয়ই। আমরা বড়ই হয়েছি পছন্দ-অপছন্দ বা ইচ্ছা-অনিচ্ছাগুলো বড়দের হাতে ছেড়ে রেখে। এতে অবশ্য আমি আজ আর সেই বড়দের দোষও দেখতে পাই না। এখন, বলতে নেই, শিশুস্বাধীনতার প্রভূত প্রসারে আমি রীতিমতো চমকিত ও কখনও বা ঈষৎ শংকিতও বটেবলা বাহুল্য, আমি সেই সব শিশুদের কথা বলছি যারা পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়, মা’র এক্সরে নজরে হোমটাস্ক করে এবং ফাঁক পেলে টিভিতে কার্টুন চ্যানেল দ্যাখেফিরে যাই সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন একনম্বর প্লাটফর্মে। এবার ঘরে ফেরা, স্টেশন থেকে ফেরবার বেলা রিক্সায়। সেকালে আমার জীবনে রিক্সা-চাপা ছিলো যাকে বলে বিরল বিলাস। যা কিছু প্রানপণে চেয়েছি, তার একেবারে প্রথমদিকে আছে রিক্সার সামনে লাগানো কেরোসিন-লন্ঠন যার রশ্মি কেবল রিক্সাকাকুই দেখতে পেতো। আর আমি বাড়ির সামনে পৌঁছে, বাবা যতোক্ষণ ভাড়া দিতেন, সেই অবসরটুকুতে আশ মিটিয়ে দেখে নিতাম আমার সেই স্বপ্নবাতিটি। আহা কি রোমাঞ্চ   তার ওই ক্ষীণ উদ্ভাসে ! আহা কি অনন্য সুগন্ধ তার নিঃশ্বাসে ! এরপর সাতটায় হ্যারিকেনের  আলোয়  পড়তে বসা আছে, ন’টায় ঘুমে ঢুলে পড়ে বকুনি খাওয়া আছে, সাড়ে ন’টায় রাতের খাওয়া সেরে শুতে যাওয়া আছে । মাঝে তেল-শেষ-হয়ে-আসা হ্যারিকেনের নিস্তেজ আলোর বৃত্তের বাইরে ছাইগাদার আমগাছে জোনাকির ঝাড়লন্ঠন জ্বলতে দেখা আছে। তারপর অঘোর ঘুমে তাতার দস্যুদের আনাগোনা, তেপান্তরের মাঠের পারে ভূশুন্ডির চোখ, স্বপ্নবাতি হাতে আমি গহীন অরণ্যযাত্রী; কখনো অফিসার-কলোনির অদ্রিশেখরের মতো দু’দিকেই খোলে এমন পেন্সিলবক্স আমার হাতে।
এমত পৃথিবীতে যেখানে বাড়িতে সুইচ নামক ব্যাপারটির ছোট্ট হাতল তুললে ইলেকট্রিক বাতি জ্বলে ওঠাই এক বিষম বিস্ময় ছিলো, পগারের চানঘরে কলের চাবি ঘোরালে জলের ধারা এক অনির্বচনীয় ভগীরথীয় আনন্দ বয়ে আনতো, সেখানে দুর্গাপূজোর চার-চারটি দিন মানে ফূর্তির অকূল দরিয়ায় দেদার নৌকা ভাসানো। সাকুল্যে দু’টি মন্ডপ, দু’টি প্রতিমা – আনন্দের একুল-ওকুল, মাঝে উথাল-পাথাল বিধিবন্ধহীন চারটি দিন। একই ছিটের জামায় সজ্জিত দু’ভাই, পকেটে ঠাকুরমার দেওয়া কুবেরের ধন পকেট-মানি পাঁচ টাকা, নিতান্ত কৃপণের মতো চারটে দিনের এক-এক মুহুর্ত খরচ করতাম। প্রতিপলেই ভয় হতো, আহা এই মুহুর্তটি থেকে বুঝি বা সবটুকু শুষে নেওয়া গেলো না। তাহলেই তো ক্ষতি, এবং তা এমনই অপূরণীয় যে ভরতে হা-পিত্তেশ করে বসে থাকতে হবে দীর্ঘ একটি বছর। দীর্ঘ মানে কতো দীর্ঘ ? মাঝে তিন-তিনটে পরীক্ষার কালাহারি অথবা কারাকোরাম পার হওয়া, সেই সংক্রান্ত নিরস পাঁয়তাড়া, লাঞ্ছনা ও কখনো-সখনো পিঠ-চাপড়ানি (অর্থাৎ, চালিয়ে যাও, পরেরটার জন্য একইভাবে প্রস্তুত হও) ; জ্বর-সর্দি-কাশিতে ডাক্তারদাদুর পেন্টিড ৫০০ এবং মিক্সচার (এটা উপভোগ্য, বেশিতে আপত্তি ছিলো না), গরমের মুখে কলেরার টীকা (ভয়ে বাঁশবাগানে লুকিয়ে পড়তাম), ফোঁড়া এবং অ্যান্টিব্যাক্ট্রিনের গা-গুলিয়ে-ওঠা অত্যাচার, সামার ভ্যাকেশানে ফুটবল এবং স্কুলের দেওয়া বাড়ির কাজের মজুরগিরি, মাঝে হয়তো বা দিন-তিনেকের জন্য মামাবাড়ির আয়াস, ঝুলনে মাটির চাক কেটে পাহাড় বানানো আর তাতে খেলনা রেলগাড়ি চড়ে মনে মনে হিমালয়পাড়ি, রমেন(জীবনবিজ্ঞান)স্যার-এর প্যারেনকাইমা-স্কেরেনকাইমা, সুনীল(ভূগোল)স্যারের ‘রাজস্থানের জীবন-জীবিকা বলো’, অগাস্ট মাস থেকে একটি একটি করুণ দিন গোনা যার শেষে এক ভোররাতে আকাশভরে অমোঘ মুক্তির ধ্বনি বেজে উঠতো, “জাগো, তুমি জা-আ-আ-গো”, এবং আমি জেগে উঠতাম সানন্দ সকালে। বাবা একবার শেখালেন, “যেও না নবমী নিশি লয়ে তারাদলে”। আমরা ভাসান দেখতে যেতাম গঙ্গার পাড়ে। এতোদিনের সযত্ন যোগাড়যন্ত্র একদল শক্তপোক্ত লোকের কাঁধে চেপে গঙ্গাগর্ভে মিলিয়ে যেতে দেখতাম। এতো শুধু ঠাকুর ভাসান নয়, ওরই সঙ্গে বিলীন হয়ে যেতো বছরভর চাতকের প্রতীক্ষার পরে ক্ষনিক মুক্তির উল্লাস, জলে ধুয়ে-যাওয়া রিক্ত কাঠামোর মতো ভেসে উঠতো আগামী এক বছরের নিরানন্দের কঙ্কাল। বাড়ি ফেরবার পথে আঁধারঘেরা শূন্য মন্ডপে আমারই হাহাকারের মতো জ্বলতো একটিমাত্র প্রদীপ। অন্ধকারে লুকিয়ে চোখ মুছে নিতাম। সে রাতে অনেকক্ষণ জেগে থাকতাম...পশ্চিমে দমকা বাতাসে তখনো আবছা ভেসে আসতো ভাসানের ঢাকের বোল। যেন আমার নিভে আসা আনন্দিত চেতনার ক্রমক্ষীয়মান হৃদস্পন্দন। তারপর কখন জানি সব শব্দ থেমে যেতো। আমি অশ্রুসিক্ত বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়তাম।
কাগজে পড়ছিলাম বিতর্কঃ দুর্গোৎসব এক মহা অপচয় – পক্ষে ও বিপক্ষে। বিপক্ষের তার্কিকরা দুর্গাপূজোকে এই রূদ্ধশ্বাস গতির যুগে আপাতঃ বিচ্ছিন্ন বাঙালীর মিলন-অবকাশ, বাঙালীয়ানার সদর্প প্রকাশমঞ্চ ইত্যাদি অতি জরূরী বিষয়ের প্রেক্ষাপটে সমর্থন করেছেনপক্ষের ওঁরা কামান দেগেছেন, দুর্গাপূজো এই মন্দার দুনিয়ায় নেহাতই বেহিসাবি অর্থোপচয়, যা কেবল মুদ্রাস্ফীতিকে স্ফীত করে নির্ধনের ন্যূনতম বেঁচে থাকাকে কঠিনতর করে তোলে। একজন পরিবেশবাদী বলেছেন, দুর্গাপূজো মানেই নির্বিচার বৃক্ষছেদন (!), পরিবেশের দূষণ ও তার অবনয়নমাত্রা বৃদ্ধি এবং ফলে আন্তঃ-প্রজন্ম সমতা (inter-generational equity) বিনষ্ট হয়ে স্থিতিশীল উন্নয়ন বিঘ্নিত হচ্ছে। এতাদৃশ মহতি আলোচনায় অংশগ্রহণের ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি কেবল দেখে এসেছি যে, এযাবৎ যে জীবন বরাবর আমার থেকে কমপক্ষে দশবছর আগে আগে হাঁটে, সে তার অগ্রবর্তী স্ফটিকমিনার থেকে সস্নেহে নেমে এসে আমার শৈশবের হাত ধরতো দুর্গাপূজোর ওই চারটি দিন। ব্যাপারটা আরেকটু খোলসা করা যাক। ধরা যাক, আমার স্কুলের সহপাঠী তাপসের কথা। জ্যামিতির জটিলরস যা সে বারো বছরে আস্বাদন করতে সক্ষম হয়েছিলো, আমায় তা অনুধাবন করতে বাইশে পৌঁছতে হয়েছে। তাই সে নাসায় কর্মরত আর আমি সামান্য কলেজশিক্ষক মাত্র। সৌরভ গাঙ্গুলি ক্রিকেটের যে প্রকরণ পনেরোতে রপ্ত করেছে, আমার তা বুঝতে বত্রিশ বছর লেগেছে ; বত্রিশের নিজস্ব দাবিদাওয়া মিটিয়ে সে প্রকরণের প্রায়োগিক দক্ষতা এ জীবনে আর অর্জন করা বৈজ্ঞানিক কারণেই সম্ভব নয়ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের পিঠ-চাপড়ানিতেই ফুরিয়ে গিয়েছে আমার ক্রিকেট-অভিযান। এমনকি যে বিষয়টি নিয়ে এতোটা দূর ঘষটেছি, সেই অর্থশাস্ত্রের প্রাথমিক সুত্রগুলো অনেকেই পঁচিশে বেশ বুঝে নিয়েছেন আর আমি চল্লিশ পেরিয়ে আজও তাতেই হাতড়ে বেড়াই। ফলে তাঁরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ঘটন-অঘটন পত্রপত্রিকায় এবং টিভির পর্দায় যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করেন, আর আমি ওইসব বিষয়ে মুখ খুলতে হলেই মারাত্মক হীনমন্যতায় ভুগি। তা যা বলছিলাম, দুর্গাপূজোর ওই ক’টা দিন যেন এই পশ্চাদপদতা মুছে দিয়ে আমায় জীবনের সঙ্গে একসারিতে দাঁড় করিয়ে দিতো। যেখানে আমার সঙ্গে ভবিষ্যতের মহাকাশবিজ্ঞানী, সফল খেলোয়াড় অথবা তিননং-পাতার কীর্তিমান -সবাই ছিটের বেঢপ হাফপ্যান্ট বা ফ্রক পরে গর্বিত আনন্দে উচ্ছল। কেউ কোন জন্মলব্ধ কবচ-কুন্ডলে গরিয়ান নয়, কেউ দু’দিকে-খোলে-এমন পেন্সিলবাক্সর অভাবে হীন নয়। যদিও এই সাম্যলীলার মেয়াদ মাত্র চারটি দিন, মুঠো করে ধরবার আগেই আঙ্গুলের ফাঁক গলে পিছলে যেতো সময়, তবুও হাস্নুহানার হাল্কা গন্ধের মতো বেশ কিছুদিন তার ঘোরলাগা রেশ রয়েই যেতো। সেই সুবাসিত সমতার তিরতিরে স্রোতে কেটে যেতো আমার আরো দু’একটা সপ্তাহ। বাহান্ন বিয়োগ দুই কি তিন, সমান-সমান পঞ্চাশ বা ঊনপঞ্চাশ। দাঁড়িপাল্লার একদিকে এই দুই সপ্তাহ সমানে পাল্লা টানতো অপরদিকের পঞ্চাশের।
আজও আমি কোন মন্ডপে দাঁড়িয়ে বৈভব দেখতে পাইনা, দেখতে পাইনা সাড়ম্ববর আলোর রোশনাই। শুনতে পাইনা রবীন্দ্রসঙ্গীত। চোখের কোণে দেখতে পাই, আগামী-দু’বছর-ধরে-পরা-যাবে-এমন হাফপ্যান্ট, অ্যাপোলো টেলার্সের তৈরী ঢলঢলে ছিটের জামা গায়ে, পায়ে অক্ষয় নটিবয় জুতো-পরা আমার হাঁ-করা শৈশব, মন্ডপের নায়ক ঢাকিকাকুর দু’কাঠির জাদুর সম্মোহনে ও কাঁসর-হাতে ওর ছেলের সৌভাগ্যে বিমোহিত... “যেও না নবমী নিশি লয়ে তারাদলে...”।

Tuesday, 4 October 2011

কমিউনিস্টি

অন্নদাশংকর রায়

যেখানে যা কিছু ঘটে অনিস্টি
সকলের মূলে কমিউনিস্টি
মূর্শিদাবাদে হয় না বৃষ্টি,
গোড়ায় কে তার? কমিউনিস্টি।
পাবনায় ভেসে গিয়েছে সৃষ্টি,
তলে তলে কেটা? কমিউনিস্টি।
কোথা হতে এলো যত পাপিষ্ঠি।
নিয়ে এলো প্লেগ, কমিউনিস্টি।
গেল সংস্কৃতি, গেল যে কৃষ্টি
ছেলেরা বললো কমিউনিস্টি।
মেয়েরাও ওতে পায় কি মিষ্টি
সেধে গুলি খায় কমিউনিষ্টি।
যেদিকে পড়ে আমার দৃষ্টি
সেদিকেই দেখি কমিউনিস্টি।
তাই বসে বসে করছি লিস্টি
এ পাড়ায় কে কে কমিউনিস্টি।