Wednesday, 31 July 2013

(গুরু) দেব দয়া কর দীনজনে (ট্রেনজনে)

(পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত দৈনিক রেলবিহারীদের একমাত্র সাময়িকী “ট্রৈনিক”-এর বর্ষা-সংখ্যায় প্রকাশিত)

অগ্রজপ্রতিম সম্পাদক ট্রৈনিকের বর্ষা সংখ্যার জন্য একখানি সিক্ত গোছের লেখা হুকুম করেছেন এবং যথারীতি আমি বিপদে পড়েছি। একে আমার রোজকার চারণক্ষেত্রটি সাহিত্যের সততঃ উর্ব্বরা আদিগন্ত সুধাশ্যামলিম প্রান্তর তো নয়ই,  বরং তা থেকে শতেক যোজন তফাতে, তায় নৈকট্য যে দৃষ্টির সামগ্রিকতার অন্তরায় তা বন্ধুজন নিশ্চয় মানবেন। আসলে ট্রেন, বিশেষ করে শিয়ালদহ মেইন লাইনের লোক্যাল ট্রেন আমার জীবনের পরতে পরতে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে যে সে বিজড়িত বিড়ম্বনার ‘ছাড়ালে-না-ছাড়ে-কি-করিব-তারে’-জাতীয় বন্ধন কিঞ্চিত আলগা না হ’লে এর সম্পর্কে সুস্থির হয়ে কিছু বলা বা লেখা (যাতে ট্রেনজনে লেখাটিতে নেকনজর না দিন, একেবারে নেগলেক্ট না করেন) স্রেফ আবেগের কারণেই আমার পক্ষে ভারি শক্ত। সম্পাদককে তাই বিনয়াবনত হয়ে আমার রিটায়ার করা পর্যন্ত আর মাত্র পনেরো বছর অপেক্ষা করতে বলাতেই উনি মার-মার করে উঠে বললেন, বড্ড ফাজিল হয়েছিস দেখছি ; আমি ‘ফাজিল’ কথাটার আরবী অর্থ ধরে নিয়ে বুঝলাম বিপদ এ যাত্রায় এড়ানো অসম্ভব। আবেগে চোখে জল চলে এল ফলে লেখাটা সিক্ত করবার চাপ থেকে অন্তত মুক্তি পেলাম।
        সেই ছোটবেলায় পড়তে হয়েছিল অল রোডস লিড টু রোম (কাঁচরাপাড়া অফিসারর্স কলোনি থেকে আগত আমার একটি অতি আদুরে সহপাঠিনী জিভের দোষে ‘র’-কে ‘ল’ বলতো ফলে বাক্যবন্ধটির অর্থের সামান্য যেটুকু হেরফের হ’ত তার ব্যঞ্জনা আমি অনুধাবন করি আরো বছর পনেরো পর থেকে), এবং আরো ছোট্টবেলায় মনে করতাম অল ট্রেনস লিড টু শিয়ালদা। তা যাই হোক, সেই সারল্যময় সময় থেকেই জেনে এসেছি, দীনজনের অযাচিত স্পর্শ বাঁচিয়ে ট্রেনপথের শুচিতা বজায় রাখেন ওই কালোকোট পরা কাকু। কিছুকাল পরে উনিই, প্রথমে বড়দা এবং আরো পরে শুধু দাদা হিসেবে আমার জীবনট্রেনে অটুট সিংহাসনে আসীন হ’ন। আমি গাঁয়ের ছেলে, কোটপ্যান্ট নামক খানদানি বস্তুটি আমি সেই কাকুর বরাঙ্গেই সর্বপ্রথম দর্শন করি, চলতি ট্রেনপথে ওনার মুখেই সর্বপ্রথম সাহেবদের ভাষা শ্রবণ করি (পরবর্তীকালে অবশ্য আরো শুনেছি, যথা, কনস্টিপেশান ইজ দ্য মাদার অফ থার্টিটু ডিজিজেস)। সে আমলে রাম বা অযোধ্যা মোটেও ছিল না বটে কিন্তু টিকিট চাইতে গিয়ে তেনারা অনেকসময়েই বলতেন – টিকিট প্লিজ। তারপর, কি দাপট তাঁর, টিকিটহীন দীনজন কেমন সুড়সুড় করে ট্রেন থেকে নেমে যেত কামরায় ওনার শিখাগ্র প্রদর্শনের উপক্রম হ’লেই। কামরায় তাঁর প্রবেশ যেন শার্দুল জারাকখান বা রক্তপিপাসু চেংগিজ খানের মত (১, ২ – যাত্রা দু’টি আমি দেখেছি, কিন্তু কোন-কোন অপেরা তা ভুলে গেছি এতকাল পরে)। আর সে কি অন্তর্দৃষ্টি ! একশোয় পঁচানব্বইটা ক্ষেত্রেই তিনি সঠিক চিনে নিতে পারেন কার পকেটে ‘যাইবার পাস’ নেই (ইদানীং অবশ্য আমাদের রাজ্যে এক মহীয়সী  জামাকাপড় বা গায়ের রঙ দেখেই মাওবাদী স্যব্যস্ত করতে পারছেন, আমি স্বাভাবিকভাবেই এতে চমৎকৃত হ’তে পারছি না কারণ শিয়ালদা মেইন লাইনে বহুকাল আগেই আমার অন্তর্দৃষ্টির গুরুকুল দর্শন হয়ে গেছে)। অনেক পরে আমি অবাক হয়ে বহু ভেবেছি, ‘তুমি কেমন করে গান(!) কর হে গুণী’, এবং রেল কর্তৃপক্ষ কি জাতীয় স্ক্রিনিং টেস্টের দ্বারা এই দেবদূতদের নির্বাচন করেন! বুঝতেই পারছেন, ভক্তিমৌসুমীবায়ূর প্রভাবে আমার আবেগ ক্রমশঃ ঘনীভূত হচ্ছে, সামান্য শীতলতার স্পর্শেই বারিধারাপাত আসন্ন।
স্কুলে পড়বার কালে, এ হেন এক প্রবাদপ্রতিম দেবদর্শনের সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি কর্মনিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে কর্তৃপক্ষের পুরস্কারপ্রাপ্ত, তবে দৈনিক রেলাচারী জনতাজনার্দনের আশির্বাদে বেশ কয়েকবার হাসপাতালদর্শন করেছিলেন বলেও শুনেছি। বস্তুত, হাসপাতালের সযত্ন আপ্যায়ণচিহ্ন মোটামুটি নিয়মিতই তাঁর মুখমন্ডলে (‘নিরস তরুবর’ দীর্ঘ সেই কোটপ্যান্টাবৃত শরীরে আর কিই বা দৃশ্যমান ছিল ?) শোভা পেত। সেই সব যত্নআত্তি নিয়েই অনলস তিনি চার-চারটি প্ল্যাটফর্মব্যাপী বাজপাখীর ক্ষিপ্রতায় উড়ে বেড়াতেন এবং তাঁর সুতীব্র অন্তর্ভেদী দৃষ্টি শত মানুষের ভিড়েও চা’য়ের স্টলের আড়ালে আলগোছে দাঁড়িয়ে থাকা দীনজন খুঁজে নিত। অনেককে সসম্ভ্রমে বলতেও শুনেছি, সত্যি লোকটা এত প্যাঁদানি খায়, তবু ছাড়েনা; কষ আছে মাইরি। সেই অপরিণত বয়েসে গভীর বিস্ময়ে ভাবতাম, আচ্ছা উনি তো ওনার কাজটা মন দিয়ে করেন, তাহলে লোকে ওনাকে হেনস্থা করে কেন ? তাহলে এই যে স্কুলে দেববাবু পড়ালেন, চিত্ত যেথা ভয়শূন্য / উচ্চ যেথা শির, তা কি কেবল কথার কথা ? অনেক পরে সরকারি চাকরিতে ঢুকে রসস্থ হয়ে বুঝেছি, কাজে কখনো মন দিতে নেই অথবা উল্টোটা, মনকে কখনো কাজের নিগড়ে বাঁধতে নেই, কারণ এ শিবঠাকুরের একান্ত আপন দেশ। এখানে জৈন না বৌদ্ধ কোন গুরু যেন শিখিয়েছিলেন ‘মঝঝিম পন্থা’, অর্থাৎ ডাইনে নয়, বামে তো নয়ই, এক্কেবারে মাঝামাঝি - তাই শিরোধার্য। এ দেশে নিস্কাম কর্ম বা নিঃস্বার্থ সমাজসেবার নেশা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শেষমেষ জনগণেশের গুঁতোয় বিদূরিত হয়, অতএব সাধু সাবধান।
আমার বন্ধু ছোটনের আবার এই দেবসান্নিধ্যের আকর্ষণ বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের তীব্র ছিল। সে তখন সদ্য এল.আই.সি-র এজেন্ট বনেছে আর আমি তখনও বেকার এবং নাচার ফলে ছোটনের হাতে ভাগ্য সঁপে দিয়ে চলেছি ম্যাটিনিতে কি এক সিনেমা দেখতে। যথারীতি ওভারব্রিজের মাঝখানে সেই অন্তর্দৃষ্টির এক্সরে-তে আমি ধরা পড়ে গেলাম। সৌম্য চেহারার (কাকু বলে ডেকে ফেলেছিলাম প্রায়, এ আর বেশি কথা কি, চেনাজানা শ্বশুরমশাইকেও লোকে প্রথম-প্রথম কাকুই ডাকে) কালোকোট-পরিহিত মানুষটি স্নিগ্ধস্বরে আমার কাছে টিকিট চাইতে আমি ছটফটিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখি, ছোটন টিকিট-পরীক্ষাবৃত্তের বাইরে ব্রিজের শেষধাপে এক পা রেখে দাঁড়িয়ে যেখান থেকে সহজেই এক লাফে স্টেশানের একেবারে বাইরে চলে যাওয়া যায়। আমি আর্তকন্ঠে বললাম, ভাই টিকিটটা দেখা...ছোটন ওইখানেই দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর ভারিক্কী চালে আমায় ডেকে বললো, বঙ্কু, তুমি এক কাজ কর, তুমি বরং কাকাকে ছেড়ে দাও ! কালোকোটের ভিতরে কাকাটি শিউরে উঠে বললেন, বলেন কি মশাই, উনি আমাকে ছাড়বেন কি, ওনাকেই তো আমি ধরেছি ! এই ঘটনার বেশ কিছুকাল পরে টিকিটবলে বলীয়ান আমি সদর্পে সেই একই ওভারব্রিজ পেরিয়ে যেতে যেতে ওভারব্রিজের প্রান্তে কাকাদের কক্ষে গদি-আঁটা সরকারি চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে ছোটনকে খবরের কাগজ পড়তে দেখি। দরজায় ঈষৎ থমকাতেই কাগজ থেকে চোখ তুলে ছোটন আমায় বলল, আরে বঙ্কু, আয় আয়। বিস্ময়ে নয়, স্রেফ চক্ষুলজ্জায় আমি জানতে চাই, তুই এই ঘরে কি করছিস ? ঘরের মধ্যে দু’-চারজন কালোকোট কাকাকে দেখিয়ে ছোটন জবাব দিল, আর কি করব, এই এঁরা সঙ্গে করে নিয়ে এলেন, এখন ডিসিসান নিতে ডিলে করছেন, তাই হোয়াট ক্যান ডু, বসে বসে  নিউজ-পেপারটা একটু দেখছি। এই ছোটনকেই দেখেছি, লাইন টপকে দু’নম্বর থেকে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসা এক কালোকোটধারীকে একান্ত সহমর্মিতার গলায় বলতে, যখন তখন লাইন টপকে আসাযাওয়া করতে হয়, বুঝি জব হ্যাজার্ড, কোনদিন মিসহ্যাপ হয়ে যাবেন; আমার কাছে একটা এল.আই.সি করে রাখুন কাজে লাগবে। আর একদিন, বেলা এগারোটার পিক আওয়ারে শিয়ালদা পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের অফিস-কলেজমুখী জনস্রোত দেখি কোলাপ্সিবল গেটের কাছে একটা ছোট মানববৃত্তে একবারটি হ’লেও উঁকি মেরে যাচ্ছে। আমআকর্ষণ আমি এড়াই কি করে তাই আমিও উঁকি দিলাম। দেখলাম বৃত্তের কেন্দ্রে টিকিটপরীক্ষক ও সোনালি ফ্রেমের ফলস চশমা-চোখে বুশশার্ট পরিহিত যাকে বলে সুটেড-বুটেড আমার বন্ধু ছোটন। টিকিটপরীক্ষক ভুল করে ছোটনের কাছে টিকিট চেয়ে ফেলেছেন, এবং সেই অপরাধে ছোটন তাঁকে তোড়ে ইংরেজি শোনাচ্ছে। ব্যাপারটা কতক্ষণ ধরে চলছিল জানিনা, তবে ভদ্রলোকের ধৈর্য্য এবং কর্মনিষ্ঠা ছিল বলতেই হবে, কারণ  ছোটনীয় ইংরেজির সে হারিকেন ঝড়ের মুখেও তিনি টিকিটের মায়া কাটাতে পারেননি। শেষকালে চশমা, কলম, মানিব্যাগ, ও ফিল্টার উইলস সিগারেটের প্যাকেট (একান্তভাবে ক্লায়েন্টদের জন্য ছোটন পকেটে রাখত) সেই ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে, হাতের অ্যাটাচিকেস তাঁর জিম্মায় রেখে সমবেত জনতাকে হতবাক করে ছোটন কান ধরে ওঠবোস করতে শুরু করল। ভদ্রলোক হাঁ-হাঁ করে উঠলেন, আহা, আহা করেন কি করেন কি, সামান্য একটা টিকিট, কাটলেই তো ঝামেলা মিটে যেত; কয়েকবার ওঠবোস করে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে ছোটন বললো, আপনার ভাগ্য ভাল আজ ছেড়ে দিলাম, পরেরবার ধরলে পুরো পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মটার এ মাথা থেকে ও মাথা নাকখত দেবো বলে দিলাম, সামলাবেন তখন! হতভম্ব মানুষটার হাত থেকে নিজের জিনিসপত্র নিজেই তুলে নিয়ে অ্যাটাচিকেস বাগিয়ে ছোটন বীরদর্পে গেট পেরিয়ে বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রীটের ভীড়ে বিলীন হ’ল। শতখানেক লোকের কৌতুক-মাখা চাহনির সামনে দানবের (নেহাতই আলাদা করে উল্ল্যেখ করবার জন্য বলা, আসলে ছোটনও দেবতা, সে দীন জনগণদেবতার প্রতিভূ) হাতে দেবতার এই লাঞ্ছনার কথা ভাবলে আজও চোখে জল আসে।  
দেবদানব আখ্যানে আরেকজনের কথা বলি। পিংকি ব্যানার্জী (পুং) সে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দু’ ক্লাসের জুনিয়ার, স্প্যানিশ গিটারে বড় সরেস হাতখানি তার। আমি এম.এ পাস দিয়ে সিকিম ভ্রমণে যাব জেনে দার্জিলিং মেল ছাড়বার মুখে পিঠে গিটার ঝুলিয়ে সটান প্ল্যাটফর্মে এসে হাজির, বলে গুরু আমিও যাব। আমি বলি, যাবি কি রে, টিকিট ? সে  বললো, ও ব্যাপারে তুমি টেনশান নিও না, আমার জীবনের একটাই স্বপ্ন, বিনা টিকিটে ভারতদর্শন করবো। এ হেন হবু স্বামী বিবেকানন্দকে নিরস্ত করা আমার কম্ম নয়। এইখানে পিংকির পরিচ্ছদের (ওটা কোনভাবেই পোষাক নয়, অথবা ওটা পোষাক হ’লে, আমি যা পরেছিলাম সেটা পোষাক নয়, অন্যকিছু। পরে জেনেছিলাম ওটা পিংকির নিজের ডিজাইন করা) একটা যেমনতেমন বর্ণনা না দিলেই নয়। উর্ধাঙ্গে একখানি জ্যালজ্যালে সাদা ধরণের গোলগলা গেঞ্জি যার পিঠে একটি বৃহৎ কালো পদচিহ্ন আঁকা নীচে লেখা “ড্যাডস” (অর্থ হ’ল, বাবা হতাশ হয়ে লাথি মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন)। রঙচটা মলিন জিন্সের দু’ হাঁটুতে দু’খানি তাপ্পি, যার একটাতে ডটপেনে লেখা “এটা কি ?” আর অন্য হাঁটুতে লেখা “এটা কিছু নয়” (অর্থ জানিনা, পিংকিও বলেনি)। তা যাই হোক, আমার থ্রি-টিয়ার লোয়ার বার্থটিতে গ্যাঁট হয়ে বসে পিংকি গিটার ধরল। ঘন্টা দেড়েক পর নিয়মমাফিক দেবাবির্ভাব। আমি কম্পিত হস্তে একখানা (আমার) টিকিট দেখালাম, উনি তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে (কি করে হবেন, আমরা যে প্রমাণ সাইজের দু’-দু’জন, তা তো উনি সাদা চোখে দেখতেই পাচ্ছেন) গিটারসাধনরত পিংকিকে বললেন, এই যে ভাই, টিকিট ? মুখ না তুলেই পিংকি বললো – মিছিল আছে। কার মিছিল, কোথায় মিছিল ? না, কাল শিলিগুড়িতে এসইউসি-র মিছিল আছে আর ইনি তাতে গিটার হাতে পিট সিগারের ভূমিকায় নামতে চলেছেন, ওঁকে বিরক্ত না করলে আখেরে সমাজের মঙ্গল। কালোকোটদেব হাজার হ’লেও সামাজিক জীব, তাই মানে মানে পরের বার্থের শরণাপন্ন হলেন। রাত বয়ে ভোর হ’ল, গাড়ি লেটে যাচ্ছে। এমন সময় শুনলাম, গাড়িতে ভিজিল্যান্স উঠেছে। এও শোনা গেল, ডালখোলার আগে ভিজিল্যান্স ধরলে নাকি কাটিহারে চালান করে দেয়। আমি পিংকিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললাম, শিগগির বাথরুমে গিয়ে লুকো, ধরা পড়লে কাটিহার চালান করে দেবে। হাই তুলে পিংকি বললো, ফালতু টেনশান খাচ্ছো গুরু, আমি গ্যাংটকও যাইনি কাটিহারও যাইনি। ধরলে কাটিহার ঘুরে আসব কি আছে! এর পর, বোঝাই যায়, আমার বাথরুমে লুকোবার পালা এল। সেকালে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশান থেকে বেরোবার একটিমাত্র ওভারব্রিজ ছিল আর তার মাঝামাঝি জায়গায় দেবতারা নিয়ম করে (অর্থাৎ, স্টেশানে ট্রেন ঢুকলেই) দর্শন দিতেন। যাকে বলে পুরো নিশ্ছিদ্র বন্দোবস্ত। পিংকিকে বললাম, ভাই তুই স্টেশান ঢোকবার আগে গাড়ী স্লো হ’লে নেমে যা। ও বললো, (টেনশান খেও না) তোমার টিকিটটা একবার দাও। দিলাম। নিয়ে টিকিটটার পেছনে কি সব গিটারের নোটেশান-ফোটেশান লিখে আমায় ফেরত দিয়ে বললো, তুমি চেকারকে টিকিটটা দিয়ে আগে বেরিয়ে যেও। - আর তুই ?; (টেনশান খেও না) ও আমি ঠিক বেরিয়ে যাব দেখো। পাহাড়ে গিয়ে তোমার সবকথা শুনে চলবো গুরু । কি আর করি, আমি শ্লথগতিতে আমার ব্যাগটা টেনে ব্রিজে উঠে চেকারকে টিকিট দিয়ে স্টেশান ছেড়ে বেরোনোর মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম, যেখান থেকে ব্রিজের উপরটা দেখা যায়। মিনিট কয়েক পর দেখি গিটার ঘাড়ে পিট সিগার দুলকি চালে টিকিটচেকারের সামনে এসে দাঁড়ালো এবং দাঁড়ালোই। ক্রমে চারপাশে ভীড় জমতে জমতে গিটার-চেকার সব ঢেকে দিল। আমি আর থাকতে না পেরে আবার ফিরে ব্রিজে উঠে ব্যাপারখানা কি দেখতে যেতে বাধ্য হলাম। দেখি পিংকি সজোরে চিৎকার করে সমবেত জনতাকে বলছে, আমি ওনাকে টিকিট দিলাম, তাও উনি আমার কাছে একশো টাকা ঘুষ চাইছেন; ওনাকে বারবার বলছি আমি দুঃস্থ সঙ্গীতশিল্পী পকেটে একটা পয়সা নেই, প্রোগ্রামে বাজাতে এসেছি অরগানাইজাররা টিকিট করে দিয়েছিল; ওই দেখুননা ওনার হাতে আমার টিকিট, পেছনে গিটারের নোট লেখা আছে...দেখুন আপনারা দেশের কি অবস্থা...(ইত্যাদি)। নব্বই দশকের প্রথমভাগে মানুষ তখনো নারকীয় রকমের উগ্র হয়ে ওঠেনি বলে সে যাত্রা সেই টিকিট-পরীক্ষকের রেললীলা সেইদিনই সাঙ্গ হয়ে যায়নি।
এ কাহিনী অনিঃশেষ, তবু আপাততঃ ইতি টানবার সময় এসেছে। আমি নেহাতই নশ্বর মানব, দেবদানবে অচলা ভক্তি আমার পাথেয়। কে কাকে টেক্কা দেবেন, কার জোর বেশি, এ জাতীয় কুতর্কে আর যাই হোক, বস্তু মিলায় না। তাই তাঁদের খুরে-খুরে দণ্ডবৎ হয়ে প্রণতি জানাই, তাঁদের সমুদ্রমন্থনসঞ্জাত অমৃতের প্রসাদকণিকামাত্র আমার এ অকিঞ্চিতকর দীনহীন রেলায়িত জীবন সততঃ ধন্য করেছে। অথঃ দেবদানবনামাস্য প্রথমো সর্গঃ সমাপ্ত।


Sunday, 7 July 2013

বাকি কাজ

সাতসাগরের পারে আর যাওয়া হ’ল কই
তেরো নদী পার হ’তেই বিষম হইচই।
**********
একা-একাই গাইতে গেলাম পাহাড়িয়া ধুন
বাঁশিতে লাগল ছেঁকে নাছোড়বান্দা ঘুণ
গলাতেও লাগল কখন ঠান্ডা ভিজে হাওয়া
নানা কথায় ডুবে গেল সাধের সে গান গাওয়া...
*********
তেরো নদী পেরিয়ে এসে সমে পড়ল যতি
ভালোবাসা সরিয়ে রেখে মেনে নিলাম নতি
অন্তবিহীন বয়ে চলে ঝোড়ো শীতল হাওয়া
রইল বাকি এখন শুধু আগুন জ্বেলে যাওয়া।
*********
তেরো নদীর পার হ’তেই বিষম হইচই
আগুন জ্বেলে নদীর পারে একলা বসে রই।।