আমার একটা বদ্ধমূল ধারণা, আমার
একখানি বেশ কিপ-সেফ-ডিস্ট্যান্স মার্কা বদন আছে। বিল্লা বদন জন্মসুত্রে প্রাপ্ত, এ
বিষয়ে মা’য়েরও যথেষ্ট আক্ষেপ রয়েছে, বিশেষতঃ অনুজ সহোদর রূপবান ও প্রিয়দর্শন হওয়ায়।
ছেলেবেলায় মদীয় কুতকুতে চোখ ও দূরাদয়চক্রনিভস্য ভুরুতে চৈনিক আদল রীতিমত প্রকট
থাকায় এলেবেলে করে ডাকবার জন্য একখানি চীনে-গোছের নামও দেওয়া হয়েছিল। দিদা আদর করে
বলতেন, আহা মুখখানি দেখছসনি, অ্যাক্কেরে গোলপানা যেন্ (ন-এ হসন্ত দিয়েই পড়তে হবে)
পানের বাটা। প্রাইমারীতে শখ করে মাথায় স্কার্ফ-পরিহিতা এক সহপাঠিনীকে অসীম সাহসভরে
স্কুলের বাগানের ফুল ছিঁড়ে দিতে গিয়ে শুনতে হয়েছিল – এখন থাক, চুল উঠলে দিস ! যেন
ওর কামানো মাথায় চুল ওঠা অবধি ওই নশ্বর ফুল অনাঘ্রাত অটুট থাকবে ! এ পরোক্ষ প্রত্যাখ্যান
বোঝার মত মনের বয়েস তখন আমার হয়ে গিয়েছে। তারপর যে বয়েসে স্কুলের পার্শ্ববর্তী
গার্লস স্কুলের দেওয়ালে তালেবরদের নামের সঙ্গে যোগচিহ্ন দিয়ে প্রণয়িণীর নাম দেখতে
পাওয়া যায়, সেতূবন্ধনের সে বয়েসেও আমি বিলকুল যোগাযোগহীন। কতদিন ভেবেছি, সে কোথায়,
কোথায় সে, যে ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি আমায় অভিষিক্ত করবে! আছে, কোথাও নিশ্চয় আছে, আমারে
বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। কলেজে উঠে তো প্রায়ই মনে হত, কে যেন ডাকল পিছন থেকে! পজ
নিয়ে ঘুরে তাকাতাম, এবং অবধারিত ঝাঁকা মাথায় মুটে নয় খ্যাংরা-গুঁফো মুশকো জিজ্ঞেস
করতো, ভাই রানাঘাটের খবর হ’ল ? এমন চলতে
চলতে ভাই থেকে দাদা হলাম, বড়দা হলাম, তারপর অধুনা কাকুত্ব লাভ করেছি। এমনকি শেষমেষ
যে মেয়েটি নেহাত গ্রহের ফেরে আমার সঙ্গে ভিড়ে নিজেই নিজের কপাল যৎপরোনাস্তি পুড়িয়েছে
পনেরো বচ্ছর হ’ল, শুনেছি তাকেও তার বান্ধবীদের মুখে শুনতে হয়েছে, হ্যাঁরে তোর বর
তোর সঙ্গে কথাটথা বলে ? বাবা, আমার তো দেখলেই কেমন ভয়ভয় করে! (তা, আমি তো বহু
ভেবেও মনে করতে পারিনি আমি আদৌ কাউকে কস্মিনকালে এমত অসম্ভব অনুরোধ করেছি যে আমায়
দেখুন, এবং দেখতে থাকুন!) এই সব কার্যকারণে আমার বদনবইটির মলাটে যে কর্কশ, ক্রোধী,
মায়াদয়া ও ‘জীবে প্রেম’-হীন এক বিকর্ষক রঙ মাখানো আছে সে বিষয়ে আমি উত্তরোত্তর নিঃসন্দেহ
হয়ে উঠেছি। তদুপরি, সাত বচ্ছর আগে হাতে গোনা কয়েকজন অতিপরিচিত-পরিচিতার মনে রীতিমত
দাগা দিয়ে একটি ফরাসী ছাঁদের দাড়ি রেখে ঈষৎ স্যাডিস্টিক আত্মপ্রসাদ লাভ করি।
শিক্ষকতার প্রথমদিন থেকেই কানাঘুষোয় শুনে আসছি, ছাত্রছাত্রীরা (তাদের সবাই দোদুল
দে বা লালিমা পাল(পুং) নয়, অনেকেই অগ্নিদেব এবং রুদ্রবীণাও বটে) নাকি আমায় কোন
সামান্য কথা জিজ্ঞেস করতেও সাহস পায়না, কারণ তারা আমায় বিষম ভয় পায় এবং আমার
বদনখানি দেখে তাদের নিশ্চিত ধারণা যে আমি ভীষণ রাগী এক ভয়াবহ রকমের জীব। একবার তো
শুনেছিলাম, একটি (অবাঙালী) ছাত্র আমায় মন খুলে অভিসম্পাত করেছে – “ওহ যো
ফ্রেঞ্চকাট হ্যায় না, বহুত খতরনাক আদমি হ্যায়, সারা সাল ডরাতা রাহা, বলতে থে,
ক্লাস এটেন্ডেন্স এক ভি কম হো তো পারিক্সা মে বৈঠনে নেহি দুংগা। ** , দিল তো করতা
হ্যায় উনকো ইতনা শাপ দুঁ, ইতনা শাপ দুঁ কে...”, এবং তার সঙ্গী বলে, “ছোড় ইয়ার,
উনকো পহেলে হি বহোত ইস্টুডেন্ট শাপ দিয়া হোগা, ইসি লিয়ে কম উমরমে সারে বাল সফেদ হো
গয়ে...”। অনেক সহকর্মী সময়-সময় নিন্দাবাচক কোয়ারান্টাইন করে রেখেছেন। কয়েকজন
বাকসম্পর্ক স্থাপনেও অনীহা দেখিয়েছেন (ফলে তাঁদের সঙ্গে বাকি সম্পর্কের কোন প্রশ্নই
ওঠেনি)। তা বেশ করেছেন। সমাজের (অর্থাৎ কলেজের) উন্নত-অর্ধের উন্নয়নে ব্রতী একজন
(ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ তো একবার আমায় তাঁর চেম্বারে ডেকে নিয়ে গিয়ে একান্তে জানিয়ে
দিয়েছিলেন, দেখো মাই বয়, ডোন্ট মাইন্ড, তোমার উপরে আমাদের সহকর্মীদের অনেকের
অ্যালার্জি আছে বুঝলে ! আচ্ছা, এটা একটা ভেবেচিন্তে বলবার মত কথা হ’ল বলুন ? এর
চেয়ে সর্বজনীন সত্য আর কিছু আছে কি ? আরে আমি তো কোন ছার, বাংলাদেশে ঠাকুর বা রায়
পরিবার বাদে সর্বৈব নির্যালার্জি লোক আপনি পাবেন কোথায় ? চাকুরিলাভের কসরতকালে
ইন্টারভিউতেও বারংবার দেখেছি, আমায় সামনের কুর্সিতে উপনীত দেখামাত্র হুজুরদের
আর্শিনগরে প্রবল কৃষিকার্যের ছাপ। আমার ঠিক আগের প্রার্থী অবধি পুরোদস্তুর বাংলায়
চলা ইন্টারভিউ আমি ঘরে প্রবেশিতেই মুহূর্তে কালাপানি টপকে ব্রিটিশ হয়ে যেত। ফলে
যথাবিহিত ধেড়িয়ে বাইরে এসে গোসলঘরের আয়নায় নিজ মুখখানা ভালো করে দেখতাম আর ভাবতাম,
আচ্ছা আমায় কি নীলকর-ইংরেজদের মত দেখতে ? প্রত্যয় হত না, মনে হত টিকটিকিরাও দেওয়ালে
ঘোরাঘুরি করতে করতে যেন হাসি চাপতে চাইছে। থিয়েটারের শখ ছিল, আরো সত্যি করে বললে
বলতে হয়, জীবনে একসময় শখের থিয়েটার ছিল। তা সেখানেও নায়ক তো দূর, পার্শ্বনায়কের
চরিত্রেও পরিচালকেরা কোনকালে আমায় নির্বাচন করবার সাহস দেখাননি, কেবল ভিলেন,
লম্পট, নির্দয় ও ক্রুর চরিত্রেই আমার নাট্যজীবন ঘুরপাক খেয়েছে। মানে, মোটের উপর, মুখের
চারপাশে অদৃশ্য লাল সিগন্যাল জ্বলে থাকায় নিরাপদ দূরত্ব যে ভাবেই হোক বজায় থেকেছে
এবং তার জন্য, আমি আগাপাশতলা ভেবে দেখেছি, আমার মুখখানা ছাড়া অন্য কিছু দায়ী হ’তে
পারেনা। একেক সময় নুব্জ হয়ে ভাবতাম, আমি মূলতঃ যা নই সকলে আমায় তাই ভাবে কেন ? এক
এবং একমাত্র কারণ আমার বদন, যাতে নির্ঘাত মুখোসের মত আঁকা আছে হিংস্র সিংহের কেশর,
অসুরের মত গালপাট্টা, রঘু ডাকাতের মত সিঁদুরের ফোঁটা।
তবে এক এবং একটি মাত্র ক্ষেত্র আছে, যেখানে আমার মুখোস কাজ করেনি। ‘চলন্ত
রেলপথে’ (এই শব্দযুগল দৈনন্দিন রেলের কামরায় বহুশ্রুত, অর্থ বহুধাবিস্তৃত)
ভিক্ষাজীবীকুল আমার সে কুলিশকঠোর মুখোসের তোয়াক্কা রাখেননি কোনদিন। বরং আমি বিশেষ
নজর করে দেখেছি, চলন্ত রেলপথেই হোক আর স্থবির রেলস্টেশানেই হোক, চক্ষুষ্মান হোন কি
দৃষ্টিহীন, আমায় ওঁরা ঠিক খুঁজে নেন। অফিস টাইমে ভরভরন্ত পরিস্থিতিতে যখন ওঁরা
বেছে বেছে ‘কাজ’ করেন, এক ধারসে সবা’র কাছে হাত পাতেন না, শপিং মলে শৌখিন গিন্নির
ভঙ্গিতে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ করে থাকেন, তখনও দেখেছি, চার-পাঁচজনাকে টপকে অবলীলায়
তাঁরা আমায় অভিষিক্ত করছেন। জনারণ্যে আমায় বেছে নেওয়ায় ওঁদের এই দক্ষতা দেখে বারে
বারেই আমার মনে হয়েছে, আহা চাকরির ইন্টারভিউতে এঁদের কেউ যদি থাকতেন, তাহলে আমায় মোটমাট
তিনশো তেইশখানা রিগ্রেট লেটারের কশাঘাত এ তাপিত জীবনে সহ্য করতে হত না। দারুণ
দাবদাহে তপ্ত দুপুরে ততোধিক তপ্ত রেলের কামরায় ঘর্মাক্ত মুখে ক্রোধগর্ভ মুখোস
টাঙিয়েও আমি নিস্তার পাইনি। কেউ না কেউ ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ বা ‘তুমি কোন
কাননের ফুল, কোন গগনের তারা’ গেয়ে আমার থেকে নির্বিচারে এক-দু’ টাকা বাগিয়ে
নিয়েছেন। কামরার এক প্রান্তে এঁদের কাউকে দেখা মাত্র কখনো অহেতূক গভীর নিদ্রার ভান
করেছি, ওঁরা পাত্তাই দেননি, রীতিমত হাত ধরে ঝাঁকিয়ে আমার চেষ্টিত ঘুমতপস্যা
ভাঙ্গিয়ে সাহায্য বুঝে নিয়েছেন। অথচ, দেখেছি একই স্থান ও কালে অপরাপর অনেকেই বাই
ডিফল্ট কেমন সুন্দর ছাড় পেয়ে যান। কেবল আমার মুখোসেরই রথের চাকা মাটিতে, থুড়ি,
রেলপথে কেন কে জানে অদ্ভুতভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়। সয়ে-যাওয়া ফাঁক ও ফারাক মুছে গিয়ে হঠাৎ
করে গা-ঘেঁষাঘেঁষি সান্নিধ্য ক্ষনিকের জন্য সৃষ্টি হ’লে অস্বস্তি হওয়াই স্বাভাবিক।
গত বছর পঞ্চমীর গোধূলি। নৈহাটি স্টেশান জুড়ে ছোটছোট মানববৃত্তের প্রত্যেকটিতে
একেক দল ঢাকি পাল্লা দিয়ে তাদের কেরদানি জাহির করে চলেছে। তারা সব দূর-দূর থেকে
এসেছে, কাঁসি-হাতে পুঁচকে ছেলেকেও অনেকেই সঙ্গে নিয়ে এসেছে। দুর্গাপুজোর পাঁচদিন
যে সম্বৎসরের কামাই-এর সেরা সুযোগ। তাদের বায়না করতে নানা পুজো কমিটির মুরুব্বিরাও
জুটেছেন, তাঁরা এ ঢাকি ও ঢাকির মান ও মানি (পারিশ্রমিক) যাচাই করে নিচ্ছেন। একে
অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রাণান্তকর প্রতিযোগিতায় এর বোল তাকে চেপে দিচ্ছে। আগমনীর
তালে বিসর্জনীর বোল মিলেমিশে এক বিচিত্র ও
বিক্ষুব্ধ শব্দসমুদ্র তৈরি করছে স্টেশান চত্বর জুড়ে। সত্যি বলতে, মোটেই খারাপ
লাগছে না আমার, আলোর মালায় ঢাকা পড়েছে এবড়োখেবড়ো রাস্তার স্বরূপ, মায়াবী সাজসজ্জার
রূপময়তা আড়াল করেছে চলিত সভ্যতার অললিত মুখচ্ছবি। এখন আসন্ন উৎসবের রোশনাই আর
সহস্র মানুষের আনন্দিত স্রোতে মুখ আর মুখোসের টানাপোড়েন হারিয়ে যাবে দিনকয়েকের
জন্য। এমন সময় ভিড়ে ভিড়াক্কার রেলস্টেশানে আমার কাছে ঘনিয়ে এসে এক বৃদ্ধা বললেন,
বাবা, আমার পঁচিশ বছরের ছেলেটা আজ দু’মাস হসপিট্যালে ভর্তি, কিছু সাহায্য দেবেন বাবা
? এই প্রশ্নের আগে আমি তাঁকে বেশ কয়েক মিনিট ধরে আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করছিলাম, এবং
দেখছিলাম উনি খুব সিলেক্টেড দু-একজনের কাছে দাঁড়াচ্ছেন। রোজকার চেনা ট্রেনের বা
রেলব্রিজের সাহায্যপ্রার্থী উনি নন। বেশবাস দেখে মনে হয়, হঠাৎ করে ঘোর দুর্দিনের
অন্ধকার সাগরে পড়ে গিয়েছেন, সাঁতার এখনো অভ্যেস করে উঠতে পারেননি। আমার রেলজীবনের অতীত
অভিজ্ঞতা বলছে, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে চলেছি। আমি মনে মনে শঙ্কিত হয়ে
উঠছিলাম, কারণ আমি নিশ্চিত জানি শত লোকের ভীড়েও উনি ঠিক আমায় খুঁজে পাবেন, এবং
কয়েক মুহুর্ত পরেই আমার কাছে এসে দাঁড়াবেন। ওনাকে কি সাহায্য দেবো, কত সাহায্য
দেবো এ জাতীয় সিদ্ধান্ত আমার মত দ্বিধাগ্রস্ত লোকের পক্ষে চট করে ঠিক করা ভীষণ
শক্ত কাজ । কারণ, অভ্যাসিত এক-দু’ টাকা এঁকে দেওয়া আমার কেমন অসভ্যতা বলে মনে
হচ্ছে আবার পঞ্চাশ-একশো টাকার নোট বার করাও যেন বড্ড অতিনাটকীয় ঠেকে। তবে সুবিধে
আছে আমার মুখোসে সে দ্বিধা বোধহয় ঢাকা পড়ে যাবে এমন বিশ্বাসে মুখোসটাকে প্রাণপণে নৃশংসতম
করে তুললাম যেন জীবনে কখনো কোন ব্যাপারে কোন দ্বিধা ছিল না আমার। ওনাকে টাকা পাঁচ
কি দশটাকা দিয়ে কিস্যা খতম করবো ঠিক করে পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে হাতড়াতেই
বিষম সংকটে পড়ে গেলাম। এক-দু’ টাকা খুচরো আছে বটে কিন্তু তাতে পাঁচ টাকা হচ্ছে না
আর দশটাকারও কোন নোটও নেই। একটিমাত্র বিশ টাকার নোট আছে আর আছে একশো টাকা। এক
সেকেন্ড, দু’ সেকেন্ডের দ্বিধা, যেন অনন্তকাল...শশব্যস্ত আমি দ্রুত ঠিকঠাক করে নিই
ঈষৎ স্থানচ্যূত মুখোসটাকে, টেনে বার করি বিশটাকার নোটখানা। অবহেলাভরে বৃদ্ধার হাতে
তুলে দিতেই উনি আমার দু’হাত চেপে ধরে হঠাৎ সুতীব্র কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আমি
হতবাক, অপ্রস্তুত, তক্ষুনি আবার আমার কেঁপে-যাওয়া মুখোসে হাত দিতে যেতেই শব্দহীন
কাঁদতে-কাঁদতে বুঁজে-আসা কন্ঠে উনি বললেন, বাবা তুমি বড় নরম, আমার ছেলেটার মত।
তোমায় আমি মিথ্যে বলেছি বাবা, আমার পঁচিশ বছরের ছেলেটা এক বছর হ’ল ব্লাড
ক্যান্সারে মারা গেছে...মা হয়ে মরা ছেলের নামে ভিক্ষে করে পেট চালাচ্ছি বাবা, না
হ’লে যে কেউ ভিক্ষে দেয়না, ...পেটের জন্যে বাবা, দু’টো খেতে পাব বলে...তোমার
চোখদুটো আমার সেই ছেলেটার মত, তোমায় মিথ্যে বললে যে পাপ হবে বাবা...পারমাণবিক
বন্ধনমুক্ত মহামৃত্যুর সেই ‘নভঃস্পৃশ্যং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম’
কি আমি জানিনা; আমি জানিনা দ্যুলোকভেদী মহামন্দ্র দুন্দুভিনিনাদ কি বস্তু; আমি
কেবল জানি, আমার চারপাশে আকাশ ভেঙ্গে ভয়ঙ্কর বাজের শব্দে যেন লক্ষ পুত্রহারার
অশ্রুবিহীন কান্না ফেটে পড়লো তৎক্ষণাৎ... বৃদ্ধা কেঁদে চলেছেন এবং কি আশ্চর্য তাঁর
চোখে এক ফোঁটা জল নেই ! কি অতলান্তিক সে শোক, কি দুঃসহ সে জীবনের ভার, কি অপরিমেয়
তার উত্তাপ যে সদ্য সন্তানহারা মায়ের চোখের জলের শেষকণাটুকুও পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে
! কোন অদৃশ্যচারী নিষাদের নির্মম তীর আমায় এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়ে জনাকীর্ণ সেই
উৎসবমুখর রেলস্টেশানে একা এক অগ্নিকুন্ডে দাঁড় করিয়ে দিল।
স্টেশানের একেবারে উত্তর প্রান্তে চলে এলাম, ভীড় এখানে নেই, ঢাকিদের বোলও
ক্ষীণ, কেবল দূরে ঘনায়মান সন্ধ্যের অন্ধকারে সিগন্যালের লালবাতি অনিমেষ জ্বলে আছে।
আকাশের দিকে মুখ তুলে উদ্গত কান্না আগলমুক্ত
করে হা-হা করে কেঁদে উঠে চীৎকার করে বললাম, মাগো দেখেছিস তুই, সকলের পরিয়ে দেওয়া মুখোস
আমার মুখটাকে আজো পুরো ঢেকে দিতে পারেনি। মৃতবৎস্যা ওই বৃদ্ধার নিভে আসা চোখের
তারায় আমার আসল মুখখানি ধরা পড়ে গেছে। আনখশির কৃত্রিমতায় সাজানো চার-পাঁচ দিনের
উৎসবের উল্লাসী মুখোস বিসর্জনের গঙ্গায় ডুবে গিয়ে ভেসে উঠবেই সারা বছরের
নিরানন্দময় আটপৌরে মুখ। তোর নিটোল সৌষ্ঠব ধুয়ে খড়-মাটি-কঞ্চির কঙ্কাল অবধারিত
বেরিয়ে পড়বে ক’দিন পরেই, যদিও ভাগ্যিস তা দেখবার জন্য মানুষ ভীড় করে আসবে না, তাই
মুখোসকেই মুখ ভেবে ক্ষনিকের উল্লাসী চেতনার চোরাবালিতে খুঁটি গেড়ে জীবনের খেলাঘর
সাজানোর পুতুলখেলায় সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়বে আবার। ভেবে নেবে দিগন্তে কোথাও কোন
বঞ্চনা নেই, ব্যর্থতা নেই, আঘাত নেই, প্রত্যাখ্যান নেই, শোক নেই, চিরতরে মুছে
যাওয়া নেই। কেউ জানবে না, তিলে তিলে গড়ে তোলা তোর ওই অসুন্দর কাঠামোটাই সত্যি, ওটা
গড়বার জন্য রাতজাগা পরিশ্রমটা সত্যি, তার উপরে সুন্দরের প্রলেপ চড়ানোর প্রাণান্তকর
জেহাদটা সত্যি, ছানি-পড়া চোখে অশক্ত কাঁপা হাতে তোকে চক্ষুদানের নিষ্ঠাটাই সত্যি।
মা গো, রূপাচ্ছন্নতার অস্থায়ী প্রলেপে নয়, কদাকার শাশ্বত সত্যে আমায় জাগিয়ে রাখিস মা
তোর কঙ্কালের মত।
(পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত ট্রৈনিক পত্রিকার শারদ ১৪২০ সংখ্যায় প্রকাশিত)

