(বিধিসম্মত
সতর্কীকরণ – রচনাটি বি-চিত্রবর্গীয় ও হোমিওপ্যাথি-ওষুধতুল্য, তাই খাদ্যগ্রহণের আগে
বা পরে আধা-ঘন্টার মধ্যে এ লেখা পাঠে ফলাফল ভালো না হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল। এবং, কে
না জানেন ওষুধে ফলাফল ভালো না হলে তার জন্য ওষুধদাতার কোনো দায় নেই, ভুলটা
আগাগোড়াই ওষুধগ্রহীতার।)
‘পথিকৃৎ’ বলে একটা কথা আছে না ? মানে, যিনি অচেনা পথে প্রথম
হেঁটে বাকিদের জন্য পথ খুলে দেন ? বা, এমন অভূতপূর্ব কান্ড ঘটিয়ে ফেলেন যা একটি
নতুন যুগের সূচনা করে ? সোজা কথায়, যে সব মহামানব ‘প্রমিথিউস’ বা ‘ভগীরথ’-ধাঁচের কীর্তির
(বা, কেচ্ছা) বলে অমরত্ব লাভ করেন তাঁদেরই তো পথিকৃৎ বলে। যেমন ধরুন, বাবু মধুসূদন
গুপ্ত। সঙ্গে চার স্যাঙ্গাৎ রাজকৃষ্ণ দে, উমাচরণ শেঠ, দ্বারকানাথ গুপ্ত আর
নবীনচন্দ্র মিত্রকে নিয়ে সেই কোন মান্ধাতার আমলে ১৮৩৬ সালের ২৪শে অক্টোবর কলকাতা
মেডিক্যাল কলেজে প্রথম ভারতীয় হিসেবে শবব্যবচ্ছেদ করে
অশিক্ষা-কুশিক্ষা-কুসংস্কারের ঘোর অন্ধকারে ঢাকা দেশে চিকিৎসাবিদ্যাশিক্ষার নতুন
দিগন্ত উন্মোচন করেন। কলকাতা তখন বৃটিশ-ভারতের রাজধানী এবং সমাজের চলতি স্রোতের
বিপ্রতীপে বাবু মধুসূদনের এ হেন দুঃসাহসিক কীর্তিকে ফোর্ট উইলিয়াম থেকে তোপ দেগে
ব্রিটিশ সরকার অভিবাদন জানান। তারপর ধরা যাক, বাবু নগেন্দ্রপ্রসাদ সর্বাধিকারী। নয়
নয় করে প্রায় একশো চল্লিশ বছর আগে ১৮৭৭ সালের এক বিকেলে মায়ের সঙ্গে জুড়িগাড়ি চেপে
হাওয়া খেতে বেরিয়ে দশ বছরের বালক নগেন্দ্র কলকাতা ময়দানে সাহেবদের খেলা থেকে ছিটকে
আসা ফুটবলে সপাট লাথি হাঁকড়ে কলকাতা তথা ভারতীয় ফুটবলের জনক হয়ে অমরত্ব লাভ
করেছেন। এই রকম আরো কত। আমরা যে আমরা, নিতান্ত সাধারণ মানুষ, মানে মোটেও প্রমিথিউস
বা ওই গোত্রের কেউ নই, আমাদের চারণক্ষেত্র যত ক্ষুদ্রই হোক, সেই লঘিমার মধ্যে
দাঁড়িয়ে আমাদের মধ্যেও কি পথিকৃৎ হয়ে ওঠার স্বপ্ন ঘুমিয়ে নেই ? নিশ্চয়ই আছে। আমার
এক মাস্টারমশাই (এখন প্রায় পঁচাত্তর) গর্ব করে বলতেন, আমাদের স্টেশান থেকে ২২শে
অক্টোবর ১৯৬৩ প্রথম যে ইলেকট্রিক ট্রেন শিয়ালদহ গিয়েছিল (তার আগে কয়লার
ইঞ্জিনে-টানা রেল চলত), ওনার সেদিন শিয়ালদহে কোনো কাজ ছিল না, বরং অন্য সব কাজ
ফেলে সেদিন উনি সে ট্রেনে সওয়ার হয়েছিলেন। বিশ বচ্ছর পর ১৯৮৪তে কলকাতায় পাতালরেল
চালু হওয়ার দিনেও (২৪শে অক্টোবর) উনি একই কীর্তি স্থাপন করেন, আমজনতার জন্য প্রথম
যে রেকটি এসপ্ল্যানেড ছেড়ে ভবানীপুর (নেতাজীভবন) অবধি যায়, উনি তাতে চড়ে এসেছেন।
কেন ? কি উল্লাসে ? কোন কীর্তিশৃঙ্গ জয়েচ্ছায় সুভদ্র ও সুদক্ষ আমার অংকের
মাস্টারমশাই অন্য সব কাজ ফেলে, অন্য সকল ব্যস্ততার মাঝেও সময় বার করে ধারাবাহিকভাবে
এই কাজ করে এসেছেন ? এই সব শুনে সেই ছেলেবেলায় ভারী অবাক হতাম, কিন্তু আজ বুঝি,
আমরা সবাই যে যেখানেই আছি, যে যতটুকু গন্ডির মধ্যেই চরে বেড়াই না কেন, সেই ক্ষুদ্র
পরিসীমার মধ্যেও পথিকৃৎ হয়ে ওঠার সাধ আমাদের মনে মনে হেমন্তের হাল্কা কুয়াশার মত
থেকেই যায়।
যাক সে কথা, প্রসঙ্গে ফিরে আসি। কালে
কালে গঙ্গা দিয়ে কত জল বয়ে গেল, আমরা শিক্ষিত হলাম, মানে সত্যি-খারাপ ও তথাকথিত-খারাপ
কথাগুলো যে ইংরেজিভাষায় বললে দোষ কেটে যায় সে শিক্ষা আমাদের হল। ‘ইডিয়েট’ আমাদের প্রেমালাপে
ঢুকে পড়ল, নির্বাসিত হল ‘উজবুক’; নিজের বউ-এর রেফারেন্স দিতে বা লোকমধ্যে পরিচিত
করাতে ‘আমার ওয়াইফ’ বলাটাই সভ্যতা হয়ে উঠল এবং সামাজিকভাবে আরো বহুবিধ নির্দোষ
শারীরবৃত্তীয় কথাতেই মাতৃভাষা পরিত্যাজ্য হল, বাকি নিখাদ কটূ কথাগুলোর কথা আর নাই
বা বললাম। আমরা শিখলাম, গোসলঘরকে বাথরুম/ওয়াশরুম বলতে হয়, আর টয়লেটে কোন দুর্গন্ধই
থাকে না। যুগন্ধর প্রতিভা শিব্রাম চক্কোত্তি মশাই ‘আহারালয়’-এর সঙ্গে মিল দিয়ে
‘বাহারালয়’ কথাটা একটা লেখায় আমাদের শিখিয়েছিলেন, এবং তলিয়ে দেখলে দেখা যায় অসামান্য
এই নামে বিজ্ঞানসম্মত ভাবে পুরো পরিপাকপ্রনালীটি বিধৃত আছে, তবু আমরা সাহেবদের
ছোঁয়া এড়াতে পারলাম না। সাম্প্রতিক অতীতে বাংলায় আরো একটি বহু-প্রার্থিত শব্দ
সংযোজিত হয়েছে – ‘হাগজ’, যাকে মূল ইংরেজি ‘টয়লেট পেপার’-এর স্রেফ বঙ্গানুবাদ বললে ঘোর
অপমান করা হয়। কিন্তু সেই আমাদের মজ্জাগত সংস্কার, ইংরেজিতে বললে দোষ কেটে যায়,
ফলে গৃহিনীরা ‘মলে’ গেলে সেই ‘টয়লেট পেপার’ই খোঁজেন ! অথচ সংস্কৃত থেকে নিয়ে জোর
করে ‘শৌচাগার’ কথাটা সরকারিভাবে চালানোর প্রচেষ্টাও যে খুব জনপ্রিয় হয়েছে তা বলা
যায় না, ওটা পোষাকী খাতায়-কলমে আর সরকারি নির্দেশনামাতেই থেকে গিয়েছে। কিন্তু ওই
একই মানসিকতার কুপ্রভাবে আত্মবিস্মৃত জাতি আমরা ভুলেই গেছি আরেক পথিকৃৎ বাবু
অখিলচন্দ্র সেনের নাম। বাবু অখিলচন্দ্র সেন সম্পর্কে যে দু’টি তথ্য আমাদের শ্রদ্ধার
সঙ্গে স্মরণ করা প্রয়োজন তা হ’ল, উনি কাঁঠাল খেতে ভালবাসতেন ও তাঁর একটি
পত্রাঘাতেই রেলের কামরায় শৌচাগার (ওই, টয়লেট আরকি) প্রবর্তন হয় ! ইতিহাসে আছে
ভারতে ব্রিটিশ সরকার রেল যোগাযোগ শুরু করে ১৮৫৭ সালে। কিন্তু তখনও ট্রেনে
শৌচাগারের ব্যবস্থার কথা ভাবা হয়নি, মানে ওটা যে ‘চলন্ত রেলপথে’ আদৌ প্রয়োজন সেটাই
অনুভূত হয়নি । বাবু অখিলচন্দ্র সেন একবার রেলপথে ভ্রমণকালে সে প্রয়োজন সুতীব্র
ভাবে অনুভব করেন, এবং সব চেয়ে বড় কথা, সে অনুভবের সর্বজনীনতা মরমে-মরমে উপলব্ধি
করে সর্বজনহিতায় চ সাহেবগঞ্জ ডিভিশনাল রেলওয়ে অফিসে একটি চিঠি লেখেন ১৯০৯ সালে । প্রিয়
পনসফল পর্যাপ্ত পরিমাণ ভক্ষণে তাঁর ‘পৈটিক’ (poetic নয়, কারণ যে মানসিকতার কথা বলছি তার প্রভাবেই পেট-বিষয়ে
পোয়েট্রি তেমন পরিচিতি লাভ করেনি) পরিস্থিতি ভালো ছিল না (“too much swelling
with jackfruit”)। ফলে অনুভূতিটা দ্রুতই আশু প্রয়োজনে
ঘনীভূত হয় ও সেনমহাশয় বীরভূম জেলার আমোদপুর (Ahmedpur) স্টেশানে ট্রেন দাঁড়াতে স্টেশান সংলগ্ন শৌচালয় ব্যবহার করতে
বাধ্য হন। এমতাবস্থায় সময়নিষ্ঠ রেলগার্ড নিতান্ত অমানবিকতার পরিচয় দিয়ে মিনিট-কয়েক
মাত্র অপেক্ষা না করে ট্রেন ছেড়ে দেওয়ার বাঁশি বাজিয়ে দেন। ফলে অসমাপিকা
ক্রিয়াপদের মূর্ত প্রতীক হয়ে বাবু অখিলচন্দ্র একহাতে লোটা অন্যহাতে ধুতি সামলাতে
সামলাতে প্ল্যাটফর্ম থেকে বিলীয়মান ট্রেনের দিকে ধাবমান হন ও তাঁর পদস্খলন ঘটে।
জনাকীর্ণ রেল-স্টেশানে এক রাশ নারী ও পুরুষের চোখের সামনে ভূপাতিত তিনি বিশদ উন্মোচিত
ও প্রকাশিত হয়ে পড়েন। তিনি পুরুষসিংহ, নিজের এমত সম্ভ্রমহানি নীরবে মেনে নেননি,
সাহেবদের টক্কর নেওয়ার মত ভাষার জোর তাঁর আয়ত্ব ছিল, তিনি তাঁর নিজস্ব সুতীব্র ভাষায় রেলদপ্তরে পত্রাঘাত করেন। বাবু অখিলচন্দ্র সেনের ঐতিহাসিক
চিঠিটি এখনো আছে নয়াদিল্লির রেল মিউজিয়ামে। আমি কর্তব্যবশে চিঠিটির বয়ান গঠন ও
বানান অক্ষুন্ন রেখে এখানে তুলে দিলামঃ
Dear Sir,
I am arrive by passenger train Ahmedpur station and my belly
is too much swelling with jackfruit. I am therefore went to privy. Just I doing
the nuisance that guard making whistle blow for train to go off and I am
running with ‘lotah’ in one hand and ‘dhoti’ in the next when I am fall over
and expose all my shocking to man and female women on plateform. I am got
leaved at Ahmedpur station.
This too much bad, if passenger go to make dung that dam
guard not wait train five minutes for him. I am therefore pray your honour to
make big fine on that guard for public sake. Otherwise I am making big report
to papers.
Your’s faithfully servant
Okhil Ch. Sen
এ চিঠি আমাদের জাতীয় সম্পদ। মুশকিল হচ্ছে, আমাদের ওই ‘টয়লেট’-মানসিকতার
জন্য এর যথাযোগ্য সমাদর আমরা করে উঠতে পারিনি, ফলে আত্মবিস্মৃত জাতি বাবু
অখিলচন্দ্রের ঐতিহাসিক মূল্যায়ণও করে উঠতে পারেনি আজও। এ দ্বিচারিতা আমাদের লজ্জা,
বিশেষত যখন রেলপথে দূর বা অদূরযাত্রায় টয়লেটের অপরিহার্য ভূমিকা আমরা কেউই
অস্বীকার করতে পারিনা। আমি তো একবার রেলের গাড়িতে রাত্রিবাসের পর সকাল-সকাল কামরায়
দুই টয়লেটের মাঝে ওই সরু প্যাসেজে প্রতীক্ষার সারণিতে দাঁড়িয়ে অগ্রবর্তী প্রার্থীর
সঙ্গে বন্ধ-দরজার ওপাশের ‘The
Insider’–এর
মরণপণ বাক্যযুদ্ধের সাক্ষী হয়েছিলাম –
The Outsider : কি হল দাদা একটু
হাত চালান, লাইনে অনেকে আছেন...
The Insider : এক মিনিট - শেষ
করতে দেবেন তো -
The Outsider : আর এক মিনিট, এ
দিকে আমার তো ‘ডেলিভারি’ প্রায় হয়ে গেল!
কি ভাবে আমাদের এই সংকীর্ণ মনোবৃত্তিকে ব্যাখ্যা করব ? আমি ওই মানসিকতার
শিকার একেবারেই নই তা দাবী করব না, তবে একই সঙ্গে প্রছন্ন গর্বের সঙ্গে স্বীকার
করি যে আমি এই ব্যাপারে দু-চার কথা বলবার হক রাখি, কারণ একনম্বর, আমার মতে
ইংরেজদের ‘হাগজ’ ব্যবহারের চেয়ে আমাদের ‘জলখরচ’ (ক্রিয়ান্তে পরিচ্ছন্ন হওয়ার
পদ্ধতিটি বোঝাতে টাকি-বসিরহাট অঞ্চলে এই যুগ্ম শব্দটি চালু আছে, আমি নিজের কানে
শুনেছি) অনেক স্বাস্থ্যসম্মত; এবং দ্বিতীয়তঃ, রেলযাপনের বিগত তিনদশকে আমি শিয়ালদহ
মেইন লাইনে শিয়ালদহ টু কল্যাণী প্রত্যেকটি স্টেশানের বাহারালয়গুলি সরেজমিনে পরখ
করে দেখছি। এর মধ্যে কয়েকটিতে আমার আনাগোনা স্ট্র্যাটেজিক কারণেই মোটামুটি নিয়মিত
ছিল। একবার নিয়মিত হাজিরায় কিছুদিন ফাঁক পড়ায় একটির তত্ত্বাবধায়ক তো আমায় বলেই
ফেলেছিলেন – কি ব্যাপার দাদা, অনেকদিন দেখি না, আসবেন। আরেকটির তত্ত্বাবধায়কের কথা
না বললে আমার পাপ হবে, কারণ তিনিও আমার হিসেবে একজন পথিকৃৎ। প্রয়োজন মিটে যাবার
পরেও বহুদিন আমি তাঁর সঙ্গে গপ্পোগাছা করেছি, এমনকি সে গপ্পের টান এমন ছিল যে
প্রয়োজন ব্যতিরেকেও শুধুই ওনার সঙ্গে দেখা করবার জন্য সেখানে গিয়েছি। তিনি রীতিমত
সংস্কৃতির চর্চা করতেন, স্টেশানের মেহনতি মানুষ ও তাদের ছানাপোনাদের নিয়ে
রবীন্দ্র-নজরুল-সুকান্ত জয়ন্তী পালন করতেন। বাহারালয়ের প্রকোষ্ঠগুলির দরজার ভেতরে
বাইরে চক দিয়ে লিখে দিতেন বাণী, দরজার ভেতরের দিকে যদি লেখেন – তোমার সাফল্যে আমার
শুভেচ্ছা, তাহলে বাইরে লিখে দিতেন – তোমার শীঘ্রতাকে আমি সম্মান করি, তবে
শীঘ্রতারও সময় প্রয়োজন। কয়েক সপ্তাহ পরে দেখি ভেতরে লিখে দিয়েছেন – পশ্চাতে রেখেছ
যারে সে তোমারে পশ্চাতে টানিছে, আর বাইরে লিখেছেন – বাহিরে ভুল ভাঙ্গবে যখন, ‘অন্দরে’
ভুল ভাঙ্গবে কি । বুঝলাম, এখন কবিপক্ষ তাই চেনা রবীন্দ্রগানের প্রথম পংক্তির একটি
মাত্র শব্দ বদলে দিয়ে অধীর অপেক্ষার বেদনাটা ধরতে চেয়েছেন। নিয়মিত মৌলিক কবিতা
লিখতেন আমাদের ওই হীনমন্যতাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, তাতেও অনেক সময় পরিচিত কোনো
পংক্তি ব্যবহার করতেন রসের খাতিরে। এক-আধটা ভাঙ্গাচোরা লাইন এখনো আমার মনে আছে –
এ ব্যথা কি যে
ব্যথা বোঝে কি আনজনে
কাকডাকা প্রত্যুষে
/ সহসা উঠিল ফুঁসে /
লাইন ধরে হেঁটে যাই
/ ঠাঁই কোথা, ঠাঁই নাই
আমি বসি এবে
কোনখানে ?...(ইত্যাদি, ওতে রক্তিম সূর্যোদয়-টয়ও ছিল, আজ আর মনে নেই)
ওই শিয়ালদহ মেইন-লাইনের একটি কল্যাণময় শহর যেখানে মহামতি লেনিন ও
শ্রীশ্রী গুরুচাঁদের সহাবস্থান আছে, তাঁদের মাঝে তাঁদের আলাদা করে রেখেছে একখানি
‘সুলভ’ বাহারালয়। দু’টি সুউচ্চ শৃঙ্গের মাঝে একটি জলবিভাজিকা, একটি সংকীর্ণ গিরিপথ
যেখানে হাঁফ-ছাড়া যায় আর শৃঙ্গের উচ্চতার আন্দাজ নেওয়া যায়, তাকেই তো বিজ্ঞান বলে;
আর দুই শৃঙ্গেরই ছায়ায় দাঁড়িয়ে সেই গিরিপথের রক্ষণাবেক্ষণের নামই তো উন্নয়ন এবং যে
শহরের কথা বলছি, তাতে বিজ্ঞান ও উন্নয়ন হাত-ধরাধরি করে চলেছে আজ বেশ কয়েক দশক,
অতীতে শিল্পও ছিল এখন তার মলাটগুলো কেবল অতীতের শৈল্পিক গৌরবের সাক্ষী দেয়। আমার
প্রাতিষ্ঠানিক ছাত্রজীবনের (জন্মিলেই ছাত্রজীবনের শুরু, মরণে অন্ত, মাঝে নিতান্ত
একটি ছোট্ট অংশ প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাকাল) শেষদিকটা ওই শহরেই কেটেছে। সেই শহরের এক
নম্বর রেল-প্ল্যাটফর্মের উত্তরসীমায় রাধাচূড়া গাছের নীচে রেল কর্তৃপক্ষ একবার
(নব্বই দশকের শুরুতে) একটি প্রশস্ত বাহারালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন। সবদিক থেকেই
খুব বিবেচক সিদ্ধান্ত। গ্রামে-গ্রামে এই বার্তা রটে যাওয়ার আগেই আমি নিজ তাগিদে তা
জেনে ফেলি এবং ইঁট-বালি পড়া ইস্তক অকুস্থলে নিয়মিত আনাগোনা শুরু করি। মিস্তিরি ও
ভারপ্রাপ্ত কন্ট্র্যাক্টরের সঙ্গে আলাপ জমতে দেরি হল না, রেলের সহকারী বাস্তুকার
কাজের অগ্রগতি তদারকে এসে আমার সঙ্গে সম্যক আলাপিত হলেন ও চুড়ান্ত ভদ্রতাবশে আমায়
চায়ে আপ্যায়িত করে বললেন – এ তো প্রায় আপনার নিজের বাড়িরই জিনিস। একদিন দেওয়াল
গাঁথা শেষ হল, তাতে বাহারি টালির প্রলেপ পড়ল, ছাদোপরি জলের ট্যাংক যখন স্থাপন করা
শেষ, তখন রেল কর্তৃপক্ষ সেই ধর্মস্থান উদ্বোধনের দিনক্ষণ স্থির করলেন। স্বাভাবিকভাবেই
আমজনতা জানবার আগে আমি সমস্ত খবর জেনে গেলাম এবং নির্দিষ্ট তিথিতে দুপুর-দুপুর থেকে
হত্যে দিয়ে পড়ে রইলাম হলুদ ফুলে-ফুলে-ছাওয়া রাধাচূড়া গাছের তলে সেই বাহারি
বাহারালয়ের আশেপাশে। বসন্তের হাওয়ায় দোলে রাধাচূড়া আর কোন সে অদৃশ্য ডেকরেটার প্ল্যাটফর্মে
যেন হলুদ-ফুলের কার্পেট বিছিয়ে দেয় অতিথিদের অভ্যর্থনা জানাতে। অধীর প্রতীক্ষার
চার-পাঁচ ঘন্টা বাদে সেই সহকারী বাস্তুকার স্টেশানমাস্টারকে নিয়ে এলেন, আলো উঠল
জ্বলে, এগজস্ট পাখা ঘুরল বনবনিয়ে, দুজনে ঘুরে দেখলেন নব্য বাহারালয়ের বাহার।
বেরিয়ে এসে আমায় বললেন – যান মশাই, ঢুকে দেখুন কেমন হয়েছে। বিশ্বাস করুন, এ সম্মান
এমত সমাদর আমি আজ অবধি কোথাও পাইনি। গোধূলির উদাসী বসন্তবায়ে রাধাচূড়া-ফুলের নরম গালিচা
মাড়িয়ে অন্দরে প্রবেশ করতে গিয়ে বুকের মধ্যে যে আবেগের ভূমিকম্প টের পেয়েছিলাম,
হলপ করে বলতে পারি সে জাতীয় থরথরানি পরে আর একবারই মাত্র টের পেয়েছি এবং তা আমার
ফুলশয্যাকক্ষে প্রবেশের সময়। বিগলিত তত্ত্বাবধায়ক বললেন – আসেন আসেন, এতদিন ধরে
কাজ দ্যাখলেন, আপনের বাড়ির মতই তো হয়ে গ্যাছে, আপনেরে দিয়েই এস্টার্ট, আজ আপনের
ফিরি (ফ্রি)। - মূঢ়, এত জানো তবু বোঝো না,
প্রথম ইনাম দেবার অধিকার গৃহস্বামীর! হতে পারে, এ হেন জীবন কাঁচের সমান পরশকাতর,
হতে পারে আয়ু যেন পদ্মপত্রে নীর, বহু বাসনায় প্রাণপণে চেয়ে আমিও সেইদিন
পথিকৃৎ-গোত্রলাভ করলাম।

