বড় আচম্বিতে ঋতুপর্ণ
ঘোষ চলে গেলেন। ভালো কাজ করছিলেন, আমি অবশ্য মনে করতাম ওনার সেরা কাজ is yet to come । হঠাৎই দাঁড়ি পড়ে গেল যেহেতূ তাই ঋতুপর্ণর প্রতিভার সেরা দ্যূতি আমার দেখা হল
না। আমার দেখা ওনার সেরা ছবি দু’টি হল, শুভ মহরৎ এবং হীরের আংটি। কারোর সঙ্গে এ ব্যাপারে
একমত হওয়ার কোনো দায় আমার নেই। ওনার সাক্ষাৎকার বা অন্য প্রোগ্রাম যেমন ‘এবং
ঋতুপর্ণ’ টিভিতে দেখতে ভালো লাগত, শীলিত শিক্ষিত বাঙালী দেখলেই আমার ভীষণ ভালো
লাগে। কথায় বার্তায় ঠিকরে বেরোত ওনার শানিত বুদ্ধি, প্রশংসনীয় পড়াশোনা আর স্নিগ্ধ
রুচি। এই সব গুণই আমায় ওনার প্রতি আকৃষ্ট করে এবং এই সব ক’টি গুণকেই আমি হিংসে করি,
যার যা নেই তাতে তার হিংসে হওয়াটা নিন্দনীয় হ’লেও জাগতিক ব্যাপার। সৃষ্টিশীল মানুষ
শারীরিকভাবে সক্ষম না থাকলে কি বেদনাময় ঘটনা ঘটে তা বাংলা সাহিত্য ও কলাশিল্প জগত
ভালোই জানে। তাই মনে করি, ঋতুপর্ণ আরো বছর বিশেক অন্তত থাকতেই পারতেন, চলে যাওয়ায়
ক্ষতির মাত্রাটা তাই আরো দুঃসহ ঠেকে।
আশির দশকের শেষ ও নব্বই দশকের প্রথমভাগে বাংলা ছবির এক চরম দুঃসময়ে ঋতুপর্ণর
কাজ এক নতুন বাঁক নির্দ্দেশ করে সন্দেহ নেই, যে পথে বর্তমানে বাংলা ছবি বেশ
গড়গড়িয়ে ছুটছে। সেই সময়কার প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব-গৌতম-অপর্ণা গুটিকয়কে
মনে রেখেও বলা যায়, এঁরা একদিক থেকে বড় বেশি সত্যজিৎ-ঘরানার (আমার পিতা বাদে যে
পুরুষটি আমায় সবচেয়ে আকর্ষণ করেন, তিনি সত্যজিৎ রায়), জনপ্রিয়তার আগে উৎকর্ষতার
সাধনা যাঁর ঘোষিত অভিজ্ঞান। আগে উৎকৃষ্ট হোক, তারপর যদি তা জনপ্রিয়ও হয়, তবে তো কথাই নেই (পথের পাঁচালী
হয়েছিলো, কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং আরো কয়েকটি হয়নি) । জনপ্রিয়তাকে সত্যজিৎ মান্যতা দেননি
একথা বলবার মত বুরবক আমি নই, তবে সত্যজিৎ নিজে জানতেন তাঁর ছবি বাংলার আমজনতা সাধারণভাবে দেখতে পছন্দ
করে না, তাঁর ছবির একটি ছোট সুনির্দিষ্ট দর্শকমন্ডলী আছে। তাঁর সাক্ষাৎকারে একথা
তিনি বেশ কয়েকবার বলেছেন, সঙ্গে বোধহয় ঈষৎ আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, তাঁর ছবি
ফ্রান্সে সমাদৃত হয় বেশি। অসম্ভব পরিমিতি (প্রথম ছবি তৈরি করতে অর্থসংকুলানে বিপুল
ঝক্কি থেকে সঞ্জাত নয় তো ? কি জানি), মেদহীনতা, মেলোড্রামা জাতীয় আবেগের বিস্ফোরণ
থেকে শত হস্ত দূরে থাকা, নিখুঁত ডিটেলিং, না-বলা কথায় কেবল ছবির ফ্রেমে কথা বলে
দেওয়া সত্যজিৎ-এর জগতখ্যাত সিগনেচার মার্ক। দুর্গার মৃত্যুর পরে চুরি করা হারটা
খুঁজে পেয়ে সেটা পানাপুকুরে অপু ছুঁড়ে ফেললো, পানা সরিয়ে হার ডুবে গেল, জলের
সামান্য ঢেউ মিলিয়ে যেতেই আবার পানা এসে ছেয়ে ফেললো, বোঝাবার উপায় রইলো না দুর্গা
হারিয়ে গেল চিরতরে। অথবা, মুখর ও মদির জলসাঘরে পানপাত্রে ডুবে যেতে যেতে আলোর পোকার
ডানা ঝাপটানো দেখে বুঝতে হবে যে একটু পরেই জমিদারের স্ত্রী ও নাবালক পুত্রের
মাতুলালয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারানোর খবর আসবে এবং জমিদারের জীবনে ঘনাবে
শেষের শুরু, ওষুধের বশে যুদ্ধবাজ শুন্ডীরাজা ওষুধ না খেলে অরিগ্যামি করে সাদা
কাগজের পায়রা কেন বানান – এই সব দেখেই আমরা সত্যি করে সিনেমা দেখা শিখেছি। যে সব
ছবির প্রকৃত রসাস্বাদন দাবী করে নিবিঢ় দর্শন মারফত এই সব মননশীল অধ্যয়ন, তা মাঠে
ঘাটে ইয়ার্কি মারতে মারতে দেখবার তো নয়, এবং তাই সেগুলো আমজনগণেশের আশির্বাদ যে সব
সময় পাবে না তা বলাই বাহুল্য। আমি যেটা বলতে চাইছি, তা সোজা কথায়, সত্যজিৎ ও তাঁর
ঘরানার মূল প্রণোদনা ছিলো ভালো ছবি বানানো, তাতে ক্যাপটিভ অডিয়েন্স যত ছোটই হোক না
কেন, ছবির মানের প্রশ্নে আপস নৈব নৈব চ। সত্যজিৎ বোধকরি এত দ্বারা বাঙালী দর্শকের
চলচ্চিত্র শিক্ষার বুনিয়াদ তৈরী করে দিয়ে গিয়েছেন। মান ও জনপ্রিয়তা দু’টো মিশলে খুবই
ভালো, তবে সংঘাতের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্টের পক্ষে স্বভাবতঃ দাঁড়াতেন বলেই বোধহয় একটা
সাধারণ ধারণা বাংলা শিল্পসাহিত্য জগতে ছড়িয়ে পড়ে যে, জনপ্রিয় বস্তু মাত্রেই শস্তা
রুচির, খেলো ব্যাপার। কিন্তু আমি যে অস্বীকার করতে পারবো না, আমার ব্যাটলশিপ পোটেমকিনের
চেয়ে দ্য গ্রেট ডিক্টেটর দেখতে বেশি ভালো লাগে, কি করবো, সেই ছোটবেলা থেকে ভূগোল
বইএ আফ্রিকার ভূপ্রকৃতি পড়বার চেয়ে চাঁদের পাহাড় বেশি ভালো লেগে এসেছে যে। পৃথিবীতে
চার্লি চ্যাপলিনের নাম শুনেছেন এমন লোকের সংখ্যা আইজেনস্টাইনের নাম শুনেছেন যাঁরা,
নিঃসন্দেহে তাঁদের কয়েক শো গুণ বেশি। সূক্ষ্ম কন্টেন্টের সবচেয়ে ধারালো বাহক
যথাযোগ্য ফর্ম, শিল্প বুঝি সেই মহামিলনেই হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যাঁদের সম্পর্কে বলছি,
তাঁরা মানবেন বলে মনে হয় না, তবে আমার মনে হয়ে এসেছে, তাঁরা বড্ড কন্টেন্ট সচেতন,
ফর্মের পরীক্ষা নিরীক্ষা তাঁরা একেবারে করেননি একথা বলা স্রেফ মিথ্যে কথা হয়ে
যাবে, তবে এ কথাও ঠিক যে, ফর্ম বাছতে গিয়ে তাঁরা তাঁদের মাথা থেকে সেই ছোট্ট
টার্গেট অডিয়েন্সের চাহিদার কথা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারেননি। মৃণাল সেনের কোরাস
দেখা আছে ? অথবা মহাপৃথিবী ? অথবা খন্ডহর ? ওগুলোর চেয়ে ভুবন সোম, বা আকাশকুসুম বা
আকালের সন্ধানে ঢের আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা নয় কি ? কোরাস বা কলকাতা ৭১-এর চেয়ে
জনঅরণ্য বা অন্তহীন দেখতে বেশি ভালো লাগে না ? আমার অত্যন্ত হতাশ লাগে যখন ভাবি
বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উত্তরা ছবিটির শেষ দৃশ্য যেখানে সন্ধ্যের নিমীলিত আলোয় ঢেউ
খেলানো দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যাওয়া মালগাড়ির বামন রেলগার্ড আর্ত মেয়েটিকে বলছে, “আমার
গাঁয়ে যাবে ? সেখানে কেউ কাউকে মারে না” – আহা এমন একটি দৃশ্য আমার দেশের বেশির
ভাগ মানুষ দেখলো না, ফলে কিছুই বুঝলো না!
এ বিষয়ে আলোচনায় উৎসাহী উৎপল দত্তের চায়ের ধোঁয়া বইটিতে জনপ্রিয়তা ও আলমগীর
নামক অসামান্য পরিচ্ছেদটি পড়ে দেখতে পারেন। সত্তর-আশির দশক জুড়ে এ ধারা এমনই হাড়ে
মজ্জায় ঢুকে যায় যে লোকে ভুলেই গেল, এ জিনিস সার্থকভাবে প্রয়োগের পিছনে কি অপরিমাণ
অনুশীলন, পড়াশোনা ও বীক্ষণ প্রয়োজন। সেগুলো আয়ত্ত্ব করাবার কঠিন কাজটা এড়িয়ে বাঙালী
স্বভাবগুণেই সহজতর পথটা নিলো, হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়লো সত্যজিৎ হতে। অযোগ্য হাতে পড়ে
পুরো ব্যাপারটাই হয়ে দাঁড়ালো এক আরোপিত দুর্বোধ্যতার চর্চা। সর্বব্যাপী এই ‘আর্ট ফর আর্টস শেক’ -এর ফলে
হরেদরে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেল যে বাজার না পেলেই বাঙালী তার সত্যজিৎীয়
উত্তরাধিকারে নাক সিঁটকিয়ে বলা শুরু করলো, আমার কাজ তো সকলের জন্য নয়, ও জিনিস
বুঝতে গেলে মাথা লাগে। আমজনতা আমার তুলনায় অল্পশিক্ষিত, তুলনায় বোধবুদ্ধিহীন তাই যেন
অস্পৃশ্য, তার ছোঁয়া কতটা বাঁচিয়ে চলা গেলো সেটাই শিল্পকর্মের মান যাচাই-এর নিরিখ।
ছবি চলবে কেবল মিনার-বিজলি-ছবিঘর চেইনে, যদি বাই এনি চান্স তা কমলপুরের কমলা হলে
সাতদিন টেনে দেয়, তো ছ্যাঃ, সে নেহাতই পাতলা ছবি। প্রোডিউসার অবশ্য কমলার সাতদিনের
দান সযত্নে গুণে গেঁথে রাখে। ক্রাইসিসটা বাংলা সিনেমা, বাংলা কবিতা এবং কিছুটা
হ’লেও বাংলা নাটকে দারুণ ভাবে ছড়িয়ে পড়লো। মান তার মানদন্ড হারিয়ে স্বেচ্ছাকৃত
দুর্বোধ্যতার ঘেরাটোপে নিজেকে বন্দী করলো এক শ্রেণীর পণ্ডিতম্মন্য মানুষের মদতে।
কিন্তু বাজার তো পড়ে থাকে না, বাংলার মফঃস্বলে-গ্রামে এই সময়েই ব্যাঙের ছাতার
মত খুলে গেল ভিডিও হল, সেখানে শুরুর দিকে বেশির ভাগ সময়েই কি জিনিস প্রদর্শিত হতো
সে সবাই জানে (আমি দু’চার বার ঢুকে দেখে এসেছি, সদ্য সাবালক হিসেবে খুব খারাপ
লেগেছিল বলতে পারবো না)। আর ক্রমে ক্রমে হৈ হৈ করে এসে পড়লো শত্রু, নবাব, বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না।
উন্নাসিকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাংলা জুড়ে রমরমিয়ে ব্যবসা দিতে লাগলো এরা।
প্রোডিউসারকুল তো উশখুশ করছিলেনই, এইবার রাস্তা পেয়েই সটকে পড়লেন। সেচের জল শুকিয়ে
যেতেই ঈষৎ গভীর ধরণের বাংলা চলচ্চিত্র যা সত্যি করে মানুষকে ভাবাতে পারে, মনোভূমির
উর্ব্বরাশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে, তার ক্ষীণ ধারাটিও মরুপথে বিলীন হয়ে গেলো। বাংলা
ছবিতে অগ্রগতির স্বার্থে একান্ত জরূরী পরীক্ষানিরীক্ষার পথ রুদ্ধ করে দিলো নিদারুণ
অর্থাভাব।
ঋতুপর্ণকে বুঝতে হবে এই সংকটকালের প্রেক্ষাপটে। ঋতুপর্ণর আকস্মিক প্রয়াণে
শোকার্ত অনেক সেলেব্রিটির স্নেহসিক্ত বা শ্রদ্ধাবনত বক্তব্য ও লেখাপত্তর দেখলাম। ঋতুপর্ণর
স্মরণে কেউ বলছেন, হি রিডিফাইন্ড বেঙ্গলী সিনেমা (আমি দেখেছি, আবেগ প্রবল হ’লে
বাঙ্গালীরা অনেকসময়েই মাতৃভাষাটা সাময়িক বলতে ভুলে যান), উনি বাংলা ছবির চরম
দুঃসময়ে হাল ধরে বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ইদানীং বাংলায় সব বিষয়েই যিনি প্রথম
ও শেষ কথাটি বলেন (ভাগ্যিস বলেন) তিনি বলেছেন, ‘স্বর্ণযুগের স্বর্ণশিল্পী’-র
অকালপ্রয়াণে তিনি শোক জানাবার ভাষা পাচ্ছেন না (পেলে খারাপ হতো না, আমরা জানতে
পারতাম ঋতুপর্ণ সোনার কাজ ছাড়া আর কি কি পারতেন)। ঋতুপর্ণর কাজ বাংলা চলচ্চিত্রের
মনোযোগী গবেষক মন দিয়ে ঘাঁটবেন এই জন্য যে তিনি ওই দুঃসময়ে ভালো ছবির ফর্ম নিয়ে
সাহসী পরীক্ষানিরীক্ষা তো চালিয়েইছেন, এবং তার জন্য তাঁর অর্থানুকুল্যের অভাব
ঘটতেও দেননি। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, ঋতুপর্ণ ছবি তৈরির অর্থনীতিটা সমকালীন অনেক
চিত্রপরিচালকের চেয়ে ঢের পরিষ্কার করে বুঝতেন। প্রযোজকের লগ্নীকৃত পয়সা ফেরত দেওয়া
যে পরিচালকের পক্ষে পরের পরীক্ষাটি চালাবার জন্য একান্ত আবশ্যক একথা তিনি মাথা
থেকে উবে যেতে দেননি কখনো, স্তাবকতা আর নিন্দার হড়কা বানের মধ্যেও না। এর জন্য বড়
স্টার কাস্ট করা থেকে শুরু করে বিবিধ তথাকথিত জনপ্রিয়তা লাভের প্রকরণ প্রয়োগ করতেও
পিছপা হ’ননি। আমি কোনমতেই বিশ্বাস করতে রাজি নই যে, প্রসেনজিত বা ঐশ্বর্য রাই বা
অভিষেক বচ্চন বা জ্যাকি শ্রফ বা বিপাশা বসু তাঁর ছবিতে যে যে চরিত্রে আবির্ভূত
হয়েছেন সেই সব চরিত্রে তাঁরা যাকে বলে অটোম্যাটিক চয়েস ছিলেন। কিরণ খের অভিনীত
বাড়িউলির চরিত্র অন্য বঙ্গভাষী কেউ করলে কি ক্ষতি হ’ত ? বা অর্জুন রামপালের জায়গায়
তুলনায় অল্প পরিচিত বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের কেউ ? এমন কি অমিতাভ বচ্চনকেও কি লাস্ট
লিয়ারে অপরিহার্য বলে মনে হয় ? যেমন অপরিহার্য মনে হয় মগনলাল হিসেবে উৎপল দত্তকে ?
বা জটায়ু হিসেবে সন্তোষ দত্তকে ? বা ওই সন্তোষ দত্তই জনঅরণ্যে একটা ছোট্ট দালালের
চরিত্রে ছিলেন, লিফটে যাঁর সংগে প্রদীপের আলাপ হয়েছিল, সেই একটি দৃশ্যে সন্তোষের
কেবল অ্যাপিয়ারেন্সে নয়, দালালসুলভ চাহনিতেই স্পষ্ট কেন ওই চরিত্রে অন্য কেউ নন। যেমন
নায়কে উত্তমকুমার, তাই অটোগ্রাফে প্রসেনজিত আসবেনই। কাঞ্চনজঙ্ঘায় ছবি বিশ্বাসের
জায়গায় কষ্ট করেও কমল মিত্তিরকে ভাবা যাবে কি ? অথবা অরণ্যের দিনরাত্রিতে রবি
ঘোষের জায়গায় অন্য কেউ ? (খুঁটিয়ে যদি কেউ এ লেখা এ পর্যন্ত পড়ে থাকেন, তিনি
এইখানে নির্ঘাত ভাবছেন, ব্যাপারটা কি, এখনো এ ব্যাটা সৌমিত্রের নাম করে না কেন ?
সৌমিত্র আমার বিচারে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা গত ত্রিশ বছর ধরে, কিন্তু
সত্যজিৎ-এর ‘ডিরেক্টরস অ্যাক্টর’-কে আমার অপুর সংসারের অপু এবং দু’টি ফেলুকাহিনীতে
ফেলুদা বাদে সত্যজিৎ-এর বাকি যে বারোটি ছবিতে উনি অভিনয় করেছেন, তার কোনোটিতে
একান্ত অপরিহার্য বলে মনে হয়নি। এ অনুভবের সঙ্গে সৌমিত্রের অভ্রংলিহ অভিনয়দক্ষতার
কোনো সম্পর্ক নেই। বরং আমার হুইলচেয়ারে ওনাকে অপরিহার্য বলে মনে হয়েছে। আশা করি
আমি ঠিক কি বলতে চাইছি তা বোঝাতে পেরেছি।) আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই সমস্ত
কারুকার্য করে ঋতুপর্ণ তাঁর চিন্তাশীল
দর্শকমন্ডলীর খোরাক যেমন জুগিয়েছেন, একই সঙ্গে টার্গেট অডিয়েন্সের কুসুমের বাইরেও
একটা বেশ পুরু গোছের দর্শকস্তর তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন যাদের দর্শনেন্দ্রিয়ের
সঙ্গে অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের যোগ যত প্রবল, মস্তিষ্কের সংযোগ ততটা নয়। এ বড় সহজ কাজ
নয়। ফলতঃ ঋতুপর্ণ গালি কম খাননি, তথাকথিত ‘শস্তা’ প্রকরণ ব্যবহারের জন্য নাক-উচুঁরা
তাঁকে মোটেও ছেড়ে কথা বলেননি। কৌশলী ঋতুপর্ণ সমালোচনাকেও তাঁর ছবির বিপণনে কাজে
লাগিয়ে দিয়েছেন তাঁর মিডিয়ার বন্ধুদের হাত করে, তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, ছবি
করা চালিয়ে যাওয়া; ভালো ছবি, তাঁর বিশ্বাস ও রুচিমত ভালো ছবির ভাষার অন্বেষণ তাঁর
চলচ্চিত্র পরিক্রমার সর্বাংগে। তাঁর সঙ্গে একমত নাই বা হলাম, কিন্তু মানতে কোনো
অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে তাঁর পথ ধরেই শুকিয়ে আসা সিরিয়াস বাংলা ছবির ধারাটি নতুন
করে সঞ্জীবনীসুধা লাভ করেছে ;
শত্রু-মিত্র, সেজবউ-মেজবউ, নবাব-মস্তান বা বেদের মেয়ে-টেয়েরা ইদানীং বেশ কোনঠাসা
হয়ে পড়েছে দেখাই যাচ্ছে। ঋতুপর্ণ আগে না ঘটে গেলে অটোগ্রাফ বা অন্তহীন বা ব্যোমকেশ
বা হালের শব্দ ফোরাম-আইনক্স জাতীয় মাল্টিপ্লেক্সে পর্দা পেত কিনা ঘোর সন্দেহ আছে
এবং সাধারণ লোকে এসব দেখবার কথা ভুলেও ভাবতো নাকি ? আমার মনে হয় ঋতুপর্ণর আসল
অবদান হচ্ছে, পুতুপুতু ন্যাকা-ন্যাকা, ন্যাংটো হবো ইচ্ছে আছে, কিন্তু ওমা-কেউ-দেখলে-হবো-না-যাও-মার্কা
ভিক্টোরিয়ান প্রুডারি-মোড়া বঙ্গ ছায়াছবির জগতে তিনি সাবালকত্ব আমদানি করবার চেষ্টা
করেছিলেন সোচ্চারে ও সদর্পে। বিষয় নির্বাচন থেকে নরনারীর সম্পর্কের জটিলতম
টানাপোড়েনে খোঁজবার চেষ্টা করেছিলেন বাংলায় এ তাবৎকালে অদর্শিত চলচ্চিত্রের নুতনতর
ও আধুনিকতর ভাষা। দহনে স্ত্রীকে স্বামীর ধর্ষণ দৃশ্য এর ক্ল্যাসিক উদাহরণ। এই
দৃশ্যে স্বামীর সংলাপেও রেপ কথাটার উল্ল্যেখ আছে। তাঁর কাজে এ রকম উদাহরণ
ভুরি-ভুরি। মুশকিল হচ্ছে, এখানেও সেই শীলন, সেই মননশীলতা, সেই রুচিবোধ অপরিহার্য,
না হ’লে রঁদ্যা আর বটতলা এক হয়ে যেতে পারে। এবং গেলোও খানিকটা তাই। হঠাৎ করে বড়
হওয়ার মুক্তির স্বাদ, বা দীর্ঘদিনের অবদমিত স্পৃহা শিয়ালদহ সাউথের ফটাস-জলের মতো
বোতলমুক্ত হতে লাগলো। প্রবল হাওয়ায় দুলতে শুরু করলো বাংলা সিনেমা এবং সাহিত্য,
মূলতঃ বাংলা গল্প-উপন্যাস। ঠিক আগেরবারের মতই এবারেও বুড়িচাঁদ বেনোজলে ভেসে যাবার
উপক্রম হলো। এই অন্ধকারে কোন কারণটারণ ছাড়া নারীপুরুষের ধস্তাধস্তি দেখতে (বা
পড়তে) যাঁরা রাজি হবেন না, তাঁরা চিহ্নিত হবেন ব্যাকডেটেড বলে। কোনো নির্দিষ্ট
ছবির নাম করতে চাই না তবে সাহসের নামে আদতে বিনা কারণে কথায় কথায় নরনারীর অশ্লীল ক্কুকুরপ্রতিম
যৌনতা প্রদর্শনই মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠলো। পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফে চাকুরিরত আমার
বন্ধু ছোটু এই ধরণের ছবির নামই দিয়ে ফেললো আর্ট ফিল্ম। এবং এই আর্ট ফিল্মেরও একটা
ক্ষুদ্র বাজার সৃষ্টি হয়ে গেলো যা ডিভিডির কল্যাণে বহুগুনিত হ’তে থাকলো খানিকটা
যেন অলক্ষ্যেই । অনেকটা চুটকি ট্যাবলয়েডের মত, যেগুলো শিক্ষিত বাঙ্গালীর বসবার
ঘরের চায়ের টেবিলে পড়ে থাকলে গৃহস্থের শ্লাঘা ও পারিপার্শ্বিকে তাঁর মর্যাদাবৃদ্ধি
হয় এবং নিভৃত সময়ে অন্য কর্মেও কাজে লাগে। অবশ্যই এর দায় ঋতুপর্ণর নয়। না হ’লে
চিৎকৃত বিকৃত উচ্চারণে গাওয়া বাংলা ব্যান্ডের (সবগুলো অবশ্যই নয়, তবে বেশির ভাগ,
যাদের অনেকেই বেশ জনপ্রিয় হয়েছেন ইদানীং) কৃতকর্মের দায় সলিল চৌধুরী, কবীর সুমন বা
তাঁরও আগে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের উপর বর্তায়।
১৯৯২তে প্রথম ছবি হীরের আংটি দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে গত একুশ বছরে ঋতুপর্ণ নয়-নয়
করে একুশটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি পরিচালনা করেছেন, যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন বলতেই হবে।
(প্রসঙ্গতঃ, সত্যজিৎ ১৯৫৫-এ পথের পাঁচালী মুক্তি পাওয়ার পরে ১৯৯২ পর্যন্ত সাঁইত্রিশ
বছরে আঠাশটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি করেছেন।) বিষয়ের বৈচিত্র্যে তিনি বিশেষ আলোচনার
দাবী রাখেন, তবে একটি কথা এ প্রসঙ্গে না বলে থাকতে পারছি না যে, মানবের নানা
স্তরের সম্পর্কের বিশ্লেষণে তাঁর যত আগ্রহ তাঁর ছবিতে দেখা গেছে, সমকালীন দেশ ও
সমাজের আর্থ-রাজনৈতিক অস্থিরতার উত্তাপের বিশেষ কোনো আঁচ তাঁর ছবিতে আমি লক্ষ্য
করিনি। ব্যষ্টিস্বত্তা বিশ্লেষণে তাঁর দক্ষতা ছিলো প্রশ্নাতীত, কিন্তু বোধহয়
সচেতনভাবেই সে দক্ষতা তিনি সমষ্টির চেতনজগতের ক্ষেত্রটি তলিয়ে দেখতে প্রসারিত
করেননি। তাঁর ব্যতিক্রমী জীবনাচরণ, বেশভূষা বা বাচনশৈলী নিয়ে কোন আলোচনায় আমার
প্রবৃত্তি নেই, কারণ তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিপন্থী। ঋতুপর্ণের স্মরণে
বাঙ্গালী আরেকটু সাবালকত্ব দেখালে, যেখানেই থাকুন, ঋতুপর্ণ নিজেই বেশি খুশী হতেন
বলে আমার ধারণা।
