Thursday, 22 August 2013

এক উপত্যকা, দুই দেশ, মধ্যিখানে জল


কাশ্মীর দিয়ে দিলেই পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতার অবসান ?
জন্মসুত্রে সহোদর উপমহাদেশীয় দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব আর বিদ্বেষের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে ভূস্বর্গ কাশ্মীর। মুসলমান-অধ্যুষিত করদ রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরি সিং-এর ভারত সরকারের সাথে ১৯৪৭-এর ২৬ অক্টোবর ‘Instrument of Accession’- চুক্তি সই-এর মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অঙ্গীভূত হওয়া থেকে যে ইতিহাসের সুত্রপাত, কাশ্মীর-কেন্দ্রিক তিন-তিনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের (১৯৪৭-৪৯, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯; ১৯৭১-কে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক বলে যদি বাদও রাখা হয়) পরেও তা বিন্দুমাত্র প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। এ ধারাবাহিক কাহিনীর গতিতে উত্থান-পতন আছে, মাঝে মাঝে আপাতঃ নিস্তরঙ্গতা এলেও উত্তেজনা বাড়লেই নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর কামানের গর্জন শোনা যায়। দুই প্রতিবেশীর উপস্থিতিতে যে কোনো বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক আলোচনামঞ্চেও নিশ্চিত ভাবে প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক সুত্র ধরে কাশ্মীর সমস্যা উত্থাপিত হয়। যে কোনো মৈত্রী প্রয়াসে শেষমেশ দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে থাকে কাশ্মীর। ঘটনা হ’ল, পাকিস্তান বহুবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রামে সমর্থন জানিয়েছে। কাশ্মীর উপত্যকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকারের লঙ্ঘনের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরব হয়েছে। ফলতঃ, ভারতে সাধারণ  প্রচলিত ও প্রভূত জনপ্রিয় ধারণা হ’ল, নিতান্ত অনৈতিক ভাবে পাকিস্তান মৌলবাদী ভাবাবেগকে হাতিয়ার করে কাশ্মীর সমস্যায় ইন্ধন জুগিয়ে এসেছে বিগত পাঁচ-ছয় দশক ধরে এবং পাকিস্তানের উদ্দেশ্য হ’ল যেন তেন প্রকারেণ কাশ্মীরকে নিজের অঙ্গীভূত করা। সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধির লক্ষ্যে পাকিস্তান প্রথমতঃ কাশ্মীরে তারপর সমগ্র ভারতে সন্ত্রাসবাদ রপ্তানী করে। পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা ভারতের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আক্রমণ। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই জাতীয় ধারণা জনমানসে সযত্নে লালন করবার রাজনৈতিক লাভালাভ এ যাবত কাল ধরে কিভাবে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বন্টিত হয়ে এসেছে তার আনুপূর্বিক ব্যাখ্যা এই রচনায় ঈষৎ অপ্রাসঙ্গিক হ’লেও নির্ভেজাল এক প্রেক্ষাপট তো বটেই। 

প্রকৃত সত্য হ’ল, এই পঁয়ষট্টি বছরের আকচাআকচির মর্মস্থলে আছে জম্মু-কাশ্মীরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সিন্ধু অববাহিকার নদনদীগুলির জলবন্টন সংক্রান্ত দড়ি-টানাটানি। পাকিস্তানের আদত উদ্দেশ্য ও স্বার্থ কাশ্মীরে বয়ে যাওয়া পশ্চিমবাহিনী নদনদীগুলির প্রবাহের উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ত্ব লাভ এবং পাক-ঘেঁষা স্বাধীন কাশ্মীরই সেই স্বার্থসিদ্ধির সোপান। আজকের চেহারা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের ৪৩% ভারতের শাসনাধীন, ৩৭% পাক-অধিকৃত কাশ্মীর এবং বাকি ২০% চিনের অধিকারে (আকসাই চিন), যদিও চিন কোনকালেই আকসাই চিনকে জম্মু-কাশ্মীরের অংশ বলে স্বীকৃতি দেয় না, এই অঞ্চলটিকে তারা তাদের মূল ভূখন্ডের অবিতর্কিত অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ বলেই জাহির করে এসেছে। সিন্ধু অববাহিকায় সিন্ধু নদ সহ পাঁচটি প্রধান নদী, যথা, শতদ্রু (Sutlej), বিপাশা বা বিয়াস (Beas), রাভি (Ravi), চন্দ্রভাগা বা চেনাব (Chenab) এবং বিতস্তা বা ঝিলম (Jhelum) জম্মু-কাশ্মীর ও পঞ্চনদের দেশ পাঞ্জাবের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। নদীগুলির নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে পাকিস্তানের এই নদীগুলির জলবন্টন ইত্যাদি বিষয়ে স্পর্শকাতরতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক নদীজাল ও তৎসংলগ্ন মানবনির্মিত সেচব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভাবে একটি চারিত্রিক সামগ্রিকতা আছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের সময়ে এই বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচিত না হওয়ায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের (অবিভক্ত পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীর) নদনদী ও সেচপ্রণালী ব্যবস্থাটির বিভাজন কোনমতেই সুচারু হয়নি। বস্তুত, কোন রাজনৈতিক বিভাজনরেখা দিয়েই প্রাকৃতিক কোন সামগ্রিকতাকে সুষম ভাগে ভাগ করা কার্যতঃ অসম্ভব। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০-এ দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু জল(বন্টন) চুক্তি (Indus Water Treaty IWT) এই অসম্ভব কর্মটিই সম্পাদনের প্রয়াস করেছিল। চুক্তি মত, পূবের নদীগুলি যথা শতদ্রু, বিয়াস আর রাভির জলে প্রাথমিক অধিকার ভারতের ও তিনটি পশ্চিমী নদী যথা, সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের জলসম্পদে প্রাথমিক অধিকার পশ্চিমের দেশ পাকিস্তানের, যদিও নদীগুলির উচ্চ অববাহিকায় ভারতের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় এই নদীগুলির জল পূবের ভারত অভোগমূলক (Non-consumptive) ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে, যে ধরণের ব্যবহারে নদীর জলপ্রবাহ মোটের উপর হ্রাস পায় না (যেমন, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন)। একটি স্থায়ী কমিশন (Permanent Indus Commission) এই চুক্তির প্রায়োগিক দিকটা তদারক করবে এবং উচ্চগ্রামের বিতর্কের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোর্ট অব আরবিট্রেশানে (International Court of Arbitration COA) আপিল করা যেতে পারে যদিও সে কোর্টের রায় মান্য করা বা না করা বাদী-বিবাদীর সদিচ্ছার উপরেই একান্তভাবে নির্ভরশীল, কোনো আইনী বাধ্যবাধকতা কার্যতঃ নেই। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে জম্মু-কাশ্মীরের পশ্চিমবাহিনী নদনদীগুলির উপরে বিভিন্ন জায়গায় তিরিশটির বেশি বাঁধ ও সংলগ্ন জলাধার তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন ভারত সরকার। কেবল চেনাবের জল অভোগমূলক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এগারোটি বৃহৎ ও মাঝারি বাঁধ নির্মিত হয়েছে। যদিও বাঁধগুলির সবক’টির কাজ মোটের উপর সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যাবে না, তবু যে পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে তাতেই নদীগুলির নিম্ন অববাহিকায় পাকিস্তানের শিরঃপীড়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গত পঞ্চাশ বছর স্থায়ী সিন্ধু কমিশনটি টিঁকে গেলেও সিন্ধু চুক্তির (১৯৬০) পরিসরে এ সমস্যা নিরসন যে অসম্ভব তা ওয়াকিবহাল মহল ভালভাবেই জানেন। সিন্ধু অববাহিকার ৬০% পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডের অন্তর্ভুক্ত, ভারতে রয়েছে তার ২০% মাত্র (বাকি ১৫% তিব্বত ও ৫% পাক-অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের মধ্যে পড়েছে)। ২০১১-র তথ্যানুসারে পাকিস্তানের স্থূল দেশজ আয়ের (Gross Domestic Product GDP) ২১.৬% কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত হয় এবং মোট শ্রমশক্তির ৪২% কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত। পাকিস্তানের ভৌগোলিক বিস্তার ৭৯.৬ মিলিয়ন হেক্টার ও তার কম-বেশি এক-চতুর্থাংশ বা ২০ মিলিয়ন হেক্টারের মত কৃষিযোগ্য জমি, যার পরিমাণ সুদূর ভবিষ্যতেও আর বাড়াবার সুযোগ আছে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন না। এবং এই কৃষিজমির অর্ধেকের বেশি জমিই সিন্ধু অববাহিকার নদনদীকেন্দ্রিক সেচব্যবস্থার উপর প্রত্যক্ষতঃ নির্ভরশীল। পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময়ে যেখানে মাথাপিছু নবীকরণযোগ্য জলের যোগান ছিল ৫৬০০ কিউবিক-মিটার, তা ২০১০ সাল নাগাদ আতঙ্কজনক মাত্রায় কমে এসে দাঁড়িয়েছে ১০০০ কিউবিক-মিটারে। গোটা দেশটাই এমন ভয়াবহ জলসংকটের সম্মুখীন যে কেবল কৃষিই নয়, সমগ্র মানবোন্নয়ন প্রক্রিয়াটিই বিপর্যস্ত হতে বসেছে। সিন্ধুর উচ্চতর অববাহিকায় নদনদীগুলির উপর ভারতের নির্বিচারে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ নদীপ্রবাহকে শ্লথ করে তোলায় আরবসাগরে মোহানার মুখে নদীপথে সামুদ্রিক জলের আগ্রাসন মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে গত এক দশকে পাঞ্জাব সমভূমিতে মাটির লবণাক্ততা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে যা চাষবাসের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। একই কারণে পলি জমে জমে (Siltation) সিন্ধু নদের উপর ‘তারবেলা’  (ইসলামাবাদের ৩১ কিমি উত্তর-পশ্চিমে গঠনগত আয়তনের নিরিখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁধ ও জলাধার) ও ‘মংলা’ (আজাদ কাশ্মীরে মিরপুর জেলায় ঝিলমের উপর বৃহৎ বাঁধ ও জলাধার) বাঁধ ও তৎসংলগ্ন জলাধারের ভবিষ্যৎও ঘোর অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ফলে তীব্র জলসংকট ও তার অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে অভূতপূর্ব খাদ্যসংকটের ঘোর দুর্যোগের মেঘ যেন মহাজাগতিক সুনিশ্চয়তা নিয়ে পাকিস্তানকে গ্রাস করতে উদ্যত। উপরন্তু পাকিস্তানের গড় বার্ষিক শক্তি উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই জলবিদ্যুৎশক্তি, এবং এর সিংহভাগ আসে সিন্ধু অববাহিকার নদনদীগুলি থেকে। ভারতের ক্রিয়াকলাপে এই নদীগুলির জলপ্রবাহে ঘাটতি পাকিস্তানে নিদারুণ শক্তিসংকটের আতঙ্ক জাগিয়ে তুলেছে। তার উপর রয়েছে সন্দেহ আর ভীতি – বিনা নোটিশে বৃহৎ বাঁধ-সংলগ্ন জলাধার থেকে বিপুল পরিমাণ জলরাশি বাঁধনমুক্ত করে নিম্ন অববাহিকার পাকিস্তানে চুড়ান্ত বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে ভারত। আশঙ্কা যে একেবারে ভিত্তিহীন তাও বলা যায় না। ২০০৫-এর জুলাই মাসে পাকিস্তানকে পূর্বাহ্নে কোনোভাবে অবহিত না করে বাগলিহার (জম্মু-কাশ্মীরের ডোডা জেলায় চন্দরকোটে চেনাবের উপর বহু-আলোচিত সুবিশাল বাঁধ ও জলাধার) জলাধার থেকে সেকেন্ডে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ কিউবিক-ফিট জল ছাড়বার ফলে পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধ প্রদেশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভায়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। প্রাক্তন পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশারফ এক ভাষণে খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে, পাকিস্তানের নিরাপত্তার স্বার্থে জলই সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। অন্যদিকে ভারতের অবস্থাও তথৈবচ। বস্তুত, দেশের মোট জলসম্পদের সংস্থান (resources), মাত্রা (capacity), দেশবাসীর ওই জলসম্পদে অভিগমনের ক্ষমতা (access), ব্যবহার (use) ও তার পরিবেশগত প্রভাবের ভিত্তিতে পিটার লরেন্স, জেরেমি ম্যেই ও ক্যারোলিন সুলিভান (২০০২) প্রস্তাবিত জলরিক্ততা সূচকের (Water Poverty Index WPI) মানের নিরিখে ভারতের হাল কিন্তু পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য হ’লেও খারাপ;  ভারতের ক্ষেত্রে জলরিক্ততা সূচকের মান ৫৩.২ এবং পাকিস্তানের ৫৭.৮ (সূচকটির মান ০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকে)! পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, ৯০-এর দশকের গোড়া থেকে বিশ্বায়নের স্রোতে গা ভাসিয়ে ভারতে শক্তির চাহিদা বেড়েছে ২০০% এরও বেশি যা কোনভাবেই চিরাচরিত উৎসগুলি থেকে যোগান দেওয়া সম্ভব নয়। এমনিতেই বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নবিরোধী প্রচার, সচেতনতা ও আন্দোলনের মুখে গড় বার্ষিক কার্বন নিঃসরণমাত্রার নিরিখে চিনের পরেই সেকেন্ড বয় হিসেবে ভারত ইতোমধ্যেই যথেষ্ট আন্তর্জাতিক চাপে আছে, কেননা, ভারতের গড় বার্ষিক নিঃসরিত কার্বনের আশিভাগই চিরাচরিত উৎস কয়লা ও পেট্রোলিয়ামের দহনসঞ্জাত। উন্নয়ন প্রক্রিয়া সচল রাখতে শক্তির অচিরাচরিত উৎসগুলির দিকে তাই নজর ফেরানো উত্তরোত্তর বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে। শিরঃপীড়ার কারণ আরো আছে। খোদ কাশ্মীরেই বিদ্যুৎ-এর চাহিদা ও যোগানের বিপুল ফারাক হেতূ উপত্যকাবাসীর অসন্তোষ উত্তরোত্তর ধূমায়িত হচ্ছে, ২৫% মানুষের কাছে বিদ্যুৎ এখনো সম্পূর্ণ অধরা এবং বাকি ৭৫% মানুষও কেবল আংশিক সময়ের জন্য বিদ্যুৎ পান। কাশ্মীর শিল্প ও বাণিজ্য সংঘের সভাপতি শাকিল কালান্দার বলছেন, সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব – কেবল এই তিনটি নদী থেকেই উপত্যকায় ৩০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এবং উপত্যকাবাসীর মোট ঘরোয়া ও শিল্পগত (Domestic & Industrial) চাহিদা ২৫০০-৩০০০ মেগাওয়াট (২০১১) মাত্র। উপত্যকাবাসীর চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় গ্রিড থেকে গড়ে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে রাজ্যের রাজস্বভান্ডারে অহেতূক চাপ পড়ছে, যখন উপত্যকার নদনদীগুলি থেকেই চাহিদার দশগুণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রাযুক্তিক দিক থেকে খুব বেশি করেই সম্ভব। এই অবস্থায় জম্মু-কাশ্মীরে জলবিদ্যুৎ-উৎস হিসেবে প্রবল সম্ভবনাময় নদনদীগুলির নিয়ন্ত্রণ ভারত ত্যাগ করে কি করে ? দু’ পক্ষের এই স্বার্থসিদ্ধির সংগ্রামে উপত্যকাবাসী তার আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, তার দীর্ঘকালের আর্থ-সামাজিক বঞ্চনাজনিত পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নিয়ে নিছকই ক্রীড়ানক মাত্র। কাশ্মীরবাসীর আর্থ-সামাজিক অনুন্নয়ন বা তাঁদের আহত ভাবাবেগ এ সংগ্রামে সুকৌশলে ব্যবহৃত হচ্ছে কেবল। বিষয়টির অন্য আরেকটি মাত্রা তলিয়ে দেখা যেতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমারেখা নির্দ্ধারণের জন্য পাকিস্তান সেই ১৯৫০ সাল থেকেই “চেনাব সুত্র”-টির উপর জোর দিয়ে এসেছে। ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ নিয়োজিত প্রতিনিধি স্যার ওয়েন ডিক্সনের (Owen Dixon) মস্তিষ্কপ্রসূত ‘ডিক্সন প্ল্যান’ হ’ল এই চেনাব সুত্রের মূল ভিত্তি। চেনাব সুত্রে চেনাব নদীর গতিপথকে জম্মু-কাশ্মীরে ভারত ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমারেখা হিসাবে প্রস্তাবিত হয়েছে। এই সুত্র অনুযায়ী পাক-অধিকৃত কাশ্মীর, গিলগিট-বালটিস্তান ও শ্রীনগর সহ কাশ্মীর উপত্যকার বড় অংশ এবং জম্মুর কয়েকটি অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করবার প্রস্তাব আছে, লাদাখ সহ জম্মুর বাকি অংশ ভারতের অঙ্গীভূত হবে। এই বিভাজন চেনাবের গতিপথ বরাবর হ’লেও তা মোটের উপর আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর ধর্মভিত্তিক ভৌগোলিক বিন্যাসকে মান্য করে। পাকিস্তান বহুবার বহুপ্রকারে এই চেনাব সুত্র অনুসারে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান চেয়েছে; বিস্তারিত ব্যাখ্যায় প্রবেশ করবার আগেই অনুধাবন করা শক্ত নয় যে ভারতের পক্ষে এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করবারই কথা। এবং নাকচ করবার প্রাথমিক কারণ এই যে, এই প্রস্তাবে সায় দিলে লাদাখ ও অধিকৃত (পাক ও চিন) কাশ্মীর বাদে জম্মু-কাশ্মীরের প্রায় ৫৭% জায়গা অর্থাৎ প্রায় ৩২,০০০ বর্গ কিমি এলাকা পাকিস্তানকে ছেড়ে দিতে হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের চেনাব সুত্রে অতি আগ্রহের কারণ স্পষ্ট করে বুঝতে হ’লে চেনাব সুত্রে একটি কাল্পনিক পরিবর্তন ধরে নিয়ে এগোনো যেতে পারে। ধরে নেওয়া যাক সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকাই পাকিস্তানকে প্রত্যর্পিত হ’ল এবং জম্মুর গোটাটাই রইল ভারতে। সেক্ষেত্রে সিন্ধু চুক্তির আর কোন যৌক্তিকতাই বেঁচে রইল না – পাকিস্তান সিন্ধু ও ঝিলম সহ তাদের কয়েকটি উপনদীর জলে সম্পূর্ণ অধিকার লাভ করলো এবং বাকি চেনাব, বিয়াস, রাভি আর শতদ্রুর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ পড়লো ভারতের ভাগে। ভারতে (এবং পাকিস্তানে) বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী এই (কাল্পনিক) ব্যবস্থায় কাশ্মীর উপত্যকাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পঁয়ষট্টি বছরের ভারতবিরোধী ক্রিয়াকলাপের পরিসমাপ্তি ঘটবার কথা, কারণ এতদ্বারা ভূস্বর্গ কাশ্মীর পাকিস্তানেরই অঙ্গীভূত হ’ল। লড়াই-ঝগড়ার দিন পিছনে ফেলে দুই প্রতিবেশী এইবার আত্মীয়তা আর সৌহার্দ্রের বন্ধনে আবদ্ধ হ’তেই পারে বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বাস্তব কিন্তু ঠিক উল্টো কথা বলে। পাকিস্তান এই ব্যবস্থাটি কোনমতেই মেনে নিতে পারেনা। কারণ এই বিভাজন মেনে নিলে পাকিস্তানকে তার অন্যতম প্রধান নদী চেনাবের জলসম্পদে অধিকার সম্পূর্ণরূপে হারাতে হয়। হিমাচল প্রদেশ থেকে পাঞ্জাব-জম্মুর সীমানা দিয়ে বয়ে যাওয়া রাভি নদীর থেকে চেনাবের দূরত্ব মাত্র ৫০ কিমি এবং ‘মারহু” টানেল মারফত চেনাবের জলধারাকে রাভির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া ভারতের পক্ষে প্রাযুক্তিক দিক থেকে ভীষণ ভাবে সম্ভব। এর অর্থ, পাকিস্তানে সিন্ধু নদীব্যবস্থায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন কিউবিক-মিটার বা ১৭% জলহ্রাস, কারণ ঝিলম আর চেনাব সিন্ধুর দু’টি প্রধানতম উপনদী। ইতোমধ্যেই পাকিস্তানী পাঞ্জাবে সেচ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সিন্ধু ও ঝিলমের জলসম্পদ সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে ফেলা হয়েছে। পাকিস্তানের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হ’ল সিন্ধ, যেখানকার চাষবাস একান্তভাবে সিন্ধু নদের জলপ্রবাহের উপর নির্ভরশীল। পূবের নদীগুলি যথা ঝিলম-চেনাব-রাভি ও শতদ্রুর মিলিত জলধারা সিন্ধ প্রদেশে প্রবেশের ঠিক আগে সিন্ধুতে এসে মিলেছে। এখন যদি এই (কাল্পনিক) ব্যবস্থাপনায় চেনাবকে সম্পূর্ণ হারাতে হয় তবে অপেক্ষাকৃত উচ্চতর অববাহিকায় অবস্থানের কারণে পাকিস্তানী পাঞ্জাব যদি বা সিন্ধু ও ঝিলমের জলে কোনক্রমে টিঁকেও যায়, নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত সিন্ধ প্রদেশ স্রেফ মরুভূমিতে পরিণত হবে। এবং এর অনিবার্য ফলশ্রুতি হ’ল পাকিস্থানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহু প্রাচীন পাঞ্জাব-সিন্ধু রেষারেষিতে নতুন ইন্ধনের যোগান ও ঘোর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিপর্যয়। এতেই শেষ নয়, গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রইবে নতুন পাওয়া কাশ্মীর উপত্যকা, তার সমস্ত পাওয়া-না-পাওয়ার ক্ষোভ, দাবীদাওয়া আর আশা-আকাঙ্খার ঝুলি নিয়ে। সে দাবীদাওয়া আর প্রত্যাশার ন্যুনতম অংশও যদি পূরণ করতে হয় তবে ইতোমধ্যেই মৌলবাদ-উগ্রবাদে ত্রস্ত, বিদেশী-সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি এবং জল ও খাদ্যে চুড়ান্ত সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের নুন আনতে পান্তা যে ফুরোবেই তা নিয়ে পাকিস্তানী বিশেষজ্ঞরাও দ্বিমত পোষণ করেন না। এ এক ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা। অর্থাৎ আদতে যে স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে পাকিস্তানের কাশ্মীর নিয়ে এই অর্ধশতাব্দীর ধারাবাহিক সংগ্রাম, জম্মুর সুনির্দিষ্ট একাংশ বাদ দিয়ে সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকা পাকিস্তানের হাতে তুলে দিলেও তা পূরণ হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই। ধর্মীয় ভাবাবেগ উস্কে দিয়ে কাশ্মীরি জনগণের বঞ্চনা-বেদনায় যতই কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জিত হোক না কেন, তা কেবলই মুখোস, যার আড়ালে লুকোনো মুখ কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য কথা বলে। ‘মুখ’ তাই কাশ্মীর সমস্যার একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসাবে অপরিবর্তিত ‘চেনাব সুত্রের’ কথা বলে, যাতে ঝিলম ও চেনাবের উপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বজায় রাখা যায় এবং ফলতঃ নিম্ন অববাহিকায় সিন্ধু নদের জলসিঞ্চন অক্ষুন্ন থাকে। এবং সে ক্ষেত্রেও কাশ্মীর ও জম্মুর বেশ কিছু অংশ নিয়ে যে নতুন ভৌগোলিক অঞ্চলের রাজনৈতিক সীমা পুনর্বিন্যস্ত হবে, সেই অঞ্চলটিকে অঙ্গরাজ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সেই নবলব্ধ অঙ্গরাজ্যের আর্থ-সামাজিক দায়িত্বগ্রহণ পাকিস্তানের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। চেনাব সুত্র মেনে বিভাজন ঘটলে পাকিস্তানের প্রকৃত স্বার্থসিদ্ধি পশ্চিমবাহিনী নদীগুলির উপর নিয়ন্ত্রণলাভ, এবং তার জন্য এই নতুন অঞ্চলটি পাকিস্তানের আশ্রিত ও অনুগৃহিত স্বাধীন রাজ্য হিসাবে (যেমন ভূটান রয়েছে ভারতের) থাকলেই বরং পাকিস্তানের দু’ কুল রক্ষা হয়।

‘চেনাব সুত্র’ নিয়ে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করা সহজতর। চেনাব সুত্রে ভারতকে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের অধিকার ছাড়তে হবে তাই তা ভারতের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী, এ স্রেফ পোষাকী ব্যাখ্যা। চেনাব সুত্র মেনে নিলে ভারতকে লাদাখ বাদে জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগ, বারামুলা, বাদগাম, ডোডা, কুপওয়ারা, পুলওয়ামা, পুঞ্চ, রাজৌরি, শ্রীনগর এবং উধমপুর জেলার গুল-গুলাবগড় ও রিয়াসী তহসিলগুলি পরিত্যাগ করতে হয় যা সরাসরি পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এর ফলে জম্মুর আখনুর অঞ্চলও হারাতে হবে যা পুঞ্চ উপত্যকা ও লাদাখের সঙ্গে সব মরশুমে স্থলপথে যোগাযোগের মূল সেতূ। উল্ল্যেখ করা যেতে পারে যে, এই আখনুরের দক্ষিণে আছে একফালি শীর্ণ ভূখন্ড, সেনা-পরিভাষায় যার নাম ‘Chicken’s Neck’। ১৯৬৫ ও ১৯৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তান এই Chicken’s Neck দখল করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল এবং চেনাবের উপর আখনুর সেতূ প্রায় দখল করেও ফেলেছিল। পরে অবশ্য ভারতীয় সেনা আখনুর পুনর্দখল করে। আখনুর পাকিস্তানের অধিকারে চলে যাওয়ার অর্থ সেই মুরগীর গর্দান পাকিস্তানের কব্জায় চলে যাওয়া এবং সেক্ষেত্রে লাদাখ সহ জম্মু-কাশ্মীরের বাকি যে অংশ ভারতের অধিকারে থাকবে তার সঙ্গে ভারতের মূল ভূখন্ডের যোগাযোগ রক্ষা সম্পুর্ণভাবে পাকিস্তানের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়া একরকম সুনিশ্চিত। কেবল লাদাখই নয়, সমগ্র উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষায় আখনুর এলাকার গুরুত্ব তাই যুদ্ধনীতির আঙ্গিকে অপরিসীম। তাই সামরিক প্রকৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে চেনাব সুত্র মেনে চেনাবের গতিপথকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবে মান্যতা দিয়ে আখনুরের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে ভারতের আপত্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক। তদুপরি, চেনাব সুত্র মেনে নিয়ে ভারতের অংশ হিসাবে পরিগণিত লাদাখ সহ জম্মুর বাকি জেলাগুলি যথা, কাঠুয়া, কারগিল ও উধমপুরের বাকি অঞ্চলগুলির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থে চেনাবের জলের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারানোও ভারতের পক্ষে হজম করা প্রকারান্তরে অসম্ভব। অতঃপর পড়ে কি রইল ? একদিকে চেনাব ও আখনুরের নিয়ন্ত্রণ বাদে কাশ্মীর পাকিস্তানের কাম্য নয়, অন্যদিকে চেনাব সুত্র প্রয়োগে পাকিস্তান মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ দেখালে ভারত সর্বশেষ পন্থা হিসাবে সমরসজ্জা নিতেও দ্বিধা করবে না। অর্থাৎ, কাশ্মীর নিয়ে শত দর-কষাকষি, শত কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন, শত জিহাদ, আজাদির হুঙ্কার, ‘সার্বভৌমত্ব গেল-গেল’ রব, সবই মুখোসের নানা আঁকিবুঁকি। আসলে, দুই দেশের মধ্যে জল-দখলের লড়াই অনিশ্চয়তা ও দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে রেখেছে ভূস্বর্গকে।
মুম্বই-এর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ গ্রুপ কাশ্মীর সমস্যার এই প্রকৃত চরিত্রটি মাথায় রেখে সমস্যাটির সুষ্ঠু সমাধানের জন্য এক সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির (Holistic approach) অপরিহার্যতার পক্ষে সওয়াল করেছেন । এঁরা গোটা বিষয়টিকে ওই সামগ্রিকতার কাঠামোয় ফেলে দু’ পক্ষের জন্যই গেম থিওরির পরিভাষায় একটি ‘win – win’ সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন (২০০৫)। এ প্রস্তাবের নির্য্যাস হ’ল জম্মু-কাশ্মীরের পশ্চিমবাহিনী নদনদীগুলির জলসম্পদের যৌথ ও স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনা। এ ব্যবস্থাপনায় নদনদীগুলির উপরে ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে নানা প্রকল্প গড়ে তোলবার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাকিস্তান ও জম্মু-কাশ্মীরের প্রয়োজন অনুসারে যৌথ তদারকিতে জলসম্পদ বন্টিত হবে। প্রকল্পগুলির নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণও এই যৌথ উদ্যোগের আওতায় আসবে। স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ গ্রূপের এ হেন প্রস্তাবনাটি যে দুই দেশের ধারাবাহিক বিদ্বেষ ও শত্রুতার বাতাবরণে চমৎকার এক প্রশান্তির প্রলেপ প্রদান করে তাতে কোন সন্দেহ নেই, যদিও এই প্রস্তাবের বাস্তব প্রয়োগ  সম্পর্কে স্বভাবতঃই ঘোর সংশয় থেকে যায়। এই ‘সামগ্রিক’, ‘স্থিতিশীল’ জল-ব্যবস্থাপনাটি যৌথ উদ্যোগে সফলভাবে রূপায়ণ করতে হ’লে দু’ দেশের মধ্যে অর্ধ শতাব্দী প্রাচীন সন্দেহ আর বিদ্বেষের মেঘ সরিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার রোদ ওঠা প্রাথমিকভাবে একান্ত প্রয়োজন। এবং সে রোদ আনতে হ’লে তো ব্রিটিশ ভারতের ধর্মভিত্তিক বিভাজন ও তৎ-পরবর্তী রাজনীতির সম্পূর্ণ উল্টো স্রোতে চলবার শপথ নিতে হয় দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলিকে, সীমানার এপার-ওপারে সাধারণ জনমানসে দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসা পারস্পরিক বৈরিতার আমূল পরিবর্তনের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় কোমর কষে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। এ বোধহয় দু’ দেশেরই রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে মুখে আওড়াবার বুলি হিসেবে অত্যন্ত ভালো, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ বড্ড ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে। তাই এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রস্তাবনাটির অলীক আকাশকুসুম হয়ে অনির্দিষ্টতার বাতাসে প্রলম্বিত থাকাই স্বাভাবিক পরিণতি।

মোদ্দা কথায়, একদিকে কাশ্মীরবাসীর সমস্যা, অভাব-অভিযোগ, বঞ্চনা-বেদনা, তার দীর্ঘকালের রক্তক্ষরণ ও বিচ্ছিন্নতা, সময়-সময় ভারতবিদ্বেষ এবং অন্যদিকে স্বাধীনতার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের যে অস্থিরতা, এই দু’টি চরিত্রগতভাবে পৃথক বিষয় হ’লেও অর্ধশতাব্দী ধরে বহু গভীরে শিকড়বাকড় ছড়িয়ে এরা একে অন্যকে এমনভাবে আকঁড়ে ধরেছে যে কাশ্মীরবাসীর ন্যায্য অধিকারের দাবীতে যেকোন আন্দোলনেও সরকার অবধারিত পাকিস্তানের হাত দেখতে পান এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মাত্রায় হিংস্র দমননীতি প্রয়োগ করে থাকেন। প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেনাসঞ্চরণ সুরু হয়ে যায় উপত্যকা জুড়ে। দীর্ঘদিন ধরে অবদমিত মানবতা সেনাবাহিনীর ভারী বুটের তলায় দলিত হয় বারংবার। সেই আহত মননে নতুন করে জমে ভারতবিদ্বেষ আর সে বিষাক্ত মনোজগতে আফজল গুরু-রা শহীদের মর্যাদা পেতে থাকেন, অনেকটা আমাদের দেশের ভগৎ সিংহ বা ক্ষুদিরাম বোসের মত। সীমানার ওপার থেকে পাকিস্তানও নিজের স্বার্থে উপত্যকার সে ক্ষতস্থানে মলম দিতে চেষ্টার কসুর করে না। উপত্যকার আনাচেকানাচে বিদেশী পতাকার বাতাসে ডানা মেলা, আচমকা ছিটকে আসা বুলেট বা গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ভারতের অন্যান্য প্রদেশে কাশ্মীরবাসী ও মূলতঃ ইসলাম-ধর্মাবলম্বী কাশ্মীরবাসীর সম্পর্কে কেমন একটি ভীতিপ্রদ, ঘৃণামিশ্রিত ইমেজারি সৃষ্টি করে, যা আবার জাতীয়তাবাদ ও অন্যান্য ‘ইজম’-এর মোড়কে ভারতের নানা অঞ্চলে নানা ধরণের রাজনৈতিক স্বার্থে হাতে-গরম ইস্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর ডাল লেকের জলে দিনের শেষ রক্তিমাভা মাখিয়ে দিয়ে সুর্য বরফে মোড়া হিমালয়পর্বতের ওপারে অস্ত যায়, ভূস্বর্গের অপার্থিব সুন্দর নৈসর্গ্য নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে, আবার একটি বিক্ষুব্ধ ভোরে জেগে উঠবে বলে।