Saturday, 22 February 2014

সিনেমা-সিনেমা

ছেলেবেলায় আমাদের দু’রকমের ‘মা’ ছিলেন। এক, জন্মদাত্রী মা, যিনি সন্ধ্যেবেলায় ল্যাম্পপোস্টে বাতি জ্বলে যাওয়ার আগে খেলার মাঠ থেকে না ফিরলে বিরাট বকাবকি করতেন অথচ বাবার শাসনের অগ্নিদাহ থেকে শীতল ছায়া বিছিয়ে রক্ষা করতেন নিয়মিত। আর দুই হ’ল ‘সিনে-মা’, যিনি একঘেঁয়ে জীবনে লেখাপড়ার কালাহারি মরুতে কালেভদ্রে আনন্দের হিল্লোল বয়ে ওয়েসিস হয়ে আবির্ভূত হতেন।  
সেকালে হাউসে গিয়ে সিনেমা দেখা মানে ছিল একটা পরব। কশ্চিৎ-কদাচিৎ বাবা আপিস থেকে একটু আগে বাড়ি ফিরে বলতেন, “রেডি হয়ে নে, আজ আমরা সিনেমা দেখতে যাব, কিং-কং” ; অথবা পদিপিসীর বর্মিবাক্সআধা মফঃস্বল, সে কেবল বাড়িয়ে বলবার জন্য বলা, আদতে গ্রামের নিকটবর্তী গঞ্জ শহরে একটিই সিনেমা হল (বর্তমানে বন্ধ হয়ে গেছে), ঝুল-পড়া উঁচু সিলিং থেকে লম্বা ডান্ডায় ঝোলানো গুটিকয় সিলিং ফ্যান, রেক্সিন-ছেঁড়া গদির সিট, কেবল অন্ধকার হলে দরজার ওপর লাল আলোয় লেখা একটি অপরিচিত শব্দ “EXITসব মিলিয়ে-মিশিয়ে আহা কি মদির সেই স্বপ্নলোক। লাইটম্যানের দেখানো আলোকরশ্মিপথ ধরে সিট খুঁজে পাওয়া। তারপর কেমন একটা অপার্থিব কিরকির-কিটকিট শব্দ, মাথার উপর দিয়ে আলোর রেখার নড়াচড়া আর পর্দার ওপর ভেসে উঠলো, ফিল্ম  ডিভিশান কি ভেট - গান্ধীজীর ডান্ডি যাত্রা। অবাক হয়ে ভাবতাম, পর্দা জুড়ে এত বৃষ্টি পড়ে কেন ? তারপর বেশ একটা ফর্ম গোছের কি যেন দেখানো হ’ত আর হল জুড়ে ফিসফাস হ’ত, “ও তেরো রিল, ছোট বই !” আমি এই ধাঁধাঁটা বুঝতে পারতাম না। প্রথমঃ, তেরো রিলটা কি ও কোত্থেকে সেটা জানা গেল আর দ্বিতীয়তঃ, রিলের সঙ্গে বই ছোট না বড় তার সম্পর্ক কি, বই তো পাতা দিয়ে মাপে জানি। অর্থাৎ, পুরো ব্যাপারটার মধ্যেই কেমন শিহরণ, রহস্যময়তা আর সবচেয়ে বড় কথা একঘেঁয়ে পড়া থেকে একদিনের মুক্তি দেদার মজা।

আমার মামাবাড়ি ছিল বেহালা আর এখন বুঝতে পারি দিদা ছিলেন সিনেমার পোকা। গরমের ছুটিতে দিন সাতেক (যত উঁচু ক্লাসে উঠতে থাকি, মামাবাড়ির বরাদ্দ দিনসংখ্যা তত কমতে থাকে, শেষে ক্লাস নাইন-টেনে উঠে তা শূণ্য হয়ে যায়) মামাবাড়ি-যাপন বাঁধা ছিল, এখন বুঝি তাতে মায়ের পিয়ার-প্রেসার ভালরকম কাজ করত। সেই দিন সাতেকের মধ্যে দিদার হাত ধরে (অতি অবশ্য বাবার অগোচরে) অশোকা বা ইলোরা বা অজন্তা সিনেমা হলে একটা দুপুরের শো-দর্শন ঘটতই। ছবিগুলো যে সবসময় ‘শিশুপাচ্য’ ছিল তা বলতে পারি না, যেমন ফুলেশ্বরী, হসপিটাল, বা তিসরি মঞ্জিল। তবে এগুলোর প্রত্যেকটার মধ্যেই শিশুর শিক্ষণীয় জিনিসের অভাব ছিল বলে আমি অন্তত মনে করি না। টিকিট কাউন্টারের জাল-লাগানো জানালার উপরে হাতে লেখা বিজ্ঞপ্তি সাঁটা থাকত – “বিদ্যুৎ বিভ্রাটের জন্য কর্তৃপক্ষ দায়ী নহেন”। তা দিদার সঙ্গে ফুলেশ্বরী ছবি দেখতে গিয়ে (বিশ্বাস করুন, ওই ছবিটি আমার বড় হয়েও আর দেখা হয়ে ওঠেনি) যেই না মন-ভরানো গান শুরু হয়েছে, যেও না দাঁড়াও বন্ধু, অমনি ঝপ করে আলো চলে গেল। হলময় হাহুতাশের মধ্যে খানিক অপেক্ষা করে দিদা বললেন, “নাঃ তর দেখতে আছি কপালটাই খারাপ, বাপে তো আর এইসব দেখাইবো না, যাইক গা, চল কাইল আবার আসুম”। আমি কাঁদো-কাঁদো (ছেলেবেলাটায় ফস করে চোখে জল চলে আসত কত সহজে, কোন দায় ছিল না, বড় হ’বার সবচেয়ে বড় যন্ত্রণা এত কান্না গিলতে হয় !) হয়ে দিদার অনুগামী হলাম। দিদা সটান কাউন্টারে গিয়ে বললেন, “এই দ্যাখেন আমার নাতির মুখখান, হ্যয় সারারাত কাঁদব, বাপে-মায়ে দূরদ্যাশে থাহে, কান্নাকাটি কইর‍্যা জ্বরজারি বাঁধাইলে কি করুম কন ? হয় টিকিটের পয়সা ফেরত দ্যান নয় এই ছেঁড়া টিকিটে লিখ্যা দ্যান যাতে কাইল ম্যাটিনিতে পোলাটারে সিনেমাটা পুরা দেখাইতে পারি !” আমি পরেরদিন দিদার সঙ্গে বুক ফুলিয়ে গিয়ে পুরো ফুলেশ্বরী দর্শন করি (সেদিন আর বিদ্যুৎ বিভ্রাট ঘটেনি)। কিন্তু, শিক্ষালাভ হ’ল না জানেন, আমি আজও নারী-পুরুষ তফাত করেই দেখে এলাম, শুধুই “মানুষ” দেখা শিখতে পারলাম না।

সেকালে বাংলা সিনেমা (অর্থাৎ, বাংলা “বই”) আর ম্যাটিনি কথা দু’টি মোটামুটি সমার্থক ছিল। ইভিনিং শো তবুও ঠিক আছে, নাইট শো’তে বিশিষ্ট তালেবর ও নবদম্পতি বাদে বাঙ্গালীরা বিশেষ যেতেন-টেতেন না। ফলে ম্যাটিনি বাদে বাকি শো-গুলোতে টিকিট-কাউন্টারবাবুরা বেশ রিল্যাক্সড চিত্তে থাকতেন। টিকিট-প্রার্থীদের সঙ্গে রঙ্গালাপও করতেন মাঝে মধ্যে। নিন্দুকে দেখেছে, সেই নির্দোষ আলাপচারিতা বেশির ভাগই হলে আগত মহিলা দর্শকদের সঙ্গেই চলতো, তবে অল্পবয়েসীদেরও তাঁরা সে দাক্ষিণ্য যে একেবারে করতেন না, তা নয়; আমি নিজে তার সাক্ষী। যথা, ক্লাস এগারোতে উঠে নৈহাটির নৈহাটি সিনেমায় দেখতে গিয়েছি উত্তম-সুচিত্রার সুপারহিট “বই”- “সপ্তপদী”। এ আমার জন্মের আগে তৈরি হওয়া ছবি, তবে বাঙ্গালী এই রকম কিছু ছবিকে তার জীবনে চিরন্তন করে চিরস্থায়ী স্থান দিয়ে ফেলেছিল, তাই নতুন সিনেমা রিলিজ করুক চাই না করুক, সম্বৎসর বাংলার কোন না কোন হলে এ ধরণের “বই” চলতোই, আর বাঙ্গালী তার জানা পাঠ আবার ঝালিয়ে নিতো নিয়ম করে। তা যাক, আমাদের তিনবন্ধুর হয়ে আমি একাই লাইনে দাঁড়িয়েছি। এক সময় টিকিট-জানালায় পৌঁছলাম। কাউন্টারে বসা মাঝবয়েসী ভদ্রলোক নাকের ডগায় চশমার উপর দিয়ে তাঁর এক্সরে নজর আমার উপর ফেললেন। কাউন্টারের “কাকু”-র তীব্র কোপদৃষ্টির সামনে লজ্জায় নতমুখে তিনটে ফার্স্টক্লাসের টিকিট চাইতেই তিনি ভাববাচ্যে বললেন, “কোন ক্লাসে পড়া হয় ?” মিনমিনে গলায় জবাব দিলাম – “ক্লাস ইলেভেন”। উনি চিবিয়ে চিবিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বলি মাধ্যমিকে কোন ক্লাস পেয়েছিলে ছোকরা ?” আমি মিইয়ে গিয়ে বললাম, “কাকু মাধ্যমিকে তো ক্লাস হয় না, হয় ডিভিশান; আর আমি ফার্স্ট ডিভিশান পেয়েছিলাম”। আরো ব্যঙ্গাত্মক স্বরে পরের প্রশ্ন, - “অ্যাঁ ফার্স্ট ডিভিশান!! তবে বলো দেখি ছোকরা, ‘চাঁদের গায়ে চাঁদ লেগেছে আমরা ভেবে করবো কি’ এই কথার তাৎপর্য কি ?” প্রশ্নোত্তরে টিকিট কাটায় অহেতূক দেরি হচ্ছে দেখে আমার বাকি দুই বন্ধুও লাইনে উঁকিঝুকি মারছিলো আমি তা খেয়াল করিনি। তাদের মধ্যে ফক্কড়তমটি গলা বাড়িয়ে বলে উঠলো – “আমি বলবো কাকু ? চাঁদের গায়ে চাঁদ, অর্থাৎ মুন-মুন, তা হলে এই লাইনের অর্থ হলো গিয়ে, মুনমুন সেনকে নিয়ে ভেবে আমরা কি করবো !!” সালটা ১৯৮৪, সপ্তপদীর অমর জুটির নায়িকা সুচিত্রা সেনের কন্যা মুনমুন সেন তখন ছায়াছবির জগতে খ্যাতির চূড়োয় উঠছেন। মুহুর্তে যেন বাজ পড়লো, কাউন্টারকাকু জানালা দিয়েই পারলে লাফ মেরে বেরিয়ে আমার সেই ফাজিল বন্ধুর টুঁটি টিপে ধরেন আরকি! নেহাতই না পেরে তিনি পেল্লায় হুঙ্কার ছেড়ে কাকে (খুব সম্ভব হলের গুঁফো দারোয়ান) যেন হুকুম দিলেন, “ওরে ***, যা এক্ষুনি ছেলেগুলোকে ধরে নিয়ে আয়, ধর ধর, হতচ্ছাড়াদের আটকে রাখবো; তারপর বাড়িতে খবর দেবো, বাপ-মা এসে ছাড়িয়ে নিয়ে যাবে, বলে কিনা মুনমুন সেন কে নিয়ে... !!” প্রখ্যাত নায়িকার প্রতি নিতান্ত অর্বাচীন অপোগন্ডদের এ হেন বিদ্রূপে ক্রোধে উনি ভাষা হারিয়ে ফেললেন। তা কপাল ভালো, সেই বয়সে আমাদের সকলেরই শরীরস্বাস্থ্য বেশ নমনীয় থাকায়, অমুকচন্দ্র দারোয়ান টিকিট-কাটবার লাইন পর্যন্ত পৌঁছবার আগেই আমরা তিনবন্ধুই তিন লম্ফে নৈহাটি স্টেশানে ঢুকে পড়ে গা ঢাকা দিয়ে ফেলায় সে যাত্রায় সমূহ বিপদ থেকে রক্ষা পাই।

দুঃখ লাগে, যখন দেখি “উন্নয়ন” আমার তেরোবর্ষীয় পুত্রের জীবনে সেই জাতীয় শিহরণের কোন অবকাশ আর ফেলে রাখেনি। কি আর করা, গমকল উঠে গেছে, সাইকেলরিক্সায় লন্ঠন নেই, বাঙালির বাড়িতে গেলাসে জল খাওয়া উঠে গেছে, বাঙালি বোতল ধরে ফেলেছে...ছাইগাদার ঝুপসি আমগাছে প্রত্যেক সন্ধ্যেয় জোনাকির ঝাড়বাতি নিভে গেছে কবে...এরপর ট্যাব আর ই-বুকের ঘাড়ধাক্কা খেয়ে একদিন যদি জীবন থেকে বই (আমি ‘বই’ বলতে বই-ই বোঝাতে চাইছি, ‘ম্যাটিনি’ বা ছায়াছবি নয়) হারিয়ে যায়...ভয়ংকর দুঃস্বপ্ন দেখি আমার তেরো বছরের ছেলেটার দিকে তাকিয়ে....তবু বড় পিছুটান...আমি DRAWBACK কথাটার বঙ্গানুবাদ করেছি ‘পিছুটান’...