 |
| ধোত্রে থেকে 'ঘুমন্ত তথাগত' |
কত লোকে উত্তরাধিকারসুত্রে কত কি পায় – তা সে একেবারে শিলাইদহ-পতিসর
না হোক, মুর্শিদাবাদের দিকে ধরা যাক একশো বিঘা ধানী জমি, বর্ধমানে সুপুরিগাছ-ঘেরা
চারটে টলটলে পুকুর যাকে সরোবর বলে আর বাঁশঝাড়, সোনারপুর-বারুইপুরের দিকে একটা
পেল্লায় বাগানবাড়ি উইকএন্ডে উইথ বিয়ার মাছ-ধরতে যাবার জন্য, শান্তিনিকেতনের পূব বা
রতনপল্লীতে মেরামতির প্রতীক্ষায় পাঁচিল-ঘেরা একটা চারপাঁচ-কামরা-হালকা-ব্যালকনি
সমন্বিত দোতলা বাড়ি, নিদেনপক্ষে নিউটাউনে বা গড়িয়ার দিকে একখানা তিন কামরার
ফ্ল্যাট যেটা গত পনেরো বচ্ছরে টাকাটাকে মিনিমাম পনেরোগুণ করে দিয়েছে ; কেউ
উত্তরাধিকারে গোটা দেশ পায়, কেউ বা অ্যালুমিনিয়ামের সানকি। তা আমিও সৌভাগ্যে
রাজাধিরাজ জানলেন, জন্মসুত্রে আমিও পেয়েছি এক-রাত্তির দূরের হিমপাহাড়ে নিঝুম নিরালা
একটা গোটা মখমলী বন – পরনে তার নীলসবুজ জামদানি, গলায় নাম-না-জানা জঙ্গলিফুলের
মালা। তার মাথায় বিশ্বসুন্দরীর তাজের মত পরানো আছে পৃথিবীর সুন্দরতম তুষারপর্বতের
মুকুট। ভোরে কুসুমরঙা সূর্যের জলটিপ কপালে পরে শিশিরে স্নান করে উঠেও কেমন
ঘুমজড়ানো চোখে সে আমার দিকে মদির তাকায় আর বলে, - আজই চলে যাবে ? থেকে যাও না আর
দুটো দিন আমার কাছে ?
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশানে গাড়ির বন্দোবস্ত ছিল। পথ নেহাত কম নয়,
প্রায় একশো-পাঁচ কিলোমিটারের সামান্য এদিকওদিক হবে। দার্জিলিং-এর রাস্তা ধরে ঘুম
অবধি গিয়ে বাঁয়ে বেঁকে লেপচাজগত হয়ে সুখিয়াপোখরি। সুখিয়া বাজারে টি-ব্রেক নিয়ে
সতেরো কিলোমিটার মানেভঞ্জন। সেইখানে সান্দাকফুর রাস্তা ভাগ হয়ে আবার বাঁ পাশে খাড়াই
পাহাড় চড়া শুরু করবে আর রিম্বিকের পথ বেঁকে যাবে ডানদিকে নির্জন অনিন্দ্যসুন্দর
পালমাজুয়া ফরেস্টের মধ্যে। দেখতে
দেখতে পাঁচ হাজার ফিটের উপর উঠে আসা গেছে,
রাস্তা চড়াই হবে উত্তরোত্তর আর তারপর এক জায়গায় হঠাৎ বন পাতলা হয়ে গিয়ে যে পাহাড়
বেয়ে চলেছি তার গা দেখা যাবে, রোদ পাওয়া যাবে, আর তক্ষুণি বুঝবো আমি ‘আমার’ মখমলী
বনের গ্রাম ধোত্রে এসে পৌঁছলাম আবার। পথ অবশ্য আয়েসী ধোত্রেকে ফেলে গড়িয়ে যাবে
রিম্বিকের দিকে (আরো ২৩/২৪ কিমি)। শিলিগুড়ি থেকে আরেকটা রাস্তাও আছে, গাড়িধুরা থেকে
শুকনা ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে রোহিনী হয়ে মিরিক। মিরিক লেকের পাড়ে কফি ও মোমো ভক্ষণ,
তারপর যেন অফুরান থার্বো টি-এস্টেটের মধ্যে দিয়ে গুটিগুটি এগিয়ে পশুপতিনগরের (নেপালের
প্রবেশপথ) বিখ্যাত (বা, কুখ্যাত) বিদেশী জিনিসের বাজারকে বাঁ ফেলে ঘন বনের ছায়ায়
ছায়ায় সীমানা গ্রাম। সীমানায় মিনিট পনেরোর হল্ট হতেই পারে কারণ সে হল প্রথম পূর্ণদর্শনের
ভিউপয়েন্ট, যদিও আমার মনে হয় এর মানে হয় না কোনো, পুরো পথটাই তো দর্শনীয়। এইবারের
যাত্রায় দেখলাম এই সীমানা বাজার থেকে হুড়মুড়িয়ে নীচে নেমে গেছে সদ্য-তৈরী-হওয়া একটা
রোগা পিচরাস্তা। সাহস করে ওতে গিয়ে দেখলাম সুখিয়ার ভিড় বাইপাস করে সরাসরি
মানেভঞ্জন পৌঁছে গেছি মিনিট পনেরোর মধ্যে, এই শর্টকাটে সময় বাঁচলো তা প্রায় চল্লিশ
থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট। তবে যেদিক দিয়েই যাওয়া যাক, দূরত্ব হরেদরে একই, সময়ও লাগবে হরে দরে ওই
চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টা। আমার প্রেস্ক্রিপশান সহজ - মিরিক হয়ে যাওয়া আর
লেপচাজগত-ঘুম হয়ে নামা।
 |
| পাহাড়ের পূব ঢালে এলিয়ে ধোত্রে গ্রাম |
ধোত্রে গ্রাম পাহাড়ের পূবঢালে গড়িয়ে গেছে অল্প নীচ অবধি, ভোরে সূর্য
উঠলেই তাই গ্রামের ঘরগুলোর টিনের চাল আলোয় ঝকমক করে ওঠে। বছর দশেক আগেও সান্দাকফু-ফালুট-ফেরতা ট্রেকারদল
রিম্বিক থেকে গাড়ি চড়ে সদ্য সমাপ্ত ট্রেকিংস্টোরির বীররস নিয়ে জাবর কাটতে কাটতে
কখন ধোত্রে পেরিয়ে যেতেন টেরও পেতেন না। এখন অবশ্য ধোত্রেতে রাতে-থাকবার কয়েকটি
জায়গা তৈরী হয়েছে, এবং গত চার বছরে দেখছি তার সংখ্যা বেশ হুড়মুড়িয়েই বাড়ছে। সেরাটা
অবশ্য চিনজু শেরপার শেরপা লজ। ঐ চিনজু ‘মাসীমা’-র বাড়িতে আমার ঘর আছে, আর সে কি
যেমনতেমন ঘর ? তার পূবের জানলায় সূর্য ওঠে আর পশ্চিমের জানালায় সে মায়াবী আলোয়
নিলাজ স্নান করে আমার জন্মের প্রেমিকা রাজনন্দিনী কাঞ্চনজঙ্ঘা। নানা ক্যালকুলেশান
করে কেউ কেউ যেমন শেয়ার বাছে, দার্জিলিং-এ হোটেল বাছে আলুপোস্ত পাওয়া যাবে কিনা
দেখে নিয়ে, আমি অবশ্য এক্ষেত্রে তেমন কিছু গিন-চুনকে চিনজুর বাড়ি বাছিনি। আমি
প্রথম যখন ধোত্রে যাই, সেখানে ওই একটিই রাতে-থাকবার জায়গা ছিল। গাঁয়ের শেষপ্রান্তে
উঁচু শিরার উপর বাড়ি থেকে সিঁড়ি দিয়ে দশ পা নেমে পিচরাস্তা (রিম্বিক গেছে), সে
রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে শিবমন্দিরের পাশ দিয়ে একশো দিনের কাজে তৈরী চারফুটের
পাথর-বাঁধানো পথ ধরে দশ মিনিটের চড়াই-এ ধোত্রে-ভিউপয়েন্ট।
 |
| চিনজুর বাড়ি আর রাজনন্দিনী |
 |
| ধোত্রে ভিউ পয়েন্ট |
সেখানে আগে শুধু ছিল
গায়ে-মন্ত্র-লেখা পাশাপাশি দু’টি স্মৃতিবেদী আর একটি নড়বড়ে রেলিং গোছের ব্যাপার,
এবারে দেখলাম তৈরী হচ্ছে ওয়াচটাওয়ার আর কংক্রিটের বড় ছাতা, বসবার জায়গা। সেখান
থেকে কি দেখা যায় ? ভাষায় বর্ণনা দিতে যেদিন পারব, মনে করব আমি আমার রাজনন্দিনীর
উপযুক্ত হয়ে উঠতে পেরেছি। ঐ ভিউপয়েন্ট থেকে সামনে একশো-আশি ডিগ্রি বিছিয়ে আয়েস করে
শুয়ে আছেন ভগবান তথাগত, মুখমন্ডল যাঁর কুম্ভকর্ণ পর্বত, উদর হল কাঞ্চনজঙ্ঘার মূল
শৃঙ্গ (সাউথ পিক; তিনটে মোট, আমরা এত দূর থেকে আর এই দিক থেকে কেবল একটিই দেখতে
পাই, এমন জায়গাও আছে যেখান থেকে নজর করলে দু’ নম্বর শৃঙ্গটিও দেখা যায়), আর পদযুগল
মাউন্ট পান্ডিম। ‘স্লিপিং বুদ্ধা’-কে নিশ্চিন্তে শায়িত রেখে উল্টোদিকে মুখ ঘোরান,
সুর্য আড়াল করতে চোখের উপর হাতের কার্নিস তৈরী করুন, আর দেখুন মুঠো-ভর্তি ধোত্রে
কেমন টুক করে ফুরিয়ে গেল আমার সেই মখমলী বনে। ভিউপয়েন্টের উচ্চতা থেকে পাখীর চোখে
দেখে নিয়েছেন ধোত্রেকে, তাই আপনি এখন জানেন চিনজুর বাড়ির পাশ দিয়েই পায়ে চলা পথ
হারিয়ে গেছে গভীর সে মখমলী বনে। এইবার তবে বুদ্ধকে ঘুমন্ত রেখে ভিউপয়েন্ট থেকে নেমে
এসে ঠিক উল্টোদিকে আবার চিনজুর বাড়ির পাশ দিয়ে ঢুকে পড়া যাক মখমল বনে। একটু এগোলেই
ধোত্রে প্রাইমারি ইস্কুল, সবুজ টিনের চাল, হলদেটে কাঠের ঘর; খাদের দিকে লোহার জাল
দিয়ে ঘেরা ছোট্ট খেলার মাঠ, খুদে গোলপোস্ট।
 |
| ইস্কুলের পাশে মখমল বন শুরু |
মাঠভর্তি ধুলো, পড়ুয়ারা বেশ দাপিয়ে খেলে বোঝা যায়, তাই ঘাস নেই মাঠে। মাঠ পেরিয়ে এগোই, পাথরে বাঁধানো হাঁটাপথ ওই ইস্কুল পেরোলেই ধীরে ধীরে পাহাড় চড়া শুরু করে। একটা চর্তেন, পাহাড়ি নিয়ম মেনে তাকে ডাইনে রেখে এগিয়ে চলি আর আমার দু’ পাশে ঘন হয়ে আসে মখমলী সিঙালীলা ফরেস্ট। এই পথ গিয়েছে টংলু, মাত্র সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার ধোত্রে থেকে, দেদার আরামদায়ক গড়ানে পথ, শেষ এক কিলোমিটার কেবল সামান্য কষ্টকর চড়াই। টংলু থেকে চেনা রাস্তায় তুমলিং-গৈরিবাস-কালিপোখরি-বিখেভঞ্জন হয়ে সান্দাকফু। কিন্তু এ যাত্রায় কেবল ধোত্রেরই গল্প হোক। পরিচিত সান্দাকফু-ফালুট ট্রেইলে এই ধোত্রে থেকে টংলু পথটি তুলনায় নতুন (নতুনই বা বলি কি করি, এ পথেও সিরিয়াস পাহাড়প্রেমী হাঁটছেন আজ প্রায় বিশ বছর হল), আর সহজ। সৌন্দর্যের তুলনাটা কুরুচিকর, তাই ওতে যাচ্ছি না।
 |
| মখমল বনের গাছেরা |
এটুকু বলাই যায়, মার্চের শেষ বা এপ্রিলে এ পথে অন্তত
দশ-পনেরোরকম রোডোডেনড্রন (সিঙালীলা জাতীয় উদ্যানে মোট ২০/২২ রকম রোডোডেনড্রন পাওয়া
যায়) ও অন্যান্য নাম-না-জানা ফুলের ম্যাহফিলে উপস্থিত হলে মুখর কবি কোন রূপবৈভবের
সম্মোহনে নীরব হতে চাইবেন তা উপলব্ধি করতে আমার অন্তত অসুবিধে হয়নি। গাছ – এরা কি শুধুই গাছ ? পাহাড়ি বাঁশ,
ম্যাগনোলিয়া, ওক, সিলভার ফার, হেমলক, জুনিপার, ভুর্জপত্র – এ কোন অপার্থিব রেশমী সাজে
সেজে রিনরিনে হাওয়ার বাঁশি বাজায় সারাদিন ? মখমলে মোড়া এ রূপসীর বসনপ্রান্তে
বাহারি কুচির মত থরে থরে ফুটে থাকে জেরেনিয়াম, প্রিমুলা। সাদা আর পিচরঙা ম্যাগনোলিয়া ফুলভারে মাথা
ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানায়। একমাত্র ওখানে গেলেই আমার তীব্র আফশোস হতে থাকে,
অর্থশাস্ত্রে ফেঁসে গিয়ে আহা কেন যে বটানি বা জুলজি পড়লাম না ! এবারের সঙ্গী প্রাণীবিদ্যার মেধাবী ছাত্র ও অধ্যাপক দেবাশিস
গাছ-ফুল-পাখী কয়েকটা চেনালো। হিমালয়ান কোবরা লিলি আমি আগেই চিনতাম, ও ফুলে বিষ আছে
(Arisaema), টংলু ছাড়িয়ে আরো উপরে সান্দাকফুর (পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম স্থান, ৩৬৩০
মিটার) দুই কিমি আগে বিখেভঞ্জনের নামেই “বিখে” এরই জন্য (বিখে – বিষাক্ত, ভঞ্জন -
উপত্যকা)। সিঙালীলা জাতীয়
উদ্যানের শিরোপা লাভ করেছে ১৯৯২ সনে, এবং এ হল বিলীয়মান রেড পান্ডার আঁতুড়ঘর।
ধোত্রে থেকে টংলুর পথ প্রায় পুরোটাই ঘন জঙ্গল, পোর্টার ছোকরাগুলো ভারি ফক্কড়,
নরমসরম নভিস ট্রেকার দেখলেই ভয় দেখায়, সাব ইধার রুকিয়েগা মৎ, জঙ্গলমে লেপার্ড
হ্যায়। - ‘হ্যায়’ তো মালুম হ্যায় বচ্চে, লেকিন তাদের এক-আধ ঝলক দেখা দিতে এত লজ্জা
পেলে চলে কি করে ? ক্লাউডেড লেপার্ড না হোক নিদেন পক্ষে লেপার্ড ক্যাট একখানা পথের
বাঁকে যদি দর্শন দেয় সেই আশা বুকে চেপে ক্রমাগত উঠতে থাকি টংলুর দিকে। দেবাশিস
কানে কানে ফিসফিস করে বলে যায়, দাদা এ জঙ্গলে ছোট ভালুক (ব্ল্যাক বিয়ার),
প্যানথার, কাকর হরিণ, প্যাঙ্গোলিনও আছে। বলতে বলতে একটা খোলা জায়গায় এসে পড়ি, ছায়াময়
হিমেল পথের পরে আহা রোদ্দুর তুমি রোদ্দুর – গা এলিয়ে দিই ঘাসের নরম রেশমী কার্পেটে
(কোনো মরমানুষের সাধ্য কি অমন কার্পেট বোনে), হাত দু’টো ভাঁজ করে রাখি মাথার নীচে,
কারণ আমার এই স্বর্গীয় বেডরুমের সামনেই সুনীল আকাশজুড়ে ফ্রেমহীন টাঙানো আছে আমার
রাজনন্দিনী কাঞ্চনজঙ্ঘার হীরে-ঝকমক ছবি। আমি মনে মনে কথা কইতে শুরু করি ওর সাথে, -
কেন বারবার তোমার কাছে ফিরে ফিরে আসি বোঝো না, আর “কেমনে প্রকাশি’ কব কত ভালোবাসি”...আচ্ছা
বরং থাক, এ জীবনে থাক না, - “কেহ জানিবে
না মোর গভীর প্রণয়, কেহ দেখিবে না মোর অশ্রূবারিচয়” ... এমন সময় – “দাদা দাদা,
চটপট ওঠো ক্যামেরা নাও, গোল্ডেন ঈগল -”; গাঢ় নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে রাজার মত পাখা
মেলে দুই সাথী মাথার উপরে চক্কর দিচ্ছে খুব বেশি হলে চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট উঁচুতে, উজ্জ্বল
বাদামী ডানার প্রান্তে সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিকিয়ে উঠছে – হ্যাঁ সোনার ঈগলই বটে। এ
ছাড়াও আমার এ রেশমী দরবারে রোজ ব্লাড ফেজ্যান্ট আর ট্র্যাঙ্গোপ্যানের নাচিয়ে দল
নেচে যায়, গান গেয়ে যায় গোল্ডেন বুশ রবিন আর ব্যাবলারের ঝাঁক, নাচগানে তাল দেয়
হিমালয়ান উডপেকার আর সিংদরোজায় ঘাড় বেঁকিয়ে পাহারা দেয় আমুর বাজপাখী। কমবেশি আড়াই
শো রকমের পাখী দেখতে পাওয়া যায় এ চত্বরে, তাদের রূপবৈচিত্র্য বর্ণনা করবার মত
বিদ্যে আর ভাষা কোনোটাই আমার আয়ত্বে নেই, তবে তাতে অপার মুগ্ধতায় স্তব্ধ হওয়া
ঠেকাচ্ছে কে ?
 |
| টংলু টপের ঠিক নীচে সেই প্রশস্ত বুগিয়াল |
তা ওই যে শুরুতেই বলেছি, এ মখমলী বন আমার জন্মসুত্রে পাওয়া, সে কথাটা
আরেকটু ভেঙ্গে বলে লজ্জাহীন এই প্রেমকাহিনী শেষ করি। ভেঙ্গে বলাটা জরূরী। এই
এলাকায় অনেক লোক আসছেন ইদানীং, গ্রামের লোকে হোমস্টে না কি যেন বলে, আসলে স্রেফ
হোটেল, তাও খুলছে একটার পর একটা; গাঁয়ে ইলেকট্রিসিটি এসে গেছে (আগেরবার ২০১২-র
ডিসেম্বরে ছিল না)। ধোত্রে থেকে টংলুর
মায়াবী পথে টংলু টপের পাঁচ-সাতশো ফুট নীচে আছে ওই সাড়ে পাঁচ-ছয় হাজার ফিট উঁচুতে
অবাক-করা অতি প্রশস্ত এক বুগিয়াল। রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে তাতে পা মেলে বসেছি, সঙ্গে
আনা কমলালেবুর খোসা ছাড়াচ্ছি। সঙ্গী পার্থর স্ত্রী সমর্পিতা আলতো গলায় গান ধরেছে –
এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, আকাশে খুব নীচে তখনও উড়ছে সেই গোল্ডেন ঈগল দম্পতি
(ওরা নির্ঘাৎ তাই !)। এমন সময় দেখি – ওরে বাবা দেখো চেয়ে কত সেনা চলেছে সমরে – সমস্ত
অত্যাধুনিক ট্রেকিং গ্যাজেটে সজ্জিত প্রায় চল্লিশ জনের একটি দল ধোত্রের দিকের
জঙ্গল ফুঁড়ে উদয় হল। মুহুর্তে যেকোনো মেট্রোপলিটানের বড় শপিং মলের বিরক্তিকর কলকাকলিতে
ভরে উঠল সেই অনাঘ্রাত প্রাঙ্গণের অনাবিল বাতাস। কিছুক্ষণ হুল্লোড়ময় বিশ্রাম সেরে তারা আবার
এগোলো টংলুর শেষ চড়াই ধরে টংলুর দিকে। আমি ও আমার সঙ্গী চারজন বিষন্ন হাতে কুড়িয়ে আনলাম ছেঁড়া পটেটো চিপসের প্যাকেট,
ক্যাডবেরির র্যাপার। পকেটে ভরে নিচে নিয়ে যাব এই সমতলিক পাপ। পাপ লুকোতে পারলাম,
তবে দুশ্চিন্তা নয়। মনে হল, আমি খানিক আগে জন্মাবার উত্তরাধিকারে এই রেশমী বন
পেয়েছি বটে, পুত্রকে হাতে ধরে এখানে এনে দেখিয়েছি তার বংশানুক্রমে প্রাপ্ত ঐশ্বর্যরাজি;
কিন্তু আমার ঊনতিরিশ বছর পরে জন্মানো আমার সন্তানের কপালে বোধহয় সে সৌভাগ্য আর
নেই। সে যদি কোনোদিন তার সন্তানকে ধোত্রে নিয়ে এসে তার পিতার ফেলে-যাওয়া পদচিহ্ন
খুঁজতে যায়, হয়তো যারপরনাই হতাশ হবে। ধোত্রেতে তখন হয়তো পাঁচতলা হোটেল, এসি
ব্যাঙ্কোয়েট হল, বাথরুমে রানিং হট ওয়াটার, খাবার টেবিলে কন্টিনেন্টাল ডিশ – শুধু
ময়ূরকন্ঠী রঙের বুক, ছোট্ট সেই থ্রাশ পাখীটি তার সমস্ত পরিবারপরিজন নিয়ে চিরতরে
মুছে যাবে এই মখমলী বন থেকে, যেমন প্রায় মুছেই গেছে লাজুক রেড পান্ডার দল। পাকা
রাস্তা রিম্বিক ছাড়িয়ে রাজাপীর, শেপি গ্রাম টপকে প্রায় শ্রীখোলা অবধি চলে গিয়েছে,
দু’ ধারে পোঁতা হচ্ছে ইলেকট্রিকের খুঁটি। পাহাড়ের গায়ে গাছের পোশাক ফেলে দিয়ে
পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কংক্রিটের জামা। কবিতা তো হিয়েরোগ্লিফিক্স, বটানি জুলজির
রোমান্টিকতাও মুছে গেছে, আজ ভবিতব্য নির্ধারণ করে আমার অর্থনীতি। পর্যটক বাড়বে,
বাড়বে আয়। স্থিতিশীল উন্নয়ন সোনার পাথরবাটি হয়ে উঠবে দিন-কে-দিন। আর শ্রীখোলা-
রাম্মামখোলা নিরুপায় চেয়ে চেয়ে দেখবে কেবল।
 |
| ধোত্রে থেকে রাজনন্দিনী কাঞ্চনজঙ্ঘার উদ্ধত অহংকার |
(ড. হরিসাধন দে অধিকারী সম্পাদিত "গন্ডীছুট" পত্রিকায় ১ লা বৈশাখ ১৪২২ সংখ্যায় প্রকাশিত)