...রক্তে
রাঙা বুকের মণি তার / কাঁপিয়ে দিলো বুড়িগঙ্গা তীরের অন্ধকার”। (বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)
সুদীপ্তর মৃত্যুর পরে দু’টি সহানুভূতিশীল চ্যানেলের সান্ধ্যকালীন টক-শো
অনুষ্ঠান দেখতে দেখতে কেমন শিউরে শিউরে উঠছিলাম গতকাল। একটি আলোচনার ফোকাস ছিলো
ছাত্র-রাজনীতির পরিনাম ভয়ঙ্কর এবং সেহেতূ ক্যাম্পাসে ছাত্র-রাজনীতি বন্ধ করা উচিত
তার স্বপক্ষে মত প্রতিষ্ঠা করা। তবে কোনো অবস্থায় একান্তই যদি একেবারে তা বন্ধ করা
না যায় তবে নিদেনপক্ষে রামকৃষ্ণ মিশন, সেন্ট জেভিয়ার্স কলেজ বা বেসু-র মডেল
প্রয়োগের কথা মৃত সুদীপ্তর শোকে বুঁজে আসা
কন্ঠে উদারপন্থীরা বারবার বললেন। সঞ্চালকের বাধ্যবাধকতা তো সহজেই অনুমেয়, তিনি
সুদীপ্তর শোকবিহবলা দিদির ভাষ্য উপস্থিত করলেন, যেখানে তিনি বলেছেন, পার্টীই সুদীপ্তর মাথা খেয়েছে
(মগজধোলাই করেছে) এবং যেমন খুশি তাকে ব্যবহার করেছে। বাপ-মায়ের উচিত চড় মেরে
(অর্থাৎ শাসন করে) তাঁদের সন্তানকে রাজনীতি করা থেকে নিরস্ত করা। অর্থাৎ, প্রমাণিত
হচ্ছে রাজনীতি করা ছাত্রদের পক্ষে কি ভীষণ ভাবে অনুচিত। ছাত্রানাং অধ্যয়নং তপঃ, তাহারা
যেন সকল পাঠ মন দিয়া পড়ে। মুদ্রার অনুচ্চারিত উলটো পিঠে তাহলে থাকে যে, রাজনীতি
করবেন রাজা-জমিদার, শিল্পপতি, প্রোমোটার, সাট্টার ঠেকের মালিক, মদবিক্রেতা, তোলা-উত্তোলন
শিল্পী, পৈতৃক সম্পত্তিপ্রাপ্ত নব্য লুম্পেন এবং এই সকল মহাপ্রাণদের অনুগমন করবেন
প্রসাদপ্রাপ্ত নিম্নবর্গীয় লুম্পেনকুল। সকালের কাগজে ইতোমধ্যেই লিখে ফেলা গেছে,
রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র সুদীপ্ত নাকি পরের প্রজন্মকে রক্তপাতহীন বিপ্লবের শিক্ষায়
অনুপ্রাণিত করতে চেয়েছিলো। কারণ, সুদীপ্তর শোকাচ্ছন্ন পিতা বলেছেন, আমার ছেলেটা
সবসময়ে বলতো, রক্ত নয়, শান্তি চাই। কি সুক্ষ্মভাবে সহমর্মিতার মোড়কে বেনেভোলেন্ট
ডিক্টেটরশিপের জয়গান গেয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং সবাই শব্দশালীনতা বজায় রাখছেন দেখে অবাক
লাগে। রাজনীতি ‘ছোট’-দের ব্যাপার নয়, সে হচ্ছে গিয়ে রাজার নীতি, যা করবেন কেবল রাজা
এবং অন্যান্য ‘বড়’-রা যাদের কথা আগে বলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে থেকে কোনো টুইডিল্ডাম
বা টুইডিল্ডী শাসনভার হাতে নেবেন, কে নেবেন সেটা শান্তিময় আলোচনার ভিত্তিতে এবং
জনমতের (যে জনতার সন্তানের রাজনীতি করা উচিত নয়) ভিত্তিতে তাঁরাই ঠিক করে নেবেন এবং
তারপর সেই পরম কারুণিক শাসক আপামর প্রজাসাধারণ্যে সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিতরণ করবেন।
মানে গাছে-গাছে ফল, মাঠে-মাঠে ফসল, মাথার উপর সন্ন্যাসী রাজা যিনি অনাবৃষ্টিতে
কৃষক তাঁর কাছে কর দিতে না পেরে কেঁদে পড়লে ক্ষমাসুন্দর কন্ঠে বলেন – “মাপ, মাপ”,
আর সে অনুগৃহীত কৃষক মহারাজের জয়ধ্বনি দিতে দিতে প্রস্থান করে। তিনি ‘সবারে দেন
মান, সে মান আপনি ফিরে পান’, অর্থাৎ কেউ
সমালোচনায় সরব হ’লে তাকে গ্রেফতারে উদ্যত সান্ত্রীদের থামিয়ে দিয়ে তিনি বলেন, আহা
ওকে বলতে দাও,...কে না জানে Barking dog
seldom bites (ইংরেজী অংশ অবশ্য যাকে বলে, ইতি গজ)। কোথাও হিংসা নেই, নেই বিদ্বেষ - আর কি চাই ? গণতন্ত্রের আর কি বাকি রইলো ? এখন তর্কাতীতভাবে সুদীপ্ত যে মতবাদে বিশ্বাসী
ছিলো, সে মতের শ্রেষ্ঠ অনুশীলনকারীর (লেনিন) লেখাপত্র শুধুমাত্র উপর-উপর পড়া-থাকা বা
না-থাকা যে কোন মানুষই জানেন, দিনবদলের বিপ্লব কখনো অমন নিরামিষ হতে পারে না,
কারণ, বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী সস্নেহে চামচে করে ক্ষমতা শ্রমিকশ্রেণীর হাতে তুলে
দেবে, এ আশা বাতুলতা মাত্র, বরং তারা ক্ষমতায় যেন-তেন-প্রকারেণ টিঁকে থাকবার জন্যে
জোর করেই যুদ্ধ চাপিয়ে দেয় শ্রমিকশ্রেণীর উপর। সুতরাং বিপ্লব
রক্তাক্ত হবে, না রক্তপাতহীন, তা বিপ্লবী শ্রমিকশ্রেণীর ইচ্ছার উপর নির্ভর করে না।
ইতিহাস (গতকাল পর্যন্ত) বলছে, বিপ্লবের
সামান্যতম স্ফূরণও শাসকপক্ষ নির্মম দমননীতি দ্বারা রোধ করবার প্রয়াস করে থাকে। বিপ্লব
রক্তপাতহীন হবে, এ ঘৃণ্য বুর্জোয়া-দালাল (ইতিহাস প্রতিষ্ঠিত) ও সংশোধনবাদী খ্রুশ্চেভীয় মত। আমার নিশ্চিত
বিশ্বাস, রীতিমত রাজনৈতিক পড়াশোনা করা সুদীপ্ত এ মতের শরিক ছিলো না, তার রাজনীতিকে
এভাবে ব্যাখ্যা করা তাকে সত্যি করেই চিরতরে মেরে ফেলবার প্রয়াস। যদি তা ভুল হয়ে থাকে,
তাহলে সুদীপ্তর দিদির কথাই দাঁড়িয়ে যায়, এবং মেনে নিতে হয়, মার্কসবাদী পার্টীতে
মাথায় পচন ধরেছে, সংশোধনবাদ বাসা বেঁধেছে ক্যান্সারের মত। সে ভয় অবশ্য খুব অমূলক
নয়, বর্তমান নেতানেত্রী অনেকেরই কীর্তিকলাপ ও কথাবার্তা সময়-সময় এতো বেশী
অমার্ক্সীয় যে আমার মত সামান্য মানুষের মনে হতেই পারে, পার্টী লেনিন-স্ট্যালিনের
রাজপথ ছেড়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রের বুর্জোয়া কানাগলিতে ঢুকে পড়েছে যেখানে
অন্যায়-অনাচারের প্রতিবাদ-প্রতিরোধ হাঁটু-পর্যন্ত-ধুতি ও হাতে-লাঠি গান্ধীবাবার
শীতল ছায়ায় আবেগঘন আবৃত্তি ও মোমবাতি প্রজ্জ্বলনেই ফুরিয়ে যায়। এ ভয় অমূলক নয় যখন
দেখি, তিন দশকের (তথাকথিত) বাম শাসনের পরেও সুদীপ্তর মৃত্যুর দিনে জাঙ্গিয়া-দেখানো
চিত্রনায়কের বেলাল্লেপনা দেখতে এই শহর কলকাতার পঁয়ষট্টি হাজার জনতা ভিড় করে আসে।
সেই জনতার প্রতিটি উল্লাসী অভিব্যক্তির আড়ালে এক গভীর ক্ষয় হিংস্র দাঁত-নখ বার করে
হাসে। আমি ভয় পাই। আমার সন্তানের দিব্যি, আমি শিউরে উঠি। এ যদি সত্য হয়, তাহলে
সুদীপ্ত তো সত্যিই মরে গেলো চিরটাকালের জন্য, তাহলে আমার সন্তান কি নিয়ে বাঁচবে ?
কি প্রত্যয়ে বলতে শিখবে, “আমি আমার দেশকে ফিরে কেড়ে নেবো / বুকের মধ্যে টেনে নেবো
কুয়াশায় ভেজা বিকেল...” ?
অপর একটি চ্যানেল আবার মাত্রাতিরিক্ত অশ্রুসজল। সুদীপ্তর মরদেহ তাঁরা
প্রশিক্ষিত স্নিফার ডগের মতো অনুসরণ করে চলেছেন। সদ্য সন্তানহারা পিতার মুখ থেকে
তাঁরা বলাবেনই বলাবেন যে সুদীপ্তর মৃত্যুর জন্য দায়ী বর্তমান সরকার ও তার
মুখ্যমন্ত্রী। সুদীপ্ত যে মতে বিশ্বাসী ছিলো তা এতখানি নির্বুদ্ধিতার চর্চা অনুমোদন
করে কি ? সত্য যা, তা কি সুদীপ্তর শোকার্ত পিতা, আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব কি
বলবেন না বলবেন তার উপর নির্ভর করে বসে আছে নাকি ? ওঁরা বলতে না চাইলে বা অন্যতর
কথা (যেমন দিদি সুমিতা বলেছেন) বললেই সত্যটা পালটে যাবে নাকি ? সত্য তো চৈত্রের
ঠা-ঠা রোদের মতো স্পষ্ট। সরকারবিরোধী প্রতিবাদী আন্দোলন পোষা হিংস্র কুকুর লেলিয়ে
দিয়ে দমন করবার চেষ্টা, এটাই তো সত্য। এটাই তো সত্য যে সরকার চাইছেন, কেউ কথা বলো
না কেউ শব্দ করো না, করলে ঘাড় মটকে দেওয়া হবে। পৃথিবীতে কোনোকালে এর দায় কোনো সরকার নিয়েছে নাকি ? শোকসন্তপ্ত পরিবারের
থেকে নিজে যা শুনতে চাই তা বলিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে কোন বিপ্লবী সামাজিক কর্তব্য
সিদ্ধ হলো ? আমার তো মনে হলো এও বাজারমুখী এক নির্দয় অমানবিক প্রচেষ্টা। ব্যক্তিগত
পুঁজি, বিলগ্নীকরণ, শপিং মল আর মাল্টিপ্লেক্স-মার্কা এবং মাঝে মাঝে শ্রমিক-কৃষকের
শোনবার-ফুরসত-নেই এমন গনসঙ্গীত-গাওয়া শহুরে উচ্চমধ্যবিত্তের পক্ষে সহজপাচ্য
মার্কসবাদের বঙ্গীকরণ করা বামাচারীদের লেজুড়বৃত্তি (এর বাজার উত্তরোত্তর তেজি
হচ্ছে বর্তমান সরকারের নির্লজ্জ লুম্পেনরাজে) ছাড়া আর কি উদ্দেশ্য থাকতে পারে
তাঁদের এই কর্মে ? সমাজ পরিবর্তনে গণমাধ্যমের জরূরী ভূমিকা যা প্রাভদা পালন করেছিল
লেনিন-স্ট্যালিনের কালে তার কণামাত্র যদি আজ এই সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে পালন করতে হয়
তবে এই ধাষ্টামো পরিত্যাগ আশু প্রয়োজন। শেষ লাইনটা লিখতে গিয়ে হাসি পেলো। যে
নির্ভুলতায় চার-পাঁচ বছর আগেই আমার মতো অনেকেই টের পেয়েছিলাম কি ভয়াবহ কাল সমাগত,
সেই বিশ্বাসের নিশ্চিত ইঙ্গিতেই বুঝতে পারি, বৈপ্লবিক দায়িত্বের চেয়ে টিকি-দাড়ি
নেড়ে তৈলাধার কি পাত্র, না পাত্রাধার কি তৈল -জাতীয় তত্ত্বালোচনায় ঝুঁকি কম,
মুনাফা বেশি। ব্যাপার দেখে শুনে নব্বই-এর দশকে দেখা একটি নাটকের কথা মনে পড়ে গেলো। মন্নু ভান্ডারীর লেখা
“মহাভোজ” (আদতে উপন্যাস, পরে তা থেকে মন্নু নাটক করেন, বাংলাতে অনুবাদ হয়েছে) নাটকের
মূল উপজীব্য ছিলো এক লড়াকু কৃষক নেতার খুন ও সেই ঘটনাকে সরকারপক্ষ, বিরোধীপক্ষ,
আমলাতন্ত্র ও মিডিয়ার ভাঙ্গিয়ে খাওয়া।
কিন্তু এত সত্ত্বেও থামানো গেল না মুর্শিদাবাদের আজাদ হোসেনকে। ছেলে জোশেফ
হোসেন সুদীপ্তর সাথে একই দিনে একই আন্দোলনে সামিল ছিল। আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে
আশঙ্কাজনক, এখন ডানহাতটা চিরকালের জন্য হারাতে বসেছে। অনমনীয় বাবা আজাদ বলছেন, এর
পরেও ছেলেকে বলবেন ওই একটা হাত নিয়েই রাজনীতি করতে, যাতে সে অন্যায়ের প্রতিবাদ
করতে পারে, মানুষের মঙ্গলে কাজ করতে পারে। সেলাম হোসেন সাহেব,
পুঁজিপতি-বুর্জোয়া-সংশোধনবাদীদের ক্ষমতা নেই আমাদের ভবিষ্যতকে আপনার ছেলে এবং
সুদীপ্তদের হাত থেকে ছিনতাই করে। আপনার ছেলের এখনো টিঁকে থাকা বাঁ হাতই আমাদের
অমোঘ আয়ুধ। আর দূর নেই, দিগন্তের বেশি দূর নেই, সব রাত্রির অন্ত এবার।
শেষের পরেঃ আজ দুপুরে খবর পেলাম, আমার ছেলের স্কুল যাকে আমি আন্টিনিকেতন বলে
ব্যঙ্গ করতাম, তারা তাদের মর্নিং সেশানে আগত প্রাইমারীর (ক্লাস ফাইভ অবধি)
বাচ্চাদের প্রেয়ারের (ওরা বলে অ্যাসেম্বলি) পর ছুটি দিয়ে দিয়েছে। ছুটি বলে মজা করে
বাড়ি ফিরে যাও, তা কেবল নয়। বাচ্চাদের স্কুলে পৌঁছে দিতে আসা অভিভাবকদের দাঁড়
করিয়ে রেখে, অন্যান্য সকল শিক্ষক-শিক্ষিকাদের উপস্থিতিতে প্রধানাশিক্ষিকা ওই
সারিবদ্ধ হাজারটা বাচ্চাকে মাইক্রোফোন মারফৎ বুঝিয়ে বলেন, কেন তাদের স্কুল আজ বন্ধ
রাখা হলো। বলেন, শহীদ কথাটার মানে তোমরা এখন হয়তো বুঝবে না তবে তোমাদের এক খুব
ভালো দাদা শহীদ হয়ে আকাশের তারা হয়ে গেছে । সেও একদিন তোমাদের মতোই ছোট্ট ছিলো,
হয়তো তোমাদের মধ্যেই সে আবার বড় হচ্ছে , হয়তো কেন, আমি জানি, সুদীপ্তদাদারা তোমাদের
মধ্যেই লুকিয়ে আছে। তোমরা বড় হবে, সকলের ভালো করবার জন্য সুদীপ্তদাদাদের মতো বড়
হবে।...(রীণাদিদিমনি, আপনাকে চিনি না, আলাপ নেই, আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা জানবেন)।
তাই মনে হচ্ছে, সত্যি রে ছেলে, সাবাশ ভাই...রক্তে রাঙা বুকের মণি তোর, কাঁপিয়ে দিল
বুড়িগঙ্গা তীরের অন্ধকার।
