Thursday, 8 November 2012

পর্ব ১ : পূর্বরাগ


এ প্রেমকাহিনী প্রায় আঠেরো কি বিশ বছর পুরোন। পরিষ্কার মনে আছে, এম.এ পাশ করে বিরানব্বই-এর মার্চ মাসে তিন বন্ধু মিলে উত্তর সিকিমের মঙ্গন গিয়েছিলাম দিন সাতেকের জন্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রিয় সিনিয়র যদুদা (যদুমানিক লোধ, ফিজিক্যাল এডুকেশান ডিপার্টমেন্ট, বাড়ি ত্রিপুরার বিলোনিয়ায়) স্পোর্টস অথোরিটি  অফ ইন্ডিয়ার ফুটবল কোচের চাকরি নিয়ে মঙ্গনের প্যান্টক (নর্থ সিকিম হাইওয়ের উপর মঙ্গন স্টপ থেকে উলটো দিকের পাহাড়ে প্রায় আড়াই কিমি খাড়াই উঠলে উত্তর সিকিমের একমাত্র হাইস্কুল আর সাই-এর অফিস। এই জায়গাটার নামই প্যান্টক যা সিকিমের ট্যুরিজম ম্যাপে পাওয়া যাবে না) নামে একটা জায়গায় স-বাংলো একাকী অধিষ্ঠান করছে খবর ছিলো। ইনল্যান্ড লেটার চালাচালিতে সাব্যস্ত হলো, আমরা তিনজনা গ্যাংটক-ছাঙ্গু মেরে ওর একাকীত্ব ঘোচাতে ওরই শরণ নেবো দিন চারেকের জন্য। আমাদের কেবল মঙ্গন পৌঁছানো, বাকি যদুদা-র দায়িত্ব। সে সফরের বেতান্ত কখনো আলাদা করে লিখতে পারলে খুশী হবো, দেখি...। তা গ্যাংটক শহরে দু’দিন টই-টই করে বেড়াতে-বেড়াতে আচমকাই চোখে পড়ে গিয়েছিলো, ট্র্যাভেল-ট্রেক সংস্থার সাইনবোর্ড। বোর্ড জুড়ে সপার্ষদ রাজনন্দিনী কাঞ্চনজঙ্ঘা, নিচে লেখা “জোংরি-গোয়েচা লা ট্রেক”। সেই কাঞ্চনজঙ্ঘা যাকে আমি সেই এগারো বছর বয়েস থেকে প্রায় প্রতি রাতে স্বপ্নে আদর করি!! কাউন্টারের বাইরে ইতিউতি র‍্যাকস্যাক-ম্যাট্রেস-স্টিক পিঠে বিদেশী কয়েকজন। কেবল চামড়ার রঙের জন্য নয়, ওদের কেমন যেন ভিন গ্রহের আগন্তুক বলে মনে হচ্ছিলো। এতো স্পর্ধা ওদের, ওরা স্রেফ পায়ে হেঁটে চলে যাবে আমার কাঞ্চনজঙ্ঘার কাছে !! আর আমায় কেন বেমালুম উলটো পথে সমতলে বাড়ি ফিরে যেতে হবে, চাকরির চেষ্টা করতে হবে ?  কেন ? কেন ? ওদের চেয়ে আমি কম কিসে ? ভয়ানক ঈর্ষায় আশিরনখ জ্বলে গেলো, সস্তার সিকিমি রাম কিনে হোটেলে ফিরে বন্ধুদের বললাম, আমিও যাবো, এবং যাবোই। এই সন্ধ্যের আট-ন’ বছর আগে থেকেই আমি মদ-টদ খাই, ফলে বন্ধুরা আমার উদ্গারকে প্রলাপ বলে ধরে নিতে সাহস করলো না; তবে ত্রস্তে বললো, না না ঠিক আছে, এবারটা ছেড়ে দে, এবার বরং যদুদার ওখানেই যাই...খবর দেওয়া আছে, না গেলে দুঃখ পাবে। আকন্ঠ গিলে জানালায় দ্বাদশীর জ্যোৎস্নায় নিলাজ স্নান করতে থাকা আমার মানিনী প্রেমিকাকে আঙ্গুল তুলে বললাম, অন্য কারো সংগে নয়...কেবল আমার সংগে...আসবো, আমি আসবোই। 
বাড়ি ফিরে আরো কয়েক জন বন্ধুবান্ধবকে আড্ডায় কথায় কথায় বললাম জোংরি-গোয়েচা লা-র কথা। আমার মুখে তারা প্রথম এই নামগান শুনলো এবং বছর দু’য়েকের মধ্যে তাদের তিন-চারজন সাহস করে চলেও গেলো জোংরি, ফিরে এসে গল্প শোনালো। কেবল আমি কবিতা-নাটক-বেকারত্ব-প্রেম-পরিবার ইত্যকার সামতলিক ও চিরন্তন পরিবেষ্টনীতে আটকা পড়ে রইলাম তো রইলামই। এ বন্ধনে পরিতাপের কিছু দেখি না। বরং জীবন যখন যে রকম, তাকে তখন সেইভাবে যাপন করবার মেদুরতা রয়েছে, অভিজ্ঞতার সঞ্চয় রয়েছে। “জীবনের ধন কিছুই যায় না ফেলা”। এরি মধ্যে প্রতি বছর নিয়ম করে দূর থেকে এক-দু’বার দেখে যাই আমার প্রিয়তমাকে। অনেকটা সেই টিন-এজ প্রেমের মতো, প্রেমিকা যে রাস্তা দিয়ে টিউশন পড়ে একঘন্টা আগে বাবার সাথে বাড়ি ফিরে গেছে, সেই রাস্তা দিয়ে সাইকেলে যেতে যেতে গায়ে কেমন যেন পুলক লাগে; ওদের বাড়ির জানালা বন্ধ থাকলেও মনে হয় যেন সেই দু’টি চোখের আমন্ত্রণ জাফরি গলে বাহারি আলোর রেখার মতো হাল্কা ছুঁয়ে গিয়ে আমায় অভিষিক্ত করলো। ঘুরে ফিরে সেই নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশানে নামি বার-বার, বার-বার দূর-দূর থেকে দৃষ্টিপ্রদীপ জ্বালাই। কাছে যেতে দেরি হয়ে যাচ্ছে, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে ও এক-একেক বার রাগ করে মেঘের ওড়নায় মুখ ঢেকে রেখে আমার বিরহ দীর্ঘতর করে। যাবতীয় অস্ত্রশস্ত্র আমার উপর প্রয়োগ করে আমার অস্তিত্ব টালমাটাল করে তোলে। আমিও হারবার পাত্র নই; ব্যালান্স, সম্পূর্ণ ব্যালান্সের খেলা চালিয়ে যাই আর বছরের পর বছর চলে যায়, আমার শরীরে তার অনপনেয় পদচিহ্ন রেখে।
২৪ শে অক্টোবর ২০১২ সন্ধ্যের মুখে থানসিং (১২,৮৯৪ ফিট)-এ বরফ পড়া শুরু হতে আমার সংগী আমার ভাই হঠাৎই আমার পিঠ চাপড়ে দিয়ে বললো, এটা তোমার প্রাপ্য। এতো দিন ধরে এতো চড়াই-উৎরাই, এতো ভাঙ্গাগড়া, এতো কিছুর মধ্যেও একে সযত্নে লালন করা, এবং শেষমেশ সব টপকে এর কাছে চলে আসা, সহজ কাজ নয়। প্রেমে মদির আমি ফ্যাকাশে হেসে কেবল বলেছিলাম – বলছিস ?  ইচ্ছের থেকে অনেক অনেক কাছে দুই পাহাড়ের ফাঁকে বিকেলের শেষ কনে-দেখা আলোয় ও তখন স্নিগ্ধ তাকিয়ে আছে, কি লাজুক লাগছিলো ওকে, কি বলবো। ও জেনে ফেলেছে, আগামী কাল আরো কাছে চলে আসবো আমি...মনে হল যেন পেরিয়ে এলেম অন্তবিহীন পথ...