আমি রবীন্দ্রনাথকে চিনতাম। আমি সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, যামিনী রায়, উত্তমকুমার, উমাপতিকুমার
প্রভৃতিদেরও চিনতাম। এবং, বিশেষতঃ আমি যে সব সেনেদের চিনতাম তাঁরা প্রত্যেকেই আপন
প্রতিভার দ্যূতিতে ও কীর্তির ব্যাপকতায় আমাকে আপ্লুত করেছেন। যথা, বল্লাল সেন, সানইয়াৎ
সেন, আমুন্ড সেন, স্যামুয়েলসেন (Samuelson), অমর্ত্য সেন, ভীম সেন
(মধ্যম পান্ডব বা যোশী, যাকেই ধরুন না কেন), মৃণাল সেন, সুচিত্রা সেন, সুদীপ্ত সেন
ও সেনদাদু...প্রত্যেকেই আপনাপন ক্ষেত্রে সেনসেশন্যাল...কত বলব। উপরোক্ত
বুধমন্ডলীতে শেষোক্ত মহামানব বাকিদের থেকে ঈষৎ তফাতে থাকবেন, যদিও এ আলোচনায় সে
তফাত ধর্তব্য নয়। এবং সে তফাত হল এই যে, বাকিদের প্রত্যেককেই কেবল আমি চিনি বা
চিনতাম। শেষোক্ত মহাত্মনই একমাত্র, যিনি আমাকে চিনতেন। স্বর্গীয় প্রতিভার
স্বর্ণাসনে অভিষিক্ত, অথচ আমাকে বেমালুম চেনেন, এমন ঘটনা বলতে আমার জীবনে একমাত্র
সেনদাদু। সেনদাদুর কথা অমৃতসমান। আমার এক সিনিয়র দাদা বলেন সেনদাদু নাকি আমার
সৃষ্টি; আমার, কি যেন বলে, ‘অলটার ইগো’। হায় রে, আমি যদি ওই মাত্রার ইন্টেলেক্ট
পেতাম, তাহলে কি আর স্রেফ কথক ‘সঞ্জয়’ হয়ে জীবন কাটত, কুরুক্ষেত্রে রথী-মহারথী না
হোক, দু’-একটা পাতি সেপাই অন্তত বধ করে বীর অথবা সুশীলের মর্যাদা ছিনিয়ে নিতে
পারতাম।
সেনদাদু কর্মজীবনে শুনেছি রেলের গার্ড ছিলেন।
সেনদাদুর কাহিনীর সঙ্গে রেল-যোগাযোগ বলতে একমাত্র এইটুকুই। শুরুতেই হলপ করে
বলছি, সেনদাদুর প্রত্যেকটি গল্পই যাকে বলে সত্যকাহিনী অবলম্বনে, কেবল সাহিত্যের
খাতিরে এখানে ওখানে আধ-আধটু পলেস্তারা রিপেয়ার করা। ফলে গল্প (নাকি ঘটনাবলী বলবো
?) যাই হোক, তার কোন কৃতিত্ব বা দায় কোনোটাই কিন্তু পরিবেশক ‘সঞ্জয়’-এর নয়।
সেনদাদুর প্রথম কাহিনীটি আমার বাবার মুখে শোনা। সে বোধহয় ১৯৫৫-৫৬ সাল হবে। ওপার
বাংলা থেকে আগত উদ্বাস্তুদের কলোনিতে প্রথমেই তৈরি হ’ল একটি ক্লাব নাম স্থানীয়
সংঘ। কলোনির বিপদে-আপদে বুক পেতে দাঁড়ানো, বিকেলে ফুটবল, বছরে একটি
রবীন্দ্রজয়ন্তী, তারপর সামান্য সংস্থানে একটি দুর্গাপুজো, কালে কালে ক্লাবের নিজের
বাড়ি তৈরি হ’লে সকালে সেখানে মেয়েদের প্রাইমারি স্কুল বসানো – এই হ’ল সেকালের সেই
স্থানীয় সংঘ। উল্ল্যেখ থাকে যে, সেই সময় (পঞ্চাশে দশকের প্রথম ভাগে) বিশ ত্রিশ
কিলোমিটারের মধ্যে ছেলেদের হাইস্কুল ছিল তিনখানা, একটা কলেজ ছিল (ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র
কলেজ), কিন্তু মেয়েদের জন্য ওই স্থানীয় সংঘ গার্লস প্রাইমারি স্কুলই একমাত্র।
ক্লাবের বয়ঃজ্যেষ্ঠরা তাই এলাকার মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে একটি মেয়েদের হাইস্কুল
স্থাপন করতে উদ্যোগী হবেন বলে মনস্থ করেন। অন্যদিকে কলেজের পড়া শেষ করে সদ্য
চাকরিতে ঢোকা আমার বাবার মত তরুণ সদস্যবৃন্দের নজর ছিল উঁচুতে, তাঁদের মত হ’ল, এলাকায়
একটা কলেজ হ’লে এলাকার ইজ্জত বহুগুণে বেড়ে যাবে। তা ক্লাবের বার্ষিক সভার আগে এই
তরুণদল জোট বাঁধলেন যে কোন মূল্যে ক্লাবকে কলেজ স্থাপনের পথে নিয়ে যেতে হবে,
বুড়োদের পশ্চাদপদতার বাধা টপকে। যথারীতি সাধারণ সভায় বয়স্কদের মেয়েদের জন্য
হাইস্কুলের প্রস্তাব যুবশক্তির কাছে হার মানবার মুখে এসে দাঁড়ালো। আসন্ন জয়ের চাপা
উল্লাসে তরুণ সদস্যরা প্রায় উপচে পড়েন এমন সময়ে, সেনদাদু মুখ খুললেন। মনমরা বয়স্ক
সদস্যদের উৎসাহ দিতেই যেন বললেন, “ আপনেরা অমন মুখ ঝুলাইয়া বইস্যা আসেন কেন,
হ্যারা কলেজ করতে চায়, আমি যা বুঝি তায় আমগো ভাবনাচিন্তাই ভুল আছিল। তা আমগো বাড়ির
মাইয়ারা জুদি প্রাইমারি থিক্যাই এক লম্ফে কলেজে জাইতে পারে ক্ষতিডা কি কন দেহি ?
হ্যায় ত আনন্দেরই বিষয়”। বাবা বললেন, “লজ্জায় আমাদের মাথা নীচু হয়ে গেলো সেনকাকার
কথায়। বুঝলাম, এই তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলোর অন্তর্দর্শন এবং দূরদৃষ্টি কোন তারে
বাঁধা, যা আমরা কলেজের গন্ডি টপকে প্রথাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত হয়েও আত্মস্থ করতে
পারিনি”। সেই গার্লস স্কুল তৈরি হয়, প্রথমে তা জুনিয়ার হাই (ক্লাস এইট অবধি) স্তরে
উন্নীত হয়, আমার মা ওই স্কুলেরই শিক্ষিকা ছিলেন। বছর কুড়ির মধ্যে এলাকায় অবশ্য আরো
দু’-তিনটি গার্লস স্কুল তৈরি হয়। ২০০০ সাল নাগাদ স্থানীয় সংঘ গার্লস স্কুলটি অন্য
একটি হায়ার সেকেন্ডারি কো-এড স্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
আমরা তখন ছোট, এত ছোট যে, স্বাধীনতার দিনে স্কুলে গেলেই যে বেফালতু একটা ছুটির
দিন ভোগ করা যেতে পারে, সেই বোধটা তৈরী হয়নি (বাড়িতে থাকলেই তো
ভূগোল-বিজ্ঞান-অঙ্কের ছকবাঁধা চক্করে আটকে থাকতে হবে, যৌথ পরিবারে নজরদার অনেক)।
সে যাই হোক, বাড়ি থেকে মায়ের শাড়ি, বৈঠকখানার চেয়ার ইত্যাদি নিয়ে গিয়ে পাশে
রাণাদের বাড়ির সামনের তিনদিক খোলা বারান্দায় স্টেজ বানানো হচ্ছে, বিকেলে আমাদের
সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই কয়েকটা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান আর শেষে, পাটকাঠিতে
টাঙ্গানো কাগজের তেরঙ্গা হাতে পাড়ার সকল বাচ্চার সমবেত জাতীয় সঙ্গীত; ও হ্যাঁ,
সভার শুরুতেই সভাপতির ভাষণ। বিকেল হ’ল, সভাও শুরু হ’ল, সভাপতি সেনদাদু। তিনি পাড়ার
বয়ঃজেষ্ঠ কেবল নন, অনুষ্ঠানের শেষে শিল্পীদের জিলিপি খাওয়ার জন্যে তিনি অকাতরে
পাঁচ টাকা দান করেছেন। সভাপতি বলতে উঠলেন, “...হক্কালে উইঠ্যা চা নিয়া বারান্ডাটায়
আইসা বইসি, দেহি পোলাপানে ফুড়ুৎ ফাড়ুৎ দৌড়াদৌড়ি করে। তাইরপর দেহি আমার বেড়ার বাঁশ-কঞ্চি ধইর্যা টানাটানি
করতেয়াসে। তা আমি ধমক দিয়া কই, করস কি, করস কি ? হ্যারা হাইস্যা কয়, দাদু আইজ
স্বাধীনতা না !! এ-এ-এ-এ-ই আরকি...আর কি কমু কন”। সেনদাদুর সেই ঈষৎ টেনে ছেড়ে
দেওয়া ‘এ-এ-এ-এ-ই’ বহু কষ্টার্জিত ও বহু প্রতিশ্রুতির ভারতীয় স্বাধীনতার গত
অর্ধশতাব্দী কাল ধরে মূষিকপ্রসবকে (‘ইয়ে
আজাদি ঝুটা হ্যায়’) অনেক বছর পর ভারী চমৎকার সামারাইজ করেছিল আমার ক্রমপ্রস্ফূটিত
চেতনায়।
সেনদাদুর আরেকটি গল্প শোনাই। তখন পাঁচ কি ছয় ক্লাসে পড়ি, তখনো পাড়ার মুদির
দোকানে উপরে শীতলপাটী পাতা একটি তক্তাপোষ থাকত, যার উপরে দোকানদার কাকা /জেঠু /
দাদু বসতেন। সেকালে ভারী স্নিগ্ধ একটি সামাজিক মূল্যবোধ শীতের হাল্কা কুয়াশার মত
গোটা সমাজটাকে মুড়ে রাখত, যেখানে দোকানীর সঙ্গে লেন-দেন বা আত্মীয়তার সম্পর্কের উপরেও আরো বড় সামাজিক সম্পর্কের
বাঁধুনি থাকতো, তাই নিতান্ত অপরিচিতের সঙ্গে আলাপেও সম্বোধনে আকছার কাকু, জেঠু,
দাদু ব্যবহৃত হ’ত। তা, মা পাঠিয়েছেন
মিত্তিরদাদুর মুদিখানা (দোকানের নাম কি ‘মিত্র ভান্ডার’ ছিল? মনেও নেই। কি যায়
আসে, আমরা জানতাম, বিস্কুট-গরমমশলা-চাল-ডাল-চিনি-তেল-গুড় কিনতে মিত্তিরদাদুর
দোকানে যেতে হয়, আর কদমা-নকুলদানা-বাতাসা কিনতে পালানজেঠুর দোকানে যেতেই হবে
উপরন্তু ওখানে রিঠা আর সাবানও পাওয়া যায়; রিমের কাগজ, খাতা বা পেন্সিল কিনতে কমলকাকুর
লাবণ্য বুক স্টলই গতি, তাছাড়া ‘বঙ্গলিপি’ খাতা রেশন দোকানেও মেলে।) দোকানে কি কি
সব আনতে, কাগজে লিখে দিয়েছেন, হাতে পয়সা দেননি, পয়সা দেওয়ার প্রশ্নই ছিল না।
বন্দোবস্তটা সরল, মিত্তিরদাদু ওই তালিকাটাতেই টিক দিয়ে দিয়ে দাম লিখে মাল ওজন মেপে
আমার ব্যাগে ভরে দেবেন, আমার পকেটে গুঁজে দেবেন ওই টিক-দেওয়া-দাম-লেখা তালিকাটা,
এবং বলবেন, “রাস্তার বাঁদিক ধরে আস্তে
আস্তে যাবি দাদু, নে একটা মাছ লজেন্স নে” (মাছ লজেন্স মনে আছে কারো ? অক্ষয় সে
মৎস্যাকৃতি লাল, হলুদ বা সবুজ লজেন্স চুষতে চুষতে টাকরার ছাল উঠে যেত, অনেক সময়ে
জলে ধুয়ে কাগজে মুড়ে রেখে দিতাম, বাকিটা পরে খাবো বলে)। আমার দাদু (তাঁর বিকেলের
চার-ইয়ারি মজলিশি আড্ডাটা মিত্তিরদাদুর দোকানেই বসতো) বা অফিসফেরতা বাবা খরিদারির
দাম মিটিয়ে দেবেন। সেদিনও এই নিয়মেই তালিকা দেখে দেখে মিত্তিরদাদু মাল মেপে আমার
থলিতে এক-এক করে ভরে দিচ্ছেন। সঙ্গে অবশ্য টুকটাক পড়া ধরাও চলছে, যেমন, বল তো দেখি
‘ডাকঘর’ কে লিখেছেন ? গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড কার তৈরি ? এককিলো চিনির দাম ৩ টাকা
হলে সাড়ে তিনশো গ্রামের দাম কত ? এবং, ইত্যাদি। এ হেন সময় দোকানে সেনদাদুর
আবির্ভাব – বাঁশ ফালি করে চটা দিয়ে বানানো বেঞ্চিতে জুত করে বসে আমার ঠিকুজি নিলেন
– “মনীন্দিরের (আমার দাদু মনীন্দ্রনাথ ওনার ইয়ারবক্স, বিকেলের আড্ডার বোনাফাইড
মেম্বার) নাতি না ? এই ‘বঅসে’ চোখের মাথাডা খাইলি কি কইর্যা” ? (আমার নাকে চশমা
ওঠে ক্লাস টু-তে পড়বার সময়ে)। মিত্তিরদাদু জিভে একটা আফশোসের শব্দ তুলে বলেন – “জুগই
(যুগ) এমন পড়স্যে, কি বলবা” ! যুগের ‘পতনে’ অভাবনীয় আর কি কি দেখবেন ভেবেই বোধহয় কিয়ৎকাল
সেনদাদু উদাস হয়ে পড়েন। খানিক পরে গা ঝাড়া দিয়ে তাঁর উদাসীনতা সরিয়ে তিনি
মিত্তিরদাদুকে জিজ্ঞেস করেন, “কই কি মিত্তির, তর অ্যারারুট বিস্কুট কত কইর্যা ?”
মিত্তিরদাদু – “টাকায় আড়াই শো”। অপ্রত্যাশিত চড়া দামের অভিঘাতে বেশ টেনে নিজ
পিতৃনাম স্মরণ করে সেনদাদু ফের প্রশ্ন করেন – “বা-আ-আ-বা, কস কি !! আর তর ওই গুঁড়া
গুলা ?” তখন অ্যারারুট বিস্কুট আসতো টিনে করে, বিক্রি হত ওজনে। টিনে ভাঙ্গা, গুঁড়ো
হয়ে যাওয়া বা টিন থেকে বয়ামে সাজাবার সময় ভাঙ্গা বিস্কুটাংশ অন্য বয়ামে রাখা হত,
অক্ষত বিস্কুটের চেয়ে ঢের সস্তায় বিকোত সেগুলো। এ ক্ষেত্রে হয়তো টাকায় পাঁচশো
গ্রাম। মিত্তিরদাদুর মুখে দাম শুনে নিয়ে সেনদাদুর চোখের থেকে যেন লেজার বিম বেরিয়ে
পূর্ণাঙ্গ ও প্রতিবন্ধী বিস্কুটের বয়াম দু’টি জরিপ করতে লাগলো এবং প্রোসেসিং এর
জন্য ইনপুটস মস্তিষ্কে চালান করতে লাগলো। ইতিমধ্যে মিত্তিরদাদু আমার অর্ডারি মাল
গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দিয়ে, টিক দেওয়া ও মালের পাশে দাম লিখে দেওয়া তালিকাটা আমার
পকেটে গুঁজে দিতে যাচ্ছেন, এমন সময়ে সেনদাদু সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন – “মিত্তিররে, এক
কাম কর, তুই ওই ভাঙ্গাগুলাই দে দুই শ (গ্রাম)। বেশি দাম দিয়া গোটা বিস্কুটে কাম কি
যখন চা দিয়া খাওনের সময় ভাইঙ্গাই খাইতে হইব!” হায় রে, আমি কিনা সেনদাদুকে কিপটে
ভাবছিলাম! তাঁর বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিশীল চিন্তাধারা সেই সময় থেকেই আমায় সেনদাদুর
প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে তোলে। এ হেন যুক্তিশীলতার পরিচয় সেনদাদু বারবার
দিয়েছেন।
অনেককাল পরের কথা। আমি তখন গ্র্যাজুয়েশান করছি, আমাদের সেই বয়েসে সেই কালে
এলাকায় সর্বসমক্ষে ধূম্রপানে কিঞ্চিত বিধিনিষেধ থাকায়, বিড়ি টানতে গিয়েছি রেলদীঘির
ওপারে, রেলইয়ার্ডের পাঁচিলের ধারে। রেলদীঘি বেশ ভরভরন্ত স্বাস্থ্যবতী, তার সব
ঋতুতে অক্ষত যৌবনের রহস্য নাকি দীঘির মধ্যিখানে দুটো গভীর কুয়ো। ঠাকুরমার ঝুলির
রাক্ষসী রাণীর প্রাণভোমরা দীঘির নীচে যে কুয়োর মধ্যে এক স্ফটিকস্তম্ভে লুকোন
থাকতো, নীলকমল যেটা এক ডুবে তুলে আনতে পেরেছিল, সেই কুয়োই বোধহয়। রেলদীঘির কুয়ো
কেউ কোনকালে চোখে দেখেনি, কারণ নীলকমলেরা আর জন্মাচ্ছে না বহুকাল হল; তাই লোকের
মুখের কথাতেই সে কুয়োর অস্তিত্ব। যাক সে কথা, এ গল্প কুয়োর নয়, কুয়োর চেয়ে ঢের
গভীর সেনদাদুর। তা সে রেলদীঘির চারপাশে চারখানি বাঁধানো ঘাট ছিল। রেলইয়ার্ডের
দিকের সুদূরবর্তী ঘাটখানি (ওতে বসবেন যাঁরা, সেই মাতব্বরেরা সন্ধ্যে বেশ ঘনিয়ে না
এলে জনসমক্ষে বেরোতেন না, তাঁরা দিনমানে নিদ্রা যেতেন, রাতে তল্লাট-বেতল্লাটের
গৃহস্থবাড়িতে নাইটডিউটি করবেন বলে) বাদে বাকি তিনটি ঘাটে চারপাশের গাছগাছালির ছায়া
দীর্ঘ-হওয়া পড়ন্ত বিকেলে বৃদ্ধরা এসে বসতেন, কেউ কেউ সুরে-বেসুরে গানও ধরতেন –
ছায়া ঘনাইছে বনে বনে। রেলইয়ার্ডের ধারে নিরিবিলিতে বিড়িটিড়ি টেনে ফেরবার পথে একদিন
দেখি একটি ঘাটে ঈষৎ উদাস সেনদাদু একা বসে। বলে রাখি সেনদাদুর একটি পায়ের গোড়ালির
কাছে দীর্ঘদিনের সযত্ন-লালিত এগজিমা ছিল, মিত্তিরদাদুর দোকানে বসে তাঁকে
নিবিষ্টচিত্তে চুলকাতে আগেই দেখেছি বহুবার। এখানেও দেখি উদাস দাদু পায়ের উপর পা
তুলে অভ্যস্ত হাতে এগজিমা চুলকে যাচ্ছেন, অনেকটা জাবর কাটার মত। কি মনে হল, এগিয়ে
গিয়ে বললাম, “দাদু, তখন থেকে চুলকাচ্ছেন, এতদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছেন, ডাক্তার দেখিয়ে
ওষুধ খেলেই তো সেরে যাবে, ডাক্তার দেখান না কেন ?” সেনদাদু সেকেন্ডের জন্য থমকালেন,
চুলকুনি থামালেন, আবার উদাস হয়ে চুলকাতে চুলকাতে তাঁর অতুলনীয় যুক্তিবাদিতার
জ্বলন্ত প্রমাণ পেশ করে বললেন – “ নাহ, আছে থাউক। আমার চুলকানি আমি চুলকাই...আরামও
লাগে, সময়ও কাটে”। পরবর্তী জীবনে বহুক্ষেত্রে নিজেকে ও সময়বিশেষে অপরকে চুলকে সময়
কাটিয়েছি, আরামও যে পাইনি তা বলব না। সে কর্মশিক্ষার সোপানের কারিগর তো সেনদাদুই।
এরই কাছাকাছি সময়ে সেনদাদুর মুখেই আরেক কাহিনী শুনেছিলাম। সেটা আবার দেশোদ্ধার
বিষয়ক। সত্তরের দশক। এক ঝাঁক উজ্জ্বল অল্পবয়েসী ছেলেমেয়ে কি একটা ‘অলীক’ স্বপ্নে
জারিত (এ লেখায় স্বপ্নটা অলীক না আলোকসুন্দর সে আলোচনা করা হলদিয়া যেতে হনলুলুর
পথে হন্টনের সামিল হবে, তাই বাদ) হয়ে সমাজ বদলের নেশায় মাতোয়ারা। প্রশাসনও দাঁতনখ
বার করে প্রতিষ্ঠিত অচলায়তনের সুরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ। গান্ধীর কংগ্রেসের প্রতি
মোহভঙ্গ হয়ে বহু বাঙ্গালীই ওই সব ঝকঝকে পরার্থপর তরুণতরুণীর প্রতি নৈতিক সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষণা
জ্ঞাপন করেন। সেইকালে আমাদের সেই সিকি শহরে সেনদাদুর মত ষাটোর্ধ্ব কয়েকজন
দূরদর্শকেরও এই আলোর পথযাত্রীদলের প্রতি একধরণের অনুচ্চার গুরুজনসুলভ প্রশ্রয় ছিল।
এ হেন সময়, শোনা গেল সেনের প্রয়াত বন্ধু যুগলের ভ্রাতুষ্পুত্র অতনু যে নাকি
‘কলকেতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পইড়্যা-পইড়্যা বিরাট দিগগজ হইয়া উঠত্যাছে’, তারও নাকি
সেই একই মাথার ব্যামো, তাই ‘তারে পুলিশে গরুখোঁজা কইর্যা শ্যাশে খুঁইজ্যা পাইয়া
গোবেড়েন দিয়া’ পড়াশোনা লাটে তুলে দিয়েছে। ফলে, কেউকেটা হয়ে উঠতে উঠতে দিগভ্রষ্ট
পুত্রের ভবিষ্যত-চিন্তায় যুগলের ভায়ের ‘রাইতে ঘুম নাই চোখে’। তা তারে নিয়ে এসে
তোলা গেল পারিবারিক বন্ধু সেনের ‘বার-বাড়ির একখান ঘরে’। নিরাভরণ ঘরখানিতে একটি
সিঙ্গল তক্তাপোষ, একটি আলনা, একটি জলের কুঁজো ও জানালার পাশে একসেট চেয়ার টেবিল
পাতা। ‘তয় সবই তো করন গেল, কিন্তু হ্যায়ে ক্যাবল খাটটাহে হুইয়া হুইয়া জানলা দিয়া
বাইরাত বেবাক উদাস তাকায় থাহে’। ‘কি করন যায়, হ্যায়েরে সংসারের প্রেতি ক্যামনে
টানন যায়’, নিতান্ত অসময়ে জীবনের প্রতি আকর্ষণ-হারিয়ে ফেলা সে উদাস বালক অতনুর নিখাদ
শুভচিন্তক সেনমশায় ঘোর চিন্তায় পড়লেন। শেষে এক অমোঘ ও চিরকালীন উপায় ঠাওরালেন তিনি,
‘পাশের বাড়ি বিপিনের বুন লীলারে’ ফিট করলেন, সকাল-বিকেল অতনুর কি লাগে না লাগে তার
তদারকিতে। সেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে লীলা অতনু-র মাথা থেকে দেশোদ্ধারের ভূত ‘ওয়াশ’
করে তাকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনবে, আইডিয়াটার অন্তর্নিহিত মোক্ষ তাই। বাকি
অংশ সেনদাদুর জবানে আমি যেমন শুনেছি তেমনি শোনা যাক – “কি আর কমু, দুই মাস যাইতে
না যাইতে, লীলা অতনুর ব্রেনওয়াশ করব কি, লীলারেই ‘ওয়াশ’ করাইয়া আনতে হেই আমারেই
দৌড়াইতে অইলো। হালায় কি করত পাঠাইলাম আর কি কইর্যা বসল”।
আরো পরে আরেকদিন, তখন আমি হাফ-বেকার, মানে ইতিউতি কলেজে ও ম্যানেজমেন্ট
ইন্সটিটিউটে পার্টটাইম পড়িয়ে বেড়াই আর বাড়িতে গ্র্যাজুয়েট-পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কিছু
ছাত্রছাত্রী পড়াই, ফলে এলাকায় ‘মাস্টার’ নামে কুখ্যাতি ছড়িয়েছে। কুখ্যাতি থাকলেই
গতিবিধি, আচারআচরণের উপর কিছু স্বতঃ-নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্ত হয়েই যায়, অন্তত নিজ
এলাকায়; সুখ্যাতি হলে তো উল্টোটাই হওয়ার কথা, চালু সামাজিক বিধিনিষেধগুলো
নামডাকওয়ালা প্রতিভাবানদের ক্ষেত্রে ধর্তব্য নয় এমনটাই তো হয়ে এসেছে। কথায় আছে, যে
জমিতে বাস, সে জমিতে চাষ কভু নয়। সর্বোপরি যেহেতূ কুখ্যাতি ধনবিজ্ঞান পড়েশুনে
“এডুকেশান লাইন” ধরবার কারণে তাই যে কোন ধরনের জনসমাগমে যথা, রবিবারের চায়ের
দোকানে, বন্ধুর বোনের বিয়েতে ধরেই নেওয়া হত, ভারতের অর্থনীতি কেন গোল্লায় যাচ্ছে
তা এ ব্যক্তি দু’-একটা পাতলা কথায় জলবৎ বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হবে (যদি তা না পারে তাহলে,
বোঝ এরাও আজকাল মাস্টারি করছে, দেশটা কোথায় গেল!)। আর সত্যি কথা বলতে, অর্থনীতিতে
বোঝবার আছেটাই বা কি,‘সবই তো ওই ডিমান্ড আর সাপ্লাই’ আর এ কথা তো জানাই আছে যে ‘ইনপুট
করলেই আউটপুট হবে’। এই রকম একটা সময়ে আমায় পথিমধ্যে পাকড়াও করে বাজারের ব্যাগ-হাতে
অশীতিপর সেনদাদু আমায় জানতে চাইলেন –“ আইচ্ছা মাস্টার, তুমি তো এডুকেশন লাইনে আসো
(উচ্চারণটা দশ আনা ‘ছ’-এর সঙ্গে ছয় আনা ‘স’ জ্বাল দিয়ে তৈরি করতে হবে) , তা
ব্যান্ডপার্টি দেখসো ? ওই যে এক ব্যাটায় এক বিরাট ঢাক (ড্রাম) পিঠে কইর্যা বইয়া
নিয়ে যায় আর আরেক ব্যাটায় হেইডা দুমদুমাদুম বাজায়, দেখসো ?” প্রশ্নের অভাবনীয়তাতেই
বোধহয় মাথাটা অজান্তেই ঈষৎ হ্যাঁ-সূচক হেলে গিয়েছিল ফলে সেনদাদু তাঁর আসল প্রশ্নটা
করলেন – “ ওই যে ব্যাটায় বিরাট বোন্দা মত ঢাকটারে ক্যাবল বইয়া নিয়া যায়, তারে কি
কয় জানো ? তোমাগো শাস্তর কি বলে ?” আমি দিনদুপুরে চৌমাথায় চৌরাস্তার মোড়ে অথৈ
শব্দকল্পদ্রুম সমুদ্রে ডুবুরির মত ডুব দিতে গিয়ে একপ্রস্থ খাবি খেলাম, ‘মাতৃভাষা
মাতৃদুগ্ধসম’ পর্যন্ত মনে পড়ে গেল, কিন্তু ওই ড্রামবাহকের কোন উপযুক্ত প্রতিশব্দ
খুঁজে না পেয়ে নিজের ‘এডুকেশন লাইনে’ থাকবার ডুবন্ত ইজ্জত বাঁচাতে মরিয়া হয়ে বলে
বসলাম –“ইয়ে, দাদু...ওটা হ’ল গিয়ে... মানে ইকোনমিক্সে তো...সরাসরি এর কোনো প্রতিশব্দ
নেই... বলা যায়... যেমন ধরুন গিয়ে... ড্রাম-ক্যারিয়ার!” আমার অজ্ঞানতাজনিত দ্বিধার
এই অন্তবর্তী কয়েক সেকেন্ড সেনদাদু আমায় তাঁর স্বভাবজ তীব্র চাহনির এক্সরে-তে ফেলে
জরিপ করছিলেন। আমার উত্তর শুনে বোধহয় অনুকম্পাতেই তাঁর দৃষ্টির অগ্নিবাণ কিঞ্চিৎ
স্তিমিত হয়ে এল, শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হয় বুজছি, তোমার মুন্ডু। অরে কয় **র বাই
(ভাই)”। উপর্যুপরি আঘাতের পর আঘাতে আমার স্নায়ু বিমূঢ়, আমি বাক্যহারা, আমায়
স্তম্ভিত করে সেনদাদু তাঁর অমোঘ দার্শনিক সংজ্ঞা প্রকট করলেন – “ অল ইন্ডিয়ানস আর
লাইক দ্যাট **র বাই (ভাই), বুঝছ । বয় একজনা আর বাজায় অন্য জনা !” আমার চোখে ‘ই’
সমান সমান ‘এম সি স্কোয়ার’ হ’ল পৃথিবীর সরলতম ইকোয়েশান যা দিয়ে জটিলতম এক সম্পর্ক
প্রকাশিত হয়েছে। ভারত, ভারতীয় অর্থনীতি ও তার সঙ্গে আমভারতবাসীর সম্পর্ক বিষয়ে বেশ
কয়েক গাছা বই আমায় মুখস্ত করতে হয়েছে, শিফটিং অব ট্যাক্স বার্ডেন বা লোড-শেডিং
সম্পর্কেও কিছু ধারণা আছে, এমনকি ‘রানার’ কবিতার ‘পিঠেতে টাকার বোঝা তবু ওই টাকাকে
যাবেনা ছোঁয়া’-র এক্সটেনশানে শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রম-সম্পর্ক ও শোষণ ইত্যাদি
ঘোলাটে ভাবে হ’লেও কিছুটা জানি। তবু রণে-বনে-জনে-জঙ্গলে গত সাতদশকের যেকোন ‘আননোন
ইন্ডিয়ান’-এর ছায়ামাত্র দেখলেই সেনদাদুর এই সরলতম মূল্যায়ণ মনে ঝলকে ওঠে, এর
মাহাত্ম্য আমার কাছে আইনস্টাইনের ওই ব্রহ্মান্ডবিশ্লেষী ফর্মূলার চেয়ে একচুল কম
নয়।
**********
আপাততঃ শেষকথা – সেনদাদুর এ সকল ভাষার পশ্চিমবঙ্গীয় অনুবাদ করতে বরেণ্য
ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী মশায় বারণ করেছেন, তাঁর ‘রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর
পরচরিতচর্চা’ গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।
(পার্থ পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত "ট্রৈনিক" পত্রিকার বর্ষা ১৪২১ সংখ্যায় প্রকাশিত)
