সকল ই তোমার ই ইচ্ছা
জানিনা আর এ ই ব্লগ লিখতে পারবো কিনা। সরকারবাহাদুর বলেছেন, এ ই সমস্ত সামাজিক কূটকাচাল ই-ক্ষেত্রগুলোতে বিনিপয়সায় প্রবল সম্মাননীয় ও প্রাতঃবন্দনীয় রাজনৈতিক নেতা-নেত্রীদের নিয়ে ই ফাজলামি বন্ধ করতে তাঁরা বদ্ধপরিকর। শুধু একটা যেমনতেমন ই পরিচয় দিয়ে, একটা ই খাতা খুলে যে কেউ যা-খুশি-তাই লিখে যাবে, এর মুণ্ডু তার ঘাড়ে আর ওনার হাত তেনার কাঁধে মার্কা ছ্যাবলছবিতে (তামাশাচিত্র) ই গাত্র ভরিয়ে তুলবে, গোটা রাজনৈতিক ব্যবস্থাটাকেই সার্কাসের জোকারদের আখড়া হিসেবে প্রতিপন্ন করবে, কেলোর কীর্তিগুলোকে সোজাসাপ্টা কেলোর ই কর্ম বলে ই প্রচার করবে আর সংগে সংগে আরো লক্ষ জনা শিয়ালের মত তার ই পোঁ ধরবে, এবং এতাদৃশ কুকাজে প্রভূত আমোদ ও ই বন্ধুজনপ্রসাদ লাভ করবে, এ সিমপ্ল ই চলতে দেওয়া যায় না। এ ই হচ্ছে যাকে বলে ভুশুণ্ডীর মাঠে ভূতের কীর্তন। সব থেকে বড় কথা হোল, বহু গর্বের জনমতাদেশভিত্তিক এই বৃহত্তম গনতন্ত্রের নাটবল্টু-কলকব্জা যাঁরা, তাঁরা হলেন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি এবং তাঁরা যে সকল ক্লেদের ঊর্ধে তা তাঁদের শুভ্রবসনেই প্রতিভাত (এঁরা মূলতঃ শ্বেত বস্ত্র/ভেক পরিধানে আসক্ত। যদিচ ইদানীং কালে, যে কিছু নিখাদ শিল্পী নির্ভেজাল দেশপ্রেম নামক পৌরাণিক (ভিন্টেজ) সুরা যা কর্মাভাবে পেয়, তার প্রভাবে দেশদশকর্মে আত্মদান কবুল করেছেন, তাঁরা কিছু রঙ পরিধানে ব্যবহার করছেন; তবে এ বিচ্যুতি ধর্তব্য নয়, কারণ এঁদের অনেকেই পাদুকাতেও শ্বেতাসক্তি প্রতিনিয়ত প্রকাশ করে থাকেন)। এঁদের সৎ-চেতনা ও সদিচ্ছার ওপর বিশ্বাস যখন একবার সংখ্যাধিক্যে প্রমাণিত হয়েছে তখন সংবিধান মতে অন্তত পাঁচ বছরকাল সে বিশ্বাসের ভিতে ফাটল ধরাবার যে কোন ই প্রচেষ্টা কেবল নিন্দনীয়ই নয়, তা অবশ্য নিবারণীয়।
অর্থাৎ অতঃপর সরপঞ্চ কোনও শিক্ষিকার কপোলে চপেটাঘাত করলে, অথবা কোন জোয়ান-অব-আর্ক ভূমিকম্পের তীব্রতা ২০ পয়েন্টে মাপলে অথবা কোন ভূমিপুত্রী তাঁর দীক্ষাগুরুর স্মৃতিকানন স্থাপনে মাত্র একশো কোটি টাকা ব্যয় করলে; সবার উপরে পুঁজি সত্য বলে শ্রমিকনেতা নেত্য জুড়লে; কোন হাসপাতাল অসহায় রোগীর শেষ সম্বলটুকু চিকিৎসার নামে লুটে নিয়ে বিনিময়ে কনসেন্ট্রেশান ক্যাম্পের গ্যাসচেম্বারের মত বীভৎস মৃত্যু উপহার দিলে অথবা বাজারধর্মী কোন সংবাদমাধ্যম ঘোলাজলে মাছ (মুনাফা) ধরা ভিন্ন বকধর্মে উদ্যোগী হয়েছে দেখলে কোন “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর” ই মন্তব্য/চিত্র সাধারণ্যে চালাচালি করা চলবে না। সাধারণ্যে উত্তরোত্তর জনপ্রিয়তালাভ করা সামাজিক কূটকাচালির ই-ক্ষেত্রগুলোকে এই মর্মে সরকারের তরফে এক বরিষ্ঠ বাহাদুর সতর্কবার্তা জারি করেছেন। বেশ করেছেন, কারণ রটনা এ ই যে, উক্ত বাহাদুর বর্তমান সরকারের প্রথম দফাতেই (যা এই সরকারের আলোকদশা নামে পরিচিত) তিনশো-গুণ ধনী হয়ে উঠেছেন যা তাঁর এই পর্বের আইন সিদ্ধ কর্মলব্ধ বলে ঈষৎ আলোকপ্রাপ্তরা মেনে নিতে নাও পারেন। এবং কে না জানেন, আলোকদশার পরে আসে আঁধারদশা, আর সে দশায় কার-কার “রাশি রাশি ভারা ভারা, ধানকাটা হল সারা” তা ঘনায়মান অন্ধকারে ফসলশূণ্য মাঠ আবছা দেখলেও অনুমান করবার জন্য গান্ধীবাদী বা মার্ক্সবাদী হওয়ার কোন আশু প্রয়োজন আছে বলে মনে হয়না। তবে কোন মন্তব্য “আপত্তিকর” বা “প্ররোচনামূলক”, অথবা কোন চিত্র “অবমাননাকর” সে বিষয়ে সরকারের উক্ত বাহাদুর স্পষ্ট করে কিছু বলেননি, এবং সেই কারণেই জলবৎ স্পষ্ট যে, সমস্ত বিষয়ে একমাত্র সরকারি দৃষ্টিভঙ্গীর সমার্থক কার্যকলাপই কেবল গ্রহণীয় ও সেই কারণে অনুমোদনযোগ্য, বাকি সমস্ত মত ও পথই “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর”। (এহেন অনুসিদ্ধান্তে আপত্তি করা “আপত্তিকর” বা “প্ররোচনামূলক”।
অথচ, পাব্লিকের হাতে কোন ব্যাপারে তাৎক্ষণিক মতামত প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে আছেটা কি? না পেন, না পেন্সিল; কারণ শ্লেটটা যে বড্ড দামী। দু-চারজন ইয়ারবক্স জুটে বড়জোর চা-য়ের কাপে তুফান তুলতে পারেন, যদিও পরিবর্তিত সমাজজীবনের উর্ধ্বশ্বাসগতির কারণে বারোইয়ারি আড্ডা প্রায় বিলুপ্ত বললেই চলে। যদি মতামত ছাপার হরফে প্রকাশ করতে চান তো সেক্ষেত্রে মনে রাখতেই হয় যে, জনপ্রিয় পত্র-পত্রিকার জনপ্রিয়তার মাপকাঠি হল বিক্রির মাত্রা। কোন কোন বৃহৎ পত্রিকাগোষ্ঠীর উচ্চাকাঙ্খা বিক্রয়সঞ্জাত মুনাফা ছাপিয়ে আরও বেশি। তাঁরা তাঁদের পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদ-বিষয়-রচনাভঙ্গি-চিত্রাবলী-টীকা ইত্যাদি মারফত সামগ্রিক জনমানস ও জনমত নিয়ন্ত্রণ করতে সততঃ প্রয়াসী, কারণ তাতে তাঁদের বিনিয়োগের দীর্ঘকালীন মুনাফাযোগ্যতা (profitability) সুনিশ্চিত হয়। ফলে এই কৌশলের পরিপন্থী কোন মতামত কখনো-সখনো তাঁদের প্রকাশনায় স্থান পেলে স্বভাবতঃই বোঝা যায়, বাজারে নিরপেক্ষতার মুখোসের দর ও কদর (বারে বারে ‘মুনাফা’ শব্দে দূষণ বাড়ছে, তাই অগত্যা) বেড়েছে। ঠিক এই বিষয়ে অবশ্য বৈদ্যুতিন মাধ্যমের কালোয়াতি তারিফযোগ্য। অ্যান্টেনায় কাক বসতে না বসতেই “মোহরকুঞ্জ থেকে সরাসরি”, অথবা, “নেশান-ওয়াইড” বিতর্ক (লাইভ)। কোন কোন চ্যানেলমালিক আবার টেলি-দর্শকের মেধার উপর পূর্ণ আস্থা না রাখতে পেরে প্রচারিত অনুষ্ঠানের নামকরণ করেছেন “প্রতিপক্ষ” – তবে যদি তাঁদের নিরপেক্ষতার সাধনা জনপ্রসাদলাভে সমর্থ হয় !! এতেও যদি হাসি না পায় তবে হাসি (জন্তুরা হাসতে পারেনা, হায়নার হাসি আদতে ডাক) বস্তুটি আছে কি করতে ?
তা এই বাজারে ই-ক্ষেত্রগুলো পাব্লিকের বেশ মনে ধরেছে। যৎসামান্য খরচে দু-চার কথা নিজের মতো করে বলবার এবং বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে শেয়ার করবার একটা মঞ্চ পাওয়া গেছে। কোন বিষয়ে সক্কলে যে এককাট্টা হবেই তার কোন নিশ্চয়তা নেই, বরং চুড়ান্ত মতপার্থক্যেও টেবিল না চাপড়ে, খেউড়ে একে অন্যকে থামিয়ে না দিয়ে, অল্প কথায় নিজের মতামত জানাবার এর চেয়ে সুলভ ও শোভন আর কিছু সরকার সাধারণের জন্য ফেলে রাখেননি। সকলেই ঝান্ডা কাঁখে মেট্রো চ্যানেলে জনসাগরে সাঁতার দিতে নাও চাইতে পারেন, অথবা চুল-টুল বেঁধে, ফেস পাউডার মেখে হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে (প্রতিবাদেও ঈষৎ সাজগোজের প্রয়োজন আছে বৈ কি – ফেস-ভ্যালু বলে একটা ব্যাপার আছে না ? আজকাল আবার জ্বলন্ত মোম-মিছিল দিনের বেলাতেও সংগঠিত হয় দেখা যাচ্ছে, বোধকরি বৈদ্যুতিন মাধ্যমের আবদারে। কে যেন কতকাল আগে বলেছিলেন, যে জন দিবসে, মনের হরষে (হুতাশে), জ্বালায় মোমের বাতি...) মূকমিছিলে পায়চারি করতে নাও চাইতে পারেন; কিন্তু তবুও কিছু বলতে চান, নিজের অনুভূতি সকলের সংগে বেঁটে নিতে চান। আজ যে ঘটনাটি তাঁকে নাড়া দিলো, তাঁর মানসসরোবরে ঢেউ তুললো, বৃহৎ প্রেক্ষাপটে সেই দুলুনির কম্পাঙ্ক যতোই সামান্য হোক, তিনি তাঁর বন্ধুবর্গে সেই আলোড়ন ভাগ করে নিতে চাইতেই পারেন। এ এক নির্ভেজাল স্বার্থশূণ্য মানবিক বিনিময়। এক অন্য আনন্দ বাজার, যেখানে কারুর চেয়ে পেছিয়ে পড়বার ভয় নেই। দু-এক দশক আগে চৌমাথার চা’য়ের দোকান, পার্কের বেঞ্চি আর কোন সহৃদয় বন্ধুর (আসলে, সহৃদয়া স্ত্রী-যুক্ত বন্ধু, বন্ধুর মান এখানে ধর্তব্য নয়) বৈঠকখানায় রোববারের সকাল যে কারণে প্রসিদ্ধ ছিলো। আজকের এই ই-দেওয়ালে বহুপাক্ষিক মতামতের ঠোকাঠুকিতে জব্বর জটলা চলে, কুৎসিত অসভ্যতা বা ভীতিপ্রদর্শন ছাড়াই যুক্তির তলোয়ারে যুক্তি কাটাকাটি চলে। এ এক এমন মঞ্চ যেখানে প্রকৃত অর্থেই সমাজতান্ত্রিক সাম্য বিরাজ করে। সমস্যা যে এদেশে এ মঞ্চের প্রসার এখনও অতি সীমিত। নীচে একটা তালিকা পেশ করা গেল যা বিশ্লেষণ করতে যাওয়া নেহাতই বাহুল্যমাত্র –
India : Internet Users Population Statistics 2011 (estm) | |
Population | 1,189 Millions |
Internet Users | 1,12, Millions |
% of Population | 9.3% |
% of Urban Users in total internet users | 79% |
% of At least Once-in-a-month Users | 90% |
% of frequent users (at least for 10 days a month) | 2.2% |
% of internet users on mobile phones | 8% |
PCs in use | 58.6 Millions |
Internet Connections | 14.7 Millions |
Broadband Connections | 11.9 Millions |
যদিও এ ই-ব্যবহারকারীদের সংখ্যাবৃদ্ধির হার অতি সন্তোষজনক, গত বছরের সাপেক্ষে প্রায় ১৩% এবং এঁদের সংখ্যা ২০১৪-র মধ্যে তিনগুণ হয়ে যাবে বলে তথ্যাভিজ্ঞ মহল মনে করছেন। এর সংগে যদি হাতফোন-ব্যবহারকারীদের সংখ্যায় প্রতিমুহূর্তে কচুরিপানার মতো উল্কাগতির বৃদ্ধি যোগ করা যায়, তাহলে আগামী কয়েক বছরে দুনিয়ার তাবৎ মুনাফাতাড়িত ই-পরিষেবাপ্রদানকারী বহুজাতিকের ঠিকানা যে ভারত (এবং চীন) সে বিষয়ে সন্দেহ থাকলে তা “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর”।
তবে আজকের ই-পরিষেবার এই ২ .২ শতাংশ মোটামুটি নিয়মিত ও প্রধানতঃ নাগরিক ব্যবহারকারীদের ব্যবহারে সরকার উত্যক্ত হচ্ছেন কেন ? ঈশানকোণে বুঝি সিঁদুরে মেঘ দেখা যাচ্ছে ? ই-দেওয়ালে “আপত্তিকর”, “প্ররোচনামূলক” বা “অবমাননাকর” বস্তু দেখলে সরকারের তরফে মামলা ঠুকে দিলেই তো ল্যাঠা চুকে যায়। নাকি সেখানে কিঞ্চিত অসুবিধা আছে, কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরোতে পারে এমত ভীতি বোধকরি অমূলক নয় ? তাই সহজতর পথ নেওয়া ? ক্রমবর্ধমান ই-বাজারের লোভনীয়তাকে সামনে রেখে ই-পরিষেবা সংস্থাগুলোকে তাঁদের নিজ-নিজ দেওয়াল নিজ দায়িত্বে “পরিচ্ছন্ন” রাখবার হুঁশিয়ারি দেওয়া যে “হুয়ারগুলান হারাদিন ঘোঁৎলায়” (মাননীয় তপন রায়চৌধুরী মশায় এসকল ভাষার অনুবাদ করতে মানা করেছেন, যাঁর বোঝার বুঝে নেবেন) তাদের নিবৃত্ত করুন, নচেৎ এ দেশে ব্যবসা করতে দেবো না। “হারাদিন” ঘোঁৎলানোর অধিকার এই বৃহত্তম গনতন্ত্রে একমাত্র জনপ্রতিনিধিকুলের। (দুরাচারী কেহ বা কাহারা গণতন্ত্রের মন্দির পার্লামেন্টকে “হুয়ারের খোঁয়াড়” বলেছিলো না? “তাগো হোগায়...” অনুবাদ নিষিদ্ধ)।
মনে রাখতে অনুরোধ করি, জনপ্রতিনিধি মাত্রেই পেশায় রাজনীতিক নাও হতে পারেন, এঁদের অনেকেরই “সুপারি”-র বা অন্যতর ব্যবসা আছে; কারও আছে উত্তরাধিকার; মোটকথা হোল, দেশের ও দশের মঙ্গলচিন্তা নামক নেশার বশে এঁরা আছাড়িবিছাড়ি খাচ্ছেন এবং নেহাতই বাকি নয়জনা চাইছে তাই বাধ্য হয়ে মঙ্গলকর্মপ্রসাদলাভে একনম্বরে নিজের নাম রেখেছেন। এই জনপ্রতিনিধিকুলের অনেকেই আলাদিনের দৈত্যের প্রভুও বটেন। অথবা টিনের তলোয়ারের পাটের দালাল ও গ্রেট বেংগল অপেরার স্বত্বাধিকারী বীরকৃষ্ণ দাঁ-র মতো, যিনি তাঁর দু-হাতে পরা আংটিগুলোর মধ্যে মাত্র কয়েকটা দিয়ে “সাহিত্য-ফাহিত্য” সব কিনে নিতে পারেন বলে বেণীমাধব চাটুজ্জে ওরফে কাপ্তেনবাবুকে হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন। দু-একটি মুদ্রণ/বৈদ্যুতিন মাধ্যম খরিদ করে ফেলা এঁদের অপ(বাম)হস্তামলকের কাজ। ভাত ছড়ালে মানুষ (অতীতে এদেরই ‘কাক’ বলা হ’ত; পঞ্চাশের মন্বন্তরের পর, এদের মেটামরফোসিস ঘটে) তো কোন ছার, সাংবাদিকেরও অভাব হয় না। এবং বাবু যা বলিবেন তার শতগুণ বলিবার জন্যই পোষ্য যে পোষিত হয় তা তর্কাতীত। তাহলে, পরিশেষে ব্যাপার কি দাঁড়ালো ? বাবু বা বিবি, দাদা বা দিদি যখন যেমন চাইবেন, যখন যেমন বলবেন, পোষ্যকুলের প্রবল ও সমস্বর সংকীর্তনের মাধ্যমে তাই পরম সত্য বলে প্রতিষ্ঠিত হবে।
অতএব, সাধু সাবধান। সকল-ই “তোমার”-ই-ই-ই ইচ্ছা...।

