Saturday, 22 August 2015

লালু, ব্রজ ও আরো কয়েকজন

The Cycles of Heaven in twenty centuries
Leading us farther from God and
Nearer to Dust. (T. S Eliot)


।। ব্রজ ও বিজন ।।

বিজন এইরকম জায়গাতেই পড়েছিল। হয় এইখানটাতেই, না হয় দু-চার ফুট এদিকসেদিক। এটা বিলের পূবপাড়কমবেশি পনেরো-বিশ হাজার একরের ভাকুড়িয়া বিল পশ্চিমে ভাগীরথীর সঙ্গে জোড়া ছিল এককালে, বহুদিন হলো তার নাড়ি ছিঁড়ে গেছে। উত্তর-পশ্চিমদিকটায় তবু জল বেশ গভীর; পিয়ারগঞ্জ, গড় ভক্তপুর আর চরডাঙার বাসিন্দারা নৌকায় পারাপার করে। চরডাঙা তো চরই, কুমড়ো আর ফুটি ফলে ভাল। ঘোড়ার নালের মত বেঁকে বিল এসেছে পূবে, আর এ দিকটায় এসে প্রায় মজে গেছে।  বিল এদিকটায় নামেই, আসলে জলাজঙ্গুলে বাদা। কাটা-গোবিন্দপুরের কাটাকেষ্টর মন্দিরের পর দু’ দশ ঘর পাখমারা থাকে, তারপর বিলকুল ফাঁকা, জনমনিষ্যির বাস নেই। চুমরির খাল ফি বর্ষায় উপচানো ভাগীরথীর জল বাঁওড়ে এনে ফেলে উত্তর-দক্ষিণে এলিয়ে থাকা ৩৪ নং জাতীয় সড়ক ডুবিয়ে দিয়ে কেলেঙ্কারী বাঁধাতো বছর পাঁচেক আগেও। তারপর একশো দিনের কাজে তৈরী হল দীঘলকাটীর মাটির বাঁধ, গ্রাম-সড়ক যোজনায় ব্রজবাবুর জেলা পরিষদ টাকা দিল জাতীয় সড়ক থেকে ওই বাঁধ অবধি তিন কিলোমিটার পাকা রাস্তা বানাবার। শীতে নানান ভিনদেশী পাখী আসে বিলের পূবদিকটাতে; বহরমপুর তো বটেই, পাকা রাস্তাটা হয়ে যাওয়ার পর কোলকাতা থেকেও গত কয় বছর গাড়ি করে লোকজন আসা অনেক বেড়েছে শীতকালে পাখপাখালীর ছবি তুলতে, পিকনিক করতে। পাখমারাদের পাখী-ধরার ব্যবসা উঠে গেছে কবেই, পাখমারারা  এখন বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ, জিয়াগঞ্জ, সাগরদিঘি, ডোমকলে ইমারতির রমরমা কারবারে যোগালের কাজ করতে যায়  বছরে দশ মাস আর শীতকালে অগভীর জলে লগি ঠেলে ঠেলে ডিঙি ভরে শহরের বাবুদের পাখী চেনাতে-চেনাতে বিল ঘোরায়, ঘন্টায় ছ’শো টাকা।  ব্রজবাবুর জেলাপরিষদ  এই বাবুদের বিলের পাড়ে দীঘলকাটী বাঁধের উপরে রাতে থাকবার জন্য চার-কামরার অতিথিনিবাস বানানোর কাজে হাত দিয়েছিল গত বৈশাখে, বন্যানিয়ন্ত্রণ দপ্তরের ইঞ্জিনিয়াররাও অনেকদিন বিলের কাছাকাছি একটা ভদ্রগোছের থাকবার জায়গার জন্য ঘ্যানঘ্যান করছিল। শিলান্যাস করতে জেলা সভাপতির সঙ্গে কলকাতা থেকে পর্যটনমন্ত্রীকেও নিয়ে এসেছিল গোবিন্দ।  ‘পাখীর বাসা’ নামটাও ভারি শখ করে রেখেছিলেন ব্রজবাবু। সেই অতিথিনিবাস লিনটেল অবধি উঠে যাওয়ার পরেই তো ঘটনাটা ঘটলো, বিজন পড়ে রইল ওই অতিথিনিবাসের পূব কোণে ইঁটের পাঁজার পাশে। ভোর-ভোর মাঠে যেতে গিয়ে যারা প্রথম দেখেছিল তারা পরে ব্রজকে বলেছিল, গাছের ফাঁক দিয়ে প্রথম আষাঢ়ের মেঘভাঙ্গা ভোরাই সুর্যের আলো তেরচা হয়ে পড়েছিল বিজনের মুখে, আর বুকের কাছে জমাট রক্তে ভনভন করছিল মাছি।

।। লালু ও ব্রজ ও গোবিন্দ ।।

লালু ব্রজর পিছন পিছন ঠিক এই জায়গাটায় এসে রোজই কয়েকবার ঘুরপাক খায় কোন একটা অদৃশ্য কেন্দ্রের পরিধি ধরে। প্রথম প্রথম ব্রজ অতটা খেয়াল করেননি।  লালু বিজনকে পছন্দ করতো  সেটা ব্রজর বেশ মনে আছে, বিজনের বাড়ি নিয়মিতই যাতায়ত ছিল লালুর। বিজনের বউ ইন্দ্রানী আর মেয়ে সুজাতাও লালুকে ভালোই খাতির করতো সেটা ব্রজ নিজের চোখেই দেখেছেন। গত পাঁচই জুন পরিবেশ দিবসে বিজনের ইস্কুলের অনুষ্ঠানে চিফ গেস্ট হয়ে গিয়েও ব্রজ দেখেছিলেন, স্টাফরুমের সিঁড়িতেই লালু অনুগত দেহভাষা নিয়ে দন্ডায়মান। এমনকি  ব্রজর দেওয়া নাম ধরে বিজন ডাক দিলেও লালু একই রকম বশংবদ চোখে ফিরে তাকাতো সেটাও ব্রজর পরিষ্কার মনে পড়ে। তা প্রতিদিন ভোরে ব্রজর সঙ্গে ব্রজর পিছন পিছন মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে অতিথিনিবাসের পূব কোণে ইঁটের পাঁজার কাছে ঠিক এই জায়গাটায় লালু রোজই থমকে দাঁড়ায় একটিবার, মুখ নামিয়ে মাটিতে কি যেন শোঁকে, ঘন ঘন ল্যাজ নাড়ে আর মুখে অস্ফুট কুঁইকুঁই শব্দ করে। জায়গাটাকে বেড় দিয়ে ঘুরপাক খায় দু’-চার বার।
যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহণের সঙ্গী তো ছিলেন একমাত্র সারমেয়বেশী যমরাজ, তা ব্রজ এই ব্যাপারে যুধিষ্ঠিরকে দশ গোল মেরেছেন। তল্লাটের প্রায় সমস্ত কুলশীল ও অজ্ঞাতকুলশীল কুকুরই বংশানুক্রমে ব্রজর অনুগামী। পশুপাখী ব্রজ অল্পবয়েস থেকেই ভালোবাসেন, আর এতটাই তাঁর সারমেয়প্রেম যে বিয়ের পর-পর অনিমা তো একদিন ভালোবেসে বলেই ফেলেছিলেন, ‘তোমার গায়ে কেমন যেন কুকুর-কুকুর গন্ধ’। সেই সময় ব্রজর ঠাকুরদার তৈরী সাতাশটা ঘরের দোতলা চকমিলান বাড়িতে  নিজের পোষা দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ছ’-ছটা কুকুর, তার মধ্যে সেরাটি একখানা দশাসই ল্যাব্রেডর হাউন্ড যার পূর্বপুরুষ সাক্ষাৎ  নেকড়েআজ পঞ্চাশ বছর পরে সেই রমরমা আর নেই, কলসীর জমানো জল কেবল গড়িয়ে নিয়ে খেতে থাকলে ফুরিয়েই আসে। কাটছাঁট হয়েছে ব্রজর কমবয়েসের অনেক কিছুই, ঝাউ আর মরশুমী ফুলের কেয়ারি-করা দশ কাঠার উঠোন ঘিরে ইংরেজি ইউ আকৃতির সেই প্রাসাদের চার-পাঁচটা বাদে সাতাশটা ঘরের বিশ-বাইশটাই রঙ করা হয়ে ওঠে না গত চল্লিশ বছর। মালিরা সবাই বিদায় নিয়েছে, ঝাড়বাতিও নিভে গেছে কবেই, তবু কড়িবরগা থেকে ঝুলন্ত তার ঝুলপড়া শরীর এখনো এ বংশের নীলরক্তের নীরব অভিজ্ঞান।  বাজার-সরকার কাম ম্যানেজার বৃদ্ধ শ্রীপতিবাবু, ব্রজর খাস চাকর কালিপদ আর গোটা দুই চাকরবাকর কেবল টিঁকে রয়েছে কোনোমতে। ব্রজ সক্রিয় পলিটিক্সে নেমেছেন বছর পাঁচেক হ’ল অনিমার ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও। বলতে গেলে বিজনই তাঁকে ধরে বেঁধে প্রথমে ওদের স্কুলের সেক্রেটারি করে আর তারপর ধীরে ধীরে ব্রজর মাথায় সুপ্ত দেশোদ্ধারের বীজে জল দিয়ে দিয়ে চারাগাছ ফুটিয়ে তোলে। তবে যতই বাধ্যতামূলক সাশ্রয়জনিত হিসেবিয়ানা এসে পড়ুক, সেটার মধ্যে দাঁড়িয়েও ব্রজর সারমেয়প্রেমে কোন ঘাটতি পড়েনি। ওদের নামকরণে  ব্রজ একটি সরল পদ্ধতি তৈরি করে নিয়েছেন সেই ছেলেবেলা থেকে; সাদা রঙ হলে ধলু (পুং) বা ধলা (স্ত্রী), লাল-খয়েরি হলে লালু আর লালি, কালো হলে সেই একই নিয়মে কালু আর কালি। এবং প্রায় প্রতিটি প্রজন্মেই একাধিক ধলু বা লালু বা কালি পাওয়া যায়, এই প্রত্যন্ত মফস্বলে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও নাশবন্দীকরণ কর্মসূচী মনুষ্যসমাজেই এখনো তেমন প্রচলিত নয়। একই প্রজন্মের একাধিক সমবর্ণ সারমেয়র নামকরণে ব্রজ ঈষৎ হাইর‍্যার্কি মেইনটেন করেন। প্রথম লালটির নাম দেন লালু, তারপর আবার কোন লাল পুরুষ সারমেয়র জন্ম হলে স্বাভাবিকভাবেই তার নাম দেন লালুর ভাই, পরেরটির নাম হয় লালুর ছোটভাই, যেটা ডাকার সময় শুধু লালু বা শুধু ছোটভাই হয়ে দাঁড়ালেও ও তরফে থেকে সাড়া পেতে আজ পর্যন্ত কোনোদিন দেরি দেখেননি ব্রজ। আজও বহরমপুরে লোক পাঠিয়ে কুকুরের ওষুধ আনান ব্রজ, বাড়িতে নাই বা রইল, এই তল্লাটে তাঁর অনুগামী সারমেয়দের সংখ্যা বংশপরম্পরাক্রমে প্রচুর। ওদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে, ওদের ভালোবেসে ওদের অনেক কিছু স্বাভাবিক ভাবেই ব্রজ জেনে ফেলেছেন গত ষাট বছরে। ব্রজ জেনেছেন, কুকুর সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ও একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে প্রভুভক্তি, এ ব্যাপারে ওরা একেবারেই বহুগামী নয়। প্রভুহীন কুকুরের দুঃখ ভারি এবং এ দেশে বেশির ভাগ কুকুরই বেওয়ারিশ। ব্রজর স্পষ্ট মনে আছে, বছর দু’য়েক আগে গোবিন্দর সঙ্গে কলকাতায় পার্টির সদর দফতরে যেদিন প্রথম গিয়েছিলেন, যেদিনই ঠিক হয় জেলা থেকে একমাত্র মন্ত্রী শ্যামাচরণ বিশ্বাস নন, জেলাপরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী তিনিই হবেন, সেদিন বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়েই সেই প্রজন্মের এক নাছোড় লালু তাঁর গাড়ির (গাড়ির মালিক গোবিন্দ) পিছু নিয়েছিল। বড় রাস্তায় পড়ে তিনি বাধ্য হয়ে গাড়ি থামাতে বলেন, নেমে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘যা বাড়ি ফিরে যা, বড় রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে মরবি তো; আমি সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে আসব রে’তা সেইদিন সন্ধ্যেতে তাঁর আর ফেরা হয়নি, প্রার্থীপদ পাকা হওয়ায় গোবিন্দসহ আরো দু’চার জন উমেদারের ফূর্তির ঝুলোঝুলিতে তিনি সে রাতে কলকাতার এক হোটেলে থেকে গিয়েছিলেন। পরেরদিন দুপুর নাগাদ বড় রাস্তার মোড়ে ব্রজর গাড়ি পৌঁছতে তাঁকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানাতে জড় হওয়া জনা পঞ্চাশ নানাবয়েসী পতাকাধারী পার্টিকর্মীর পুরোভাগে তিনি লালুকে দেখতে পান। গাড়ি থেকে নেমে আবার ওর মাথায় হাত বুলোচ্ছেন যখন, তখন ভীড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলেছিল, ‘কাল সেই যে আপনি গেলেন সার, সেই থেকে ব্যাটা মোড়ের বটতলায় শুয়ে আছে, আমরা কত ডাকাডাকি করলাম, তাও উঠল না। আজ যেই আপনার গাড়ির আওয়াজ পেল অমনি তড়াক করে উঠে চলে এল’! সেইখানেই হাতমাইকে গোবিন্দ ব্রজর জন্য চটজলদি স্বাগতভাষণ দিয়েছিল। গোবিন্দ ভাষণটা রপ্ত করেছে ভাল, যদিও তাতে যুক্তির আঁটসাটের চেয়ে পার্টিলাইনভিত্তিক আবেগের হাঁকডাক থাকে বেশি, এ প্রত্যন্ত গাঁ-গঞ্জে সেইটেই ‘খায়’ মানুষে। সেদিনও ভাষণে বেশ খানিক আবেগের লেবু কচলে লালুর প্রভুভক্তির রেফারেন্স টেনে গোবিন্দ বলল, দীর্ঘদিনের অপশাসন ঘুঁচিয়ে উন্নয়নের জোয়ার আনতে দলীয় কোঁদল ভুলে সব্বাই এক হয়ে  ব্রজকে ভোটে জেতাতে লালুর মতই জান কবুল করে মাঠে নামতে হবে আজ থেকেইবক্তৃতার শেষে জনা পঞ্চাশেকের জটলায় যখন হাততালির ফটাফট আওয়াজ, লালু তখন ব্রজর পায়ের কাছে শুয়ে নিবিষ্ট মনে  তাঁর কোলাপুরি চপ্পল শুঁকছিল।
একই রকম স্পষ্ট মনে আছে, গোবিন্দর মোটরবাইকের ফটফট শব্দ দূর থেকে শুনলেই লালু কেমন ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মত সিধে হয়ে যায়, গোবিন্দ ঠোঁটে আহবানসূচক চুঃ-চুঃ করলেও ব্যাটা পিছিয়ে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কেমন যেন সিঁটিয়ে দাঁড়ায়। গোবিন্দ অবশ্য চিরকালই কাজের মানুষ, ওর অত নজর করবার সময় কোনোকালেই ছিল না। সামান্য পোস্টমাস্টারের ছয় ছেলেমেয়ের তৃতীয় সন্তান হয়েও বাকি ভাইবোনেদের মত সাদামাটা মেঠো জীবন কাটায়নি গোবিন্দ। ভারী করিৎকর্মা সে, তেরো-চোদ্দ বছর বয়েসেই বহরমপুরে কোন কনস্ট্রাকশান ফার্মে মালিকের ফাইফরমায়েশ খাটতে ঢুকে আজ বিশ বচ্ছর পর নিজেরই বেশ কয়েক কোটি টাকার বিরাট ইমারতি কারবার, কার্ড ছাপিয়ে ব্রজকেও দিয়েছে একটা, তাতে লেখা “শ্রীমা কনস্ট্রাকশানস, বিল্ডার্স এন্ড প্রোমোটার্স, চিফ প্রোপ্রাইটার – গোবিন্দ ধাড়া, সিটি অফিস কোর্টপাড়া বহরমপুর”। ব্রজ শুনেছেন গোবিন্দর নাকি বহরমপুর শহরে দু’-দুটো ফ্ল্যাট, একটি রক্ষিতা আর একটি সেকেন্ড হ্যান্ড কোয়ালিস গাড়িও আছে। বছর দেড়েক বছর হল পারিবারিক ভিটেতে গোবিন্দ বেশ খোলতাই একটা দোতলা বাড়ি হাঁকিয়েছে, গৃহপ্রবেশে জেলা পরিষদের সব সদস্যেরই পরিবারসহ নেমন্তন্ন ছিল, গাঁয়ের লোক তো ছিলই, সবশুদ্ধু প্রায় হাজার দু’য়েক হবে। যদিও ব্রজ কোনকালে অর্থোপার্জনের চেষ্টা করেননি, তাঁর বংশে তিনি অবধি কেউই করেননি, মানে করবার প্রয়োজনই হয়নি, তবুও তাঁর বুঝতে কোন অসুবিধে হয়না যে, গোবিন্দর উন্নতির এ হেন উর্ধ্বশ্বাসগতি ঠিক সরল স্বাভাবিক নয়। কিন্তু গোবিন্দ যে ভারী করিৎকর্মা ছেলে তা ব্রজ বোঝেন। পলিটিক্সে নামার সময় জেলা নেতৃত্বের চোখে ওজনদার হয়ে উঠতে সামান্য যে লাখ ত্রিশেক টাকা লগ্নী করতে হয়েছিল ব্রজকে, সেটা তাঁদের পিয়ারগঞ্জের বিশ বিঘা পতিত জমি বিক্রির বন্দোবস্ত করে বলতে গেলে হাতে করে তুলে দিয়েছিল ওই গোবিন্দই।

।। জমি ও শিল্প ।।

ওই জমিজমা নিয়েই গোলটা বেঁধেছিল। সে অবশ্য ব্রজর পৈতৃক জমি নয়, ভাকুড়িয়া বিলের দক্ষিণ-পূবের মজে আসা অংশে জাতীয় সড়ক লাগোয়া দু’ হাজার একর জমি সরকার অধিগ্রহণ করবেন বলে গত বছর মাঘ মাসে নোটিশ পাঠালেন জেলা পরিষদে। কানাঘুষো আগেই শোনা যাচ্ছিল, তবে নোটিশেই সরকারি ভাবে জানা গেল যে সে জমি নিয়ে সরকার তুলে দেবেন জয়কিষেন এন্ড পান্সারি গ্রূপ অব কোম্পানীর হাতে, তারা সেখানে সিমেন্ট, নানারকম রাসায়নিক রঙ থেকে শুরু করে মশলাপাতি-আচার অবধি বানাবার রকমারি কারখানা তৈরি করবে, যাকে আজকাল কাগজে-পত্রিকায় বলা হয় শিল্পপার্ক। মুখ্যমন্ত্রী নিজে সে শিল্প-পার্কের নামকরণ করলেন মাস্টারদা সূর্য সেন শিল্পপার্ক।  স্বাধীনতার পর এতো বড় বেসরকারি উদ্যোগ রাজ্যে আর আসেনি কখনো, ফলে শিল্পমন্ত্রী তো বটেই, গোটা মন্ত্রীসভার দু’-আনা চার-আনার সদস্যরাও কথায় কথায় গত তিন বছরে উদ্যোগী মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় রাজ্যে শিল্পের জোয়ার এসেছে জানাতে গিয়ে প্রস্তাবিত এই সূর্য সেন শিল্পপার্কের প্রসঙ্গ টেনে আনা শুরু করে দিয়েছিলেন। খবরের কাগজগুলোও মেতে উঠলো, নানা সমীক্ষার কথা ছাপা হতে লাগলো যেগুলোতে রঙীন ছবিটবি ও আঁকিবুকি কেটে বেশ জলবৎতরলং করে বোঝানো হচ্ছিল যে, এই বিরাট বেসরকারি পুঁজির লগ্নী জেলা তো কোন ছার, গোটা রাজ্যের শিল্প-ভবিষ্যৎই পালটে দেবে। মানে বড়বড় রাস্তাঘাট-দোকানপাট, ঘরে ঘরে চাকরি, পাকা বাড়িঘর, মা-বোনের হাসিখুশি মুখ, আজ পর্যন্ত খালি পায়ে টইটই-ঘোরা ন্যাংটো বাচ্চাকাচ্চার ইস্কুলে যাওয়া – সোজা কথায়, পুরো শহুরে ছবির মত ব্যাপারস্যাপারএখন সে ছবি দেওয়ালে টাঙ্গালে প্লাস্টারের চিড় ঢাকা পড়ে ঠিকই, কিন্তু সক্কল আমজনতার চিঁড়ে যে ভিজবেই তা তো নিশ্চয় করে বলা যায় না, তাই অবধারিতভাবে ঘোঁট পাকল। প্রথমদিকে বহরমপুর থেকে কিছু কলেজপড়ুয়ার দল এসে ভাকুড়িয়া বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের ছবি এঁকে স্থানীয় স্কুলগুলোতে শিল্পপার্কের বিরোধিতা করে প্রচার চালাতে শুরু করল। স্থানীয় দু’চারটে পাতি পত্রপত্রিকায় সে বিষয়ে লেখা-ছবি বেরোতে এদের দল দ্রুত আরো ভারি হয়ে কলকাতার কলেজ-ইউনিভার্সিটির বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীও এসে জুটল আর তারা সরকারের জমি-অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় বহরমপুর শহরের নানা জায়গায় পথনাটক আর পোস্টার প্রদর্শনীর বন্দোবস্ত করল।  নেচে গেয়ে ছবি এঁকে সেই ছোকরার দল মানুষকে বোঝাতে চাইল, ভাকুড়িয়া বিলের দু’হাজার একরে ওই শিল্পপার্ক হলে সাধারণ মানুষের লাভের চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশি – লাভের গুড় নিয়ে যাবে বড় ব্যবসাদার, কেবল উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকবে স্থানীয় মানুষের জন্য আর পড়ে থাকবে দূষিত ভাকুড়িয়া বিল, যেখানে মাছ-গুগলি-শামুক জন্মাবে না, শালুক-শাপলা ফুটবে না, পাখপাখালী আর এসে ডিম পাড়বে না।  ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া গাঁয়ের মানুষের আমও যাবে, ছালাও যাবে। এদের উপেক্ষা করলেও হয়তো চলতো কিন্তু ব্রজ খবর পেলেন, বিজনের নেতৃত্বে তাঁর পার্টিরই দু’চারজন ওই ছেলেমেয়েগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বিল-লাগোয়া গাঁয়ে গাঁয়ে ক্যাম্পেন করছে। তিনি পত্রপাঠ বিজনকে ডেকে পাঠান তাঁর বাড়ির একতলায় তাঁর দপ্তরে। বিজন এলো, কিন্তু একা নয়।  বহরমপুরের হাইস্কুল আর কলেজের আরো তিন-চারজন শিক্ষক আর ওই ছেলেমেয়েগুলোর কয়েকজনকে সঙ্গে করে একদিন সন্ধ্যায় ব্রজর দপ্তরে এলো বিজন। পরিচয়পর্ব শেষ হতে ব্রজকে বিজন বললো, ‘দাদা, জানি আপনি কেন আমায় ডেকেছেন। আমি পার্টিবিরোধী কাজ করছি বলে আপনার কাছে খবর এসেছে, আমি জানি। আমার মনে হয় দাদা আপনি ইস্যুটা একবার এঁর কাছে ভালো করে শুনুন’বিজনের কথায় একমাথা পাকাচুল চোখে ভারী চশমা যাঁকে ব্রজ আগে দেখেছেন বিজনের ইস্কুলের পরিবেশদিবসের অনুষ্ঠানে, বহরমপুর কলেজের প্রাণিবিদ্যার সেই প্রবীণ অধ্যাপক ডক্টর রাহা একবার গলা খাকরানি দিয়ে শ্লেষ্মাবিজড়িত স্বর পরিষ্কার করে নিলেন আর তারপর একনাগাড়ে মিনিট দশেক ধরে ব্রজকে বোঝালেন যে, এই মূলধননিবিড় শিল্প পার্কে অদক্ষ শ্রমিকের কোন চাহিদা নেই, তারা কেবল পাহারাদার, সাফাইওয়ালার কাজ পেতে পারে। আর করতে পারে দু’ চারটে খাবারের দোকান, বা ধার করে কিনতে পারে মোটর-বসানো ভ্যানো, যাতে চেপে বাসরাস্তা থেকে তিন কিলোমিটার পথ পেরিয়ে শিল্পপার্কে আসবে প্রশিক্ষিত শহুরে কর্মীর দল। কিন্তু তাতে ভাকুড়িয়া বিলের উপর প্রত্যক্ষতঃ নির্ভরশীল পাঁচটি গ্রামের সাড়ে তিন থেকে চার হাজার পরিবারের অন্নসংস্থান হওয়া পারতপক্ষে অসম্ভব। তিনি নানা পত্রপত্রিকার কাটিং দেখালেন, এই জয়কিষেণ এন্ড পান্সারি শিল্পগোষ্ঠীর পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়ে অতীত রেকর্ড অন্যান্য প্রদেশে অতি সন্দেহজনক, তারা টাকা ছড়িয়ে প্রশাসনের মাথা আর বিচারব্যবস্থাকে কিনে রাখে, দরকার পড়লে পেশিশক্তির ব্যবহারেও পেছপা হয় না।  উত্তরপ্রদেশে এক তরুণ আইএএস অফিসার এদের চক্ষুশূল হওয়ায় গত কয়েকমাস ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে, পুলিশ নিরুদ্দেশ বলে ডাইরি লিখেই ক্ষান্ত দিয়েছে, কোর্ট মামলা নেয়নিমোট কথা, এ তল্লাটের মানুষের জীবনজীবিকার উপর, স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশের দীর্ঘকালীন সুস্থিতির উপর এ প্রস্তাবিত শিল্পপার্ক এক চরম অনিশ্চয়তার ভয়াবহ ঝড় টেনে আনতে পারে। উপস্থিত ছোকরার দলের মধ্যে প্যান্টের উপর পাঞ্জাবি-পরা একটি মেয়ে সটান ব্রজকে বলে বসে, ‘আঙ্কেল, আপনি তো লার্নেড পার্সন, আপনি সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্টের ব্যাপারটা জানেন নিশ্চয়ই ? এটা আজ বা কালের চটজলদি লাভের বিষয় নয়, এটা ইন্টার-জেনারেশান্যাল ইকুইটির প্রশ্ন’  বিজন এইবার বলে, ‘দাদা, আমরা কেউ এলাকার উন্নয়নের বিরোধী নই, কিন্তু যেভাবে বিষয়টা লোককে বোঝানো হচ্ছে, ব্যাপারটা অত সোজা নয় দাদা। এই ভাকুড়িয়া বিল এখানকার কলিজা, সিমেন্ট বা রাসায়নিক ফ্যাক্টরি হলে এটা মরে যাবে দাদা। তার চে’ দু-চারটে মোটরগাড়ি কম চলুক না, বরং আমরা পার্টিকে আরো চিন্তাভাবনা করে এমন কিছু শিল্পের কথা ভাবতে বলি যেখানে আমাদের এই এলাকার লোকগুলো সারাবছর ধরে সত্যি করেই কাজের মত কাজ পায় আর বিলটাও বাঁচে ? এটা আপনি জেলায় তুলুন দাদা, দরকার পড়লে আমরাও আপনার সঙ্গে যাব, কলকাতায় যাব, তবু এলাকাটাকে বাঁচান’  ব্রজ বিপদে পড়েন, বিষয়টা তিনি যে একেবারে বোঝেননি তা নয়, ডক্টর রাহা বেশ জলবৎ বুঝিয়েছেন।  কিন্তু তা সত্ত্বেও ধন্ধ যে পুরোপুরি কাটে না; তাহলে কতকাল স্রেফ মাছ ধরে, লগি ঠেলে আর গেঁড়ি-গুগলি-কলমী শাক খেয়ে মানুষগুলোর দিন চলবে ?  জমি না পেলে শিল্প কি আকাশে হবে ? আর শিল্প না হলে উন্নয়ন আসবে কোন পথে ? সেদিনের মিটিং অ্যাডজর্ন হয়ে গেল, ব্রজ বিজনকে পরেরদিন জোনাল পার্টী অফিসে আসতে বললেন।
জোনাল অফিসে তো এক কান্ডই হয়ে গেল। একদিকে গোবিন্দ সহ প্রায় পুরো পার্টি, অন্যদিকে বিজনের নেতৃত্বে জনা ক’য় মাত্র। বিজনদের সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট বনাম গোবিন্দদের ‘উন্নয়নের জোয়ার’, এমনকি বেশ কয়েকজন সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট জিনিসটা খায় না মাথায় দেয়, সে প্রশ্নও তুলে ফেললো। একদিকে একটা আবছা ভয়-ভয় মার্কা যুক্তি, অন্যদিকে প্রধান শিল্প, অনুসারী শিল্প, এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন, হাজারো কাজ, হাসপাতাল-স্কুল-কলেজ বাঁধানো রাস্তাঘাট, শপিং মল, সবার গায়ে চকচকে কাপড়জামা আরো কত কি, যার স্পষ্ট ছবি টিভিতে পার্টির এমপি দীপকুমার অভিনীত ‘আমি তোর স্বামী’ বা ‘শ্বশুর যখন অসুর’ সিনেমায় বা যেকোনো বাংলা বা হিন্দি সিরিয়ালে রোজ সন্ধ্যেবেলায় দেখা যায়। সোজা কথায়, বিজনদের স্থিতিশীল উন্নয়নের যুক্তি কেমন সব ভারিক্কী শব্দে ভরা, ভাসাভাসা, আর তাতে কিন্তু-যদি-হয়তোর ছড়াছড়ি, সাদাকথায় দুর্বোধ্য; তুলনায় গোবিন্দদেরটা অনেক সোজাসাপটা, সাধারণলোকে সহজে বোঝে, মেঠো কথায় মাইকে ফুঁকলে গাঁ-গঞ্জের মানুষ টিভিতে-সিনেমাতে দেখার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে  চট করে ‘খাবে’ গোছের। দাঁড়িপাল্লায় কোনদিক ভারী ? ব্রজ বিরাট আতান্তরে পড়েন, তাঁর সকলকে নিয়ে চলবার অভিভাবকসুলভ নেতৃত্ব চরম চাপের মধ্যে পড়ে যখন ব্যাপারটা ব্যক্তি-আক্রমণের চেহারা নেয়। গোবিন্দদের দলবল বিজনের সঙ্গে বিরোধী পার্টির যোগসাজশের প্রমাণ হিসেবে একটি ফোটো দাখিল করে যেখানে বিজন বহরমপুর শহরে এক বিরোধী নেতার বাড়িতে তাঁর ছেলের বৌভাতে সপরিবার নেমতন্ন খাচ্ছে বলে দেখা যায়। ‘দলবিরোধী ধান্দাবাজ বিজন দত্ত দূর হটো’- ধাঁচের শ্লোগান উঠি-উঠি করছে এমন সময় বিজন তার হাতব্যাগ থেকে একটি কাগজ বার করে উঁচু করে ধরে সকলের চোখের সামনে।  সেটা দেখা যায় একটি চিঠির ফোটোকপি। বিজন সোচ্চারে বলে চলে, ‘মন্ত্রী শ্যামাচরণ বিশ্বাস তাঁর নিজের প্যাডে ভূমিরাজস্ব সচিবকে এই কথা লিখলে সেটা দলবিরোধী কাজ হয়না ?  শিল্পপার্কের জন্য জমি তৈরী করতে কাদের কাদের টেন্ডার-ফেন্ডার ছাড়াই বরাত দিতে হবে তার জন্য শ্যামাদা রেকমেন্ড করছেন !! কেন ? কোন স্বার্থে ? কাদের স্বার্থে ?  জলা ভরাট করা, বাউন্ডারী ওয়াল তোলা, রাস্তা বড় করা শুদ্ধু প্রায় ২০০ কোটি টাকার বরাত দিতে হবে ওনার রেকমেন্ড করা এই চারজন কন্ট্র্যাক্টরকে ? এতে তিননম্বর নামটা কার একবার দেখবেন ব্রজদা’ ? শ্যামা বিশ্বাসের রেকমেন্ডেশানের চিঠিতে তিননম্বরে গোবিন্দ ধাড়ার নামটা বোমার মত ফেটে পড়ে পার্টি অফিসে। বোমা ফাটলে বিশৃঙ্খলা তো হয়ই, এখানেও দু’ পক্ষে হাতাহাতি হ’বার উপক্রম হলো।  নিরূপায় ব্রজ পার্টি থেকে পদত্যাগ করবার হুমকি দিয়ে তা ঠান্ডা করতে বাধ্য হলেন।  দু’ পক্ষের থেকে ছবি আর চিঠির কপি জমা রাখলেন, আর বললেন বিষয়টি নিয়ে পার্টির উঁচু মহলে তিনি কথা বলবেন, ততদিন দু’ পক্ষকেই শান্তি বজায় রেখে পার্টির অনুগত সদস্যের কর্তব্য করে যেতে আদেশ করলেন। তবে যাই বলুন, গোবিন্দ তার অনুগামীদের নিয়ে পার্টি অফিস ছেড়ে বেরোবার আগে বিজনের দিকে যে একটা হিংস্র হাসি হেসে গেল, সেটা ব্রজর নজর এড়ায় না।

।। ব্রজ ও একটি লাশ ।।

এর পরের ঘটনাগুলো এক্সপ্রেস ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যপ্রবাহের মত দ্রুত ঘটে চললোমন্ত্রী শ্যামা বিশ্বাস জেলা পরিষদে ব্রজর অফিসে এসে ওনার সেই বিতর্কিত চিঠিটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্রে বিজন জাল করেছে এই অভিযোগে বিজনকে পার্টি থেকে সাসপেন্ড করবার দাবী তুললেনব্রজ কেমন করে সে জাল চিঠি বিবেচনার জন্য গ্রহণ করলেন সে কথা কলকাতায় পার্টির  হেড অফিসে বড় মাথাদের কাছে তুলবেন বলে জানিয়ে পিছনে সশব্দে দরজা বন্ধ করে ঘা-খাওয়া নেকড়ের মত ব্রজর অফিস ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। শ্যামা বিশ্বাসের দাবীটাবিগুলো প্রকাশ্য মিটিং-এই ধমকের মত শোনায়, ব্রজর এসি চেম্বারে তা যে নির্ভেজাল হুমকির মত শোনাবে তা আর আশ্চর্য কি ?  ব্রজ সবদিক থেকেই স্থানু হয়ে কেমন জড়ভরত হয়ে পড়েন।  এ জগত তাঁর অচেনা, তিনি ছেলেবেলা থেকেই তাঁদের কাছারিবাড়িতে লোককে হত্যে দিয়ে অনুনয়-বিনয় করতে দেখেছেন। সে সব জমিদারীর দিন না হয় অতীত, তবু আজ অবধি সকলেই তাঁর সামনে সসম্ভ্রমে তাঁর সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করেছে  পার্টি করা ইস্তক বহু অসংস্কৃত সদস্যের সঙ্গে তাঁকে খানিকটা বাধ্য হয়েই মেলামেশা করতে হয়েছে, তারা তো বটেই এমনকি গোবিন্দদের মত আঙুল-ফুলে-কলাগাছেরাও তাঁকে সরাসরি অপমান তো দূরের কথা, কণামাত্র অবজ্ঞাও তাঁর সামনে দেখাতে সাহস করেনি আজ পর্যন্ত  তাই ঈষৎ বিধ্বস্ত হয়ে দুপুরে বাড়ি ফেরেন ব্রজ। ফিরেই খবর পেলেন বিজন এসেছিল। একটা হাতচিঠি রেখে গেছে যাতে জানা গেল আজ একটু আগে ক্যুরিয়ারে বিজনের বাড়িতে একটা সাদা থান কাপড় এসেছে, প্যাকেটের উপরে লেখা ‘বিজন দত্তর বিধবা ইন্দ্রানীর জন্য’। এর তিন দিন পরেই বহরমপুর শহরে কলেজের রাস্তায় দিনদুপুরে বিজনের মেয়ে সুজাতার ওড়না কেড়ে নিল দু’টো মোটরবাইকে চেপে আসা চার যুবক; খবরটা  জানামাত্র বিজনকে মোবাইলে ধরবার চেষ্টা করলেন ব্রজ, বিজন ফোন ধরেনি, ধরল ওর বউ ইন্দ্রানী। স্তিমিত ভয়ার্ত স্বরে বলল, ওরা মেয়েটাকে বলে গেছে বাপ লাইনে না এলে ওকে রেপ করে লাশটা ভাকুড়িয়ার বাদায় পুঁতে দেবে। ব্রজ গোবিন্দকে ডেকে পাঠান, ওকে বেশ ডেঁটে বলেন, ‘এ সব কি হচ্ছে গোবিন্দ’ ? গোবিন্দ আকাশ থেকে পড়ে, ‘কি বলছেন দাদা, আমি ? ছি ছি, একথা আপনি ভাবতে পারলেন ? পার্টি অফিসে সেদিন মিটিং-এর পরেই কত লোকে বিজনকে ধরতে চেয়েছিল আপনি জানেন ? তাদের কে ঠেকিয়েছে দাদা ? হ্যাঁ, বিজন এলাকার উন্নয়নে হিড়িক দিচ্ছে সেটা জেনে অনেকেই ওর উপর হেভি ক্ষেপে গেছে সেটা ঠিক, তবে আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে, আমি নিজে ব্যাপারটা খোঁজ নেবো, আপনার কোনো চিন্তা নেই’। ব্রজ তবু নানা চিন্তা করতেই থাকেন – কারখানা, এলাকার উন্নয়ন, ভাকুড়িয়া বিল... বিজনের কথাগুলো অবেলার অম্বলের মত মনে পড়ে। চোঁয়া ঢেকুর তুলিয়ে মুখে বিশ্রি স্বাদ আনে। এই চিন্তার মেঘেই আবার বিদ্যুৎ হানে হপ্তা দু’য়েক পরে শ্যামা বিশ্বাসের ফোনে গর্জন, বিজন নাকি এইবার কোলকাতার বিখ্যাত পরিবেশকর্মী ও আইনজীবী সুহাস দাসকে দিয়ে ভাকুড়িয়া বিলের জমি অধিগ্রহণের বিরূদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেছে। এ তো সোজাসুজি সরকারের নীতির বিরোধিতা, পার্টির বিরোধিতা, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়নের স্বপ্নের বিরোধিতা ! পার্টির মহাসচিব এবার নড়েচড়ে বসেছেন,  ব্রজ যদি এই মুহূর্তে বিজনকে পার্টি থেকে বরখাস্ত না করেন তো সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর রোষের মুখে পড়বেন।  সেই সন্ধ্যেয় ব্রজ পার্টি অফিসে মন্ত্রী শ্যামাচরণ ও লোক্যাল কমিটির বাকি সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে বিজন দত্তর পার্টি-সদস্যপদ খারিজের সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিলেন। চিঠিটা তৈরী হয়ে টাইপ হয়ে এল এবং প্রেসিডেন্ট ব্রজ, ভাইস-প্রেসিডেন্ট শ্যামাচরণ ও লোক্যাল কমিটির সম্পাদক তাতে সই করলেন এবং সে সব চুকিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা বাজলো ব্রজর তবে সে বরখাস্তের চিঠি বিজনকে হাতে আর ধরানো গেল না, পরেরদিন সকালেই বিজন লাশ হয়ে পড়ে রইল দীঘলকাটীর বাঁধের উপর নির্মীয়মাণ ব্রজর সাধের সেই “পাখীর বাসা” অতিথিনিবাসের পূব কোণে ইঁটের পাঁজার পাশে।  প্রথম যারা দেখেছিল তারা বলেছিল, গাছের ফাঁক দিয়ে প্রথম আষাঢ়ের মেঘভাঙ্গা ভোরাই সুর্যের আলো তেরচা হয়ে পড়েছিল বিজনের মুখে, আর বুকের কাছে জমাট রক্তে ভনভন করছিল মাছি।

।। লালু ও শৃঙ্খলিত সুশীল কুকুরগুলো ।।

নিজের পার্টির ছেলে বলে নয়, এমনিতেই বিজনকে ওর ছেলেবেলা থেকেই বেশ ভালো চোখে দেখতেন ব্রজ রায়, ফলে ঘটনাটা তাঁকে ব্যথাই দিয়েছিল। তার উপর ঘটনাটার মধ্যে দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্ধের প্রবল গন্ধ তাঁকে আরো উদাস করে তুলেছিল। ইন্দ্রাণী মেয়ে সুজাতাকে নিয়ে তারপরে একদিন ব্রজর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে এল, তার পরণে বৈধব্যের সাদা থান নয়, আর গলাও সেই রাতের ভয়-পাওয়া পাখীর মত নয়। সুতীক্ষ্ণ স্বরে মা-মেয়ে ব্রজকে জানিয়ে গেল, তারা কোর্টে গোবিন্দ আর মন্ত্রী শ্যামাচরণের নামে খুনের মামলা দায়ের করছে, সুজাতা বলল, ‘জেঠু সবই তো গেছে, এখন আমরা ভয়ডরের উপরে উঠে গেছি। রেপ করবে, করুক। তবু বাবার খুনীদের শেষ দেখে ছাড়বো’।  ব্রজর সান্ত্বনাবাক্যের অপেক্ষা না রেখেই মা-মেয়ে উঠে পড়ে, দৃপ্ত পায়ে ব্রজর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায় সহায় সম্বলহীন, অজানা কোনো এক অনন্ত কুরুক্ষেত্রের দিকে।
মাস খানেক পর একদিন দুপুর-দুপুর জেলা পরিষদের অফিসে বসে ফোনে ব্রজ খবর পেলেন জমি অধিগ্রহণ দপ্তরের চুড়ান্ত নোটিশ ইস্যু হয়ে গিয়েছে, জেলা পরিষদ অফিসে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। তখন রাত প্রায় ন’টা বাজে, ব্রজ বাড়ির একতলায় তাঁর দপ্তরে বসে এ চিঠি ও চিঠি দেখছেন, উপর থেকে রাতের খাবারের ডাক আসলো বলে এমন সময় গোবিন্দ সে নোটিশের ফোটোকপি হাতে বাইক ফটফটিয়ে ব্রজর বাড়ি এসে উপস্থিত, একা নয় সঙ্গে চার-পাঁচটি বাইকারূঢ় আরো আট-দশজনা পার্টিকর্মী।  ‘ব্রজদা, এসে গেছে, আপনার নেতৃত্বেই এই এলাকার মানুষ সত্যিকার সুদিন দেখতে চলেছে, ওরে ব্রজদাকে মিষ্টি খাওয়া’একটি বালা-পরা পুরুষের হাত বিরাটাকায় এক রসগোল্লার হাঁড়ি এনে ব্রজর সামনে টেবিলে রাখে, ‘নিন দাদা, এমন শুভদিনে একটু মিষ্টিমুখ না করলে চলে’ ? ‘সবচেয়ে বড় কথা দাদা’, গোবিন্দ বলে, ‘ওই জলার ধারে যে দু’-দশ ঘর মানুষকে শিল্পপার্কের কাজ শুরু হ’বার আগে উঠে যেতে হবে, তাদের জন্যে ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার একলপ্তে পাঁচ লাখ টাকা করে দেবেন বলে ঠিক হয়েছে।  ভাবুন তো, ওই টাকার লাখ দুয়েকে একটা দোকান-টোকান করে বাকি টাকা পোস্টাপিসে এমআইএস করে রাখলে মাস গেলে হাতে বেফালতু দেড়-দু’ হাজার করে পাবে লোকগুলো, ওদিকে দোকানটা তো রইলই’এই সময় আনন্দের আতিশয্যে এক অত্যুৎসাহী পার্টিকর্মী যুবক ব্রজর সামনেই গোবিন্দকে বলে ফেলে,  ‘গুরু, পোস্টাপিসে কোন আবুইদ্যা টাকা রাখবে, শ্লা তোমার ইঁটভাটায় লাগালে দু’ বছরে ডবল ফেরত পাবে, বলো ওস্তাদ’ ? গোবিন্দ মাছি তাড়াবার ভঙ্গীতে কথাটা বাতাসেই উড়িয়ে দেয়। বরিষ্ঠ পার্টিনেতা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মিস্টিমুখ করানো হচ্ছে মার্কা ছবিও তোলা হয় মোবাইলে, ফলে ফেলে-ছড়িয়েও এই অবেলায় ব্রজকে চার-পাঁচটা পেল্লায় সাইজের রাজভোগ গলাঃধকরণ করতে হয়। উদ্দীপিত ছেলেছোকরার দল ব্রজর দপ্তরে আর কতক্ষণ শুকনো গলায় বসে থাকবে এই উল্লাসী সন্ধ্যেয় ? তাদের লিডার গোছের একজনকে একপাশে টেনে নিয়ে গোবিন্দ কি যেন বলে এবং তারা মুখ্যমন্ত্রীর নামে, জেলার একমাত্র মন্ত্রী শ্যামাচরণ বিশ্বাসের নামে, ব্রজর নামে, আর গোবিন্দর নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে বেরিয়ে যায়।  উচ্ছ্বাস, হৈ হট্টগোল কমলে গোবিন্দ ব্রজকে বলে, ‘ল্যান্ড অ্যাকুইজিশান ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা সামনের সপ্তাহেই সার্ভেতে আসবে বলে আমাকে বলেছেন মন্ত্রী, তারপর সামনে শুধু কাজ আর কাজকাল বিকেল পাঁচটায় কোর্টমোড়ে একটা মিটিং ডেকে দিয়েছি দাদা, সুখবরটা আপনিই সারা জেলার লোককে জানাবেন কাল, শ্যামাদার কাল মন্ত্রীসভার মিটিং আছে, আমার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে, ওনার আসতে একটু দেরি হবে; টিভির লোক, কাগজের লোক সব আসছে, আমি হোটেল অক্সিজেনে বলে রেখেছি, ওখানেই ফুডিং-লজিং-এর ব্যবস্থা থাকছে আর মিটিং-এর পর আপনি ওখানেই প্রেস-কে মিট করবেন’ব্রজ তারিফের চোখে গোবিন্দর দিকে তাকান - নাঃ, উন্নতি গোবিন্দ করবেই ! ঘরে বাদবাকি দু’পাঁচজন যা ছিল, তাদের গোবিন্দ বলে, ‘চলুন চলুন, রাত হ’ল, এবার দাদাকে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিতে দিন, কাল অনেক কাজ দাদার’। আর ব্রজকে বলে, ‘কাল সকাল সকাল রেডি থাকবেন দাদা, আমি ন’টা নাগাদ গাড়ি পাঠিয়ে দেবো, সোজা জেলা অফিস। দুপুরে ওখানেই ব্যবস্থা হচ্ছে, সেখান থেকে মিটিং করে হোটেল অক্সিজেনে প্রেস কনফারেন্সের পর ডিনার সেরে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব। আজ তাহলে আসি দাদা’।
গোবিন্দদের বাকি পাঁচ-সাতজন বেরিয়ে যেতে খাস চাকর কালিপদকে হাঁক দিয়ে সদর দরজা বন্ধ করতে বলে বেশ পরিতৃপ্তির ধীর পায়ে নিজের দপ্তরের দিকে ফেরেন ব্রজ। ঘরের দরজার কাছে পৌঁছতেই তাঁর নজর পড়ে আলোআঁধারির মধ্যে দু’পায়ের ফাঁকে লেজ গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লালু, বোধহয় গোবিন্দদের দলবলের সঙ্গেই উঠোনে ঢুকে পড়েছিল, কেউ খেয়াল করেনি। বেশ ভরাট মেজাজ আজ ব্রজর, তিনি সস্নেহে লালুকে ডাক দেন, ভাবেন কালিপদকে বলবেন বাড়তি রুটি-ফুটি যা আছে লালুর জন্যে এনে দিতে।  ব্রজর ডাক শুনে লালু কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে কয়েক ফুট এগিয়ে এসে ব্রজর ঘরের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, কাছে আসেনাব্রজর ডাক শুনেও লালুর এই ব্যবহার কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক, তাই ব্রজই এগিয়ে যান তার দিকে। ব্রজকে এগোতে দেখে লালু আরো সিঁটিয়ে যায়, কাছাকাছি যেতে ব্রজ লালুর গলায় অস্ফুট একটা ঘড়ঘড়ানি শব্দ শুনতে পান যেন। অসুখবিসুখ করলো নাকি, ব্রজ আরো কাছে এগিয়ে যান। লালু মুখ তুলে দু’বার সপাটে ডেকে ওঠে, শাসনের ধমক দেন ব্রজ, ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে যান।  ব্রজ এখন লালুর এতটা কাছে যেখান থেকে উনি লালুর চোখের চাহনিও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। ওর তাকানোটা ব্রজর অদ্ভুত মনে হয়, এটা আনুগত্যের চাহনি নয়, এমনকি রাগের চাহনি নয়, ক্ষিদের চাহনি নয়, ব্যথার চাহনিও নয়।  এ চাহনি ব্রজর সম্পূর্ণ অচেনা, লালুর চোখে তো বটেই, আজ অবধি কোনো মানুষ তাঁর সামনে অমন চাহনি নিয়ে কখনো দাঁড়ায়নি। ব্রজর বেশ অস্বস্তি হয়, ‘কিরে লালু, কি হয়েছে তোর ?’ । কালিপদ কয়েকটা বাসী রুটি লালুর জন্যে নিয়ে আসে আর ব্রজকে বলে, ‘বাবু, উপরে যান, মা খাবার বেড়েছেন’। ব্রজ মনে একটু খচখচানি নিয়েই সিঁড়ির দিকে এগোন, লালু ও এলাকার যাবতীয় কালু-লালু-ধলুদের প্রতি তাঁর অযাচিত স্নেহের জন্যেই জন্মচেনা লালুর চোখে এহেন অচেনা চাহনি তাঁকে ঈষৎ বিব্রত করে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে উঠতেই অবশ্য সে অস্বস্তি মরে আসে, কারণ ততক্ষণে মর্মচক্ষে আগামীকালের সভার শেষে নিজেকে মাল্যভূষিত ও আবীরমন্ডিত দেখতে পাচ্ছেন  তিনি। শুধু লালুর চোখে কেন, কোন মানুষের চোখেও ওই চাহনি আজ অবধি ব্রজ নজর করেননি, তাই চিনবেন কি করে ? ভাগ্যিস। সে চাহনি চিনলে বা তার মানে বুঝলে তাঁর মনের অস্বস্তির বুদবুদ এত সহজে তাঁকে ছাড় দিতো না, বরং সুনামির ঢেউ হয়ে কেউটের ছোবলের মত তাঁর সত্ত্বাকে, তাঁর অস্তিত্ত্বকে গ্রাস করতে উদ্যত হতো।  গত শীতকালে ভাকুড়িয়ার ধারে পিকনিক করতে কোলকাতা থেকে দু’-তিনটে বড় বড় গাড়ি করে একদল মানুষ এসেছিল, সঙ্গে বহু শখে বহু শৌখিনতায় লালন করা জাঁদরেল এক কুকুর। খাবারের লোভে জড় হওয়া লোক্যাল কালু-ধলুরা সে খানদানি কুকুর গাড়ি থেকে নামতেই চিল চিল্লানো চিল্লিয়েছিল, আর ব্রজ রায়ের পেয়ারের লালু সেই বাহারি বকলেস-পরা, দামী চামড়ার ফিতেয় বাঁধা তার স্বজাতীয়ের দিকে আজকে রাতের এই ঘৃণামিশ্রিত অনুকম্পার চাহনিতেই তাকিয়েছিল নির্নিমেষ।  
*****
(পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত "ট্রৈনিক" পত্রিকার বর্ষা ১৪২২ সংখ্যায় প্রকাশিত)