আমাদের ছোটকালের বেশিরভাগ আমোদই টেলিফোন-টেলিভিশনের ই-যুগে হারিয়ে গিয়েছে। আজ আর আমার চেনা শহরের কোনো বাচ্চাকে তার বাবা একঘেঁয়েমি থেকে একটুকরো মুক্তি দিতে একচিলতে রেলব্রিজের ওপর থেকে অন্ধকার দক্ষিণদিক থেকে ধেয়ে আসা ৬।১৫-এর আপ মেল লালগোলার আলো দেখায় না। ঝড়ের মতো সে ট্রেন কানে-তালা-লাগানো সিটি বাজিয়ে অকিঞ্চিতকর স্টেশনটাকে চমকে দিয়ে দুর্ধর্ষ তাতার দস্যুদলের ভঙ্গিতে উত্তরে উধাও হতো। থর-থর কাঁপতে থাকা দুবলা রেলব্রিজে উৎসুক পিতা-পুত্রের মুখে উড়ে এসে পড়তো ধূলোবালি, শুকনো পাতা, খড়কুটো। চাপড় মেরে চুল থেকে ধূলো ঝাড়তে ঝাড়তে বাবা বলতো – “দেখলি ?” (অর্থাৎ, কেমন দেখালাম বল ?); ছেলের শিরায় রোমাঞ্চ, চোখে ঘোর। গাছে-গাছে ছাওয়া শহরতলিতে (আসলে, নিপাট গ্রাম) অন্ধকার তখন বেশ ঘন হয়ে উঠেছে। ব্রিজ থেকে নেমে একনম্বর প্লাটফর্মের একমাত্র স্টলে টিমটিমে আলোয় ছানার জিলিপি খাওয়া। এবং অবাক, বাবা জানতে চাইতো, “আরেকটা খাবি ?”; এখানে সংযোজনা - যাদের মনে নেই, তাদের জন্য ঃ আমাদের ছোটবেলায় বড়রা কেউ আমাদের কাছে কৈফিয়ত ছাড়া কিছু জানতে চাইতো না, পছন্দ-অপছন্দ বা ইচ্ছা-অনিচ্ছার ব্যাপারে তো নয়ই। আমরা বড়ই হয়েছি পছন্দ-অপছন্দ বা ইচ্ছা-অনিচ্ছাগুলো বড়দের হাতে ছেড়ে রেখে। এতে অবশ্য আমি আজ আর সেই বড়দের দোষও দেখতে পাই না। এখন, বলতে নেই, শিশুস্বাধীনতার প্রভূত প্রসারে আমি রীতিমতো চমকিত ও কখনও বা ঈষৎ শংকিতও বটে। বলা বাহুল্য, আমি সেই সব শিশুদের কথা বলছি যারা পিঠে ব্যাগ নিয়ে স্কুলে যায়, মা’র এক্সরে নজরে হোমটাস্ক করে এবং ফাঁক পেলে টিভিতে কার্টুন চ্যানেল দ্যাখে। ফিরে যাই সেই অন্ধকারাচ্ছন্ন একনম্বর প্লাটফর্মে। এবার ঘরে ফেরা, স্টেশন থেকে ফেরবার বেলা রিক্সায়। সেকালে আমার জীবনে রিক্সা-চাপা ছিলো যাকে বলে বিরল বিলাস। যা কিছু প্রানপণে চেয়েছি, তার একেবারে প্রথমদিকে আছে রিক্সার সামনে লাগানো কেরোসিন-লন্ঠন যার রশ্মি কেবল রিক্সাকাকুই দেখতে পেতো। আর আমি বাড়ির সামনে পৌঁছে, বাবা যতোক্ষণ ভাড়া দিতেন, সেই অবসরটুকুতে আশ মিটিয়ে দেখে নিতাম আমার সেই স্বপ্নবাতিটি। আহা কি রোমাঞ্চ তার ওই ক্ষীণ উদ্ভাসে ! আহা কি অনন্য সুগন্ধ তার নিঃশ্বাসে ! এরপর সাতটায় হ্যারিকেনের আলোয় পড়তে বসা আছে, ন’টায় ঘুমে ঢুলে পড়ে বকুনি খাওয়া আছে, সাড়ে ন’টায় রাতের খাওয়া সেরে শুতে যাওয়া আছে । মাঝে তেল-শেষ-হয়ে-আসা হ্যারিকেনের নিস্তেজ আলোর বৃত্তের বাইরে ছাইগাদার আমগাছে জোনাকির ঝাড়লন্ঠন জ্বলতে দেখা আছে। তারপর অঘোর ঘুমে তাতার দস্যুদের আনাগোনা, তেপান্তরের মাঠের পারে ভূশুন্ডির চোখ, স্বপ্নবাতি হাতে আমি গহীন অরণ্যযাত্রী; কখনো অফিসার-কলোনির অদ্রিশেখরের মতো দু’দিকেই খোলে এমন পেন্সিলবক্স আমার হাতে।
এমত পৃথিবীতে যেখানে বাড়িতে সুইচ নামক ব্যাপারটির ছোট্ট হাতল তুললে ইলেকট্রিক বাতি জ্বলে ওঠাই এক বিষম বিস্ময় ছিলো, পগারের চানঘরে কলের চাবি ঘোরালে জলের ধারা এক অনির্বচনীয় ভগীরথীয় আনন্দ বয়ে আনতো, সেখানে দুর্গাপূজোর চার-চারটি দিন মানে ফূর্তির অকূল দরিয়ায় দেদার নৌকা ভাসানো। সাকুল্যে দু’টি মন্ডপ, দু’টি প্রতিমা – আনন্দের একুল-ওকুল, মাঝে উথাল-পাথাল বিধিবন্ধহীন চারটি দিন। একই ছিটের জামায় সজ্জিত দু’ভাই, পকেটে ঠাকুরমার দেওয়া কুবেরের ধন পকেট-মানি পাঁচ টাকা, নিতান্ত কৃপণের মতো চারটে দিনের এক-এক মুহুর্ত খরচ করতাম। প্রতিপলেই ভয় হতো, আহা এই মুহুর্তটি থেকে বুঝি বা সবটুকু শুষে নেওয়া গেলো না। তাহলেই তো ক্ষতি, এবং তা এমনই অপূরণীয় যে ভরতে হা-পিত্তেশ করে বসে থাকতে হবে দীর্ঘ একটি বছর। দীর্ঘ মানে কতো দীর্ঘ ? মাঝে তিন-তিনটে পরীক্ষার কালাহারি অথবা কারাকোরাম পার হওয়া, সেই সংক্রান্ত নিরস পাঁয়তাড়া, লাঞ্ছনা ও কখনো-সখনো পিঠ-চাপড়ানি (অর্থাৎ, চালিয়ে যাও, পরেরটার জন্য একইভাবে প্রস্তুত হও) ; জ্বর-সর্দি-কাশিতে ডাক্তারদাদুর পেন্টিড ৫০০ এবং মিক্সচার (এটা উপভোগ্য, বেশিতে আপত্তি ছিলো না), গরমের মুখে কলেরার টীকা (ভয়ে বাঁশবাগানে লুকিয়ে পড়তাম), ফোঁড়া এবং অ্যান্টিব্যাক্ট্রিনের গা-গুলিয়ে-ওঠা অত্যাচার, সামার ভ্যাকেশানে ফুটবল এবং স্কুলের দেওয়া বাড়ির কাজের মজুরগিরি, মাঝে হয়তো বা দিন-তিনেকের জন্য মামাবাড়ির আয়াস, ঝুলনে মাটির চাক কেটে পাহাড় বানানো আর তাতে খেলনা রেলগাড়ি চড়ে মনে মনে হিমালয়পাড়ি, রমেন(জীবনবিজ্ঞান)স্যার-এর প্যারেনকাইমা-স্কেরেনকাইমা, সুনীল(ভূগোল)স্যারের ‘রাজস্থানের জীবন-জীবিকা বলো’, অগাস্ট মাস থেকে একটি একটি করুণ দিন গোনা যার শেষে এক ভোররাতে আকাশভরে অমোঘ মুক্তির ধ্বনি বেজে উঠতো, “জাগো, তুমি জা-আ-আ-গো”, এবং আমি জেগে উঠতাম সানন্দ সকালে। বাবা একবার শেখালেন, “যেও না নবমী নিশি লয়ে তারাদলে”। আমরা ভাসান দেখতে যেতাম গঙ্গার পাড়ে। এতোদিনের সযত্ন যোগাড়যন্ত্র একদল শক্তপোক্ত লোকের কাঁধে চেপে গঙ্গাগর্ভে মিলিয়ে যেতে দেখতাম। এতো শুধু ঠাকুর ভাসান নয়, ওরই সঙ্গে বিলীন হয়ে যেতো বছরভর চাতকের প্রতীক্ষার পরে ক্ষনিক মুক্তির উল্লাস, জলে ধুয়ে-যাওয়া রিক্ত কাঠামোর মতো ভেসে উঠতো আগামী এক বছরের নিরানন্দের কঙ্কাল। বাড়ি ফেরবার পথে আঁধারঘেরা শূন্য মন্ডপে আমারই হাহাকারের মতো জ্বলতো একটিমাত্র প্রদীপ। অন্ধকারে লুকিয়ে চোখ মুছে নিতাম। সে রাতে অনেকক্ষণ জেগে থাকতাম...পশ্চিমে দমকা বাতাসে তখনো আবছা ভেসে আসতো ভাসানের ঢাকের বোল। যেন আমার নিভে আসা আনন্দিত চেতনার ক্রমক্ষীয়মান হৃদস্পন্দন। তারপর কখন জানি সব শব্দ থেমে যেতো। আমি অশ্রুসিক্ত বালিশে মুখ গুঁজে ঘুমিয়ে পড়তাম।
কাগজে পড়ছিলাম বিতর্কঃ দুর্গোৎসব এক মহা অপচয় – পক্ষে ও বিপক্ষে। বিপক্ষের তার্কিকরা দুর্গাপূজোকে এই রূদ্ধশ্বাস গতির যুগে আপাতঃ বিচ্ছিন্ন বাঙালীর মিলন-অবকাশ, বাঙালীয়ানার সদর্প প্রকাশমঞ্চ ইত্যাদি অতি জরূরী বিষয়ের প্রেক্ষাপটে সমর্থন করেছেন। পক্ষের ওঁরা কামান দেগেছেন, দুর্গাপূজো এই মন্দার দুনিয়ায় নেহাতই বেহিসাবি অর্থোপচয়, যা কেবল মুদ্রাস্ফীতিকে স্ফীত করে নির্ধনের ন্যূনতম বেঁচে থাকাকে কঠিনতর করে তোলে। একজন পরিবেশবাদী বলেছেন, দুর্গাপূজো মানেই নির্বিচার বৃক্ষছেদন (!), পরিবেশের দূষণ ও তার অবনয়নমাত্রা বৃদ্ধি এবং ফলে আন্তঃ-প্রজন্ম সমতা (inter-generational equity) বিনষ্ট হয়ে স্থিতিশীল উন্নয়ন বিঘ্নিত হচ্ছে। এতাদৃশ মহতি আলোচনায় অংশগ্রহণের ধৃষ্টতা আমার নেই। আমি কেবল দেখে এসেছি যে, এযাবৎ যে জীবন বরাবর আমার থেকে কমপক্ষে দশবছর আগে আগে হাঁটে, সে তার অগ্রবর্তী স্ফটিকমিনার থেকে সস্নেহে নেমে এসে আমার শৈশবের হাত ধরতো দুর্গাপূজোর ওই চারটি দিন। ব্যাপারটা আরেকটু খোলসা করা যাক। ধরা যাক, আমার স্কুলের সহপাঠী তাপসের কথা। জ্যামিতির জটিলরস যা সে বারো বছরে আস্বাদন করতে সক্ষম হয়েছিলো, আমায় তা অনুধাবন করতে বাইশে পৌঁছতে হয়েছে। তাই সে নাসায় কর্মরত আর আমি সামান্য কলেজশিক্ষক মাত্র। সৌরভ গাঙ্গুলি ক্রিকেটের যে প্রকরণ পনেরোতে রপ্ত করেছে, আমার তা বুঝতে বত্রিশ বছর লেগেছে ; বত্রিশের নিজস্ব দাবিদাওয়া মিটিয়ে সে প্রকরণের প্রায়োগিক দক্ষতা এ জীবনে আর অর্জন করা বৈজ্ঞানিক কারণেই সম্ভব নয়। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বন্ধুদের পিঠ-চাপড়ানিতেই ফুরিয়ে গিয়েছে আমার ক্রিকেট-অভিযান। এমনকি যে বিষয়টি নিয়ে এতোটা দূর ঘষটেছি, সেই অর্থশাস্ত্রের প্রাথমিক সুত্রগুলো অনেকেই পঁচিশে বেশ বুঝে নিয়েছেন আর আমি চল্লিশ পেরিয়ে আজও তাতেই হাতড়ে বেড়াই। ফলে তাঁরা জাতীয় বা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক ঘটন-অঘটন পত্রপত্রিকায় এবং টিভির পর্দায় যুক্তিসহ বিশ্লেষণ করেন, আর আমি ওইসব বিষয়ে মুখ খুলতে হলেই মারাত্মক হীনমন্যতায় ভুগি। তা যা বলছিলাম, দুর্গাপূজোর ওই ক’টা দিন যেন এই পশ্চাদপদতা মুছে দিয়ে আমায় জীবনের সঙ্গে একসারিতে দাঁড় করিয়ে দিতো। যেখানে আমার সঙ্গে ভবিষ্যতের মহাকাশবিজ্ঞানী, সফল খেলোয়াড় অথবা তিননং-পাতার কীর্তিমান -সবাই ছিটের বেঢপ হাফপ্যান্ট বা ফ্রক পরে গর্বিত আনন্দে উচ্ছল। কেউ কোন জন্মলব্ধ কবচ-কুন্ডলে গরিয়ান নয়, কেউ দু’দিকে-খোলে-এমন পেন্সিলবাক্সর অভাবে হীন নয়। যদিও এই সাম্যলীলার মেয়াদ মাত্র চারটি দিন, মুঠো করে ধরবার আগেই আঙ্গুলের ফাঁক গলে পিছলে যেতো সময়, তবুও হাস্নুহানার হাল্কা গন্ধের মতো বেশ কিছুদিন তার ঘোরলাগা রেশ রয়েই যেতো। সেই সুবাসিত সমতার তিরতিরে স্রোতে কেটে যেতো আমার আরো দু’একটা সপ্তাহ। বাহান্ন বিয়োগ দুই কি তিন, সমান-সমান পঞ্চাশ বা ঊনপঞ্চাশ। দাঁড়িপাল্লার একদিকে এই দুই সপ্তাহ সমানে পাল্লা টানতো অপরদিকের পঞ্চাশের।
আজও আমি কোন মন্ডপে দাঁড়িয়ে বৈভব দেখতে পাইনা, দেখতে পাইনা সাড়ম্ববর আলোর রোশনাই। শুনতে পাইনা রবীন্দ্রসঙ্গীত। চোখের কোণে দেখতে পাই, আগামী-দু’বছর-ধরে-পরা-যাবে-এমন হাফপ্যান্ট, অ্যাপোলো টেলার্সের তৈরী ঢলঢলে ছিটের জামা গায়ে, পায়ে অক্ষয় নটিবয় জুতো-পরা আমার হাঁ-করা শৈশব, মন্ডপের নায়ক ঢাকিকাকুর দু’কাঠির জাদুর সম্মোহনে ও কাঁসর-হাতে ওর ছেলের সৌভাগ্যে বিমোহিত... “যেও না নবমী নিশি লয়ে তারাদলে...”।