স্বপনবাবু হারিয়েই গেলেন।
সাত সকালবেলায় ঠিকে কাজের মাসী বেল বাজাল, কেউ দরজা খুলল না। একা ব্যাচেলর
স্বপনবাবু ছাড়াও এ পাড়ায় মাসীর আরো তিন বাড়িতে বাসনমাজা আর ঘর ঝাঁট দেওয়া আছে। এ
বাড়ি থেকেই মাসী শুরু করে, কারণ স্বপনবাবু সকাল-সকাল উঠে পড়েন আর স্বপনবাবুর কাজই
সবচেয়ে হালকা, সামান্য দু’চারটে বাসন ধোয়া আর দুটো মাত্র ঘর ঝাঁট দেওয়া আর মোছা,
কাজের মধ্যে বাইরের ঘরে নীচু চৌকিতে শোয়ানো সেতার আর ডুগি-তবলা রোজ ধুলো ঝেড়ে সাফ
সুতরো রাখা। বাড়িটা সদর রাস্তার উপর নয় গলির বেশ ভেতরে আর স্বপনবাবুর ভাড়া নেওয়া
একতলার দু’ কামরার ফ্ল্যাটের জানলা তো দিনমানে বন্ধই থাকে বেশির ভাগ দিন, ধুলো আর
কতটুকু জমে। তবু বাবুর কড়া হুকুম, রোজ সেতার আর ডুগি-তবলা দু’টোর আগাপাশতলা মুছে
রাখতেই হবে, তাদের মোছার কাপড়ও আলাদা। মোটমাট খুব বেশি তো মিনিট পনেরোর কাজ
এবাড়িতে। এ পাড়ায় বাকি দুই বাড়িও ছোট, একটাতে বাপ-মা-ছেলে-বৌমা-বাচ্চা, আরেকটাতে
দাদা-বৌদি আর তাদের কলেজে-পড়া মেয়ে। তিননম্বর বাড়িতে অবশ্য চাপ আছে, মোট নয়জনের
জয়েন্ট ফ্যামিলি, ওদের কাজ বেলায় করে মাসী হোটরে নিজের বাসায় দুপুরের খাওয়া সারতে
এগারোটা কুড়ির ডায়মন্ড ধরে। বাড়ি ফিরে রান্না করা আছে তাই এগারোটা কুড়ি মানে
এগারোটা কুড়ি। আজ তাই বেলের আওয়াজে স্বপনবাবু দরজা খুললেন না দেখে মওকা বুঝে মাসী
অন্য দুই বাড়ির কাজ সারতে হাঁটা লাগায়, ন’টায় রান্নার মিনতি এসে পড়ে যদি ভাত চাপায়
তো হাঁড়ি নিজেই ধুয়ে নেবে, মাসীর সঙ্গে মিনতির সে র্যাপো আছে, জামাইষষ্ঠীতে
ধার-দেওয়া সাড়ে তিনশো টাকা মাসী এখনো মিনতির থেকে পায়। সাড়ে ন’টা নাগাদ এসে বাকি
কাজ সারলেই চলবে।
মুশকিল হল যে, সাড়ে ন’টায়
এসে মাসী স্বপনবাবুর বাড়ির সামনে ছোট্ট একটা জটলা দেখতে পেল। মিনতি তার সিডিউলড
টাইমে এসে দু-পাঁচবার বেল বাজিয়ে দরজা কেউ খুলল না দেখে দরজায় ধাক্কাধাক্কি করে, আর
তাতে দরজার মায়ায় বাড়িওয়ালা সাগরবাবু মিনতিকে ধমকে দেবেন বলে নীচে নেমে আসেন।
বাজার করে ফিরতি পথে রাইটার্সের অবসরপ্রাপ্ত উচ্চকোটির করণিক মিত্রবাবু (উনি
নিজেকে এখনো মিত্রসাহেব ভাবতে ভালোবাসেন) শোরগোল দেখে দাঁড়িয়ে পড়েন, দীর্ঘদিন
সরকারি পদে থাকায় সমস্যার ধোঁয়া দেখলেই ইন্টারভেইন করাটা তাঁর মজ্জাগত। তারপর
কাগজ-বিলি সেরে ফেরবার পথে কাগজওয়ালা, মিউনিসিপ্যালিটির ময়লাগাড়ির ফক্কড় ছোকরা,
মেট্রো ডেয়ারির দুধ-দেওয়া বিকাশ, আশপাশের বাড়ির কাজের লোক দু-চারজনা, মিলিয়েজুলিয়ে
জনসমাগম খারাপ হয়নি। প্রত্যেকেই নানা সম্ভাবনার কথা বলাবলি করছেন,
কি-করলে-কি-হবে-তাই-কি-করা-যায় আলোচনা করছেন, ময়লাগাড়ির ছোকরা কি কায়দায় বাইরের
ঘরের বন্ধ জানলার একপাটি প্রায় খুলে ফেলেছে, এমন
সময় মিত্তিরসাহেবই নজর করেন, সদর দরজায় বাইরে থেকেই তালা দেওয়া। বিকাশ
সাজেশান দেয়, স্বপনবাবুকে একটা ফোন ‘মেরে’ দেখতে। মিনতি ধরিয়ে দেয়, দাদার ঘরে কোন
‘রাখা’-ফোন নেই, দাদার ছিল মোবাইল, আর সে নম্বর
তার মোবাইলে আছে। দেখা গেল, সে মোবাইলও সুইচড অফ। সে যাই হোক, এই নাটকটা কুড়ি
মিনিটেরও বেশি সময় ধরে চলতে থাকার পক্ষে বড্ড একঘেঁয়ে, টিভিতে সবচেয়ে জমাট সিরিয়ালও
বিজ্ঞাপনের বিরতি বাদে খুব বেশি তো মিনিট পনেরো চলে। ফলে, এইবার কাজের লোকেরা
নিজের-নিজের কাজে হাঁটা লাগাল। মিনতি আর কাজের মাসী নিজেদের মধ্যে নিচুগলায়
আলোচনায় একমত হয়ে দু’জন দু’পথ ধরল, মিনতির পরের বাড়িটা আবার বাসে যেতে হয় তিন
স্টপেজ। সবশেষে ডিসপার্সড হলেন মিত্তিরসাহেব, উইথ এ ফ্রেন্ডলি অ্যাডভাইস টু বাড়িওয়ালা
সাগর সাহা যে, সাগরবাবু শ্যুড ট্রাই স্বপনবাবু লেটার ওভার টেলিফোন, জাস্ট টু
কনফার্ম হোয়েদার হি ইজ আউট অফ স্টেশান অর নট।
পরের
তিনদিনেও স্বপনবাবুর খোঁজ পাওয়া গেল না, মানে বাড়িওয়ালাকে উনি কোনো খবর দিলেন না।
গত দশবছর এখানে উনি আছেন, কোনদিন কোন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধবকে ওঁর বাড়ি আসতে
পড়শিরা কেউ দেখেননি। অডিটে, না পরিবেশ ভবনে, না সেন্ট্রাল এক্সাইজে যেন চাকরি
করতেন, রোজ পৌনে দশটায় বেরিয়ে সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টার মধ্যে বাড়ি ফিরতেন। এবং শুধু
কাজের দিনে ওই পৌনে দশটায় নয়, ছুটির দিন-টিনে মাঝেসাঝে যখনই ঘর থেকে বেরোতেন, যে
রকম ছিমছাম ক্লিন-শেভেন ফিটফাট হয়ে বেরোতেন আর ব্র্যান্ডেড জামাকাপড় ছাড়া পরতেন না
তাতে যেখানেই চাকরি করুন, সেটা যে বেশ ভালো পোস্টেই করতেন তা নিয়েও প্রতিবেশীদের
সন্দেহ ছিলনা। বছর দুই আগে ট্রাম থেকে নামতে গিয়ে রাস্তার কাদায় পা হড়কে পড়ে
গিয়েছিলেন স্বপনবাবু। বড়সড় দুর্ঘটনা ঘটতেই পারত, তা যে যাত্রা কেবল বাঁ হাতটা
ভাঙ্গার উপর দিয়েই ফাঁড়া কাটে। প্রায় মাসখানেক ঘরবন্দী হয়েছিলেন, তখন ওনার অফিস
থেকে দু’-একজন সহকর্মী কয়েকবার ওনাকে দেখতে এসেছিলেন। এমনিতে ভদ্রলোক অমায়িক ব্যক্তি
ছিলেন, তবে সদালাপী ছিলেন বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। পথে মুখোমুখি দেখা হয়ে গিয়ে
পাড়া-প্রতিবেশীরা প্রথম কথাটথা শুরু করলে খুবই ভদ্রতার সঙ্গে প্রত্যালাপ করতেন।
তবে নিজে থেকে কারো কখনো খোঁজ নিয়েছেন বলে কেউই মনে করতে পারলেন না। সন্ধ্যের দিকে
ওনার জানলা-বন্ধ বাইরের ঘর থেকে মৃদু সেতারের আওয়াজ অনেকেই পেয়েছেন, শুনেই বোঝা
যায় রেকর্ডেড বাজনা নয়, লাইভ বাজনা। প্রথম প্রথম কৌতূহলী প্রতিবেশীরা জিজ্ঞেস করলে
সুভদ্র হেসে স্বপনবাবু ভাসা ভাসা জবাব দিয়েছেন, ওই আরকি, সেতারের আধ-আধটু শখ আছে।
কালে কালে মোটামুটি সকলেই জানতে পেরেছিলেন যে স্বপনবাবু রীতিমত তালিম নেওয়া
বাজিয়ে, সেতারের হাত তাঁর যথেষ্ট সরেস। এ কথাটা চাউর হ’বার পর একবার পাড়ার
ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশান থেকে তাঁকে বাৎসরিক রবীন্দ্র-নজরুল জয়ন্তীতে বাজাবার
অনুরোধ করা হয়, কিন্তু ভদ্রলোক এত বিনয়ের সঙ্গে ও এত পালিশ-করা ভদ্রতার মোড়কে
দৃঢ়ভাবে সে প্রস্তাব নাকচ করে দেন যে ফিরে তাঁকে আর কোন অনুষ্ঠানে বাজাতে বলবার
কথা কারোর মাথায় দ্বিতীয়বার আসেনি। মোটমাট সম্পন্ন গেরস্থ বাড়ির সাজানো
ড্রয়িংরুমের কাঁচের ফুলদানিতে অনাঘ্রাত খুঁতহীন প্লাস্টিকের ফুলের মত ‘থাকলে বেশ
ভাল কিন্তু না থাকলেও বিরাট কোন ইতরবিশেষ হবে না’ এই রকম একটা স্ট্যাটাস নিয়ে
স্বপনবাবু এ পাড়ায় বাস করতেন গত দশ বছর।
শশব্যস্ত
এই সময়ে যেখানে গভীরতম শোকের আয়ু মেরেকেটে সাতদিন, সেখানে এ হেন একলসিঁড়ে
স্বপনবাবু তিনদিন ধরে কেন বাড়ি ফিরে আসছেন না, তা নিয়ে বিরাট জলঘোলা হওয়ার সম্ভাবনা
কম। তাঁর ঘর তালাবন্ধ আজ তিনদিন, মাসের চার তারিখ থেকে তিনি বেখবর। বাড়িভাড়া,
মিনতি ও কাজের মাসীর মাইনে, খবরের কাগজের বিল তিনি মিটিয়ে দিয়ে গেছেন, ফলে এই
ধরনের কেউ হঠাৎ করে নিরুদ্দিষ্ট হ’লে যারা সর্বাগ্রে তোলপাড় তোলে তারাও এই
ব্যাপারে ততটা উৎসাহ বোধ করল না। কেবল পাড়ার মেয়েবউরা যাঁদের কেউ-কেউ গৃহের বাইরেও
কর্মরতা, কিন্তু সকলেই নিয়মিত স্বাস্থ্যপত্রিকা ও টিভিতে নানা ডাক্তারি ও রূপটান
সম্পর্কিত প্রোগ্রাম দেখে ও সর্বোপরি বাবা রামদেবের সহজ যোগপ্রক্রিয়া দেখে-দেখে ঘোর
অনুপ্রাণিত, যাঁরা সকাল সাড়ে ছ’টা বাজবার আগেই লেক অবধি হেঁটে আসেন ও আসাযাওয়ার
পথে এটিপি বা রয়টারের দক্ষতায় সমস্ত আঞ্চলিক খবরাখবর আদানপ্রদান করেন, তাঁরা স্বপনবাবুর
অন্তর্ধান নিয়ে বেশ কয়েকটি সম্ভাবনার কথা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করলেন গত
দু’-তিনদিনে।
প্রথম
অবধারিত যে সম্ভাবনাটি নিয়ে অল্প সময় আলোচনা হল, মানে রোজ সকালের মোট হাঁটাপথের
এক-পঞ্চমাংশ যে আলোচনায় ওঁরা হেঁটে দিলেন, সেটা হল পথ-দুর্ঘটনা। মাধবীবৌদি
দূরদৃষ্টিসম্পন্না, মানে তাঁর বাড়ির দোতলার জানলা দিয়ে তিনি গোটা পাড়ায় তীক্ষ্ণ
নজর রাখতে পারেন ও রেখে থাকেন, তিনি বললেন, ভদ্রলোককে অনেকদিন ধরে দেখে বেশ আনমনা
উদাস টাইপের মনে হয়েছিল তাঁর বহুকাল আগেই, স্বাভাবিকভাবেই কাউকে সেকথা বলেননি। রাস্তাঘাটের
যা অবস্থা, তাতে অমন বেখেয়ালি লোকের কিছু একটা ‘হয়ে যাওয়া’ আশ্চর্য নয়। কিন্তু
তাহলে তো একটা খবর অন্তত চলে আসত এতদিনে নাকি, অন্তত পুলিশ-টুলিশ ? বান্ধবীদের
দু-একজনের এইসব প্রশ্নের জবাব মাধবীকে দিতে হল না, তনিমাদেবীই তাঁর হয়ে উত্তর দিয়ে
দিলেন – কে খবর নেবে ? সাগর সাহা ? কেন নেবে গো ? ওর তো ভাড়া পাওয়া নিয়ে কথা, আর এ
মাসের তো ভাড়া পেয়েই গেছে শুনলাম। আর পুলিশ ? ওদের খেয়েদেয়ে আর কাজ নেই নাকি যে,
কে কোথায় তিনদিন বাড়ি ফেরেনি তার খোঁজ নেবে! পুলিশের সমালোচনা এই বিশেষ গোষ্ঠির
আলাপে বেশিদূর এগোয় না কারণ ভোরের হন্টনপটিয়সীদের দলে অন্যতম মেম্বার শ্যামলীদেবীর
‘উনি’ পুলিশে ছিলেন, গত এপ্রিলে রিটায়ার করেছেন। তার উপর স্বপনবাবু লোকটার কাছে
কোন আত্মীয়স্বজন বা বন্ধুবান্ধব বলে কেউ কোনকালে যে আসেনি, তা মাধবী হান্ড্রেড
পারসেন্ট কনফার্ম করলেন, এখন একমাত্র যদি ওর অফিস থেকে কেউ খোঁজটোজ নেয়। সেটা জানা
যাবে, তবে আরো ক’টা দিন সময় লাগবে। বাজারের আগের আইল্যান্ডটা, এই ক’দিন আগে যেটার নামকরণ
করা হয়েছে সুচিত্রা সেন উদ্যান, যার কাছাকাছি এসে দলের পরিপূর্ণ ওয়ার্ম-আপ হয়ে যায়
এবং দল হাঁটার স্পিড বাড়ায়, সেইটা পেরোবার সময় দ্বিতীয় সম্ভাবনার কথাটা হৈহৈ করে
তুলে দিলেন লেডিজ ক্লাবের সেক্রেটারী এণাক্ষী সেন – ওর অফিসে গিয়ে খোঁজ নিন, কোনো
লেডি-কলিগ একই সঙ্গে অ্যাবসেন্ট; উইথ অল প্রোব্যাবিলিটি, শি মে বি আ লোনার অর আ
ডিভোর্সি। স্বপনবাবু তো, টু মাই মাইন্ড, মে বি জাস্ট অন দ্য আদার সাইড অফ
ফিফটি...ওঁরা নতুন করে জীবন শুরু করতে চাইছেন, দে ওয়ান্ট টু স্টার্ট অ্যাফ্রেশ,
হোয়াটস রং ইন ইট ? এণাক্ষী একটি নামজাদা কর্পোরেট হাসপাতালের ফ্রন্ট অফিসে আছেন,
ফস করে ওনার বক্তব্যকে ‘রং’ বলে দেওয়ার অসুবিধে দু’টো। এক, তাহলে স্বপনবাবুর অফিসে
গিয়ে খোঁজ নিতে হয়, যদিও স্বপনবাবু ঠিক কোন অফিসে বা কোন কোম্পানীতে চাকরি করতেন
তা নিয়ে ধোঁয়াশা আছে। আর দুই, এণাক্ষী সাড়ে সাতাশি পয়সা কথাই ইংরেজিতে বলেন এবং দুইকুড়ি-দুই
বয়সে পৌঁছেও কথায় কথায় ‘লাইফ’কে ‘এঞ্জয়’ করতে বলে থাকেন। তাই পঞ্চান্ন-পেরোনো
মাধবী-শ্যামলী-তনিমারা কথা না বাড়িয়ে হাঁটার গতি বাড়ালেন। - আচ্ছা, লোকটা
সন্ন্যাসী-টন্ন্যাসী হয়ে কোনো আশ্রমটাশ্রমে চলে যায়নি তো ? খানিক বাদে প্রশ্ন
তোলেন গৃহবধূ জয়তী রাহা, যিনি পুরো হাঁটাপথে অন্তত চারবার হাতজোড় করে কপালে ঠেকিয়ে
থাকেন; প্রথমবার বাড়ি থেকে বেরিয়েই ডানদিকে ফিরে, কারণ ওইদিকটা উত্তরপশ্চিম,
ওইদিকেই দক্ষিণেশ্বর, তারপর রিক্সাস্ট্যান্ডে শনিমন্দিরের সামনে, মেইনরোড পেরোনোর
সময় পূবদিকে তাকিয়ে সূর্যপ্রণতি আর শেষে বাড়ি ঢোকবার ঠিক আগে টুক করে আরেকবার, ওটা
কার জন্য তা কেবল উনিই জানেন। কিন্তু ততক্ষণে দল একপাটের হাঁটার শেষে লেকপার্কে
লাফিং ক্লাবে পৌঁছে গেছে। হাস্যসঙ্ঘের হা-হা রবে জয়তীর প্রশ্ন চাপা পড়ে যায়। দল
এইখানে এসে দশ মিনিট ব্রেক নেয়, কেউ টুকটাক ফ্রি-হ্যান্ড করেন এণাক্ষীর
নির্দেশনায়, কেউ স্রেফ দু’ হাত তুলে হেসে নেন, কেবল শ্যামলী আর জয়তী বেঞ্চে বসে
আঁচলে মুখ মোছেন। ফিরতি পথে কথাটা আবার ওঠে, এবার তোলেন বন্দনা ওনার এক
পিসশ্বশুরের রেফারেন্স দিয়ে – একদিন পায়ে হেঁটে পেনসান তুলতে গেছেন গড়িয়া
পোস্টঅফিসে, তারপর আর বাড়ি ফিরতে পারছেন না, বাসে উঠে চলে গেছেন ডালহৌসি জিপিও-র
কাছে। দুপুর পেরিয়ে যেতে খোঁজ-খোঁজ, কি কপাল বড় জা-র বড়ছেলের এক বন্ধু ওখানে ওঁকে
দেখতে পেয়ে বলে, দাদু এখানে কি করছেন ? উনি তাকেও চিনতে পারেননি, বলেন কি, উনি
বাড়ি ফিরতে চান কিন্তু বাড়ির ঠিকানাটা কিছুতেই মনে করতে পারছেন না, ভাবো কি
সাঙ্ঘাতিক! পরে তো ডাক্তার দেখানোয় ধরা পড়ল ওটা নাকি একটা রোগ, তাও ফার্স্ট স্টেজ।
উনি তো পরে ওইরোগেই... স্বপনবাবুরও যদি ওইরকম রোগ হয়ে থাকে ? বলা যায় না বাবা,
আজকাল কোনো রোগের কি কোনো বয়স আছে নাকি, তোমার পাশের বাড়ি অধীরবাবুর ছোটছেলেটা বল
তনিমাদি, মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে হার্ট অ্যাটাক হয়ে...। সকলে নীরবে বাড়িমুখো হাঁটতে
থাকেন, সেটা নিরুদ্দিষ্ট স্বপনবাবুর চিন্তায়, না বন্দনাদেবীর সেই অনিকেত পিসশ্বশুরের
কথা ভেবে, না অধীরবাবুর অকালপ্রয়াত ছেলেটির শোকে বলা মুশকিল। বোধহয় তিনটেই।
শেষকালে পাড়ার মুখে এসে “অভিষিক্তা” বুটিকের মালকাইন রঞ্জনা ঘোষ স্বপনবাবুর
অন্তর্ধানের পঞ্চম ও সবচেয়ে জটিল সম্ভাবনার কথাটা পাড়লেন – আমার বাবা লোকটাকে
দেখলেই কেমন একটা লাগত (কেমন লাগত সেটা ভেঙ্গে বললেন না, কেবল ডিডাকসানটা
জানালেন), একাএকা থাকে, কারো সাথে মেশেটেশে না...এর মধ্যে অনেক বড় ব্যাপার আছে
দেখো – বলে, কেমন একটা ফিসফিসে ছায়া-ছায়া ভয়াল আন্তর্জাতিকমাত্রার ষড়যন্ত্রের
ইঙ্গিতপূর্ণ চক্ষু ও ভ্রূ-ভঙ্গী করলেন। সকলেরই গা কেমন ছমছম করে উঠল দিনের
বেলাতেও, যে যার বাড়ির গেট খুলে একে একে ভেতরে সেঁধিয়ে গেলেন।
ওঁরা
কেউই ঠিক ধরতে পারেননি। পারবার কথাও নয়, সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে কি সমুদ্রের
অতলান্ত গভীরতা মাপা যায় ? একলা সাগরে ছোট্ট ভেলায় ভেসে পড়া নাবিকের কাছে সমুদ্রের
গভীরতা কি স্রেফ ফুট-মিটারের হিসেবে পরিমেয় ? হিলস্টেশানের সাজানো শৌখিনতায়
দুই-তিনদিন যাপনে দূরদৃষ্ট রজতাচলের শিখরচূড়ায় পা রেখে নীচে তাকাবার অনুভূতি কোনভাবে
কি বোঝা সম্ভব ? নীহারবিন্দুবাহী তীক্ষ্ণ সে ব্লিজার্ড শৃঙ্গজয়ী একাকী অভিযাত্রীর
কানে কানে কি কথা বলে যায়, তা কি বোঝা সম্ভব শৌখিন পর্যটকের পক্ষে ? আসলে স্বপনবাবু ভারতীয়
মার্গসঙ্গীতে হারিয়ে যেতে চেয়েছিলেন, ওটাই ছিল তাঁর মাস্তুল, তাঁর নোঙ্গর-ফেলা
বন্দর। রোজকার চারপাশে ক্যান্সারের চেয়েও দ্রুত বেড়ে-চলা কপটতা-কৃত্রিমতা-তঞ্চকতার
সমুদ্রে বিশুদ্ধ সুর আর ধ্বনির ভেলায় ভেসে বেহাগে, মালকোষে, ভৈরবীতে, ইমনের নির্মল
পবিত্রতায় খুঁজতে চাইতেন নিজেকে, দিনের সব পঙ্কিলতা ধুয়ে ফেলে জীবনরস শুষে নিতে চাইতেন অনাবিল সুরের স্বতোৎসারিত ঝরণায়। সেতার
শিখেছিলেন ছোট বয়েস থেকে, পরে মাইহার ঘরানার ওস্তাদ এজাজ খাঁ সাহেবের কাছে নাড়া
বেঁধে, তাঁর পার্কসার্কাসের বাড়িতে দিনের পর দিন পড়ে থেকে। দশ বছর ধরে নিখুঁত
হওয়ার নিমগ্ন সাধনার পর প্রথম প্রকাশ্য অনুষ্ঠানে আশাবরী রাগ বাজাতে গিয়ে স্বপনবাবু
সামান্য তাল কাটেন, শ্রোতারা অবশ্য বিশেষ ধরতে পারেনি। কিন্তু স্বপনবাবু ভেঙ্গে
পড়েন। উপর-উপর সে ভেঙ্গে-পড়া কেউই টের পায়নি, স্বপনবাবু টের পেতে দেননি। তবে তারপর
থেকে আর কখনোই প্রকাশ্য অপ্রকাশ্য কোন অনুষ্ঠানেই বাজাননি বহু অনুরোধ-উপরোধ সত্ত্বেও।
যে নিখাদ বিশুদ্ধতার আরাধনা তিনি করে এসেছেন জীবনব্যাপী, তার উৎকর্ষতার মাত্রা কি
কত লোকের অভিনন্দনে অভিষিক্ত হল তা দিয়ে মাপা সম্ভব নাকি ? সে তো আপন হৃদয়ের
গভীরতম কোণে পবিত্রতম সততার নিক্তিতে ওজন করে দেখবার জিনিস। কালে কালে তথ্যসংস্কৃতি
বিভাগে চাকরি নিলেন স্বপনবাবু। তিনি যে দুধের সর, তাই পরিবার থেকেও ছিলনা তাঁর,
বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর শেষ বন্ধনটুকুও ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল বহুদিন আগেই। শহরতলির
পারিবারিক বাড়ি বেচে দিয়ে ছোট্ট একটি ফ্ল্যাট ভাড়া নিলেন। পারিপার্শ্বিক সমাজে বাস
করতেন শৈবালের মত, সেই শৈবাল যে জলার আবদ্ধ জলের আবিলতায় ভেসে থেকেও গায়ে মাখে না
নোংরা জল, বরং হীরের কুচির মত ফুল ফোটায় গায়ে। অফিস থেকে ফিরে স্নান সেরে দরজা-জানলা
বন্ধ করে সন্ধ্যে বেলায় রেওয়াজ করতেন, যাতে বাইরের গাড়িঘোড়ার ব্যস্ততার আওয়াজে সে
শব্দ কেউ তেমন শুনতে না পায়। বিশুদ্ধতম সুরের তপস্যা করতেন, রাগরাগিনীর গোপন
কন্দরে কন্দরে দূরূহতম পথে খুঁজে বেড়াতেন সেই চির-আকাঙ্খিত অনাবিলতা। তিনদিন আগের
সন্ধ্যেরাতেও তিনি প্রতিদিনের মতই স্নান সেরে গায়ে সামান্য ইয়ার্ডলি ল্যাভেন্ডার
মেখে, ফ্লাস্কের চা খেয়ে, জুত করে বসেছিলেন সেতার নিয়ে। মৃদুস্বরে বাজাচ্ছিলেন
তাঁর প্রিয় ছায়ানট। ধীরে ধীরে বাহ্যজ্ঞান লুপ্ত হতে থাকে তাঁর, সুরের সমুদ্রে
নিজেকে হারিয়ে ফেলে অনাবিল এক অন্তরাত্মার ছায়ার নীচে তিনি প্রায় পৌঁছে যাচ্ছেন,
ছুঁয়ে ফেলছেন নিজের চিরকাঙ্খিত সেই বিশুদ্ধ সুরধ্বনিবিন্দু। এমন সময়ে অভ্যস্ত কান
তাঁকে বলে দেয়, সামান্য তাল কাটল বুঝি। শ্বাস ফেলে সেতার নামিয়ে রাখেন স্বপনবাবু।
****
হিমাচল প্রদেশের সাংলার কাছে
বটসেরি গ্রামটি ছিটকুল যাওয়ার রাস্তার থেকে প্রায় দু’ হাজার ফুট নীচে বসপা নদীর
ধার বরাবর বিছিয়ে আছে। ভারি উৎকৃষ্ট আপেল ফলে সেখানে। সেই গ্রামের সরল সোজা একটি
মেষপালক বালক ভোরে ভেড়া চরাতে বেরিয়ে খাদের কাছে স্বপনবাবুকে খুঁজে পেল। ও অবশ্য
স্বপনবাবুকে চেনে না, তবে মরে-যাওয়া মানুষ চেনবার দায় এখনো ওর জীবনে নেই। ও অনেক
উপরের গাড়িরাস্তার দিকে তাকিয়ে মানুষটা কোথা থেকে পড়ল সেটা আন্দাজ করবার চেষ্টা
করল একবার, তারপর পাহাড়ের ঢালে ভেড়াদের চরতে ছেড়ে রেখে গ্রামের দিকে ফিরল খবরটা
দিতে। জটিলতা দেখবার চোখ ওর এখনও তৈরী
হয়নি, তাই ও দেখতে পেলনা স্বপনবাবুর মুখে একটা মৃদু অথচ অনাবিল হাসির রেশ। এ
স্বর্গ-ছোঁয়া অবারিত বরফপাহাড়, রূপো গলে নেমে আসা নিষ্কলুষ হিমবাহ, মেঘশূণ্য উদার সুনীল
আকাশ আর অকুন্ঠিত নির্মল বাতাসের অনাবিল বিশুদ্ধতায় স্বপনবাবু শেষমেষ নিজেকে খুঁজে
পেয়েছেন।


