Thursday, 14 March 2013

ঈশ্বরের নিঃশ্বাস ছুঁয়ে


পর্ব ২ - চললাম



ইয়কসাম বাজার থেকে


ইয়কসাম পৌঁছোতেই সন্ধ্যে হয়ে গেলো। প্রথমতঃ পদাতিক এক্সপ্রেস নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছাতে ঘন্টা চারেক গাঁইগুঁই করলো এবং তারপরে শেয়ার গাড়ি দু’বার বদলে জোড়থাং পৌঁছোলাম এমন বেলায় (বিকেল ৫টা) যে ইয়কসাম-গামী যে দু’চারখানা গাড়ি জোড়থাং থেকে পাওয়া যায়, তারা পাকদন্ডি বাওয়া পাহাড়ি রাস্তায় প্রত্যন্ত জনপদে দিনে-দিনে পৌঁছাবার তাগিদে বেলা ১টা নাগাদই রওনা দিয়ে দিয়েছে (শিলিগুড়ি থেকে ইয়কসাম প্রায় ১৭৫ কিমি)। ফলে নিরুপায় হয়ে জোড়থাং-এই রাত্রিবাস করতে হলো। পরের দিন সকাল সাড়ে ন’টা থেকে জোড়থাং-এর চারতলা জিপ-স্ট্যান্ডে হত্যে দিয়ে পড়ে থেকে বেলা ১টা নাগাদ যে টাটা সুমো (শেয়ারে) পেলাম, সেটি আবার তাসিডিং পৌঁছাতে না পৌঁছাতে বাঁদিকের স্প্রিং ভেঙ্গে দ হয়ে পড়লো। কাকতালীয় এই যে আমি ও এই অভিযানে আমার লিডার আমার ভাই ওই গাড়িতে জোড়থাং থেকে এতোক্ষণ বাঁদিকেই বসেছিলাম এবং আমাদের সম্মিলিত ওজন ১৬০ কিলোর মতো।  তাসিডিং-এ ঘন্টাখানেক ধরে গাড়ি সারাই হলে ড্রাইভার লজ্জার মাথা খেয়ে আমাদের বলেই ফেললো, সাব মেহেরবানি করকে আপ দোনো ইসবার ডাহিনা সাইড মে বৈঠনা, কিউ কি এ সেকেন্ড হ্যান্ড স্পেয়ার স্প্রিং য়াদা মজবুত নেহি হ্যায়, ফির তোড়নে সে আজ ইয়কসাম নেহি পৌঁছ পায়েঙ্গে। আমরা জবাবে বললাম, ঠিক আছে, ঠিক আছে, ফিকর মৎ করো, একবার যব নিকলা তো পৌঁছকেই রহেঙ্গে। হমকো ইঁহাকা রাজকুমারীনে নিশির ডাক সে বুলা লিয়া। সাদাসিধে সিকিমি ছোকরা কি বুঝলো কে জানে, তবে বড় সাবধানে গড়িয়ে গড়িয়ে ইয়কসামে আমাদের আস্তানায় (হোটেল কাভুর) নামিয়ে দিলো সন্ধ্যে সাড়ে ছ’টা নাগাদ। ইয়কসাম (৫,৭০০ ফিট) পশ্চিম সিকিমের এক্কেবারে উত্তর-পশ্চিমে একটি স্নিগ্ধ জনপদ। মাত্র তিরিশ কিলোমিটার দূরের পেলিং-এর সাহাদা-মিত্রবাবু-রায়বৌদিদের (স্রেফ উদাহরণ) গড়িয়াহাটপ্রতিম কলরোল আর শশব্যস্ততার মূর্তিমতী বৈপরীত্য হয়ে যেন নবোঢ়া গ্রাম্যবধূর লাজুক ঘোমটা-টানা পেলব লক্ষ্মীশ্রী মেখে কেমন আলগোছে চুপটি করে দোরের পাশে অপেক্ষায় শান্তসবুজ ইয়কসাম। এইখানে এসে গাড়িরাস্তা শেষ। ইয়কসাম বাজারে (গোনাগুনতি আট-দশটি দোকান) গাড়ি থেকে নেমে বাঁ দিকে মুখ তুলে চাইলেই একটুকরো দেখা যায় তাকে। যে তাকে একবার মন থেকে দেখেছে, সে জানে সেই রাজনন্দিনীর মায়াবী নিশির ডাক কি ভয়ানক। সেই ডাকেই মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাহাড় চড়া শুরু হয় ইয়কসাম থেকে। দুর্গম পাহাড় ভেঙ্গে তার পায়ের কাছে নতজানু হয়ে বসে প্রেমনিবেদনের স্বপ্ন নিয়ে সারা ভারত তো বটেই, পৃথিবীর নানা কোণ থেকে ট্রেকাররা ফি বছর এপ্রিল-মে অথবা সেপ্টেম্বর-অক্টোবর মাসে হাজির হয় ইয়কসামে। আমাদেরই সঙ্গে গেছে এক জার্মান পিতাপুত্র, একটি বালগেরিয়ান মেয়ে - বয়স কত হবে, এই কুড়ি-বাইশ! পথে দেখা হয়েছে কেপটাউন থেকে আসা মা আর তাঁর মেয়ের সঙ্গে, তারা তখন ফিরতি পথে। মোটমাট আমাদের বাইশ জনের দলে বাঙ্গালী বলতে আমি, আমার ভাই, আর মাত্র চারজনা। ইয়কসাম নিজেও সিকিমের যে কোন ছোট্ট প্রান্তিক জনপদের মতোই রূপসী, বাজারে রাজনন্দিনীর একচিলতে উঁকি বাদেও রাজবাড়ির ভগ্নাবশেষ, দুবধি মনাস্ট্রি (২ কিমি হাঁটতে হয় জঙ্গুলে পথে), কাথোক ইকো-লেক আর রাথোং উপত্যকার  সবুজে সবুজ মখমলি ওড়নায় অবগুন্ঠিতা ইয়কসাম প্রকৃতিপ্রেমীর স্বপ্নসঙ্গিনী। তা যাই হোক, এ যাত্রায় আর ইয়কসাম উপভোগের সুযোগ নেই। কাল ভোরে পুলিশ ফাঁড়িতে নামধাম এন্ট্রি করে রুট পারমিট করিয়ে, পরিবেশ দপ্তরের অফিসে আমাদের পিঠে স্যাকে করে সঙ্গে নেওয়া প্লাস্টিকের ক্যারিব্যাগ ইত্যাদি নন-বায়োডিগ্রেডেবল জিনিসের তালিকা জমা করে (ফেরবার সময় মিলিয়ে দেখা হবে, কম পড়লে জরিমানা ; এ ব্যবস্থা কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশানাল পার্কের স্পর্শকাতর বাস্তুতন্ত্রের সুরক্ষার স্বার্থে সিকিম সরকার চালু করেছেন) পাহাড়ি পথে হাঁটা শুরু করতে-করতে কম-সে-কম সকাল সাড়ে ন’টা বেজে যাবে। প্রথমদিনের পাড়ি প্রায় চোদ্দ কিলোমিটার যার শেষ চার-পাঁচ কিমি দমফাটা চড়াই। ফলে রাত্রি দশটার মধ্যে শুয়ে পড়লাম। ইয়কসামে তখন নিশুতি রাত। আজ সারাদিনের পথের ক্লান্তি, গন্তব্যে পৌঁছাবার উদ্বেগ আর আগামীকাল থেকে শুরু হতে চলা অভিযানের উত্তেজনায় রাত জুড়ে কেমন কাঁচামিঠে ঘুম ভাঙ্গল সকাল সাতটায়। আগামী নয়দিনের খাবারদাবার, তাঁবু, জ্বালানি ইত্যাদি ইয়াকের (এখানে এ জীবটির ডাক নাম ‘Zu’, উচ্চারণ সৌজন্য পরশুরাম ; এই ‘জু’-এর কথা পরে আবার বলতেই হবে) পিঠে চাপানো দেখতে-দেখতে দ্রুত তৈরি হয়ে নিলাম। বাড়িতে ফোন করে নিলাম, কারণ আগামী ন’দিন যেখানে চলেছি সেখানে মোবাইল দিয়ে পেরেক ঠোকার কাজ পর্যন্ত চলতে পারে, কিন্তু কথোপকথন চলবে না কিছুতেই, সিগন্যাল বস্তুটি ও তল্লাটে মাছ-ভাতের চেয়েও দুর্লভ;  পথপ্রদর্শক ও দলনায়ক তাসির কাছে সরকারি ছাড়পত্রে একটি স্যাটেলাইট ফোন থাকবে নিচের জনপদের সঙ্গে একমাত্র আপৎকালীন যোগাযোগের মাধ্যম  হিসেবে। মোবাইল সুইচ-অফ করতে গিয়ে দেখলাম, আজ ২১শে অক্টোবর রবিবার, মনে পড়ে গেলো সমতলে আজ মহাষষ্ঠী, দুর্গাপুজোর ধুমধাম আজ থেকে তুবড়ির মতো ফেটে পড়বে। ঢাকের বাজনা, সাজুগুজু ভিড়ভাট্টা, হৈ-হট্টগোল, আলোর রোশনাই থেকে বহু দূরে যেন এক অন্য গ্রহের অজানা পথে কেবল ঝিঁঝিঁর ডাক, আর ঝরনার নূপুরের ধ্বনি শুনতে শুনতে রওনা দিলাম যখন ঘড়িতে তখন ন’টা বেজে চল্লিশ। পথের যেমনতেমন বর্ণনা দেওয়াও আমার মতো অর্থনীতির ছাত্রের পক্ষে মুশকিল, কারণ এই শাস্ত্রে আমরা শিখি (ও শেখানোর চেষ্টা করি) সম্পদ ‘ছড়িয়ে ফেলা’ এবং ‘গোছানোর’ সংক্ষিপ্ততম উপায়, এককথায় how to economize আর কি। অথচ এ পথের ইতিকথাই তো বলবার, তা না বললে অনুবর্তী প্রেমিককুল জানবেন কি করে, সে রাজার বেটির স্বয়ংবরে দাখিল হতে কি জাতীয় স্ক্রিনিং টেস্টের যোগ্যতামান টপকাতে হয় ! আমি বরং তাই সাহিত্য ছেড়ে মেঠো বিবরণই পেশ করি।

পথের পাঙ্কচুয়েশান

ইয়কসাম ছেড়ে রাথোং উপত্যকার (প্রেক-চু এবং ফা-খোলা মিলে রাথোং-চুর জন্ম; এ দেশে ‘চু’ মানে নদী, ‘খোলা’ মানে ঝরনা, ‘সো’ মানে সরোবর আর ‘লা’ হলো গিরিপথ বা ‘পাস’) ঘন জঙ্গুলে পাহাড়ি পথ শুরু হয় প্রায় মিনিট চল্লিশেক পর, ফা-খোলা পার হওয়ার পর থেকে। আরো এগিয়ে ডানহাতে পড়বে সুশে-খোলা, সশব্দে ঝাঁপিয়ে পড়ছে অনেক নিচে প্রেক-চুতে মিশবে বলে। এঁর উপর ৫০ মিটার দীর্ঘ লোহার ঝুলন্ত (বলাই বাহুল্য) ব্রিজ। ব্রিজ পেরিয়েই কাঞ্চনজঙ্ঘা ন্যাশানাল পার্কের বেশ একটা পোষাকি প্রবেশদ্বার ও চেকপোস্ট তৈরির কাজ চলছে দেখলাম। এই ব্রিজ পার হয়ে বাঁদিকে পাথুরে রাস্তা এই প্রথম সত্যি করেই পাহাড় চড়তে শুরু করে। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ফিতের মতো অজস্র সরু-সরু জলধারায় সিক্ত পথে সাবধানী পায়ের নিচে গড়িয়ে যায় নুড়িপাথর। উচ্চতা ক্রমশঃ বাড়ার সঙ্গে বাতাস হাল্কা হতে শুরু করে, পথশ্রমে ঠান্ডা টের পাওয়া যায়না, তবে ছায়ায় জিরোতে দাঁড়ালে একটু পরেই সিরসিরে ঠান্ডা কান আর নাকের ডগায় অনুভব করা যায়। ঘন্টা খানেক পর আবার একটা ঝিরঝিরে খোলার উপর ছোট্ট কংক্রিটের ব্রিজ, কোন বোর্ড লাগানো নেই, ম্যাপ থেকে জানলাম, ইহা হয় মেন্টোগ্যাং খোলা এবং এ রাস্তায় প্রথম ট্রেকারর্স হাট যেখানে আমাদের গাইড নরবু কথা দিয়েছে চা খাওয়াবে, ৭২০০ ফিট উচ্চতার সেই সাচেন আর মাত্র আধা-ঘন্টা দূরে। সাচেন আজকের মোট পাল্লার মাঝামাঝি, ইয়কসাম থেকে ৭ কিলোমিটারের মতো। বেলা পৌনে ১টা নাগাদ ড্যাংড্যাঙ্গিয়ে সাচেন পৌঁছে নরবু দুপুরের খাবারের টিফিন কৌটো খুললো। ময়দার হাফ ইঞ্চি মোটা সিকিমি রুটি, সঙ্গে তেল-ঝাল-নুন বাদে অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর (!) আলুর তরকারি। বুদ্ধি করে রওনা দেওয়ার আগে ইয়কসাম বাজার থেকে মিক্সড পিকল কিনে নেওয়া হয়েছিলো বলে কষ্টেসৃষ্টে দেড়খানা ওই চিজ গলাধঃকরণ করা গেল, র’ চা সহযোগে। সফরের বাকি দিনগুলোতে খাবারের বর্ণনা আর বিশেষ দেবোনা, কারণ পরে ভেবে দেখেছি, এ অভিজ্ঞতার সবচেয়ে অপ্রয়োজনীয় জিনিস ওইটি। মানে, যা জুটবে তার যতটুকু পারা যাবে গলা দিয়ে কোনরকমে নামিয়ে দিলেই হলো। আর আন্ডা তো দিনে একবার পাওয়াই যাবে, আর কি চাই ? তবে গাইড-পোর্টার কাম রাঁধুনিদের আন্তরিকতা সমতলের তুলনায় সাত হাজার ফুট উঁচু; আমাকে এরা ১৪০০০ ফিটে বসে ইয়াকের দুধে কর্নফ্লেক্স (চিনি বাদে) অবধি খাওয়াতে এসেছিলো ! শিউরে উঠে বলেছিলাম, হঠা লেও, হম বিলাইতি চিড়া নেহি খাতে হ্যায়। তা যাই হোক, এই সাচেনে ইঁট-সিমেন্টে তৈরি ছোট্ট জিরেন-ছাউনিতে বসে নরবু-র সেই ‘লনচ’ (Lunch) করতে করতে দেখছিলাম, সব্বার শেষে ইয়কসাম থেকে রওনা-দেওয়া মালবাহকের দল গোটা পনেরো zu-এর পিঠে আমাদের বাইশজনের (ভুল হলো, গাইড-পোর্টার-কুক মিলে মোট বত্রিশ-তেত্রিশ জনের) আগামী নয়দিন সাড়ে নয় হাজার ফিট ও তদুর্ধ্বে সহি-সলামত টিঁকে থাকবার অত্যাবশ্যকীয় ন্যুনতম লটবহরাদি চাপিয়ে নিজেদের মধ্যে হাসিমস্করা করতে করতে বিন্দাস এগিয়ে গেল। ন্যুনতমই বটে, এক-একটি জু-র পিঠে কমপক্ষে তিরিশ-চল্লিশ কিলো মাল ধরে একুনে দাঁড়ায় কমবেশি ছ’শো কিলো। বস্তাবন্দী আটা-ময়দা-চাল-ডাল-নুন-তেল, বেতের ঝুড়িতে ডিমের ক্রেট, গোটা বারো তাঁবু, গ্যাস সিলিন্ডার-ওভেন, মায় ফাইবারের পুঁচকে ডাইনিং টেবিল ও গোটাকয় টুলও চাপানো দেখলাম। পরে নজর করেছিলাম, ডাইনিং টেবিলের শাহী বন্দোবস্ত সেই  সাহেব (জার্মান) পিতাপুত্রের খিদমতের নিমিত্ত, কেননা অতিথি দেব ভবঃ, তা সে ইউনিয়ান কার্বাইড-ওয়ালমার্টই হোক বা ফর্সাপানা বন্দুকব্যবসায়ীই হোক। মেরা ভারত স্বাধীনতার পরমূহুর্ত থেকেই মহান। মিনিট কয়েকের মধ্যেই পুরো দলটি পাহাড়ি বাঁক পেরিয়ে চোখের আড়ালে চলে গেলো। আবহে জু-এর গলায় বাঁধা ঘন্টির ঠিং-ঠং-রিন-ঠিন-ঠিন সুরেলা কন্সার্টের ক্রমক্ষীয়মান রেশ। তার সাথে তাল দিতেই যেন টিই-টিই-টিইইই করে ডেকে উঠলো নাম-না-জানা কোন পাখী। তারপরই বুঝলাম, কি গভীর নৈঃশব্দের সমুদ্রে ডুবে গেছি কখন যেন, যেখানে আমারই বুকের ধুকপুকুনি আমি নিজে শুনতে পাচ্ছি। আমার মনে কেমন মেঘ জমলো কোথা থেকে ?   

জু-এর জারিজুরি