তোমার খোলা হাওয়া
(বিধিসম্মত সতর্কীকরন : এটি একটি অ্যাকাডেমিক প্রবন্ধ। এই ধরণের ‘টেকনিক্যাল’ লেখায় এতো ফুটনোট লাগে যে বলবার নয়। তা আমি ফুট কাটতে ফুটারের ফুটপাথ ব্যবহার না করে মেইন-লাইনেই সেগুলো বেড়া (ব্র্যাকেট) দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া মনস্থ করলাম। যুক্তি সহজবোধ্য, রেলপথের কোন ফুটপাথ হয় না।)
লাল সিগন্যাল
অকপটে স্বীকার করা যাক, আমার বর্তমান চাকরিটা ‘জ্ঞান’-বিষয়ক। যদিচ ইদানীং কান্ডকারখানা দেখে হিতাহিত জ্ঞান হারাবার উপক্রম করেছি, তথাপি অজ্ঞান-অন্ধকার দূরীকরণকে যেকোন দায়িত্বজ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষকই অবশ্য-কর্তব্যজ্ঞান করবেন, অন্তত যতোক্ষণ বাহ্যজ্ঞান রহিত না হয়। একথা সাহেবদের ভাষায় বলা যায় ‘politically correct’। এই পরিপ্রেক্ষিতে আরো অকপটে স্বীকার যাই যে, আমার এ-হেন চাকরিটাই আমার জ্ঞানাহরণের পরিপন্থী - যাকে বলে প্রধান অন্তরায়। ব্যাপারটা খোলসা করি। বিগত একযুগ যাবত আমার বর্তমান চাকরিটি আমায় কেবল ট্রেনে তুলেই নামিয়ে দেয়। আক্ষরিক অর্থেই কেবল ওঠা আর ওঠামাত্র নামা। কাজেই রবীন্দ্রগানে নতুন কি পরীক্ষানিরীক্ষা হলো, তা সম্যক অনুধাবনের সৌভাগ্য আমার হয়না। বাংলার সর্বশেষ যুগসূচক বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারগুলি যথা, আয়ূর্বেদিক নতুন আইটেম যা কিনা কোষ্ঠকাঠিন্য ও দাদের উপশমে সমান কার্যকর, দাম্পত্যকলহ নিরসনে সর্বরোগহর আমলকীর উপযোগিতা অথবা বাঁকুড়ার গামছার সর্বশেষ গুণাগুণ (যথা, ঘর্মাক্ত বাড়ি ফিরে স্নান করে এতে গা মুছলে চন্দন বা পদ্মগন্ধ নির্গত হয়) সম্বন্ধে পূর্নাঙ্গ জ্ঞানার্জনের আগেই চাকুরিস্থল এসে পড়ায় আমায় ট্রেন থেকে নেমে পড়তে হয়। এর ফলে বিগত এক দশক ধরেই আমার পাড় ভাঙ্গে। একলা রাত্তিরে তার আওয়াজ শুনি ঝুপ-ঝুপ-ঝুপ। বারোটা বেয়াল্লিশের লাস্ট ট্রেনের দূরসঞ্চারী শব্দে তা চাপা পড়ে যায়। আমি ঘুমিয়ে পড়ি – কাল সকালে আবার এক জ্ঞানহীন জাগরণের জন্য।
চালাও পানসি বেলঘরিয়া
সত্যি কথা বলতে কি, তিরিশ বছরের বেশী হল (ইদানীং ‘চৌত্রিশ বছর’ কথাটা একটা যাকে বলে iconic phrase হয়ে উঠেছে; বস্তুত আমারও চৌত্রিশই হল, ’৭৮-এর জানুয়ারী থেকে ’১২-র জুন। আমি বচনে ‘অপ’-ভাব এড়াতে তিরিশ বলাই বাঞ্ছনীয় বলে মনে করলাম) মেইন লাইনে ‘কাজ’ করছি। এ এক অনন্য সমতল যেখানে দেখাশোনা চিরকালই ফ্রি, এবং কেনাকাটা চিরকালই ব্যক্তিগত ব্যাপার। এ এক অনির্বচনীয় সাম্যসুত্রে গাঁথা আনন্দবাহন যেখানে আগে-ওঠা যাত্রী সামান্য সুবিধাজনক অবস্থায় আছেন। এখানে আমরা সবাই কথকতা করছি, আবার সবাই শুনছিও। সবাই জায়গা চাইছি, কিন্তু কেউ জায়গা দিচ্ছি না, উঠেই offside (এই শব্দটা নিত্যট্রেনযাত্রীর ‘কি-করিতে-হইবে’ পুস্তিকায় কি করে জায়গা পেলো কে জানে) দাঁড়িয়ে পড়ছি। কানে বাজে দরজা ধরে আধ-ঝুলন্তের আর্তি - “দাদা একটু ঢুকুন, পড়ে যাবো যে...”। জায়গা-দিতে-অপারগ নাচারের (হয়তো আমি) সপাট জবাব – “আপনি পড়ে যাবেন সেটা আলাদা ব্যাপার, কিন্তু আমি কোথায় ঢুকবো ?” এ হেন মেইন লাইনই আমার শৈশবের চারণভুমি, যৌবনের প্রথমার্ধের উপবন; দ্বিতীয়ার্ধের সাধনক্ষেত্র হতে-হতেও হল না, এর জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী। সম্প্রতি নতুন করে দীর্ঘায়িত প্ল্যাটফর্মের উত্তরপ্রান্তের নির্বিকল্প বেঞ্চিগুলো তো আমার বার্ধক্যের বারানসীর দৃশ্যে রোজ বিকেলে রিহার্সাল দিয়ে চলেছে। তা রেলযাপনের এই তিরিশ বছরে যা কিছু ভালো দেখলাম তার সর্বাগ্রে থাকবে বাঙালী স্বাস্থ্যোন্নতি। আমরা এখন গলির আসনে কোনভাবেই চারজন আঁটি না, দেওয়ালি জোড়া-আসনে আটের বেশি তো কোনমতেই নয়। অথচ এককালে আঁটতাম, বিশ্বাস করুন / ‘পোড়’প্রাপ্তরা স্মরণ করুন, আঁটতাম। তেঁতুলপাতায় ন’জন সুজন আঁটবার কথা এবং তাই অনামুখো নিন্দুকে (অক্সফোর্ডে এঁদেরই কেউ-কেউ unknown Indian–এর বদান্যবিনয়ে ছড়ি-কড়ি-যশ, বাড়িগাড়ি-আঙুরের রস হাঁকিয়ে নামফলকে নাইটত্বের পেখম ধরেছেন) বলে, এতোদ্বারা প্রমাণ হইতেছে যে, বাঙালী সুজনত্ব হারাইয়াছে। আসনে চতুর্থ ব্যক্তিরা হলেন প্রকৃত অর্থেই একেকজন আত্মঘাতী বাঙালী, না হলে নিজ পশ্চাতদেশ কিসের ভরসায় সাড়ে তিন ইঞ্চি পরিসরে স্থাপন করে শরীরের অপরাপর অঙ্গপ্রত্যঙ্গগুলির জন্য অন্যত্র ভ্যাকেন্সি খোঁজেন ? ওই একই সংগ্রামী সময়ে জানালায় ধারে আসীন প্রথম ব্যক্তি বোধিবৃক্ষতলে সমাধিস্থ তথাগত, সুজাতা নাম্নী কন্যার হাতে পায়েস না খাওয়া পর্যন্ত যার ধ্যানভঙ্গের কোন সম্ভাবনা নেই। দুইপাশে এই দুই কলাগাছের মধ্যিখানে যে দু’জন, তাঁদের অনুচ্চারিত অনুপম থিমগীতি তো বর্তমান বঙ্গভূমে রণে-বনে-জলে-জঙ্গলে ধ্বনিত – “আমাকে আমার মতো থাকতে দাও, আমি নিজেকে নিজের মতো গুছিয়ে নিয়েছি...”।
দ্বিতীয় হ্লাদজনক বিবর্তন দেখছি নিত্যরেলযাত্রীর এক অনন্য অভিজ্ঞানে অর্থাৎ তার ব্যাগে : যাতে থাকবেই ছাতা, টিফিন-কৌটো, ভাঁজ-করে-ছোট্টটি-করা বাজারের থলি (বাজারের লিস্টটা অবশ্য অন্যত্র আছে - বিয়ের ঠিক পরে-পরে বৌএর পাসপোর্ট ছবি যেখানে থাকতো, লিস্টটা এখন নির্ভুল সেখানে আছে), মৌরির ডিবে, আধপাতা জিনট্যাক/র্যানট্যাক (উৎসবের মরশুমে উপুরি লোমোটিল/লোপামাইড/নরফ্লক্স); ইদানীং জলের বোতল (বাড়িতেও জলের জাগ/গ্লাস উঠে গেছে, বাঙ্গালী বোতল ধরে ফেলেছে) এবং নেতৃশ্রেণীর বাড়তি থাকবে দু’ প্যাকেট তাস (এ বাদে বহু কিছু থাকতে পারে, যার বেশ কয়েকটি উদ্ভাবনের চমৎকারিত্বে ও উপযোগিতায় রীতিমতো নোবেলিত হওয়ার যোগ্য, যথা, ছয় মিমি লোহার রড বাঁকিয়ে তৈরি ইংরেজি S-আকৃতির আংটা যার সাহায্যে বাংকে স্থানাভাব ঘটলে ব্যাগ/থলি যেকোনো জায়গায় ঝুলিয়ে রাখা যায়; তার-প্লাগ-হোল্ডারসহ চল্লিশ ওয়াটের বাল্ব, যার আলোয় পুরোন কাঠের গাড়ি যথা লালগোলার অন্ধকার কম্পার্টমেন্টেও তাসলীলা জারী রাখা সম্ভব, রেলের জানালার মাপে-মাপে বানানো পর্দা ও তা টাঙ্গানোর হুক সহ তার...সে যাক, এ ফিরিস্তি ছেড়ে আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসি)। গত দু’-তিন দশকে ব্যাগ নামক এই অপরিহার্য বস্তুটির বিবর্তন সত্যিই নজরকাড়া। এটি নিত্যরেলবিহারী বাঙ্গালীর বগল থেকে হাত ঘুরে কাঁধে উঠেছিলো বছর পনেরো আগেই। সম্প্রতি তা বিক্রমাদিত্যের বেতালের মতো পিঠে চড়েছে। তার চেহারাচরিত্রেও এসেছে চমকপ্রদ পরিবর্তন। বলাই যায় বাঙ্গালী এখন হাত খুলে জগতের যেকোনো ওঠাপড়ার মহড়া নিতে তৈরি। এই সদ্য-অর্জিত শশব্যস্ততার অনুসঙ্গ হচ্ছে সদ্য-অভ্যাসিত চলভাষিক ত্বরিতবচন – “হ্যাঁ, দেখুন না, রোজই ঢোকাবার সময় লেট করে...হ্যাঁ হ্যাঁ আপনি ঢুকে যান, আমি দশ মিনিটের মধ্যে ঢুকছি...সে কি, ক-বাবু এখনো ঢোকেননি ? এতো লেট করে ঢোকার কোন মানে হয়...(ইত্যাদি)”। হায়, সেই “বাসায় পৌছিয়া অবশ্য তার করিবে...তোমার পৌঁছ-খবর মাতাঠাকুরানীর সমীপে সময়মতো না পঁহুছিলে...”-এর যুগের কফিনে শেষ পেরেকটি এতোদ্বারা অম্লানবদনে ‘ঢুকিয়ে’ দেওয়া গেছে।
ইদানীংকালে সঙ্গীতের বড়ই প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমাদের মেইন-লাইনও সেই মড়কে আক্রান্ত। আমি তানসেনও নই, তালকানাও নই, তাই রেলময় এই অনর্গল ও নির্বিচার মিউজিকথেরাপির বিরূদ্ধাচারণ করি কিসের জোরে ? রেলাচারী মান্না-হেমন্ত-সন্ধ্যা লতা-রফি-কিশোর নিয়ে আমরা দিনের পর দিন রেলযাপন করেছি, মন্বন্তরে আমরা মরিনি। আমি বনেদী রেলবিহারী, তবে গোড়াতেই স্বীকার করেছি, অতীতের সে গৌরব আজ আর নেই। হিমশৈলের সামান্য যে চূড়াটুকু এখনো দেখতে পাই, তাতেই বুঝতে পারছি, এখন চ্যালেঞ্জ আরো প্রখর - এখন বাতাবরণ রবীন্দ্রময়। আর সে কি যে সে রবীন্দ্র ? এ হলো ‘রেলরবীন্দ্র’ যাতে গানের সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় (মতামত ব্যক্তিগত ও বাংলাব্যান্ডপ্রসূত) ব্যাপারটা অর্থাৎ গানের বাণীটুকুর ভার কেবল রবিঠাকুরের ওপর ছাড়া হয়েছে। বাকিটুকুতে পাওয়া যায় দমদমের ঢেউ-এর ছন্দ, সোদপুরের লঘুতা, শ্যামনগরের ভক্তিরস। পাওয়া যায় শিয়ালদহ আউটারে অকারণ অপেক্ষার স্থৈর্য্য, পাওয়া যায় ফার্স্ট-স্টপেজ-ব্যারাকপুরের বেগ। এরপরে স্টেশানে আছে রেলমিডিয়া যাতে ‘দিদি’-র গেঞ্জি-জাঙ্গিয়া বা হারপিকের সুরেলা গুণকীর্তনের ফাঁকে ফাঁকে সঙ্গীত গুঁজে দেওয়া হচ্ছে। বরানগরে কাজ (ক্লাস) সেরে সন্ধ্যে রাতে বেলঘরিয়া স্টেশানে মানবসাগরে সাঁতার দিচ্ছি, ঘোষনা হলো দমদমে ‘রেল বহির্ভূত’ কারণে অবরোধ।...রেলমিডিয়ায় সঙ্গীত...আবার ঘোষনা, “আপ কৃষ্ণনগর এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসছে (ঢুকছে)...পরের আপ আসতে (ঢুকতে) অনির্দিষ্ট কাল দেরি হবে...” ...সঙ্গীত...ট্রেন ঢুকলো এবং আমায় বিন্দুমাত্র পাত্তা না দিয়ে চলেও গেল... সঙ্গীত...“...জানি তুমি অনন্য, আশার হাত বাড়াই...”। মনে হলো, একি অন্তরাত্মার কন্ঠস্বর ! সত্যিই তো, ‘তুমি’ যখন টইটুম্বুর, তখন তোমাতে প্রবিষ্ট হ’তে ‘আশার হাত’ বাড়ানো ছাড়া আমার মতো দুর্বল চশমা-ছেলের কিই বা করবার আছে (ছিলো)! সেইদিনই বহু কসরত করে ঘন্টা তিনেক পর বাড়ির স্টেশানে নামবার সময় আরেক উপলব্ধি হলো। দগদগে ফোস্কা হঠাৎ ফেটে যেমন পুঁজরক্ত বেরোয়, তেমন করেই ট্রেন তখন উগরে দিচ্ছে গৃহগতপ্রাণ একপাল মানুষ। তুমুল হুড়োহুড়ি করে নামবার সময় নিত্যযাত্রী এক বছর-পঞ্চান্নের কুনুই-এর সজোর গুঁতো লাগলো অল্পবয়েসী একটি বিবাহিতার কোলের শিশুর ব্রহ্মতালুতে। বছর-খানেকের বাচ্চাটি ব্যথায় চিল চিৎকার করে উঠলো। এবং আশ্চর্য্য, নাতির বয়েসী দুধের বাচ্চার যন্ত্রণায় ককিয়ে ওঠা কান্নায় ক্ষনিকের দৃকপাত না করে একবারও পেছন ফিরে না তাকিয়ে সেই ব্যক্তি ত্বরিতগতিতে বোধকরি সাইকেল স্ট্যান্ডের দিকে হাঁটা লাগালো। যেন শ্মশানে দাহকার্য শেষে হাঁড়ি ফাটিয়ে পেছনে না তাকিয়ে হাঁটা দেওয়া। ব্যাগ থেকে জলের বোতল বার করে বাচ্চাটার মাথায় ঢালতে গিয়ে হাত বুলিয়ে বুঝলাম, বেচারির চোট-পাওয়া ব্রহ্মতালু আগুন-গরম। হঠাৎই মনে হলো, আমি যেন সর্বব্যাপী অহেতুক হিংস্রতার এক অগ্নিবলয়ে একা দাঁড়িয়ে, “...এ যেন এক রণক্ষেত্র, পিঠ ফেরালেই আছে শত-শত তীর...” (সুনীল)।
প্রায় ‘ঢুকে’ গেছি
এ কাঠের বগি উঠে যাওয়ার আগেকার কথা। এখন মেইন লাইনে লালগোলা সেই বিলুপ্তপ্রায় প্রজাতির শেষ প্রতিভূ ; কাটিহার-জাতীয় বাকি দু’একটি যা আছে তাদের গোত্র আলাদা। বছর তিরিশেক আগে সেই কাঠের গাড়িতে গদি-আঁটা সিটের ফার্স্টক্লাস কামরাও থাকতো। সে বনেদী কামরার মদির অন্দরমহল আমি জানালা দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখেছি, কোনদিন চড়বার সৌভাগ্য হয়নি। কারণ রেলের কোন কামরায় চড়া হবে সে বিষয়টি তখন আমার মর্জির উপর নির্ভর করতো না। তা অধরা মাধুরীর প্রতি মানুষের স্বভাবজ আকর্ষণ তো চিরন্তন সত্য। তাই লায়েক হ’বার পর সামান্যতম সুযোগ পেলেই কাঠের গাড়িতে চড়বার চেষ্টা করতাম। তদ্দিনে অবশ্য সেই স্বপ্নের ফার্স্টক্লাস কামরা মিউজিয়াম-আইটেম হয়ে গেছে। তবু আধুনিক ই.এম.ইউ কোচের থেকে কাঠের বগির চওড়া তক্তার আসন, মাথার উপর বার্থ আর অ্যাটাচড বাথরুমের দুর্নিবার আকর্ষণ আমি কিছুতেই উপেক্ষা করতে পারতাম না। শিয়ালদহ নয় নম্বর প্ল্যাটফর্ম থেকে রাত সাড়ে আটটায় ছাড়তো কাঠের বগির গেদে লোক্যাল, কখন গেদে পৌঁছত কে জানে। এটি আমার বড় প্রিয় বাহন ছিলো। এর কয়েকটি কামরা আগাগোড়া নিস্প্রদীপ থাকতো, কোন-কোনটাতে দমদম বা ব্যারাকপুরে আলো আসতো। সেইরকম কোন কামরায় জুত করে বসে আলোআঁধারির স্নিগ্ধতায় চোখ বুজে জীবনরসায়নের নতুন শেখা ফর্মুলাগুলো মাথার মধ্যে নাড়াচাড়া করতে কি যে আত্মরতির সুখ পেতাম তা ভাষায় প্রকাশ করার সাধ্য আজও আমার অনায়ত্ত। ফর্মুলা বলতে মনে পড়লো, বীজগণিতের বহু কঠিন অংক যথা, নান্টু + মিতা (স্রেফ উদাহরণ, দয়া করে কোনো নান্টুবাবু বা মিতাদেবী কুপিত হবেন না যেন), তুমি + আমি হোলস্কোয়ার সমান-সমান, অথবা, মিতা তোমার দাদা গ্রেটার দ্যান..., এর সমাধান আমি সেই কাঠের কামরার দেওয়ালে নাম-না-জানা শিক্ষককুলের কাছে শিখতে পেরেছি। তাঁদের কাছে ঋণ এ জন্মে শোধ করতে পারবো বলে মনে হয়না। এইরকম কাঠের বগিতে-চড়া মোহমুগ্ধ সময়ে বছর পনেরো আগে একদিন, ওই সাড়ে আটটার গেদে লোক্যালে কামরার ভিতরে জানালার ঠিক উপরের তেলচিটে কাঠে ত্যাড়াবেঁকা হরফে খোদাই-করা লেখা দেখেছিলাম – “সত্য মারা গেছে”। সত্য মারা গেছে !! কে সত্য ? কার ছেলে ? কার বন্ধু ? কার প্রেমিক ? কার হাহাকার কে লিখলো ? নাকি কোন পাগল, আমায় শোনালো তার পাগলামির কারণ ? যতবার পড়ি, সত্যের গহীনতা আমায় দিশাহারা করে তোলে। এতোদিন পরে আজও লোডশেডিং-এ নিস্তেল স্টেশানের উপর দিয়ে ঝমঝমানো উপেক্ষায় চলে যেতে যেতে জানালায় বসে তোমার খোলা হাওয়া আর বাইরের নিঃসীম অন্ধকার আমায় ঝাঁকুনি দিয়ে মনে করিয়ে দেয়, সত্য মারা গেছে...শুনতে পাচ্ছো, সত্য মারা গেছে। অমোঘ তুমি জীবন তবু ছুটেই চলো গন্তব্যের পানে।