Wednesday, 1 October 2014

ছায়া নট


স্বপনবাবু হারিয়েই গেলেন। সাত সকালবেলায় ঠিকে কাজের মাসী বেল বাজাল, কেউ দরজা খুলল না। একা ব্যাচেলর স্বপনবাবু ছাড়াও এ পাড়ায় মাসীর আরো তিন বাড়িতে বাসনমাজা আর ঘর ঝাঁট দেওয়া আছে। এ বাড়ি থেকেই মাসী শুরু করে, কারণ স্বপনবাবু সকাল-সকাল উঠে পড়েন আর স্বপনবাবুর কাজই সবচেয়ে হালকা, সামান্য দু’চারটে বাসন ধোয়া আর দুটো মাত্র ঘর ঝাঁট দেওয়া আর মোছা, কাজের মধ্যে বাইরের ঘরে নীচু চৌকিতে শোয়ানো সেতার আর ডুগি-তবলা রোজ ধুলো ঝেড়ে সাফ সুতরো রাখা। বাড়িটা সদর রাস্তার উপর নয় গলির বেশ ভেতরে আর স্বপনবাবুর ভাড়া নেওয়া একতলার দু’ কামরার ফ্ল্যাটের জানলা তো দিনমানে বন্ধই থাকে বেশির ভাগ দিন, ধুলো আর কতটুকু জমে। তবু বাবুর কড়া হুকুম, রোজ সেতার আর ডুগি-তবলা দু’টোর আগাপাশতলা মুছে রাখতেই হবে, তাদের মোছার কাপড়ও আলাদা। মোটমাট খুব বেশি তো মিনিট পনেরোর কাজ এবাড়িতে। এ পাড়ায় বাকি দুই বাড়িও ছোট, একটাতে বাপ-মা-ছেলে-বৌমা-বাচ্চা, আরেকটাতে দাদা-বৌদি আর তাদের কলেজে-পড়া মেয়ে। তিননম্বর বাড়িতে অবশ্য চাপ আছে, মোট নয়জনের জয়েন্ট ফ্যামিলি, ওদের কাজ বেলায় করে মাসী হোটরে নিজের বাসায় দুপুরের খাওয়া সারতে এগারোটা কুড়ির ডায়মন্ড ধরে। বাড়ি ফিরে রান্না করা আছে তাই এগারোটা কুড়ি মানে এগারোটা কুড়ি। আজ তাই বেলের আওয়াজে স্বপনবাবু দরজা খুললেন না দেখে মওকা বুঝে মাসী অন্য দুই বাড়ির কাজ সারতে হাঁটা লাগায়, ন’টায় রান্নার মিনতি এসে পড়ে যদি ভাত চাপায় তো হাঁড়ি নিজেই ধুয়ে নেবে, মাসীর সঙ্গে মিনতির সে র‍্যাপো আছে, জামাইষষ্ঠীতে ধার-দেওয়া সাড়ে তিনশো টাকা মাসী এখনো মিনতির থেকে পায়। সাড়ে ন’টা নাগাদ এসে বাকি কাজ সারলেই চলবে।
মুশকিল হল যে, সাড়ে ন’টায় এসে মাসী স্বপনবাবুর বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা জটলা দেখতে পেল। মিনতি তার সিডিউলড টাইমে এসে দু-পাঁচবার বেল বাজিয়ে দরজা কেউ খুলল না দেখে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে, আর তাতে দরজার মায়ায় বাড়িওয়ালা সাগরবাবু মিনতিকে ধমকে দেবেন বলে নীচে নেমে আসেন। বাজার করে ফিরতি পথে রাইটার্সের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চকোটির করণিক মিত্রবাবু (উনি নিজেকে এখনো মিত্রসাহেব ভাবতে ভালোবাসেন) শোরগোল দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন, দীর্ঘদিন সরকারি পদে থাকায় সমস্যার ধোঁয়া দেখলেই ইন্টারভেইন করাটা তাঁর মজ্জাগত। তারপর কাগজ-বিলি সেরে ফেরবার পথে কাগজওয়ালা, মিউনিসিপ্যালিটির ময়লাগাড়ির ফক্কড় ছোকরা, মেট্রো ডেয়ারির দুধ-দেওয়া বিকাশ, আশপাশের বাড়ির কাজের লোক দু-চারজনা, মিলিয়েজুলিয়ে জনসমাগম খারাপ হয়নি। প্রত্যেকেই নানা সম্ভাবনার কথা বলাবলি করছেন, কি-করলে-কি-হবে-তাই-কি-করা-যায় আলোচনা করছেন, ময়লাগাড়ির ছোকরা কি কায়দায় বাইরের ঘরের বন্ধ জানলার একপাটি প্রায় খুলে ফেলেছে, এমন  সময় মিত্তিরসাহেবই নজর করেন, সদর দরজায় বাইরে থেকেই তালা দেওয়া। বিকাশ সাজেশান দেয়, স্বপনবাবুকে একটা ফোন ‘মেরে’ দেখতে। মিনতি ধরিয়ে দেয়, দাদার ঘরে কোন ‘রাখা’-ফোন নেই, দাদার ছিল মোবাইল, আর সে নম্বর তার মোবাইলে আছে। দেখা গেল, সে মোবাইলও সুইচড অফ। সে যাই হোক, এই নাটকটা কুড়ি মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকার পক্ষে বড্ড একঘেঁয়ে, টিভিতে সবচেয়ে জমাট সিরিয়ালও বিজ্ঞাপনের বিরতি বাদে খুব বেশি তো মিনিট পনেরো চলে। ফলে, এইবার কাজের লোকেরা নিজের-নিজের কাজে হাঁটা লাগাল। মিনতি আর কাজের মাসী নিজেদের মধ্যে নিচুগলায় আলোচনায় একমত হয়ে দু’জন দু’পথ ধরল, মিনতির পরের বাড়িটা আবার বাসে যেতে হয় তিন স্টপেজ। সবশেষে ডিসপার্সড হলেন মিত্তিরসাহেব, উইথ এ ফ্রেন্ডলি অ্যাডভাইস টু বাড়িওয়ালা সাগর সাহা যে, সাগরবাবু শ্যুড ট্রাই স্বপনবাবু লেটার ওভার টেলিফোন, জাস্ট টু কনফার্ম হোয়েদার হি ইজ আউট অফ স্টেশান অর নট।  
পরের তিনদিনেও স্বপনবাবুর খোঁজ পাওয়া গেল না, মানে বাড়িওয়ালাকে উনি কোনো খবর দিলেন না। গত দশবছর এখানে উনি আছেন, কোনদিন কোন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবকে ওঁর বাড়ি আসতে পড়শিরা কেউ দেখেননি। অডিটে, না পরিবেশ ভবনে, না সেন্ট্রাল এক্সাইজে যেন চাকরি করতেন, রোজ পৌনে দশটায় বেরিয়ে সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টার মধ্যে বাড়ি ফিরতেন। এবং শুধু কাজের দিনে ওই পৌনে দশটায় নয়, ছুটির দিন-টিনে মাঝেসাঝে যখনই ঘর থেকে বেরোতেন, যে রকম ছিমছাম ক্লিন-শেভেন ফিটফাট হয়ে বেরোতেন আর ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় ছাড়া পরতেন না তাতে যেখানেই চাকরি করুন, সেটা যে বেশ ভালো পোস্টেই করতেন তা নিয়েও প্রতিবেশীদের সন্দেহ ছিলনা। বছর দুই আগে ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে রাস্তার কাদায় পা হড়কে পড়ে গিয়েছিলেন স্বপনবাবু। বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারত, তা যে যাত্রা কেবল বাঁ হাতটা ভাঙ্গার উপর দিয়েই ফাঁড়া কাটে। প্রায় মাসখানেক ঘরবন্দী হয়েছিলেন, তখন ওনার অফিস থেকে দু’-একজন সহকর্মী কয়েকবার ওনাকে দেখতে এসেছিলেন। এমনিতে ভদ্রলোক অমায়িক ব্যক্তি ছিলেন, তবে সদালাপী ছিলেন বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। পথে মুখোমুখি দেখা হয়ে গিয়ে পাড়া-প্রতিবেশীরা প্রথম কথাটথা শুরু করলে খুবই ভদ্রতার সঙ্গে প্রত্যালাপ করতেন। তবে নিজে থেকে কারো কখনো খোঁজ নিয়েছেন বলে কেউই মনে করতে পারলেন না। সন্ধ্যের দিকে ওনার জানলা-বন্ধ বাইরের ঘর থেকে মৃদু সেতারের আওয়াজ অনেকেই পেয়েছেন, শুনেই বোঝা যায় রেকর্ডেড বাজনা নয়, লাইভ বাজনা। প্রথম প্রথম কৌতূহলী প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করলে সুভদ্র হেসে স্বপনবাবু ভাসা ভাসা জবাব দিয়েছেন, ওই আরকি, সেতারের আধ-আধটু শখ আছে। কালে কালে মোটামুটি সকলেই জানতে পেরেছিলেন যে স্বপনবাবু রীতিমত তালিম নেওয়া বাজিয়ে, সেতারের হাত তাঁর যথেষ্ট সরেস। এ কথাটা চাউর হ’বার পর একবার পাড়ার ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশান থেকে তাঁকে বাৎসরিক রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে বাজাবার অনুরোধ করা হয়, কিন্তু ভদ্রলোক এত বিনয়ের সঙ্গে ও এত পালিশ-করা ভদ্রতার মোড়কে দৃঢ়ভাবে সে প্রস্তাব নাকচ করে দেন যে ফিরে তাঁকে আর কোন অনুষ্ঠানে বাজাতে বলবার কথা কারোর মাথায় দ্বিতীয়বার আসেনি। মোটমাট সম্পন্ন গেরস্থ বাড়ির সাজানো ড্রয়িংরুমের কাঁচের ফুলদানিতে অনাঘ্রাত খুঁতহীন প্লাস্টিকের ফুলের মত ‘থাকলে বেশ ভাল কিন্তু না থাকলেও বিরাট কোন ইতরবিশেষ হবে না’ এই রকম একটা স্ট্যাটাস নিয়ে স্বপনবাবু এ পাড়ায় বাস করতেন গত দশ বছর।
শশব্যস্ত এই সময়ে যেখানে গভীরতম শোকের আয়ু মেরেকেটে সাতদিন, সেখানে এ হেন একলসিঁড়ে স্বপনবাবু তিনদিন ধরে কেন বাড়ি ফিরে আসছেন না, তা নিয়ে বিরাট জলঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা কম। তাঁর ঘর তালাবন্ধ আজ তিনদিন, মাসের চার তারিখ থেকে তিনি বেখবর। বাড়িভাড়া, মিনতি ও কাজের মাসীর মাইনে, খবরের কাগজের বিল তিনি মিটিয়ে দিয়ে গেছেন, ফলে এই ধরনের কেউ হঠাৎ করে নিরুদ্দিষ্ট হ’লে যারা সর্বাগ্রে তোলপাড় তোলে তারাও এই ব্যাপারে ততটা উৎসাহ বোধ করল না। কেবল পাড়ার মেয়েবউরা যাঁদের কেউ-কেউ গৃহের বাইরেও কর্মরতা, কিন্তু সকলেই নিয়মিত স্বাস্থ্যপত্রিকা ও টিভিতে নানা ডাক্তারি ও রূপটান সম্পর্কিত প্রোগ্রাম দেখে ও সর্বোপরি বাবা রামদেবের সহজ যোগপ্রক্রিয়া দেখে-দেখে ঘোর অনুপ্রাণিত, যাঁরা সকাল সাড়ে ছ’টা বাজবার আগেই লেক অবধি হেঁটে আসেন ও আসাযাওয়ার পথে এটিপি বা রয়টারের দক্ষতায় সমস্ত আঞ্চলিক খবরাখবর আদানপ্রদান করেন, তাঁরা স্বপনবাবুর অন্তর্ধান নিয়ে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনার কথা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন গত দু’-তিনদিনে।  
প্রথম অবধারিত যে সম্ভাবনাটি নিয়ে অল্প সময় আলোচনা হল, মানে রোজ সকালের মোট হাঁটাপথের এক-পঞ্চমাংশ যে আলোচনায় ওঁরা হেঁটে দিলেন, সেটা হল পথ-দুর্ঘটনা। মাধবীবৌদি দূরদৃষ্টিসম্পন্না, মানে তাঁর বাড়ির দোতলার জানলা দিয়ে তিনি গোটা পাড়ায় তীক্ষ্ণ নজর রাখতে পারেন ও রেখে থাকেন, তিনি বললেন, ভদ্রলোককে অনেকদিন ধরে দেখে বেশ আনমনা উদাস টাইপের মনে হয়েছিল তাঁর বহুকাল আগেই, স্বাভাবিকভাবেই কাউকে সেকথা বলেননি। রাস্তাঘাটের যা অবস্থা, তাতে অমন বেখেয়ালি লোকের কিছু একটা ‘হয়ে যাওয়া’ আশ্চর্য নয়। কিন্তু তাহলে তো একটা খবর অন্তত চলে আসত এতদিনে নাকি, অন্তত পুলিশ-টুলিশ ? বান্ধবীদের দু-একজনের এইসব প্রশ্নের জবাব মাধবীকে দিতে হল না, তনিমাদেবীই তাঁর হয়ে উত্তর দিয়ে দিলেন – কে খবর নেবে ? সাগর সাহা ? কেন নেবে গো ? ওর তো ভাড়া পাওয়া নিয়ে কথা, আর এ মাসের তো ভাড়া পেয়েই গেছে শুনলাম। আর পুলিশ ? ওদের খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই নাকি যে, কে কোথায় তিনদিন বাড়ি ফেরেনি তার খোঁজ নেবে! পুলিশের সমালোচনা এই বিশেষ গোষ্ঠির আলাপে বেশিদূর এগোয় না কারণ ভোরের হন্টনপটিয়সীদের দলে অন্যতম মেম্বার শ্যামলীদেবীর ‘উনি’ পুলিশে ছিলেন, গত এপ্রিলে রিটায়ার করেছেন। তার উপর স্বপনবাবু লোকটার কাছে কোন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব বলে কেউ কোনকালে যে আসেনি, তা মাধবী হান্ড্রেড পারসেন্ট কনফার্ম করলেন, এখন একমাত্র যদি ওর অফিস থেকে কেউ খোঁজটোজ নেয়। সেটা জানা যাবে, তবে আরো ক’টা দিন সময় লাগবে। বাজারের আগের আইল্যান্ডটা, এই ক’দিন আগে যেটার নামকরণ করা হয়েছে সুচিত্রা সেন উদ্যান, যার কাছাকাছি এসে দলের পরিপূর্ণ ওয়ার্ম-আপ হয়ে যায় এবং দল হাঁটার স্পিড বাড়ায়, সেইটা পেরোবার সময় দ্বিতীয় সম্ভাবনার কথাটা হৈহৈ করে তুলে দিলেন লেডিজ ক্লাবের সেক্রেটারী এণাক্ষী সেন – ওর অফিসে গিয়ে খোঁজ নিন, কোনো লেডি-কলিগ একই সঙ্গে অ্যাবসেন্ট; উইথ অল প্রোব্যাবিলিটি, শি মে বি আ লোনার অর আ ডিভোর্সি। স্বপনবাবু তো, টু মাই মাইন্ড, মে বি জাস্ট অন দ্য আদার সাইড অফ ফিফটি...ওঁরা নতুন করে জীবন শুরু করতে চাইছেন, দে ওয়ান্ট টু স্টার্ট অ্যাফ্রেশ, হোয়াটস রং ইন ইট ? এণাক্ষী একটি নামজাদা কর্পোরেট হাসপাতালের ফ্রন্ট অফিসে আছেন, ফস করে ওনার বক্তব্যকে ‘রং’ বলে দেওয়ার অসুবিধে দু’টো। এক, তাহলে স্বপনবাবুর অফিসে গিয়ে খোঁজ নিতে হয়, যদিও স্বপনবাবু ঠিক কোন অফিসে বা কোন কোম্পানীতে চাকরি করতেন তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। আর দুই, এণাক্ষী সাড়ে সাতাশি পয়সা কথাই ইংরেজিতে বলেন এবং দুইকুড়ি-দুই বয়সে পৌঁছেও কথায় কথায় ‘লাইফ’কে ‘এঞ্জয়’ করতে বলে থাকেন। তাই পঞ্চান্ন-পেরোনো মাধবী-শ্যামলী-তনিমারা কথা না বাড়িয়ে হাঁটার গতি বাড়ালেন। - আচ্ছা, লোকটা সন্ন্যাসী-টন্ন্যাসী হয়ে কোনো আশ্রমটাশ্রমে চলে যায়নি তো ? খানিক বাদে প্রশ্ন তোলেন গৃহবধূ জয়তী রাহা, যিনি পুরো হাঁটাপথে অন্তত চারবার হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে থাকেন; প্রথমবার বাড়ি থেকে বেরিয়েই ডানদিকে ফিরে, কারণ ওইদিকটা উত্তরপশ্চিম, ওইদিকেই দক্ষিণেশ্বর, তারপর রিক্সাস্ট্যান্ডে শনিমন্দিরের সামনে, মেইনরোড পেরোনোর সময় পূবদিকে তাকিয়ে সূর্যপ্রণতি আর শেষে বাড়ি ঢোকবার ঠিক আগে টুক করে আরেকবার, ওটা কার জন্য তা কেবল উনিই জানেন। কিন্তু ততক্ষণে দল একপাটের হাঁটার শেষে লেকপার্কে লাফিং ক্লাবে পৌঁছে গেছে। হাস্যসঙ্ঘের হা-হা রবে জয়তীর প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। দল এইখানে এসে দশ মিনিট ব্রেক নেয়, কেউ টুকটাক ফ্রি-হ্যান্ড করেন এণাক্ষীর নির্দেশনায়, কেউ স্রেফ দু’ হাত তুলে হেসে নেন, কেবল শ্যামলী আর জয়তী বেঞ্চে বসে আঁচলে মুখ মোছেন। ফিরতি পথে কথাটা আবার ওঠে, এবার তোলেন বন্দনা ওনার এক পিসশ্বশুরের রেফারেন্স দিয়ে – একদিন পায়ে হেঁটে পেনসান তুলতে গেছেন গড়িয়া পোস্টঅফিসে, তারপর আর বাড়ি ফিরতে পারছেন না, বাসে উঠে চলে গেছেন ডালহৌসি জিপিও-র কাছে। দুপুর পেরিয়ে যেতে খোঁজ-খোঁজ, কি কপাল বড় জা-র বড়ছেলের এক বন্ধু ওখানে ওঁকে দেখতে পেয়ে বলে, দাদু এখানে কি করছেন ? উনি তাকেও চিনতে পারেননি, বলেন কি, উনি বাড়ি ফিরতে চান কিন্তু বাড়ির ঠিকানাটা কিছুতেই মনে করতে পারছেন না, ভাবো কি সাঙ্ঘাতিক! পরে তো ডাক্তার দেখানোয় ধরা পড়ল ওটা নাকি একটা রোগ, তাও ফার্স্ট স্টেজ। উনি তো পরে ওইরোগেই... স্বপনবাবুরও যদি ওইরকম রোগ হয়ে থাকে ? বলা যায় না বাবা, আজকাল কোনো রোগের কি কোনো বয়স আছে নাকি, তোমার পাশের বাড়ি অধীরবাবুর ছোটছেলেটা বল তনিমাদি, মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়ে...। সকলে নীরবে বাড়িমুখো হাঁটতে থাকেন, সেটা নিরুদ্দিষ্ট স্বপনবাবুর চিন্তায়, না বন্দনাদেবীর সেই অনিকেত পিসশ্বশুরের কথা ভেবে, না অধীরবাবুর অকালপ্রয়াত ছেলেটির শোকে বলা মুশকিল। বোধহয় তিনটেই। শেষকালে পাড়ার মুখে এসে “অভিষিক্তা” বুটিকের মালকাইন রঞ্জনা ঘোষ স্বপনবাবুর অন্তর্ধানের পঞ্চম ও সবচেয়ে জটিল সম্ভাবনার কথাটা পাড়লেন – আমার বাবা লোকটাকে দেখলেই কেমন একটা লাগত (কেমন লাগত সেটা ভেঙ্গে বললেন না, কেবল ডিডাকসানটা জানালেন), একাএকা থাকে, কারো সাথে মেশেটেশে না...এর মধ্যে অনেক বড় ব্যাপার আছে দেখো – বলে, কেমন একটা ফিসফিসে ছায়া-ছায়া ভয়াল আন্তর্জাতিকমাত্রার ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিতপূর্ণ চক্ষু ও ভ্রূ-ভঙ্গী করলেন। সকলেরই গা কেমন ছমছম করে উঠল দিনের বেলাতেও, যে যার বাড়ির গেট খুলে একে একে ভেতরে সেঁধিয়ে গেলেন।
ওঁরা কেউই ঠিক ধরতে পারেননি। পারবার কথাও নয়, সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে কি সমুদ্রের অতলান্ত গভীরতা মাপা যায় ? একলা সাগরে ছোট্ট ভেলায় ভেসে পড়া নাবিকের কাছে সমুদ্রের গভীরতা কি স্রেফ ফুট-মিটারের হিসেবে পরিমেয় ? হিলস্টেশানের সাজানো শৌখিনতায় দুই-তিনদিন যাপনে দূরদৃষ্ট রজতাচলের শিখরচূড়ায় পা রেখে নীচে তাকাবার অনুভূতি কোনভাবে কি বোঝা সম্ভব ? নীহারবিন্দুবাহী তীক্ষ্ণ সে ব্লিজার্ড শৃঙ্গজয়ী একাকী অভিযাত্রীর কানে কানে কি কথা বলে যায়, তা কি বোঝা সম্ভব শৌখিন পর্যটকের পক্ষে ? আসলে স্বপনবাবু ভারতীয় মার্গসঙ্গীতে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, ওটাই ছিল তাঁর মাস্তুল, তাঁর নোঙ্গর-ফেলা বন্দর। রোজকার চারপাশে ক্যান্সারের চেয়েও দ্রুত বেড়ে-চলা কপটতা-কৃত্রিমতা-তঞ্চকতার সমুদ্রে বিশুদ্ধ সুর আর ধ্বনির ভেলায় ভেসে বেহাগে, মালকোষে, ভৈরবীতে, ইমনের নির্মল পবিত্রতায় খুঁজতে চাইতেন নিজেকে, দিনের সব পঙ্কিলতা ধুয়ে ফেলে জীবনরস শুষে নিতে চাইতেন অনাবিল সুরের স্বতোৎসারিত ঝরণায়। সেতার শিখেছিলেন ছোট বয়েস থেকে, পরে মাইহার ঘরানার ওস্তাদ এজাজ খাঁ সাহেবের কাছে নাড়া বেঁধে, তাঁর পার্কসার্কাসের বাড়িতে দিনের পর দিন পড়ে থেকে। দশ বছর ধরে নিখুঁত হওয়ার নিমগ্ন সাধনার পর প্রথম প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে আশাবরী রাগ বাজাতে গিয়ে স্বপনবাবু সামান্য তাল কাটেন, শ্রোতারা অবশ্য বিশেষ ধরতে পারেনি। কিন্তু স্বপনবাবু ভেঙ্গে পড়েন। উপর-উপর সে ভেঙ্গে-পড়া কেউই টের পায়নি, স্বপনবাবু টের পেতে দেননি। তবে তারপর থেকে আর কখনোই প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য কোন অনুষ্ঠানেই বাজাননি বহু অনুরোধ-উপরোধ সত্ত্বেও। যে নিখাদ বিশুদ্ধতার আরাধনা তিনি করে এসেছেন জীবনব্যাপী, তার উৎকর্ষতার মাত্রা কি কত লোকের অভিনন্দনে অভিষিক্ত হল তা দিয়ে মাপা সম্ভব নাকি ? সে তো আপন হৃদয়ের গভীরতম কোণে পবিত্রতম সততার নিক্তিতে ওজন করে দেখবার জিনিস। কালে কালে তথ্যসংস্কৃতি বিভাগে চাকরি নিলেন স্বপনবাবু। তিনি যে দুধের সর, তাই পরিবার থেকেও ছিলনা তাঁর, বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর শেষ বন্ধনটুকুও ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বহুদিন আগেই। শহরতলির পারিবারিক বাড়ি বেচে দিয়ে ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন। পারিপার্শ্বিক সমাজে বাস করতেন শৈবালের মত, সেই শৈবাল যে জলার আবদ্ধ জলের আবিলতায় ভেসে থেকেও গায়ে মাখে না নোংরা জল, বরং হীরের কুচির মত ফুল ফোটায় গায়ে। অফিস থেকে ফিরে স্নান সেরে দরজা-জানলা বন্ধ করে সন্ধ্যে বেলায় রেওয়াজ করতেন, যাতে বাইরের গাড়িঘোড়ার ব্যস্ততার আওয়াজে সে শব্দ কেউ তেমন শুনতে না পায়। বিশুদ্ধতম সুরের তপস্যা করতেন, রাগরাগিনীর গোপন কন্দরে কন্দরে দূরূহতম পথে খুঁজে বেড়াতেন সেই চির-আকাঙ্খিত অনাবিলতা। তিনদিন আগের সন্ধ্যেরাতেও তিনি প্রতিদিনের মতই স্নান সেরে গায়ে সামান্য ইয়ার্ডলি ল্যাভেন্ডার মেখে, ফ্লাস্কের চা খেয়ে, জুত করে বসেছিলেন সেতার নিয়ে। মৃদুস্বরে বাজাচ্ছিলেন তাঁর প্রিয় ছায়ানট। ধীরে ধীরে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হতে থাকে তাঁর, সুরের সমুদ্রে নিজেকে হারিয়ে ফেলে অনাবিল এক অন্তরাত্মার ছায়ার নীচে তিনি প্রায় পৌঁছে যাচ্ছেন, ছুঁয়ে ফেলছেন নিজের চিরকাঙ্খিত সেই বিশুদ্ধ সুরধ্বনিবিন্দু। এমন সময়ে অভ্যস্ত কান তাঁকে বলে দেয়, সামান্য তাল কাটল বুঝি। শ্বাস ফেলে সেতার নামিয়ে রাখেন স্বপনবাবু।  
****

হিমাচল প্রদেশের সাংলার কাছে বটসেরি গ্রামটি ছিটকুল যাওয়ার রাস্তার থেকে প্রায় দু’ হাজার ফুট নীচে বসপা নদীর ধার বরাবর বিছিয়ে আছে। ভারি উৎকৃষ্ট আপেল ফলে সেখানে। সেই গ্রামের সরল সোজা একটি মেষপালক বালক ভোরে ভেড়া চরাতে বেরিয়ে খাদের কাছে স্বপনবাবুকে খুঁজে পেল। ও অবশ্য স্বপনবাবুকে চেনে না, তবে মরে-যাওয়া মানুষ চেনবার দায় এখনো ওর জীবনে নেই। ও অনেক উপরের গাড়িরাস্তার দিকে তাকিয়ে মানুষটা কোথা থেকে পড়ল সেটা আন্দাজ করবার চেষ্টা করল একবার, তারপর পাহাড়ের ঢালে ভেড়াদের চরতে ছেড়ে রেখে গ্রামের দিকে ফিরল খবরটা দিতে।  জটিলতা দেখবার চোখ ওর এখনও তৈরী হয়নি, তাই ও দেখতে পেলনা স্বপনবাবুর মুখে একটা মৃদু অথচ অনাবিল হাসির রেশ। এ স্বর্গ-ছোঁয়া অবারিত বরফপাহাড়, রূপো গলে নেমে আসা নিষ্কলুষ হিমবাহ, মেঘশূণ্য উদার সুনীল আকাশ আর অকুন্ঠিত নির্মল বাতাসের অনাবিল বিশুদ্ধতায় স্বপনবাবু শেষমেষ নিজেকে খুঁজে পেয়েছেন।   


(পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত “ট্রৈনিক” শরৎ ১৪২১ সংখ্যায় প্রকাশিত)

Monday, 11 August 2014

অগ্র-‘সেন’

আমি রবীন্দ্রনাথকে চিনতাম আমি সুকুমার রায়, সত্যজিৎ রায়, যামিনী রায়, উত্তমকুমার, উমাপতিকুমার প্রভৃতিদেরও চিনতাম। এবং, বিশেষতঃ আমি যে সব সেনেদের চিনতাম তাঁরা প্রত্যেকেই আপন প্রতিভার দ্যূতিতে ও কীর্তির ব্যাপকতায় আমাকে আপ্লুত করেছেন। যথা, বল্লাল সেন, সানইয়াৎ সেন, আমুন্ড সেন, স্যামুয়েলসেন (Samuelson), অমর্ত্য সেন, ভীম সেন (মধ্যম পান্ডব বা যোশী, যাকেই ধরুন না কেন), মৃণাল সেন, সুচিত্রা সেন, সুদীপ্ত সেন ও সেনদাদু...প্রত্যেকেই আপনাপন ক্ষেত্রে সেনসেশন্যাল...কত বলব। উপরোক্ত বুধমন্ডলীতে শেষোক্ত মহামানব বাকিদের থেকে ঈষৎ তফাতে থাকবেন, যদিও এ আলোচনায় সে তফাত ধর্তব্য নয়। এবং সে তফাত হল এই যে, বাকিদের প্রত্যেককেই কেবল আমি চিনি বা চিনতাম। শেষোক্ত মহাত্মনই একমাত্র, যিনি আমাকে চিনতেন। স্বর্গীয় প্রতিভার স্বর্ণাসনে অভিষিক্ত, অথচ আমাকে বেমালুম চেনেন, এমন ঘটনা বলতে আমার জীবনে একমাত্র সেনদাদু। সেনদাদুর কথা অমৃতসমান। আমার এক সিনিয়র দাদা বলেন সেনদাদু নাকি আমার সৃষ্টি; আমার, কি যেন বলে, ‘অলটার ইগো’। হায় রে, আমি যদি ওই মাত্রার ইন্টেলেক্ট পেতাম, তাহলে কি আর স্রেফ কথক ‘সঞ্জয়’ হয়ে জীবন কাটত, কুরুক্ষেত্রে রথী-মহারথী না হোক, দু’-একটা পাতি সেপাই অন্তত বধ করে বীর অথবা সুশীলের মর্যাদা ছিনিয়ে নিতে পারতাম। 

সেনদাদু কর্মজীবনে শুনেছি রেলের গার্ড ছিলেন।  সেনদাদুর কাহিনীর সঙ্গে রেল-যোগাযোগ বলতে একমাত্র এইটুকুই। শুরুতেই হলপ করে বলছি, সেনদাদুর প্রত্যেকটি গল্পই যাকে বলে সত্যকাহিনী অবলম্বনে, কেবল সাহিত্যের খাতিরে এখানে ওখানে আধ-আধটু পলেস্তারা রিপেয়ার করা। ফলে গল্প (নাকি ঘটনাবলী বলবো ?) যাই হোক, তার কোন কৃতিত্ব বা দায় কোনোটাই কিন্তু পরিবেশক ‘সঞ্জয়’-এর নয়।

সেনদাদুর প্রথম কাহিনীটি আমার বাবার মুখে শোনা। সে বোধহয় ১৯৫৫-৫৬ সাল হবে। ওপার বাংলা থেকে আগত উদ্বাস্তুদের কলোনিতে প্রথমেই তৈরি হ’ল একটি ক্লাব নাম স্থানীয় সংঘ। কলোনির বিপদে-আপদে বুক পেতে দাঁড়ানো, বিকেলে ফুটবল, বছরে একটি রবীন্দ্রজয়ন্তী, তারপর সামান্য সংস্থানে একটি দুর্গাপুজো, কালে কালে ক্লাবের নিজের বাড়ি তৈরি হ’লে সকালে সেখানে মেয়েদের প্রাইমারি স্কুল বসানো – এই হ’ল সেকালের সেই স্থানীয় সংঘ। উল্ল্যেখ থাকে যে, সেই সময় (পঞ্চাশে দশকের প্রথম ভাগে) বিশ ত্রিশ কিলোমিটারের মধ্যে ছেলেদের হাইস্কুল ছিল তিনখানা, একটা কলেজ ছিল (ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র কলেজ), কিন্তু মেয়েদের জন্য ওই স্থানীয় সংঘ গার্লস প্রাইমারি স্কুলই একমাত্র। ক্লাবের বয়ঃজ্যেষ্ঠরা তাই এলাকার মেয়েদের শিক্ষার প্রসারে একটি মেয়েদের হাইস্কুল স্থাপন করতে উদ্যোগী হবেন বলে মনস্থ করেন। অন্যদিকে কলেজের পড়া শেষ করে সদ্য চাকরিতে ঢোকা আমার বাবার মত তরুণ সদস্যবৃন্দের নজর ছিল উঁচুতে, তাঁদের মত হ’ল, এলাকায় একটা কলেজ হ’লে এলাকার ইজ্জত বহুগুণে বেড়ে যাবে। তা ক্লাবের বার্ষিক সভার আগে এই তরুণদল জোট বাঁধলেন যে কোন মূল্যে ক্লাবকে কলেজ স্থাপনের পথে নিয়ে যেতে হবে, বুড়োদের পশ্চাদপদতার বাধা টপকে। যথারীতি সাধারণ সভায় বয়স্কদের মেয়েদের জন্য হাইস্কুলের প্রস্তাব যুবশক্তির কাছে হার মানবার মুখে এসে দাঁড়ালো। আসন্ন জয়ের চাপা উল্লাসে তরুণ সদস্যরা প্রায় উপচে পড়েন এমন সময়ে, সেনদাদু মুখ খুললেন। মনমরা বয়স্ক সদস্যদের উৎসাহ দিতেই যেন বললেন, “ আপনেরা অমন মুখ ঝুলাইয়া বইস্যা আসেন কেন, হ্যারা কলেজ করতে চায়, আমি যা বুঝি তায় আমগো ভাবনাচিন্তাই ভুল আছিল। তা আমগো বাড়ির মাইয়ারা জুদি প্রাইমারি থিক্যাই এক লম্ফে কলেজে জাইতে পারে ক্ষতিডা কি কন দেহি ? হ্যায় ত আনন্দেরই বিষয়”। বাবা বললেন, “লজ্জায় আমাদের মাথা নীচু হয়ে গেলো সেনকাকার কথায়। বুঝলাম, এই তথাকথিত অশিক্ষিত মানুষগুলোর অন্তর্দর্শন এবং দূরদৃষ্টি কোন তারে বাঁধা, যা আমরা কলেজের গন্ডি টপকে প্রথাগতভাবে উচ্চশিক্ষিত হয়েও আত্মস্থ করতে পারিনি”। সেই গার্লস স্কুল তৈরি হয়, প্রথমে তা জুনিয়ার হাই (ক্লাস এইট অবধি) স্তরে উন্নীত হয়, আমার মা ওই স্কুলেরই শিক্ষিকা ছিলেন। বছর কুড়ির মধ্যে এলাকায় অবশ্য আরো দু’-তিনটি গার্লস স্কুল তৈরি হয়। ২০০০ সাল নাগাদ স্থানীয় সংঘ গার্লস স্কুলটি অন্য একটি হায়ার সেকেন্ডারি কো-এড স্কুলের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।

আমরা তখন ছোট, এত ছোট যে, স্বাধীনতার দিনে স্কুলে গেলেই যে বেফালতু একটা ছুটির দিন ভোগ করা যেতে পারে, সেই বোধটা তৈরী হয়নি (বাড়িতে থাকলেই তো ভূগোল-বিজ্ঞান-অঙ্কের ছকবাঁধা চক্করে আটকে থাকতে হবে, যৌথ পরিবারে নজরদার অনেক)। সে যাই হোক, বাড়ি থেকে মায়ের শাড়ি, বৈঠকখানার চেয়ার ইত্যাদি নিয়ে গিয়ে পাশে রাণাদের বাড়ির সামনের তিনদিক খোলা বারান্দায় স্টেজ বানানো হচ্ছে, বিকেলে আমাদের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এই কয়েকটা আবৃত্তি, দেশাত্মবোধক গান আর শেষে, পাটকাঠিতে টাঙ্গানো কাগজের তেরঙ্গা হাতে পাড়ার সকল বাচ্চার সমবেত জাতীয় সঙ্গীত; ও হ্যাঁ, সভার শুরুতেই সভাপতির ভাষণ। বিকেল হ’ল, সভাও শুরু হ’ল, সভাপতি সেনদাদু। তিনি পাড়ার বয়ঃজেষ্ঠ কেবল নন, অনুষ্ঠানের শেষে শিল্পীদের জিলিপি খাওয়ার জন্যে তিনি অকাতরে পাঁচ টাকা দান করেছেন। সভাপতি বলতে উঠলেন, “...হক্কালে উইঠ্যা চা নিয়া বারান্ডাটায় আইসা বইসি, দেহি পোলাপানে ফুড়ুৎ ফাড়ুৎ দৌড়াদৌড়ি করে তাইরপর দেহি আমার বেড়ার বাঁশ-কঞ্চি ধইর‍্যা টানাটানি করতেয়াসে। তা আমি ধমক দিয়া কই, করস কি, করস কি ? হ্যারা হাইস্যা কয়, দাদু আইজ স্বাধীনতা না !! এ-এ-এ-এ-ই আরকি...আর কি কমু কন”। সেনদাদুর সেই ঈষৎ টেনে ছেড়ে দেওয়া ‘এ-এ-এ-এ-ই’ বহু কষ্টার্জিত ও বহু প্রতিশ্রুতির ভারতীয় স্বাধীনতার গত অর্ধশতাব্দী কাল ধরে  মূষিকপ্রসবকে (‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হ্যায়’) অনেক বছর পর ভারী চমৎকার সামারাইজ করেছিল আমার ক্রমপ্রস্ফূটিত চেতনায়।

সেনদাদুর আরেকটি গল্প শোনাই। তখন পাঁচ কি ছয় ক্লাসে পড়ি, তখনো পাড়ার মুদির দোকানে উপরে শীতলপাটী পাতা একটি তক্তাপোষ থাকত, যার উপরে দোকানদার কাকা /জেঠু / দাদু বসতেন। সেকালে ভারী স্নিগ্ধ একটি সামাজিক মূল্যবোধ শীতের হাল্কা কুয়াশার মত গোটা সমাজটাকে মুড়ে রাখত, যেখানে দোকানীর সঙ্গে লেন-দেন বা আত্মীয়তার  সম্পর্কের উপরেও আরো বড় সামাজিক সম্পর্কের বাঁধুনি থাকতো, তাই নিতান্ত অপরিচিতের সঙ্গে আলাপেও সম্বোধনে আকছার কাকু, জেঠু, দাদু ব্যবহৃত হ’ত।  তা, মা পাঠিয়েছেন মিত্তিরদাদুর মুদিখানা (দোকানের নাম কি ‘মিত্র ভান্ডার’ ছিল? মনেও নেই। কি যায় আসে, আমরা জানতাম, বিস্কুট-গরমমশলা-চাল-ডাল-চিনি-তেল-গুড় কিনতে মিত্তিরদাদুর দোকানে যেতে হয়, আর কদমা-নকুলদানা-বাতাসা কিনতে পালানজেঠুর দোকানে যেতেই হবে উপরন্তু ওখানে রিঠা আর সাবানও পাওয়া যায়; রিমের কাগজ, খাতা বা পেন্সিল কিনতে কমলকাকুর লাবণ্য বুক স্টলই গতি, তাছাড়া ‘বঙ্গলিপি’ খাতা রেশন দোকানেও মেলে।) দোকানে কি কি সব আনতে, কাগজে লিখে দিয়েছেন, হাতে পয়সা দেননি, পয়সা দেওয়ার প্রশ্নই ছিল না। বন্দোবস্তটা সরল, মিত্তিরদাদু ওই তালিকাটাতেই টিক দিয়ে দিয়ে দাম লিখে মাল ওজন মেপে আমার ব্যাগে ভরে দেবেন, আমার পকেটে গুঁজে দেবেন ওই টিক-দেওয়া-দাম-লেখা তালিকাটা, এবং বলবেন, “রাস্তার বাঁদিক  ধরে আস্তে আস্তে যাবি দাদু, নে একটা মাছ লজেন্স নে” (মাছ লজেন্স মনে আছে কারো ? অক্ষয় সে মৎস্যাকৃতি লাল, হলুদ বা সবুজ লজেন্স চুষতে চুষতে টাকরার ছাল উঠে যেত, অনেক সময়ে জলে ধুয়ে কাগজে মুড়ে রেখে দিতাম, বাকিটা পরে খাবো বলে)। আমার দাদু (তাঁর বিকেলের চার-ইয়ারি মজলিশি আড্ডাটা মিত্তিরদাদুর দোকানেই বসতো) বা অফিসফেরতা বাবা খরিদারির দাম মিটিয়ে দেবেন। সেদিনও এই নিয়মেই তালিকা দেখে দেখে মিত্তিরদাদু মাল মেপে আমার থলিতে এক-এক করে ভরে দিচ্ছেন। সঙ্গে অবশ্য টুকটাক পড়া ধরাও চলছে, যেমন, বল তো দেখি ‘ডাকঘর’ কে লিখেছেন ? গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড কার তৈরি ? এককিলো চিনির দাম ৩ টাকা হলে সাড়ে তিনশো গ্রামের দাম কত ? এবং, ইত্যাদি। এ হেন সময় দোকানে সেনদাদুর আবির্ভাব – বাঁশ ফালি করে চটা দিয়ে বানানো বেঞ্চিতে জুত করে বসে আমার ঠিকুজি নিলেন – “মনীন্দিরের (আমার দাদু মনীন্দ্রনাথ ওনার ইয়ারবক্স, বিকেলের আড্ডার বোনাফাইড মেম্বার) নাতি না ? এই ‘বঅসে’ চোখের মাথাডা খাইলি কি কইর‍্যা” ? (আমার নাকে চশমা ওঠে ক্লাস টু-তে পড়বার সময়ে)। মিত্তিরদাদু জিভে একটা আফশোসের শব্দ তুলে বলেন – “জুগই (যুগ) এমন পড়স্যে, কি বলবা” ! যুগের ‘পতনে’ অভাবনীয় আর কি কি দেখবেন ভেবেই বোধহয় কিয়ৎকাল সেনদাদু উদাস হয়ে পড়েন। খানিক পরে গা ঝাড়া দিয়ে তাঁর উদাসীনতা সরিয়ে তিনি মিত্তিরদাদুকে জিজ্ঞেস করেন, “কই কি মিত্তির, তর অ্যারারুট বিস্কুট কত কইর‍্যা ?” মিত্তিরদাদু – “টাকায় আড়াই শো”। অপ্রত্যাশিত চড়া দামের অভিঘাতে বেশ টেনে নিজ পিতৃনাম স্মরণ করে সেনদাদু ফের প্রশ্ন করেন – “বা-আ-আ-বা, কস কি !! আর তর ওই গুঁড়া গুলা ?” তখন অ্যারারুট বিস্কুট আসতো টিনে করে, বিক্রি হত ওজনে। টিনে ভাঙ্গা, গুঁড়ো হয়ে যাওয়া বা টিন থেকে বয়ামে সাজাবার সময় ভাঙ্গা বিস্কুটাংশ অন্য বয়ামে রাখা হত, অক্ষত বিস্কুটের চেয়ে ঢের সস্তায় বিকোত সেগুলো। এ ক্ষেত্রে হয়তো টাকায় পাঁচশো গ্রাম। মিত্তিরদাদুর মুখে দাম শুনে নিয়ে সেনদাদুর চোখের থেকে যেন লেজার বিম বেরিয়ে পূর্ণাঙ্গ ও প্রতিবন্ধী বিস্কুটের বয়াম দু’টি জরিপ করতে লাগলো এবং প্রোসেসিং এর জন্য ইনপুটস মস্তিষ্কে চালান করতে লাগলো। ইতিমধ্যে মিত্তিরদাদু আমার অর্ডারি মাল গুছিয়ে ব্যাগে ভরে দিয়ে, টিক দেওয়া ও মালের পাশে দাম লিখে দেওয়া তালিকাটা আমার পকেটে গুঁজে দিতে যাচ্ছেন, এমন সময়ে সেনদাদু সিদ্ধান্তে পৌঁছলেন – “মিত্তিররে, এক কাম কর, তুই ওই ভাঙ্গাগুলাই দে দুই শ (গ্রাম)। বেশি দাম দিয়া গোটা বিস্কুটে কাম কি যখন চা দিয়া খাওনের সময় ভাইঙ্গাই খাইতে হইব!” হায় রে, আমি কিনা সেনদাদুকে কিপটে ভাবছিলাম! তাঁর বৈজ্ঞানিক ও যুক্তিশীল চিন্তাধারা সেই সময় থেকেই আমায় সেনদাদুর প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট করে তোলে। এ হেন যুক্তিশীলতার পরিচয় সেনদাদু বারবার দিয়েছেন।

অনেককাল পরের কথা। আমি তখন গ্র্যাজুয়েশান করছি, আমাদের সেই বয়েসে সেই কালে এলাকায় সর্বসমক্ষে ধূম্রপানে কিঞ্চিত বিধিনিষেধ থাকায়, বিড়ি টানতে গিয়েছি রেলদীঘির ওপারে, রেলইয়ার্ডের পাঁচিলের ধারে। রেলদীঘি বেশ ভরভরন্ত স্বাস্থ্যবতী, তার সব ঋতুতে অক্ষত যৌবনের রহস্য নাকি দীঘির মধ্যিখানে দুটো গভীর কুয়ো। ঠাকুরমার ঝুলির রাক্ষসী রাণীর প্রাণভোমরা দীঘির নীচে যে কুয়োর মধ্যে এক স্ফটিকস্তম্ভে লুকোন থাকতো, নীলকমল যেটা এক ডুবে তুলে আনতে পেরেছিল, সেই কুয়োই বোধহয়। রেলদীঘির কুয়ো কেউ কোনকালে চোখে দেখেনি, কারণ নীলকমলেরা আর জন্মাচ্ছে না বহুকাল হল; তাই লোকের মুখের কথাতেই সে কুয়োর অস্তিত্ব। যাক সে কথা, এ গল্প কুয়োর নয়, কুয়োর চেয়ে ঢের গভীর সেনদাদুর। তা সে রেলদীঘির চারপাশে চারখানি বাঁধানো ঘাট ছিল। রেলইয়ার্ডের দিকের সুদূরবর্তী ঘাটখানি (ওতে বসবেন যাঁরা, সেই মাতব্বরেরা সন্ধ্যে বেশ ঘনিয়ে না এলে জনসমক্ষে বেরোতেন না, তাঁরা দিনমানে নিদ্রা যেতেন, রাতে তল্লাট-বেতল্লাটের গৃহস্থবাড়িতে নাইটডিউটি করবেন বলে) বাদে বাকি তিনটি ঘাটে চারপাশের গাছগাছালির ছায়া দীর্ঘ-হওয়া পড়ন্ত বিকেলে বৃদ্ধরা এসে বসতেন, কেউ কেউ সুরে-বেসুরে গানও ধরতেন – ছায়া ঘনাইছে বনে বনে। রেলইয়ার্ডের ধারে নিরিবিলিতে বিড়িটিড়ি টেনে ফেরবার পথে একদিন দেখি একটি ঘাটে ঈষৎ উদাস সেনদাদু একা বসে। বলে রাখি সেনদাদুর একটি পায়ের গোড়ালির কাছে দীর্ঘদিনের সযত্ন-লালিত এগজিমা ছিল, মিত্তিরদাদুর দোকানে বসে তাঁকে নিবিষ্টচিত্তে চুলকাতে আগেই দেখেছি বহুবার। এখানেও দেখি উদাস দাদু পায়ের উপর পা তুলে অভ্যস্ত হাতে এগজিমা চুলকে যাচ্ছেন, অনেকটা জাবর কাটার মত। কি মনে হল, এগিয়ে গিয়ে বললাম, “দাদু, তখন থেকে চুলকাচ্ছেন, এতদিন ধরে কষ্ট পাচ্ছেন, ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খেলেই তো সেরে যাবে, ডাক্তার দেখান না কেন ?” সেনদাদু সেকেন্ডের জন্য থমকালেন, চুলকুনি থামালেন, আবার উদাস হয়ে চুলকাতে চুলকাতে তাঁর অতুলনীয় যুক্তিবাদিতার জ্বলন্ত প্রমাণ পেশ করে বললেন – “ নাহ, আছে থাউক। আমার চুলকানি আমি চুলকাই...আরামও লাগে, সময়ও কাটে”। পরবর্তী জীবনে বহুক্ষেত্রে নিজেকে ও সময়বিশেষে অপরকে চুলকে সময় কাটিয়েছি, আরামও যে পাইনি তা বলব না। সে কর্মশিক্ষার সোপানের কারিগর তো সেনদাদুই।

এরই কাছাকাছি সময়ে সেনদাদুর মুখেই আরেক কাহিনী শুনেছিলাম। সেটা আবার দেশোদ্ধার বিষয়ক। সত্তরের দশক। এক ঝাঁক উজ্জ্বল অল্পবয়েসী ছেলেমেয়ে কি একটা ‘অলীক’ স্বপ্নে জারিত (এ লেখায় স্বপ্নটা অলীক না আলোকসুন্দর সে আলোচনা করা হলদিয়া যেতে হনলুলুর পথে হন্টনের সামিল হবে, তাই বাদ) হয়ে সমাজ বদলের নেশায় মাতোয়ারা। প্রশাসনও দাঁতনখ বার করে প্রতিষ্ঠিত অচলায়তনের সুরক্ষায় নিবেদিতপ্রাণ। গান্ধীর কংগ্রেসের প্রতি মোহভঙ্গ হয়ে বহু বাঙ্গালীই ওই সব ঝকঝকে পরার্থপর তরুণতরুণীর প্রতি নৈতিক সমর্থন ও পৃষ্ঠপোষণা জ্ঞাপন করেন। সেইকালে আমাদের সেই সিকি শহরে সেনদাদুর মত ষাটোর্ধ্ব কয়েকজন দূরদর্শকেরও এই আলোর পথযাত্রীদলের প্রতি একধরণের অনুচ্চার গুরুজনসুলভ প্রশ্রয় ছিল। এ হেন সময়, শোনা গেল সেনের প্রয়াত বন্ধু যুগলের ভ্রাতুষ্পুত্র অতনু যে নাকি ‘কলকেতার প্রেসিডেন্সি কলেজে পইড়্যা-পইড়্যা বিরাট দিগগজ হইয়া উঠত্যাছে’, তারও নাকি সেই একই মাথার ব্যামো, তাই ‘তারে পুলিশে গরুখোঁজা কইর‍্যা শ্যাশে খুঁইজ্যা পাইয়া গোবেড়েন দিয়া’ পড়াশোনা লাটে তুলে দিয়েছে। ফলে, কেউকেটা হয়ে উঠতে উঠতে দিগভ্রষ্ট পুত্রের ভবিষ্যত-চিন্তায় যুগলের ভায়ের ‘রাইতে ঘুম নাই চোখে’। তা তারে নিয়ে এসে তোলা গেল পারিবারিক বন্ধু সেনের ‘বার-বাড়ির একখান ঘরে’। নিরাভরণ ঘরখানিতে একটি সিঙ্গল তক্তাপোষ, একটি আলনা, একটি জলের কুঁজো ও জানালার পাশে একসেট চেয়ার টেবিল পাতা। ‘তয় সবই তো করন গেল, কিন্তু হ্যায়ে ক্যাবল খাটটাহে হুইয়া হুইয়া জানলা দিয়া বাইরাত বেবাক উদাস তাকায় থাহে’। ‘কি করন যায়, হ্যায়েরে সংসারের প্রেতি ক্যামনে টানন যায়’, নিতান্ত অসময়ে জীবনের প্রতি আকর্ষণ-হারিয়ে ফেলা সে উদাস বালক অতনুর নিখাদ শুভচিন্তক সেনমশায় ঘোর চিন্তায় পড়লেন। শেষে এক অমোঘ ও চিরকালীন উপায় ঠাওরালেন তিনি, ‘পাশের বাড়ি বিপিনের বুন লীলারে’ ফিট করলেন, সকাল-বিকেল অতনুর কি লাগে না লাগে তার তদারকিতে। সেই কাজের ফাঁকে ফাঁকে লীলা অতনু-র মাথা থেকে দেশোদ্ধারের ভূত ‘ওয়াশ’ করে তাকে সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে আনবে, আইডিয়াটার অন্তর্নিহিত মোক্ষ তাই। বাকি অংশ সেনদাদুর জবানে আমি যেমন শুনেছি তেমনি শোনা যাক – “কি আর কমু, দুই মাস যাইতে না যাইতে, লীলা অতনুর ব্রেনওয়াশ করব কি, লীলারেই ‘ওয়াশ’ করাইয়া আনতে হেই আমারেই দৌড়াইতে অইলো। হালায় কি করত পাঠাইলাম আর কি কইর‍্যা বসল”।

আরো পরে আরেকদিন, তখন আমি হাফ-বেকার, মানে ইতিউতি কলেজে ও ম্যানেজমেন্ট ইন্সটিটিউটে পার্টটাইম পড়িয়ে বেড়াই আর বাড়িতে গ্র্যাজুয়েট-পোস্ট গ্র্যাজুয়েট কিছু ছাত্রছাত্রী পড়াই, ফলে এলাকায় ‘মাস্টার’ নামে কুখ্যাতি ছড়িয়েছে। কুখ্যাতি থাকলেই গতিবিধি, আচারআচরণের উপর কিছু স্বতঃ-নিয়ন্ত্রণ প্রযুক্ত হয়েই যায়, অন্তত নিজ এলাকায়; সুখ্যাতি হলে তো উল্টোটাই হওয়ার কথা, চালু সামাজিক বিধিনিষেধগুলো নামডাকওয়ালা প্রতিভাবানদের ক্ষেত্রে ধর্তব্য নয় এমনটাই তো হয়ে এসেছে। কথায় আছে, যে জমিতে বাস, সে জমিতে চাষ কভু নয়। সর্বোপরি যেহেতূ কুখ্যাতি ধনবিজ্ঞান পড়েশুনে “এডুকেশান লাইন” ধরবার কারণে তাই যে কোন ধরনের জনসমাগমে যথা, রবিবারের চায়ের দোকানে, বন্ধুর বোনের বিয়েতে ধরেই নেওয়া হত, ভারতের অর্থনীতি কেন গোল্লায় যাচ্ছে তা এ ব্যক্তি দু’-একটা পাতলা কথায় জলবৎ বুঝিয়ে দিতে সক্ষম হবে (যদি তা না পারে তাহলে, বোঝ এরাও আজকাল মাস্টারি করছে, দেশটা কোথায় গেল!)। আর সত্যি কথা বলতে, অর্থনীতিতে বোঝবার আছেটাই বা কি,‘সবই তো ওই ডিমান্ড আর সাপ্লাই’ আর এ কথা তো জানাই আছে যে ‘ইনপুট করলেই আউটপুট হবে’। এই রকম একটা সময়ে আমায় পথিমধ্যে পাকড়াও করে বাজারের ব্যাগ-হাতে অশীতিপর সেনদাদু আমায় জানতে চাইলেন –“ আইচ্ছা মাস্টার, তুমি তো এডুকেশন লাইনে আসো (উচ্চারণটা দশ আনা ‘ছ’-এর সঙ্গে ছয় আনা ‘স’ জ্বাল দিয়ে তৈরি করতে হবে) , তা ব্যান্ডপার্টি দেখসো ? ওই যে এক ব্যাটায় এক বিরাট ঢাক (ড্রাম) পিঠে কইর‍্যা বইয়া নিয়ে যায় আর আরেক ব্যাটায় হেইডা দুমদুমাদুম বাজায়, দেখসো ?” প্রশ্নের অভাবনীয়তাতেই বোধহয় মাথাটা অজান্তেই ঈষৎ হ্যাঁ-সূচক হেলে গিয়েছিল ফলে সেনদাদু তাঁর আসল প্রশ্নটা করলেন – “ ওই যে ব্যাটায় বিরাট বোন্দা মত ঢাকটারে ক্যাবল বইয়া নিয়া যায়, তারে কি কয় জানো ? তোমাগো শাস্তর কি বলে ?” আমি দিনদুপুরে চৌমাথায় চৌরাস্তার মোড়ে অথৈ শব্দকল্পদ্রুম সমুদ্রে ডুবুরির মত ডুব দিতে গিয়ে একপ্রস্থ খাবি খেলাম, ‘মাতৃভাষা মাতৃদুগ্ধসম’ পর্যন্ত মনে পড়ে গেল, কিন্তু ওই ড্রামবাহকের কোন উপযুক্ত প্রতিশব্দ খুঁজে না পেয়ে নিজের ‘এডুকেশন লাইনে’ থাকবার ডুবন্ত ইজ্জত বাঁচাতে মরিয়া হয়ে বলে বসলাম –“ইয়ে, দাদু...ওটা হ’ল গিয়ে... মানে ইকোনমিক্সে তো...সরাসরি এর কোনো প্রতিশব্দ নেই... বলা যায়... যেমন ধরুন গিয়ে... ড্রাম-ক্যারিয়ার!” আমার অজ্ঞানতাজনিত দ্বিধার এই অন্তবর্তী কয়েক সেকেন্ড সেনদাদু আমায় তাঁর স্বভাবজ তীব্র চাহনির এক্সরে-তে ফেলে জরিপ করছিলেন। আমার উত্তর শুনে বোধহয় অনুকম্পাতেই তাঁর দৃষ্টির অগ্নিবাণ কিঞ্চিৎ স্তিমিত হয়ে এল, শ্বাস ছেড়ে বললেন, “হয় বুজছি, তোমার মুন্ডু। অরে কয় **র বাই (ভাই)”। উপর্যুপরি আঘাতের পর আঘাতে আমার স্নায়ু বিমূঢ়, আমি বাক্যহারা, আমায় স্তম্ভিত করে সেনদাদু তাঁর অমোঘ দার্শনিক সংজ্ঞা প্রকট করলেন – “ অল ইন্ডিয়ানস আর লাইক দ্যাট **র বাই (ভাই), বুঝছ । বয় একজনা আর বাজায় অন্য জনা !” আমার চোখে ‘ই’ সমান সমান ‘এম সি স্কোয়ার’ হ’ল পৃথিবীর সরলতম ইকোয়েশান যা দিয়ে জটিলতম এক সম্পর্ক প্রকাশিত হয়েছে। ভারত, ভারতীয় অর্থনীতি ও তার সঙ্গে আমভারতবাসীর সম্পর্ক বিষয়ে বেশ কয়েক গাছা বই আমায় মুখস্ত করতে হয়েছে, শিফটিং অব ট্যাক্স বার্ডেন বা লোড-শেডিং সম্পর্কেও কিছু ধারণা আছে, এমনকি ‘রানার’ কবিতার ‘পিঠেতে টাকার বোঝা তবু ওই টাকাকে যাবেনা ছোঁয়া’-র এক্সটেনশানে শ্রেণীবিভক্ত সমাজে শ্রম-সম্পর্ক ও শোষণ ইত্যাদি ঘোলাটে ভাবে হ’লেও কিছুটা জানি। তবু রণে-বনে-জনে-জঙ্গলে গত সাতদশকের যেকোন ‘আননোন ইন্ডিয়ান’-এর ছায়ামাত্র দেখলেই সেনদাদুর এই সরলতম মূল্যায়ণ মনে ঝলকে ওঠে, এর মাহাত্ম্য আমার কাছে আইনস্টাইনের ওই ব্রহ্মান্ডবিশ্লেষী ফর্মূলার চেয়ে একচুল কম নয়।
**********
আপাততঃ শেষকথা – সেনদাদুর এ সকল ভাষার পশ্চিমবঙ্গীয় অনুবাদ করতে বরেণ্য ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী মশায় বারণ করেছেন, তাঁর ‘রোমন্থন অথবা ভীমরতিপ্রাপ্তর পরচরিতচর্চা’ গ্রন্থ দ্রষ্টব্য।
    


 (পার্থ পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত "ট্রৈনিক" পত্রিকার বর্ষা ১৪২১ সংখ্যায় প্রকাশিত)
    



Thursday, 31 July 2014

আজকের ইশতেহার - একটি প্রস্তাবনা


বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট আমাদের মত অনেক মানুষকেই এমন একটি সংকটের সম্মুখীন হতে বাধ্য করছে যার তুল্য সংকট প্রায় একটি গোটা প্রজন্মেরই অজানা। আমাদের সাধ্যমত সংকটের স্বরূপ বিশ্লেষণ করে যে ক’টি দিক উঠে আসছে তা হ’ল –

১। পশ্চিমবঙ্গের শাসনক্ষমতা থেকে বামপন্থীদের অপসারণ এক অনিবার্য পরিণতিকে নির্দেশ করে, যা একাধারে বিগত তিন দশক ধরে বামপন্থী রাজনীতির ফলিত প্রয়োগে আত্মঘাতী বিচ্যুতি ও তার ফলস্বরূপ রাজনৈতিক মননে এক অভূতপূর্ব শূণ্যতার সৃষ্টি করেছে।
২। তিন দশকের বেশি শাসনক্ষমতা হাতে পেয়েও রাজ্যের বামপন্থীরা রাজনৈতিক সচেতনতা প্রসারে উদ্যোগী না হয়ে সাধারণ মানুষকে পুরোপুরি অরাজনৈতিক করে তুলেছিলেন যার অনিবার্য ফলশ্রুতি সাম্প্রতিকতম নির্বাচনে শিকড়হীন শিল্পী, চিত্রতারকা বা ক্রীড়াবিদদের জয়।  
৩। বিরোধী শাসনের তিন বছর অতিক্রান্ত হ’বার পরেও বামপন্থী রাজনীতির (স্পষ্ট করে বলা ভাল, সংসদীয় বাম-রাজনীতি ও আরো সুনির্দিষ্ট ভাবে পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার) প্রতি মানুষের বিশ্বাসহীনতা কাটেনি, বরং প্রতিবাদী ও লড়াকু কর্মসূচীহীনতা বাম-আন্দোলনের জমিকে আরো বন্ধুর করে তুলছে প্রতিনিয়ত।   
৪। প্রতিবাদী ও সমালোচনামূলক কন্ঠস্বর ও ক্রিয়াকান্ডের প্রতি বর্তমান শাসকের সহনশীলতার চুড়ান্ত অভাব, ও সময় সময় দমননীতি প্রয়োগ এক ভীতিময় পরিবেশ সৃষ্টি করেছে যা গণতন্ত্রের পরিপন্থী।  
৫। সুস্থ রাজনৈতিক বিতর্ক বা মতাদর্শগত সংগ্রামের পথ সম্পুর্ণ রুদ্ধ হয়ে গিয়েছে।
৬। শিক্ষিত ও সুশীল সমাজের (Civil Society) প্রতিবাদী সক্রিয়তা যা ২০০৯-১১তে শেষবার দেখা গিয়েছিল তা বিলীয়মান, এবং অনেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ চাপে বা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি ও নানা সুবিধার খোঁজে শাসকের তালে তাল মিলিয়ে চলেছেন। তথাকথিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর একটি বিরাট অংশের এই সুবিধাবাদী অবস্থান গ্রহণ ও নিষ্ক্রিয়তা এক নতুন সমস্যা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। একটি বিশেষ রাজনৈতিক আনুগত্য ভিন্ন সুশীল সমাজের রাজনৈতিক-দলনিরপেক্ষ ও স্বাধীন মতামত বিনিময়ের কোন ক্ষেত্রের অস্তিত্ত্ব অন্তত প্রকাশ্যে আর নেই। ফলে, চিন্তার জগতে নতুন ও প্রগতিশীল দিশার সন্ধান আপাততঃ দেখা যাচ্ছে না।    
৭। শিক্ষাক্ষেত্রে নৈরাজ্য বাড়ছে, বাড়ছে কর্মহীনতা, তাল মিলিয়ে বাড়ছে লুম্পেন সংস্কৃতি। বিশেষতঃ কলেজপড়ুয়া ছাত্রছাত্রী ও সদ্য যুবদল এই লুম্পেন সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারছে না।  ধারাটি বিশ্বায়নের সূচনাপর্ব থেকেই ক্রমান্বয়ে সক্রিয় ছিল, গত চার-পাঁচ বছরে তার কলুষ আরো প্রকটিত হয়েছে। প্রশাসনের শীর্ষস্তরের প্রশ্রয়ে এই লুম্পেন সংস্কৃতি পুষ্টিলাভ করছে।
৮। মিডিয়ার অতিক্রিয়তা লক্ষ্য করা যাচ্ছে, একটি বড় অংশ শাসকের বিচ্যুতি নিয়ে সতত সরব। এবং সেখানেও শাসকের তরফে ঘোর অসহিষ্ণুতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
৯। আইনের শাসন বহুক্ষেত্রেই সম্পূর্ণ অনুপস্থিত দেখা যাচ্ছে, এবং একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী-সদস্যদের সকল অবৈধ / বেআইনী ক্রিয়াকলাপ শীর্ষনেতৃত্ত্বের প্রশ্রয়লাভ করছে প্রকাশ্যে, এবং সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক ও মুক্ত জীবনযাপনে আইন ও পুলিশী ব্যবস্থার সহায়তা দুর্লভ হয়ে উঠেছে। 
১০। সামগ্রিকভাবে সামাজিক সুরক্ষার ঘোর অবনতি ঘটেছে, বিশেষতঃ নারীদের সামাজিক নিরাপত্তা আজ বিরাট প্রশ্নের সম্মুখীন।  
১১। পশ্চিমবঙ্গে প্রশাসনের শীর্ষস্থল থেকে প্রদেশের ভোটরাজনীতির অংকের স্বার্থে সংখ্যালঘু-উন্নয়নের নামে নগ্ন সংখ্যালঘু-তোষণ চলছে, অনেক ক্ষেত্রে সংবিধান অমান্য করে। ফলে এই প্রদেশের সমগ্র জনগোষ্ঠীর এক বিপুল অংশের মননে অজান্তেই সাম্প্রদায়িক ভেদভাবনার বীজ উপ্ত হচ্ছে।
১২। গণতন্ত্রের মূল (প্রাতিষ্ঠানিক) স্তম্ভ যথা, নির্বাচন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন, বিচারব্যবস্থা ইত্যাদিকে পরিকল্পিতভাবে উপেক্ষা ও দুর্বল করে দেওয়ার প্রচেষ্টা প্রশাসনের তরফে লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা প্রকারান্তরে স্বৈরাচারী শাসনের হাত শক্ত করছে।  
১৩। পর্যবেক্ষণ ৩ থেকে ১২-এর মুখচ্ছবি আমাদের ফ্যাসীবাদী শাসনকেই মনে পড়ায়। এবং বর্তমান পরিস্থিতিতে এর অবশ্যম্ভাবী ফলাফল প্রতিক্রিয়াশীল ও সাম্প্রদায়িক শক্তির উত্থান।
১৪। বিগত বিধানসভা নির্বাচন চুড়ান্তভাবে দেখিয়ে দিয়েছে যে দেশের বর্তমান নির্বাচনপ্রক্রিয়ায় জনমতের সঠিক প্রতিফলন ঘটা কার্যত অসম্ভব, কারণ তা একান্তভাবে শাসকের সদিচ্ছানির্ভর।      

আমরা আরো লক্ষ্য করছি যে -

১। মধ্যবিত্ত বাঙালীর শ্রেণীচরিত্রে বিগত অর্ধশতাব্দী যাবত যে দোষটি ক্রমান্বয়ে বাড়তে বাড়তে আজ আত্মধ্বংসী আকার ধারণ করেছে তা হল ব্যক্তিস্বার্থের ক্ষুদ্র গণ্ডীর বাইরে বেরিয়ে বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থে ভাবনাচিন্তার অনীহা ও নিজেকে ওই বৃহত্তর সামাজিক স্বার্থে নিয়োজিত করবার ঘোর অনিচ্ছা। 
২। দীর্ঘ প্রায় সাড়ে তিন দশক পর পশ্চিমবঙ্গে শাসনক্ষমতা হাতবদল হলেও বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর অপ্রাপ্তি ও অসন্তোষের কোন সুরাহা হয়নি, তাই তথাকথিত ‘পরিবর্তন’ কথাটি মানুষের জীবনযাত্রার মানের গুণগত উন্নতির নিরিখে প্রযোজ্য নয়।
৩। পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ মানুষ তাঁদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান/পরিস্থিতি বিচারে সক্ষম, তাই তাঁরা তিন বছর আগে বামের বিকল্প হিসেবে, অনেকেই হয়তো কিছুটা নঞর্থ্যক অবস্থান থেকে (অর্থাৎ, বামের বিকল্প ভাল না খারাপ সে বিচারের চেয়েও, বামেরা খারাপ তাই তারা আপাতত ক্ষমতা চ্যুত হোক, এমন ভাবনা থেকে)  বর্তমান শাসকদলকে ক্ষমতায় এনেছিলেন। কিন্তু অল্প কিছু সুবিধাভোগী ও মধ্যস্বত্ত্বভোগী বাদে নতুন সরকার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ। তাই বিকল্প অনুসন্ধান এখনো শেষ হয়নি, বিগত লোকসভা ভোটের ফলাফলে সেটা বোঝা যাচ্ছে।
৪। অর্গলমুক্ত ও স্বাধীন মিডিয়া গণতন্ত্রের অন্যতম স্তম্ভ মেনে নিয়েও মনে রাখা প্রয়োজন, মিডিয়া যেহেতূ মূলতঃ ব্যক্তিপুঁজি-নিয়ন্ত্রিত ও বাজার এবং মুনাফামুখী, তাই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সামাজিক উন্নয়নে বিপ্লবী ভূমিকাগ্রহণ তার মূল অভিলক্ষ্য নয়। বরং, মিডিয়ার বড় অংশের বর্তমান শাসকের প্রতি কঠোর সমালোচনামূলক অবস্থান প্রতিযোগিতামূলক বাজারব্যবস্থায় তাদের এই অবস্থান নেওয়ার আপেক্ষিক চাহিদা যে উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে তা প্রমাণ করে। মিডিয়ার বড় অংশের এই অবস্থানগ্রহণ থেকে বর্তমান শাসকের নানাবিধ ক্রিয়াকলাপকে অপছন্দ ও সমালোচনা করবার বাজার যে উত্তরোত্তর তেজি হচ্ছে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। যদিও মনে রাখতে হবে, মিডিয়ার এই আপাতঃ প্রগতিশীল অবস্থানগ্রহণ কোনোভাবেই প্রগতিশীল বামপন্থার পুনর্জাগরণে সদর্থক ভূমিকা গ্রহনের উদ্দেশ্যে নয়।
৫। কেবল সুবিধাবাদই নয়, তীব্র সামাজিক বিপন্নতা ও বহু ক্ষেত্রে নিছক অস্তিত্ত্বের সংকট থেকে মুক্তি পেতে মূলতঃ নীচুতলার বহু বামপন্থী কর্মী প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছেন।

এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়ে আমরা মনে করছি যে যে সুস্থ ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ, শিক্ষা ও সংস্কৃতির ধারা আমাদের উত্তরাধিকার, তাকে পুনর্জ্জীবিত করবার প্রয়াসে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। আমাদের আর্থ-সামাজিক অবস্থান এই ঐতিহাসিক দায়িত্ব আমাদের পালন করতে প্রেরণা দিচ্ছে। 

১৯৩৮ সনের ডিসেম্বর মাসে কলকাতায় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’-এর দ্বিতীয় অধিবেশনে (সম্মেলনের সম্পাদক মণ্ডলী – মুলকরাজ আনন্দ, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, পন্ডিত সুদর্শন, সুধীন্দ্রনাথ দত্ত ও বুদ্ধদেব বসু) গৃহীত ইস্তাহারটি আজকের পরিস্থিতিতে আরেকবার সযত্ন পুনর্বিবেচনা দাবী করে –
“...সনাতন সংস্কৃতিতে ভাঙ্গন ধরার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের (সাহিত্যে) আটপৌরে জীবনের বাস্তবতাকে এড়িয়ে যাবার আত্মঘাতী প্রবণতা দেখা দিয়েছে। ...ফলে তার ভাবসম্পদ হয়েছে রিক্ত ও বিকৃত...যুক্তিবাদকে (সাহিত্যে) প্রতিষ্ঠিত করে প্রগতিকামী মননধারাকে বেগবান করা আমাদের (লেখকদের) কর্তব্য...সাম্প্রদায়িকতা, জাতিবিদ্বেষ, যৌন স্বৈরাচার, সামাজিক অবিচারের যে ছায়া (সাহিত্যে) পড়েছে, তার অপসারণের জন্য (তাঁদের) সর্বদা সচেতন থাকতে হবে...আমরা চাই জনজীবনের সঙ্গে সর্ববিধ কলার নিবিড় সংযোগ...ভারতীয় সভ্যতার যা কিছু শ্রেষ্ঠ আমরা তার উত্তরাধিকার দাবী করি। আমাদের দেশে নানারূপে যে প্রগতিদ্রোহ আজ মাথা তুলেছে তাকে আমরা সহ্য করব না...যা কিছু আমাদের নিশ্চেষ্টতা, অকর্মণ্যতা, যুক্তিহীনতার দিকে টানে, তাকে আমরা প্রগতিবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করি। যা কিছু আমাদের বিচারবুদ্ধিকে জাগ্রত করে, সমাজব্যবস্থা ও রীতিনীতিকে  যুক্তিসঙ্গতভাবে পরীক্ষা করে আমাদের কর্মিষ্ঠ, শৃঙ্খলাপটু, সমাজের রূপান্তরক্ষম করে, তাকে আমরা প্রগতিশীল বলে গ্রহণ করব”। (বন্ধনীর মধ্যে রাখা শব্দগুলি মূল প্রস্তাবের অংশ, বন্ধনীর মধ্যে রাখবার একমাত্র উদ্দেশ্য, এই ইস্তাহার যে কেবল সাহিত্যচর্চার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য নয়, এর ব্যাপ্তি যে আরো অনেক বড় তা স্পষ্ট করা) 

এই প্রগতিবাদ হাতিয়ার করে একাধারে বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়ার নানা অমানবিক ক্রিয়াকান্ড ও আমাদের প্রদেশে উত্তরোত্তর হিংস্র হয়ে উঠতে থাকা ফ্যাসীবাদী শাসনকে যুগপৎ প্রতিহত করতে আমাদের আজ এক ঐতিহাসিক দায়িত্বপালনে সচেষ্ট হতে হবে। আপাতত আমাদের যে সমস্ত কাজে ব্রতী হওয়া যেতে পারে তা হল –

১। যে যে ক্ষেত্রে কর্মরত বা সামাজিকভাবে জড়িত আছেন, সেখানে সহমর্মী (এই দলিলে যা যা বলা হল তার সঙ্গে মোটের উপর সহমত পোষণ করেন এমন মানুষ) ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষদের সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন, মতের আদানপ্রদান – তাঁদের মনে এই আস্থার সঞ্চার করা যে, তাঁদের চিন্তাভাবনা ও প্রতিক্রিয়া প্রকাশের ক্ষেত্রে তাঁরা সঙ্গীহীন নন, বরং বহু মানুষ এই একই মতামত পোষণ করছেন, কিন্তু এক্ষুণি হয়ত পথে নেমে আন্দোলনে যাবার মত সক্রিয় নন বা নানা ভয়ভীতি বা বাধ্যবাধকতার কারণে প্রকাশ্যে প্রতিবাদে মুখর হতে পারছেন না।
২। কর্মস্থল, বাসস্থান বা অন্যান্য সামাজিক ক্ষেত্রে ভাল যোগাযোগ আছে এমন মানুষদের সঙ্গে যোগসুত্র স্থাপন করা ও তাঁদের মারফত আরো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করা, বিশেষতঃ তরুণ-তরুণী ও নব্য যুবাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপনের চেষ্টা করা।
৩। সমমনস্ক সংগঠনগুলির সাথে (যথা, বঙ্গীয় বিজ্ঞান মঞ্চ) নিবিড় যোগাযোগ স্থাপন ও তাদের কর্মকান্ডে সামিল হওয়া।
৪। তরুণতরুণী ও নব্য যুবাদের সামিল করে ধারাবাহিকভাবে কিছু সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড সংগঠনের চেষ্টা করা, যথা সেমিনার, ডকুমেন্টারি ফিল্ম শো, বিতর্ক সভা, প্রবন্ধ প্রতিযোগিতা, স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিতে নানা বিষয়ে (যথা, পরিবেশ-সংরক্ষণ, সাধারণ স্বাস্থ্যসচেতনতা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, নারীর ক্ষমতায়ন ইত্যাদি) বিষয়ে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য পথনাটক, পোস্টার প্রদর্শনী / প্রতিযোগিতা ইত্যাদির ব্যবস্থা করবার চেষ্টা করা, দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের পুস্তক বিতরণ প্রভৃতি। স্রেফ একদিন একটি রক্তদান শিবির করে হাত ধুয়ে ফেললে চলবে না।  
৫। জাতীয় ও স্থানীয় প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ভুক্তভোগীদের দিকে সহায়তার হাত বাড়িয়ে দেওয়া।
৬। বামপন্থী কর্মী, বিশেষতঃ যাঁরা হতাশাগ্রস্ত বা ভীত বা বীতশ্রদ্ধ হয়ে পার্টির সঙ্গে সংস্রব রাখছেন না, ফলে এক অভূতপূর্ব শূণ্যতার যন্ত্রণায় ব্যথিত, তাঁদের এই কর্মকান্ডে সংযুক্ত করা যাতে তাঁরা বামপন্থায় প্রত্যয় ফিরে পান।
৭। নানা সরকারী ও অসরকারী আর্থ-সামাজিক সর্বেক্ষণ-ভিত্তিক (Survey) প্রকল্প (Project) যোগাড়ের চেষ্টা করা, এবং তাতে তরুণতরুণী, যুবা ও কর্মীদের নিয়োজনের ব্যবস্থা করা। 
৮। একটি বিশেষজ্ঞ দল গঠন করে এবং সম্মিলিত মতামত ওয়ার্কশপের মাধ্যমে সংগৃহীত করে, নির্বাচনপ্রক্রিয়ার সংস্কারের প্রস্তাব তৈরী করা, যাতে আরো বেশী সংখ্যক মানুষ স্বাধীনভাবে তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পান। এই প্রস্তাবনা বিবেচনার জন্য কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনে পাঠানো যেতে পারে। 

(যাঁরা মনে করছেন, এ রাজ্যে যেমন সব চলছে তা ঠিকঠাক চলছে না, সেই সব সমমনস্ক বন্ধুদের মতামত বিশেষ ভাবে প্রার্থনা করি)


Saturday, 22 February 2014

সিনেমা-সিনেমা

ছেলেবেলায় আমাদের দু’রকমের ‘মা’ ছিলেন। এক, জন্মদাত্রী মা, যিনি সন্ধ্যেবেলায় ল্যাম্পপোস্টে বাতি জ্বলে যাওয়ার আগে খেলার মাঠ থেকে না ফিরলে বিরাট বকাবকি করতেন অথচ বাবার শাসনের অগ্নিদাহ থেকে শীতল ছায়া বিছিয়ে রক্ষা করতেন নিয়মিত। আর দুই হ’ল ‘সিনে-মা’, যিনি একঘেঁয়ে জীবনে লেখাপড়ার কালাহারি মরুতে কালেভদ্রে আনন্দের হিল্লোল বয়ে ওয়েসিস হয়ে আবির্ভূত হতেন।  
সেকালে হাউসে গিয়ে সিনেমা দেখা মানে ছিল একটা পরব। কশ্চিৎ-কদাচিৎ বাবা আপিস থেকে একটু আগে বাড়ি ফিরে বলতেন, “রেডি হয়ে নে, আজ আমরা সিনেমা দেখতে যাব, কিং-কং” ; অথবা পদিপিসীর বর্মিবাক্সআধা মফঃস্বল, সে কেবল বাড়িয়ে বলবার জন্য বলা, আদতে গ্রামের নিকটবর্তী গঞ্জ শহরে একটিই সিনেমা হল (বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে), ঝুল-পড়া উঁচু সিলিং থেকে লম্বা ডান্ডায় ঝোলানো গুটিকয় সিলিং ফ্যান, রেক্সিন-ছেঁড়া গদির সিট, কেবল অন্ধকার হলে দরজার ওপর লাল আলোয় লেখা একটি অপরিচিত শব্দ “EXITসব মিলিয়ে-মিশিয়ে আহা কি মদির সেই স্বপ্নলোক। লাইটম্যানের দেখানো আলোকরশ্মিপথ ধরে সিট খুঁজে পাওয়া। তারপর কেমন একটা অপার্থিব কিরকির-কিটকিট শব্দ, মাথার উপর দিয়ে আলোর রেখার নড়াচড়া আর পর্দার ওপর ভেসে উঠলো, ফিল্ম  ডিভিশান কি ভেট - গান্ধীজীর ডান্ডি যাত্রা। অবাক হয়ে ভাবতাম, পর্দা জুড়ে এত বৃষ্টি পড়ে কেন ? তারপর বেশ একটা ফর্ম গোছের কি যেন দেখানো হ’ত আর হল জুড়ে ফিসফাস হ’ত, “ও তেরো রিল, ছোট বই !” আমি এই ধাঁধাঁটা বুঝতে পারতাম না। প্রথমঃ, তেরো রিলটা কি ও কোত্থেকে সেটা জানা গেল আর দ্বিতীয়তঃ, রিলের সঙ্গে বই ছোট না বড় তার সম্পর্ক কি, বই তো পাতা দিয়ে মাপে জানি। অর্থাৎ, পুরো ব্যাপারটার মধ্যেই কেমন শিহরণ, রহস্যময়তা আর সবচেয়ে বড় কথা একঘেঁয়ে পড়া থেকে একদিনের মুক্তি দেদার মজা।

আমার মামাবাড়ি ছিল বেহালা আর এখন বুঝতে পারি দিদা ছিলেন সিনেমার পোকা। গরমের ছুটিতে দিন সাতেক (যত উঁচু ক্লাসে উঠতে থাকি, মামাবাড়ির বরাদ্দ দিনসংখ্যা তত কমতে থাকে, শেষে ক্লাস নাইন-টেনে উঠে তা শূণ্য হয়ে যায়) মামাবাড়ি-যাপন বাঁধা ছিল, এখন বুঝি তাতে মায়ের পিয়ার-প্রেসার ভালরকম কাজ করত। সেই দিন সাতেকের মধ্যে দিদার হাত ধরে (অতি অবশ্য বাবার অগোচরে) অশোকা বা ইলোরা বা অজন্তা সিনেমা হলে একটা দুপুরের শো-দর্শন ঘটতই। ছবিগুলো যে সবসময় ‘শিশুপাচ্য’ ছিল তা বলতে পারি না, যেমন ফুলেশ্বরী, হসপিটাল, বা তিসরি মঞ্জিল। তবে এগুলোর প্রত্যেকটার মধ্যেই শিশুর শিক্ষণীয় জিনিসের অভাব ছিল বলে আমি অন্তত মনে করি না। টিকিট কাউন্টারের জাল-লাগানো জানালার উপরে হাতে লেখা বিজ্ঞপ্তি সাঁটা থাকত – “বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহেন”। তা দিদার সঙ্গে ফুলেশ্বরী ছবি দেখতে গিয়ে (বিশ্বাস করুন, ওই ছবিটি আমার বড় হয়েও আর দেখা হয়ে ওঠেনি) যেই না মন-ভরানো গান শুরু হয়েছে, যেও না দাঁড়াও বন্ধু, অমনি ঝপ করে আলো চলে গেল। হলময় হাহুতাশের মধ্যে খানিক অপেক্ষা করে দিদা বললেন, “নাঃ তর দেখতে আছি কপালটাই খারাপ, বাপে তো আর এইসব দেখাইবো না, যাইক গা, চল কাইল আবার আসুম”। আমি কাঁদো-কাঁদো (ছেলেবেলাটায় ফস করে চোখে জল চলে আসত কত সহজে, কোন দায় ছিল না, বড় হ’বার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা এত কান্না গিলতে হয় !) হয়ে দিদার অনুগামী হলাম। দিদা সটান কাউন্টারে গিয়ে বললেন, “এই দ্যাখেন আমার নাতির মুখখান, হ্যয় সারারাত কাঁদব, বাপে-মায়ে দূরদ্যাশে থাহে, কান্নাকাটি কইর‍্যা জ্বরজারি বাঁধাইলে কি করুম কন ? হয় টিকিটের পয়সা ফেরত দ্যান নয় এই ছেঁড়া টিকিটে লিখ্যা দ্যান যাতে কাইল ম্যাটিনিতে পোলাটারে সিনেমাটা পুরা দেখাইতে পারি !” আমি পরেরদিন দিদার সঙ্গে বুক ফুলিয়ে গিয়ে পুরো ফুলেশ্বরী দর্শন করি (সেদিন আর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেনি)। কিন্তু, শিক্ষালাভ হ’ল না জানেন, আমি আজও নারী-পুরুষ তফাত করেই দেখে এলাম, শুধুই “মানুষ” দেখা শিখতে পারলাম না।

সেকালে বাংলা সিনেমা (অর্থাৎ, বাংলা “বই”) আর ম্যাটিনি কথা দু’টি মোটামুটি সমার্থক ছিল। ইভিনিং শো তবুও ঠিক আছে, নাইট শো’তে বিশিষ্ট তালেবর ও নবদম্পতি বাদে বাঙ্গালীরা বিশেষ যেতেন-টেতেন না। ফলে ম্যাটিনি বাদে বাকি শো-গুলোতে টিকিট-কাউন্টারবাবুরা বেশ রিল্যাক্সড চিত্তে থাকতেন। টিকিট-প্রার্থীদের সঙ্গে রঙ্গালাপও করতেন মাঝে মধ্যে। নিন্দুকে দেখেছে, সেই নির্দোষ আলাপচারিতা বেশির ভাগই হলে আগত মহিলা দর্শকদের সঙ্গেই চলতো, তবে অল্পবয়েসীদেরও তাঁরা সে দাক্ষিণ্য যে একেবারে করতেন না, তা নয়; আমি নিজে তার সাক্ষী। যথা, ক্লাস এগারোতে উঠে নৈহাটির নৈহাটি সিনেমায় দেখতে গিয়েছি উত্তম-সুচিত্রার সুপারহিট “বই”- “সপ্তপদী”। এ আমার জন্মের আগে তৈরি হওয়া ছবি, তবে বাঙ্গালী এই রকম কিছু ছবিকে তার জীবনে চিরন্তন করে চিরস্থায়ী স্থান দিয়ে ফেলেছিল, তাই নতুন সিনেমা রিলিজ করুক চাই না করুক, সম্বৎসর বাংলার কোন না কোন হলে এ ধরণের “বই” চলতোই, আর বাঙ্গালী তার জানা পাঠ আবার ঝালিয়ে নিতো নিয়ম করে। তা যাক, আমাদের তিনবন্ধুর হয়ে আমি একাই লাইনে দাঁড়িয়েছি। এক সময় টিকিট-জানালায় পৌঁছলাম। কাউন্টারে বসা মাঝবয়েসী ভদ্রলোক নাকের ডগায় চশমার উপর দিয়ে তাঁর এক্সরে নজর আমার উপর ফেললেন। কাউন্টারের “কাকু”-র তীব্র কোপদৃষ্টির সামনে লজ্জায় নতমুখে তিনটে ফার্স্টক্লাসের টিকিট চাইতেই তিনি ভাববাচ্যে বললেন, “কোন ক্লাসে পড়া হয় ?” মিনমিনে গলায় জবাব দিলাম – “ক্লাস ইলেভেন”। উনি চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বলি মাধ্যমিকে কোন ক্লাস পেয়েছিলে ছোকরা ?” আমি মিইয়ে গিয়ে বললাম, “কাকু মাধ্যমিকে তো ক্লাস হয় না, হয় ডিভিশান; আর আমি ফার্স্ট ডিভিশান পেয়েছিলাম”। আরো ব্যঙ্গাত্মক স্বরে পরের প্রশ্ন, - “অ্যাঁ ফার্স্ট ডিভিশান!! তবে বলো দেখি ছোকরা, ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করবো কি’ এই কথার তাৎপর্য কি ?” প্রশ্নোত্তরে টিকিট কাটায় অহেতূক দেরি হচ্ছে দেখে আমার বাকি দুই বন্ধুও লাইনে উঁকিঝুকি মারছিলো আমি তা খেয়াল করিনি। তাদের মধ্যে ফক্কড়তমটি গলা বাড়িয়ে বলে উঠলো – “আমি বলবো কাকু ? চাঁদের গায়ে চাঁদ, অর্থাৎ মুন-মুন, তা হলে এই লাইনের অর্থ হলো গিয়ে, মুনমুন সেনকে নিয়ে ভেবে আমরা কি করবো !!” সালটা ১৯৮৪, সপ্তপদীর অমর জুটির নায়িকা সুচিত্রা সেনের কন্যা মুনমুন সেন তখন ছায়াছবির জগতে খ্যাতির চূড়োয় উঠছেন। মুহুর্তে যেন বাজ পড়লো, কাউন্টারকাকু জানালা দিয়েই পারলে লাফ মেরে বেরিয়ে আমার সেই ফাজিল বন্ধুর টুঁটি টিপে ধরেন আরকি! নেহাতই না পেরে তিনি পেল্লায় হুঙ্কার ছেড়ে কাকে (খুব সম্ভব হলের গুঁফো দারোয়ান) যেন হুকুম দিলেন, “ওরে ***, যা এক্ষুনি ছেলেগুলোকে ধরে নিয়ে আয়, ধর ধর, হতচ্ছাড়াদের আটকে রাখবো; তারপর বাড়িতে খবর দেবো, বাপ-মা এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে, বলে কিনা মুনমুন সেন কে নিয়ে... !!” প্রখ্যাত নায়িকার প্রতি নিতান্ত অর্বাচীন অপোগন্ডদের এ হেন বিদ্রূপে ক্রোধে উনি ভাষা হারিয়ে ফেললেন। তা কপাল ভালো, সেই বয়সে আমাদের সকলেরই শরীরস্বাস্থ্য বেশ নমনীয় থাকায়, অমুকচন্দ্র দারোয়ান টিকিট-কাটবার লাইন পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই আমরা তিনবন্ধুই তিন লম্ফে নৈহাটি স্টেশানে ঢুকে পড়ে গা ঢাকা দিয়ে ফেলায় সে যাত্রায় সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা পাই।

দুঃখ লাগে, যখন দেখি “উন্নয়ন” আমার তেরোবর্ষীয় পুত্রের জীবনে সেই জাতীয় শিহরণের কোন অবকাশ আর ফেলে রাখেনি। কি আর করা, গমকল উঠে গেছে, সাইকেলরিক্সায় লন্ঠন নেই, বাঙালির বাড়িতে গেলাসে জল খাওয়া উঠে গেছে, বাঙালি বোতল ধরে ফেলেছে...ছাইগাদার ঝুপসি আমগাছে প্রত্যেক সন্ধ্যেয় জোনাকির ঝাড়বাতি নিভে গেছে কবে...এরপর ট্যাব আর ই-বুকের ঘাড়ধাক্কা খেয়ে একদিন যদি জীবন থেকে বই (আমি ‘বই’ বলতে বই-ই বোঝাতে চাইছি, ‘ম্যাটিনি’ বা ছায়াছবি নয়) হারিয়ে যায়...ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখি আমার তেরো বছরের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে....তবু বড় পিছুটান...আমি DRAWBACK কথাটার বঙ্গানুবাদ করেছি ‘পিছুটান’...