Wednesday, 2 October 2013

মুখ ও মুখোস : আপনাকে এই জানা আমার


আমার একটা বদ্ধমূল ধারণা, আমার একখানি বেশ কিপ-সেফ-ডিস্ট্যান্স মার্কা বদন আছে। বিল্লা বদন জন্মসুত্রে প্রাপ্ত, এ বিষয়ে মা’য়েরও যথেষ্ট আক্ষেপ রয়েছে, বিশেষতঃ অনুজ সহোদর রূপবান ও প্রিয়দর্শন হওয়ায়। ছেলেবেলায় মদীয় কুতকুতে চোখ ও দূরাদয়চক্রনিভস্য ভুরুতে চৈনিক আদল রীতিমত প্রকট থাকায় এলেবেলে করে ডাকবার জন্য একখানি চীনে-গোছের নামও দেওয়া হয়েছিল। দিদা আদর করে বলতেন, আহা মুখখানি দেখছসনি, অ্যাক্কেরে গোলপানা যেন্ (ন-এ হসন্ত দিয়েই পড়তে হবে) পানের বাটা। প্রাইমারীতে শখ করে মাথায় স্কার্ফ-পরিহিতা এক সহপাঠিনীকে অসীম সাহসভরে স্কুলের বাগানের ফুল ছিঁড়ে দিতে গিয়ে শুনতে হয়েছিল – এখন থাক, চুল উঠলে দিস ! যেন ওর কামানো মাথায় চুল ওঠা অবধি ওই নশ্বর ফুল অনাঘ্রাত অটুট থাকবে ! এ পরোক্ষ প্রত্যাখ্যান বোঝার মত মনের বয়েস তখন আমার হয়ে গিয়েছে। তারপর যে বয়েসে স্কুলের পার্শ্ববর্তী গার্লস স্কুলের দেওয়ালে তালেবরদের নামের সঙ্গে যোগচিহ্ন দিয়ে প্রণয়িণীর নাম দেখতে পাওয়া যায়, সেতূবন্ধনের সে বয়েসেও আমি বিলকুল যোগাযোগহীন। কতদিন ভেবেছি, সে কোথায়, কোথায় সে, যে ভেঙ্গে মোর ঘরের চাবি আমায় অভিষিক্ত করবে! আছে, কোথাও নিশ্চয় আছে, আমারে বধিবে যে, গোকুলে বাড়িছে সে। কলেজে উঠে তো প্রায়ই মনে হত, কে যেন ডাকল পিছন থেকে! পজ নিয়ে ঘুরে তাকাতাম, এবং অবধারিত ঝাঁকা মাথায় মুটে নয় খ্যাংরা-গুঁফো মুশকো জিজ্ঞেস করতো,  ভাই রানাঘাটের খবর হ’ল ? এমন চলতে চলতে ভাই থেকে দাদা হলাম, বড়দা হলাম, তারপর অধুনা কাকুত্ব লাভ করেছি। এমনকি শেষমেষ যে মেয়েটি নেহাত গ্রহের ফেরে আমার সঙ্গে ভিড়ে নিজেই নিজের কপাল যৎপরোনাস্তি পুড়িয়েছে পনেরো বচ্ছর হ’ল, শুনেছি তাকেও তার বান্ধবীদের মুখে শুনতে হয়েছে, হ্যাঁরে তোর বর তোর সঙ্গে কথাটথা বলে ? বাবা, আমার তো দেখলেই কেমন ভয়ভয় করে! (তা, আমি তো বহু ভেবেও মনে করতে পারিনি আমি আদৌ কাউকে কস্মিনকালে এমত অসম্ভব অনুরোধ করেছি যে আমায় দেখুন, এবং দেখতে থাকুন!) এই সব কার্যকারণে আমার বদনবইটির মলাটে যে কর্কশ, ক্রোধী, মায়াদয়া ও ‘জীবে প্রেম’-হীন এক বিকর্ষক রঙ মাখানো আছে সে বিষয়ে আমি উত্তরোত্তর নিঃসন্দেহ হয়ে উঠেছি। তদুপরি, সাত বচ্ছর আগে হাতে গোনা কয়েকজন অতিপরিচিত-পরিচিতার মনে রীতিমত দাগা দিয়ে একটি ফরাসী ছাঁদের দাড়ি রেখে ঈষৎ স্যাডিস্টিক আত্মপ্রসাদ লাভ করি। শিক্ষকতার প্রথমদিন থেকেই কানাঘুষোয় শুনে আসছি, ছাত্রছাত্রীরা (তাদের সবাই দোদুল দে বা লালিমা পাল(পুং) নয়, অনেকেই অগ্নিদেব এবং রুদ্রবীণাও বটে) নাকি আমায় কোন সামান্য কথা জিজ্ঞেস করতেও সাহস পায়না, কারণ তারা আমায় বিষম ভয় পায় এবং আমার বদনখানি দেখে তাদের নিশ্চিত ধারণা যে আমি ভীষণ রাগী এক ভয়াবহ রকমের জীব। একবার তো শুনেছিলাম, একটি (অবাঙালী) ছাত্র আমায় মন খুলে অভিসম্পাত করেছে – “ওহ যো ফ্রেঞ্চকাট হ্যায় না, বহুত খতরনাক আদমি হ্যায়, সারা সাল ডরাতা রাহা, বলতে থে, ক্লাস এটেন্ডেন্স এক ভি কম হো তো পারিক্সা মে বৈঠনে নেহি দুংগা। ** , দিল তো করতা হ্যায় উনকো ইতনা শাপ দুঁ, ইতনা শাপ দুঁ কে...”, এবং তার সঙ্গী বলে, “ছোড় ইয়ার, উনকো পহেলে হি বহোত ইস্টুডেন্ট শাপ দিয়া হোগা, ইসি লিয়ে কম উমরমে সারে বাল সফেদ হো গয়ে...”। অনেক সহকর্মী সময়-সময় নিন্দাবাচক কোয়ারান্টাইন করে রেখেছেন। কয়েকজন বাকসম্পর্ক স্থাপনেও অনীহা দেখিয়েছেন (ফলে তাঁদের সঙ্গে বাকি সম্পর্কের কোন প্রশ্নই ওঠেনি)। তা বেশ করেছেন। সমাজের (অর্থাৎ কলেজের) উন্নত-অর্ধের উন্নয়নে ব্রতী একজন (ভারপ্রাপ্ত) অধ্যক্ষ তো একবার আমায় তাঁর চেম্বারে ডেকে নিয়ে গিয়ে একান্তে জানিয়ে দিয়েছিলেন, দেখো মাই বয়, ডোন্ট মাইন্ড, তোমার উপরে আমাদের সহকর্মীদের অনেকের অ্যালার্জি আছে বুঝলে ! আচ্ছা, এটা একটা ভেবেচিন্তে বলবার মত কথা হ’ল বলুন ? এর চেয়ে সর্বজনীন সত্য আর কিছু আছে কি ? আরে আমি তো কোন ছার, বাংলাদেশে ঠাকুর বা রায় পরিবার বাদে সর্বৈব নির‍্যালার্জি লোক আপনি পাবেন কোথায় ? চাকুরিলাভের কসরতকালে ইন্টারভিউতেও বারংবার দেখেছি, আমায় সামনের কুর্সিতে উপনীত দেখামাত্র হুজুরদের আর্শিনগরে প্রবল কৃষিকার্যের ছাপ। আমার ঠিক আগের প্রার্থী অবধি পুরোদস্তুর বাংলায় চলা ইন্টারভিউ আমি ঘরে প্রবেশিতেই মুহূর্তে কালাপানি টপকে ব্রিটিশ হয়ে যেত। ফলে যথাবিহিত ধেড়িয়ে বাইরে এসে গোসলঘরের আয়নায় নিজ মুখখানা ভালো করে দেখতাম আর ভাবতাম, আচ্ছা আমায় কি নীলকর-ইংরেজদের মত দেখতে ? প্রত্যয় হত না, মনে হত টিকটিকিরাও দেওয়ালে ঘোরাঘুরি করতে করতে যেন হাসি চাপতে চাইছে। থিয়েটারের শখ ছিল, আরো সত্যি করে বললে বলতে হয়, জীবনে একসময় শখের থিয়েটার ছিল। তা সেখানেও নায়ক তো দূর, পার্শ্বনায়কের চরিত্রেও পরিচালকেরা কোনকালে আমায় নির্বাচন করবার সাহস দেখাননি, কেবল ভিলেন, লম্পট, নির্দয় ও ক্রুর চরিত্রেই আমার নাট্যজীবন ঘুরপাক খেয়েছে। মানে, মোটের উপর, মুখের চারপাশে অদৃশ্য লাল সিগন্যাল জ্বলে থাকায় নিরাপদ দূরত্ব যে ভাবেই হোক বজায় থেকেছে এবং তার জন্য, আমি আগাপাশতলা ভেবে দেখেছি, আমার মুখখানা ছাড়া অন্য কিছু দায়ী হ’তে পারেনা। একেক সময় নুব্জ হয়ে ভাবতাম, আমি মূলতঃ যা নই সকলে আমায় তাই ভাবে কেন ? এক এবং একমাত্র কারণ আমার বদন, যাতে নির্ঘাত মুখোসের মত আঁকা আছে হিংস্র সিংহের কেশর, অসুরের মত গালপাট্টা, রঘু ডাকাতের মত সিঁদুরের ফোঁটা।
         তবে এক এবং একটি মাত্র ক্ষেত্র আছে, যেখানে আমার মুখোস কাজ করেনি। ‘চলন্ত রেলপথে’ (এই শব্দযুগল দৈনন্দিন রেলের কামরায় বহুশ্রুত, অর্থ বহুধাবিস্তৃত) ভিক্ষাজীবীকুল আমার সে কুলিশকঠোর মুখোসের তোয়াক্কা রাখেননি কোনদিন। বরং আমি বিশেষ নজর করে দেখেছি, চলন্ত রেলপথেই হোক আর স্থবির রেলস্টেশানেই হোক, চক্ষুষ্মান হোন কি দৃষ্টিহীন, আমায় ওঁরা ঠিক খুঁজে নেন। অফিস টাইমে ভরভরন্ত পরিস্থিতিতে যখন ওঁরা বেছে বেছে ‘কাজ’ করেন, এক ধারসে সবা’র কাছে হাত পাতেন না, শপিং মলে শৌখিন গিন্নির ভঙ্গিতে ‘পিক অ্যান্ড চুজ’ করে থাকেন, তখনও দেখেছি, চার-পাঁচজনাকে টপকে অবলীলায় তাঁরা আমায় অভিষিক্ত করছেন। জনারণ্যে আমায় বেছে নেওয়ায় ওঁদের এই দক্ষতা দেখে বারে বারেই আমার মনে হয়েছে, আহা চাকরির ইন্টারভিউতে এঁদের কেউ যদি থাকতেন, তাহলে আমায় মোটমাট তিনশো তেইশখানা রিগ্রেট লেটারের কশাঘাত এ তাপিত জীবনে সহ্য করতে হত না। দারুণ দাবদাহে তপ্ত দুপুরে ততোধিক তপ্ত রেলের কামরায় ঘর্মাক্ত মুখে ক্রোধগর্ভ মুখোস টাঙিয়েও আমি নিস্তার পাইনি। কেউ না কেউ ‘পুরানো সেই দিনের কথা’ বা ‘তুমি কোন কাননের ফুল, কোন গগনের তারা’ গেয়ে আমার থেকে নির্বিচারে এক-দু’ টাকা বাগিয়ে নিয়েছেন। কামরার এক প্রান্তে এঁদের কাউকে দেখা মাত্র কখনো অহেতূক গভীর নিদ্রার ভান করেছি, ওঁরা পাত্তাই দেননি, রীতিমত হাত ধরে ঝাঁকিয়ে আমার চেষ্টিত ঘুমতপস্যা ভাঙ্গিয়ে সাহায্য বুঝে নিয়েছেন। অথচ, দেখেছি একই স্থান ও কালে অপরাপর অনেকেই বাই ডিফল্ট কেমন সুন্দর ছাড় পেয়ে যান। কেবল আমার মুখোসেরই রথের চাকা মাটিতে, থুড়ি, রেলপথে কেন কে জানে অদ্ভুতভাবে স্তব্ধ হয়ে যায়। সয়ে-যাওয়া ফাঁক ও ফারাক মুছে গিয়ে হঠাৎ করে গা-ঘেঁষাঘেঁষি সান্নিধ্য ক্ষনিকের জন্য সৃষ্টি হ’লে অস্বস্তি হওয়াই স্বাভাবিক।      
       গত বছর পঞ্চমীর গোধূলি। নৈহাটি স্টেশান জুড়ে ছোটছোট মানববৃত্তের প্রত্যেকটিতে একেক দল ঢাকি পাল্লা দিয়ে তাদের কেরদানি জাহির করে চলেছে। তারা সব দূর-দূর থেকে এসেছে, কাঁসি-হাতে পুঁচকে ছেলেকেও অনেকেই সঙ্গে নিয়ে এসেছে। দুর্গাপুজোর পাঁচদিন যে সম্বৎসরের কামাই-এর সেরা সুযোগ। তাদের বায়না করতে নানা পুজো কমিটির মুরুব্বিরাও জুটেছেন, তাঁরা এ ঢাকি ও ঢাকির মান ও মানি (পারিশ্রমিক) যাচাই করে নিচ্ছেন। একে অন্যকে ছাপিয়ে যাওয়ার প্রাণান্তকর প্রতিযোগিতায় এর বোল তাকে চেপে দিচ্ছে। আগমনীর তালে বিসর্জনীর বোল মিলেমিশে এক বিচিত্র  ও বিক্ষুব্ধ শব্দসমুদ্র তৈরি করছে স্টেশান চত্বর জুড়ে। সত্যি বলতে, মোটেই খারাপ লাগছে না আমার, আলোর মালায় ঢাকা পড়েছে এবড়োখেবড়ো রাস্তার স্বরূপ, মায়াবী সাজসজ্জার রূপময়তা আড়াল করেছে চলিত সভ্যতার অললিত মুখচ্ছবি। এখন আসন্ন উৎসবের রোশনাই আর সহস্র মানুষের আনন্দিত স্রোতে মুখ আর মুখোসের টানাপোড়েন হারিয়ে যাবে দিনকয়েকের জন্য। এমন সময় ভিড়ে ভিড়াক্কার রেলস্টেশানে আমার কাছে ঘনিয়ে এসে এক বৃদ্ধা বললেন, বাবা, আমার পঁচিশ বছরের ছেলেটা আজ দু’মাস হসপিট্যালে ভর্তি, কিছু সাহায্য দেবেন বাবা ? এই প্রশ্নের আগে আমি তাঁকে বেশ কয়েক মিনিট ধরে আড়চোখে পর্যবেক্ষণ করছিলাম, এবং দেখছিলাম উনি খুব সিলেক্টেড দু-একজনের কাছে দাঁড়াচ্ছেন। রোজকার চেনা ট্রেনের বা রেলব্রিজের সাহায্যপ্রার্থী উনি নন। বেশবাস দেখে মনে হয়, হঠাৎ করে ঘোর দুর্দিনের অন্ধকার সাগরে পড়ে গিয়েছেন, সাঁতার এখনো অভ্যেস করে উঠতে পারেননি। আমার রেলজীবনের অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়তে চলেছি। আমি মনে মনে শঙ্কিত হয়ে উঠছিলাম, কারণ আমি নিশ্চিত জানি শত লোকের ভীড়েও উনি ঠিক আমায় খুঁজে পাবেন, এবং কয়েক মুহুর্ত পরেই আমার কাছে এসে দাঁড়াবেন। ওনাকে কি সাহায্য দেবো, কত সাহায্য দেবো এ জাতীয় সিদ্ধান্ত আমার মত দ্বিধাগ্রস্ত লোকের পক্ষে চট করে ঠিক করা ভীষণ শক্ত কাজ । কারণ, অভ্যাসিত এক-দু’ টাকা এঁকে দেওয়া আমার কেমন অসভ্যতা বলে মনে হচ্ছে আবার পঞ্চাশ-একশো টাকার নোট বার করাও যেন বড্ড অতিনাটকীয় ঠেকে। তবে সুবিধে আছে আমার মুখোসে সে দ্বিধা বোধহয় ঢাকা পড়ে যাবে এমন বিশ্বাসে মুখোসটাকে প্রাণপণে নৃশংসতম করে তুললাম যেন জীবনে কখনো কোন ব্যাপারে কোন দ্বিধা ছিল না আমার। ওনাকে টাকা পাঁচ কি দশটাকা দিয়ে কিস্যা খতম করবো ঠিক করে পকেট থেকে মানিব্যাগ বার করে হাতড়াতেই বিষম সংকটে পড়ে গেলাম। এক-দু’ টাকা খুচরো আছে বটে কিন্তু তাতে পাঁচ টাকা হচ্ছে না আর দশটাকারও কোন নোটও নেই। একটিমাত্র বিশ টাকার নোট আছে আর আছে একশো টাকা। এক সেকেন্ড, দু’ সেকেন্ডের দ্বিধা, যেন অনন্তকাল...শশব্যস্ত আমি দ্রুত ঠিকঠাক করে নিই ঈষৎ স্থানচ্যূত মুখোসটাকে, টেনে বার করি বিশটাকার নোটখানা। অবহেলাভরে বৃদ্ধার হাতে তুলে দিতেই উনি আমার দু’হাত চেপে ধরে হঠাৎ সুতীব্র কান্নায় ভেঙ্গে পড়লেন। আমি হতবাক, অপ্রস্তুত, তক্ষুনি আবার আমার কেঁপে-যাওয়া মুখোসে হাত দিতে যেতেই শব্দহীন কাঁদতে-কাঁদতে বুঁজে-আসা কন্ঠে উনি বললেন, বাবা তুমি বড় নরম, আমার ছেলেটার মত। তোমায় আমি মিথ্যে বলেছি বাবা, আমার পঁচিশ বছরের ছেলেটা এক বছর হ’ল ব্লাড ক্যান্সারে মারা গেছে...মা হয়ে মরা ছেলের নামে ভিক্ষে করে পেট চালাচ্ছি বাবা, না হ’লে যে কেউ ভিক্ষে দেয়না, ...পেটের জন্যে বাবা, দু’টো খেতে পাব বলে...তোমার চোখদুটো আমার সেই ছেলেটার মত, তোমায় মিথ্যে বললে যে পাপ হবে বাবা...পারমাণবিক বন্ধনমুক্ত মহামৃত্যুর সেই ‘নভঃস্পৃশ্যং দীপ্তমনেকবর্ণং ব্যাত্তাননং দীপ্তবিশালনেত্রম’ কি আমি জানিনা; আমি জানিনা দ্যুলোকভেদী মহামন্দ্র দুন্দুভিনিনাদ কি বস্তু; আমি কেবল জানি, আমার চারপাশে আকাশ ভেঙ্গে ভয়ঙ্কর বাজের শব্দে যেন লক্ষ পুত্রহারার অশ্রুবিহীন কান্না ফেটে পড়লো তৎক্ষণাৎ... বৃদ্ধা কেঁদে চলেছেন এবং কি আশ্চর্য তাঁর চোখে এক ফোঁটা জল নেই ! কি অতলান্তিক সে শোক, কি দুঃসহ সে জীবনের ভার, কি অপরিমেয় তার উত্তাপ যে সদ্য সন্তানহারা মায়ের চোখের জলের শেষকণাটুকুও পর্যন্ত শুকিয়ে গেছে ! কোন অদৃশ্যচারী নিষাদের নির্মম তীর আমায় এফোঁড়ওফোঁড় করে দিয়ে জনাকীর্ণ সেই উৎসবমুখর রেলস্টেশানে একা এক অগ্নিকুন্ডে দাঁড় করিয়ে দিল। 
          স্টেশানের একেবারে উত্তর প্রান্তে চলে এলাম, ভীড় এখানে নেই, ঢাকিদের বোলও ক্ষীণ, কেবল দূরে ঘনায়মান সন্ধ্যের অন্ধকারে সিগন্যালের লালবাতি অনিমেষ জ্বলে আছে।  আকাশের দিকে মুখ তুলে উদ্গত কান্না আগলমুক্ত করে হা-হা করে কেঁদে উঠে চীৎকার করে বললাম, মাগো দেখেছিস তুই, সকলের পরিয়ে দেওয়া মুখোস আমার মুখটাকে আজো পুরো ঢেকে দিতে পারেনি। মৃতবৎস্যা ওই বৃদ্ধার নিভে আসা চোখের তারায় আমার আসল মুখখানি ধরা পড়ে গেছে। আনখশির কৃত্রিমতায় সাজানো চার-পাঁচ দিনের উৎসবের উল্লাসী মুখোস বিসর্জনের গঙ্গায় ডুবে গিয়ে ভেসে উঠবেই সারা বছরের নিরানন্দময় আটপৌরে মুখ। তোর নিটোল সৌষ্ঠব ধুয়ে খড়-মাটি-কঞ্চির কঙ্কাল অবধারিত বেরিয়ে পড়বে ক’দিন পরেই, যদিও ভাগ্যিস তা দেখবার জন্য মানুষ ভীড় করে আসবে না, তাই মুখোসকেই মুখ ভেবে ক্ষনিকের উল্লাসী চেতনার চোরাবালিতে খুঁটি গেড়ে জীবনের খেলাঘর সাজানোর পুতুলখেলায় সকলে ব্যস্ত হয়ে পড়বে আবার। ভেবে নেবে দিগন্তে কোথাও কোন বঞ্চনা নেই, ব্যর্থতা নেই, আঘাত নেই, প্রত্যাখ্যান নেই, শোক নেই, চিরতরে মুছে যাওয়া নেই। কেউ জানবে না, তিলে তিলে গড়ে তোলা তোর ওই অসুন্দর কাঠামোটাই সত্যি, ওটা গড়বার জন্য রাতজাগা পরিশ্রমটা সত্যি, তার উপরে সুন্দরের প্রলেপ চড়ানোর প্রাণান্তকর জেহাদটা সত্যি, ছানি-পড়া চোখে অশক্ত কাঁপা হাতে তোকে চক্ষুদানের নিষ্ঠাটাই সত্যি। মা গো, রূপাচ্ছন্নতার অস্থায়ী প্রলেপে নয়, কদাকার শাশ্বত সত্যে আমায় জাগিয়ে রাখিস মা তোর কঙ্কালের মত।    
 
 (পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত ট্রৈনিক পত্রিকার  শারদ ১৪২০ সংখ্যায় প্রকাশিত)

Thursday, 22 August 2013

এক উপত্যকা, দুই দেশ, মধ্যিখানে জল


কাশ্মীর দিয়ে দিলেই পাকিস্তানের সঙ্গে বৈরিতার অবসান ?
জন্মসুত্রে সহোদর উপমহাদেশীয় দুই প্রতিবেশী ভারত ও পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকেই পারস্পরিক সন্দেহ, অবিশ্বাস, দ্বন্দ্ব আর বিদ্বেষের কেন্দ্রে অবস্থান করেছে ভূস্বর্গ কাশ্মীর। মুসলমান-অধ্যুষিত করদ রাজ্য জম্মু-কাশ্মীরের হিন্দু মহারাজা হরি সিং-এর ভারত সরকারের সাথে ১৯৪৭-এর ২৬ অক্টোবর ‘Instrument of Accession’- চুক্তি সই-এর মাধ্যমে জম্মু-কাশ্মীর ভারতের অঙ্গীভূত হওয়া থেকে যে ইতিহাসের সুত্রপাত, কাশ্মীর-কেন্দ্রিক তিন-তিনটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের (১৯৪৭-৪৯, ১৯৬৫ এবং ১৯৯৯; ১৯৭১-কে পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশ-কেন্দ্রিক বলে যদি বাদও রাখা হয়) পরেও তা বিন্দুমাত্র প্রাসঙ্গিকতা হারায়নি। এ ধারাবাহিক কাহিনীর গতিতে উত্থান-পতন আছে, মাঝে মাঝে আপাতঃ নিস্তরঙ্গতা এলেও উত্তেজনা বাড়লেই নিয়ন্ত্রণরেখা বরাবর কামানের গর্জন শোনা যায়। দুই প্রতিবেশীর উপস্থিতিতে যে কোনো বহুপাক্ষিক আন্তর্জাতিক আলোচনামঞ্চেও নিশ্চিত ভাবে প্রাসঙ্গিক বা অপ্রাসঙ্গিক সুত্র ধরে কাশ্মীর সমস্যা উত্থাপিত হয়। যে কোনো মৈত্রী প্রয়াসে শেষমেশ দুর্লঙ্ঘ্য প্রাচীর তুলে দাঁড়িয়ে থাকে কাশ্মীর। ঘটনা হ’ল, পাকিস্তান বহুবার প্রকাশ্য বিবৃতি দিয়ে কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের সংগ্রামে সমর্থন জানিয়েছে। কাশ্মীর উপত্যকায় ভারতীয় সেনাবাহিনী কর্তৃক মানবাধিকারের লঙ্ঘনের বিভিন্ন উদাহরণ তুলে ধরে আন্তর্জাতিক মঞ্চে সরব হয়েছে। ফলতঃ, ভারতে সাধারণ  প্রচলিত ও প্রভূত জনপ্রিয় ধারণা হ’ল, নিতান্ত অনৈতিক ভাবে পাকিস্তান মৌলবাদী ভাবাবেগকে হাতিয়ার করে কাশ্মীর সমস্যায় ইন্ধন জুগিয়ে এসেছে বিগত পাঁচ-ছয় দশক ধরে এবং পাকিস্তানের উদ্দেশ্য হ’ল যেন তেন প্রকারেণ কাশ্মীরকে নিজের অঙ্গীভূত করা। সেই উদ্দেশ্য সিদ্ধির লক্ষ্যে পাকিস্তান প্রথমতঃ কাশ্মীরে তারপর সমগ্র ভারতে সন্ত্রাসবাদ রপ্তানী করে। পাকিস্তানের এই প্রচেষ্টা ভারতের সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি আক্রমণ। ভারতের আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই জাতীয় ধারণা জনমানসে সযত্নে লালন করবার রাজনৈতিক লাভালাভ এ যাবত কাল ধরে কিভাবে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলির মধ্যে বন্টিত হয়ে এসেছে তার আনুপূর্বিক ব্যাখ্যা এই রচনায় ঈষৎ অপ্রাসঙ্গিক হ’লেও নির্ভেজাল এক প্রেক্ষাপট তো বটেই। 

প্রকৃত সত্য হ’ল, এই পঁয়ষট্টি বছরের আকচাআকচির মর্মস্থলে আছে জম্মু-কাশ্মীরের বুক চিরে বয়ে যাওয়া সিন্ধু অববাহিকার নদনদীগুলির জলবন্টন সংক্রান্ত দড়ি-টানাটানি। পাকিস্তানের আদত উদ্দেশ্য ও স্বার্থ কাশ্মীরে বয়ে যাওয়া পশ্চিমবাহিনী নদনদীগুলির প্রবাহের উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ ও কর্তৃত্ত্ব লাভ এবং পাক-ঘেঁষা স্বাধীন কাশ্মীরই সেই স্বার্থসিদ্ধির সোপান। আজকের চেহারা অনুযায়ী জম্মু-কাশ্মীরের ৪৩% ভারতের শাসনাধীন, ৩৭% পাক-অধিকৃত কাশ্মীর এবং বাকি ২০% চিনের অধিকারে (আকসাই চিন), যদিও চিন কোনকালেই আকসাই চিনকে জম্মু-কাশ্মীরের অংশ বলে স্বীকৃতি দেয় না, এই অঞ্চলটিকে তারা তাদের মূল ভূখন্ডের অবিতর্কিত অবিচ্ছেদ্দ্য অংশ বলেই জাহির করে এসেছে। সিন্ধু অববাহিকায় সিন্ধু নদ সহ পাঁচটি প্রধান নদী, যথা, শতদ্রু (Sutlej), বিপাশা বা বিয়াস (Beas), রাভি (Ravi), চন্দ্রভাগা বা চেনাব (Chenab) এবং বিতস্তা বা ঝিলম (Jhelum) জম্মু-কাশ্মীর ও পঞ্চনদের দেশ পাঞ্জাবের মধ্যে দিয়ে বয়ে গিয়ে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছে। নদীগুলির নিম্ন অববাহিকার দেশ হিসেবে পাকিস্তানের এই নদীগুলির জলবন্টন ইত্যাদি বিষয়ে স্পর্শকাতরতা অত্যন্ত স্বাভাবিক। প্রাকৃতিক নদীজাল ও তৎসংলগ্ন মানবনির্মিত সেচব্যবস্থার ঐতিহাসিক ভাবে একটি চারিত্রিক সামগ্রিকতা আছে। ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের সময়ে এই বিষয়টি যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচিত না হওয়ায় উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের (অবিভক্ত পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীর) নদনদী ও সেচপ্রণালী ব্যবস্থাটির বিভাজন কোনমতেই সুচারু হয়নি। বস্তুত, কোন রাজনৈতিক বিভাজনরেখা দিয়েই প্রাকৃতিক কোন সামগ্রিকতাকে সুষম ভাগে ভাগ করা কার্যতঃ অসম্ভব। ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯৬০-এ দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত সিন্ধু জল(বন্টন) চুক্তি (Indus Water Treaty IWT) এই অসম্ভব কর্মটিই সম্পাদনের প্রয়াস করেছিল। চুক্তি মত, পূবের নদীগুলি যথা শতদ্রু, বিয়াস আর রাভির জলে প্রাথমিক অধিকার ভারতের ও তিনটি পশ্চিমী নদী যথা, সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাবের জলসম্পদে প্রাথমিক অধিকার পশ্চিমের দেশ পাকিস্তানের, যদিও নদীগুলির উচ্চ অববাহিকায় ভারতের মধ্যে দিয়ে বয়ে যাওয়ার সময় এই নদীগুলির জল পূবের ভারত অভোগমূলক (Non-consumptive) ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে পারবে, যে ধরণের ব্যবহারে নদীর জলপ্রবাহ মোটের উপর হ্রাস পায় না (যেমন, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন)। একটি স্থায়ী কমিশন (Permanent Indus Commission) এই চুক্তির প্রায়োগিক দিকটা তদারক করবে এবং উচ্চগ্রামের বিতর্কের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক কোর্ট অব আরবিট্রেশানে (International Court of Arbitration COA) আপিল করা যেতে পারে যদিও সে কোর্টের রায় মান্য করা বা না করা বাদী-বিবাদীর সদিচ্ছার উপরেই একান্তভাবে নির্ভরশীল, কোনো আইনী বাধ্যবাধকতা কার্যতঃ নেই। আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে জম্মু-কাশ্মীরের পশ্চিমবাহিনী নদনদীগুলির উপরে বিভিন্ন জায়গায় তিরিশটির বেশি বাঁধ ও সংলগ্ন জলাধার তৈরির পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন ভারত সরকার। কেবল চেনাবের জল অভোগমূলক ব্যবহারের উদ্দেশ্যে এগারোটি বৃহৎ ও মাঝারি বাঁধ নির্মিত হয়েছে। যদিও বাঁধগুলির সবক’টির কাজ মোটের উপর সম্পূর্ণ হয়েছে বলা যাবে না, তবু যে পর্যন্ত কাজ শেষ হয়েছে তাতেই নদীগুলির নিম্ন অববাহিকায় পাকিস্তানের শিরঃপীড়ার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। গত পঞ্চাশ বছর স্থায়ী সিন্ধু কমিশনটি টিঁকে গেলেও সিন্ধু চুক্তির (১৯৬০) পরিসরে এ সমস্যা নিরসন যে অসম্ভব তা ওয়াকিবহাল মহল ভালভাবেই জানেন। সিন্ধু অববাহিকার ৬০% পাকিস্তানের মূল ভূখন্ডের অন্তর্ভুক্ত, ভারতে রয়েছে তার ২০% মাত্র (বাকি ১৫% তিব্বত ও ৫% পাক-অধিকৃত আজাদ কাশ্মীরের মধ্যে পড়েছে)। ২০১১-র তথ্যানুসারে পাকিস্তানের স্থূল দেশজ আয়ের (Gross Domestic Product GDP) ২১.৬% কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদিত হয় এবং মোট শ্রমশক্তির ৪২% কৃষিক্ষেত্রে নিয়োজিত। পাকিস্তানের ভৌগোলিক বিস্তার ৭৯.৬ মিলিয়ন হেক্টার ও তার কম-বেশি এক-চতুর্থাংশ বা ২০ মিলিয়ন হেক্টারের মত কৃষিযোগ্য জমি, যার পরিমাণ সুদূর ভবিষ্যতেও আর বাড়াবার সুযোগ আছে বলে আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরাও মনে করেন না। এবং এই কৃষিজমির অর্ধেকের বেশি জমিই সিন্ধু অববাহিকার নদনদীকেন্দ্রিক সেচব্যবস্থার উপর প্রত্যক্ষতঃ নির্ভরশীল। পাকিস্তানের স্বাধীনতার সময়ে যেখানে মাথাপিছু নবীকরণযোগ্য জলের যোগান ছিল ৫৬০০ কিউবিক-মিটার, তা ২০১০ সাল নাগাদ আতঙ্কজনক মাত্রায় কমে এসে দাঁড়িয়েছে ১০০০ কিউবিক-মিটারে। গোটা দেশটাই এমন ভয়াবহ জলসংকটের সম্মুখীন যে কেবল কৃষিই নয়, সমগ্র মানবোন্নয়ন প্রক্রিয়াটিই বিপর্যস্ত হতে বসেছে। সিন্ধুর উচ্চতর অববাহিকায় নদনদীগুলির উপর ভারতের নির্বিচারে একের পর এক বাঁধ নির্মাণ নদীপ্রবাহকে শ্লথ করে তোলায় আরবসাগরে মোহানার মুখে নদীপথে সামুদ্রিক জলের আগ্রাসন মাত্রাতিরিক্ত বৃদ্ধি পাচ্ছে ফলে গত এক দশকে পাঞ্জাব সমভূমিতে মাটির লবণাক্ততা অস্বাভাবিক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে যা চাষবাসের পক্ষে অত্যন্ত ক্ষতিকারক। একই কারণে পলি জমে জমে (Siltation) সিন্ধু নদের উপর ‘তারবেলা’  (ইসলামাবাদের ৩১ কিমি উত্তর-পশ্চিমে গঠনগত আয়তনের নিরিখে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম বাঁধ ও জলাধার) ও ‘মংলা’ (আজাদ কাশ্মীরে মিরপুর জেলায় ঝিলমের উপর বৃহৎ বাঁধ ও জলাধার) বাঁধ ও তৎসংলগ্ন জলাধারের ভবিষ্যৎও ঘোর অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে। ফলে তীব্র জলসংকট ও তার অনিবার্য ফলশ্রুতি হিসেবে অভূতপূর্ব খাদ্যসংকটের ঘোর দুর্যোগের মেঘ যেন মহাজাগতিক সুনিশ্চয়তা নিয়ে পাকিস্তানকে গ্রাস করতে উদ্যত। উপরন্তু পাকিস্তানের গড় বার্ষিক শক্তি উৎপাদনের প্রায় অর্ধেকই জলবিদ্যুৎশক্তি, এবং এর সিংহভাগ আসে সিন্ধু অববাহিকার নদনদীগুলি থেকে। ভারতের ক্রিয়াকলাপে এই নদীগুলির জলপ্রবাহে ঘাটতি পাকিস্তানে নিদারুণ শক্তিসংকটের আতঙ্ক জাগিয়ে তুলেছে। তার উপর রয়েছে সন্দেহ আর ভীতি – বিনা নোটিশে বৃহৎ বাঁধ-সংলগ্ন জলাধার থেকে বিপুল পরিমাণ জলরাশি বাঁধনমুক্ত করে নিম্ন অববাহিকার পাকিস্তানে চুড়ান্ত বিপর্যয় সৃষ্টি করতে পারে ভারত। আশঙ্কা যে একেবারে ভিত্তিহীন তাও বলা যায় না। ২০০৫-এর জুলাই মাসে পাকিস্তানকে পূর্বাহ্নে কোনোভাবে অবহিত না করে বাগলিহার (জম্মু-কাশ্মীরের ডোডা জেলায় চন্দরকোটে চেনাবের উপর বহু-আলোচিত সুবিশাল বাঁধ ও জলাধার) জলাধার থেকে সেকেন্ডে প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষ কিউবিক-ফিট জল ছাড়বার ফলে পাকিস্তানের পাঞ্জাব ও সিন্ধ প্রদেশে বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভায়াবহ বন্যার কবলে পড়ে। প্রাক্তন পাকিস্তানী প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মুশারফ এক ভাষণে খোলাখুলি স্বীকার করেছিলেন যে, পাকিস্তানের নিরাপত্তার স্বার্থে জলই সর্বপ্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। অন্যদিকে ভারতের অবস্থাও তথৈবচ। বস্তুত, দেশের মোট জলসম্পদের সংস্থান (resources), মাত্রা (capacity), দেশবাসীর ওই জলসম্পদে অভিগমনের ক্ষমতা (access), ব্যবহার (use) ও তার পরিবেশগত প্রভাবের ভিত্তিতে পিটার লরেন্স, জেরেমি ম্যেই ও ক্যারোলিন সুলিভান (২০০২) প্রস্তাবিত জলরিক্ততা সূচকের (Water Poverty Index WPI) মানের নিরিখে ভারতের হাল কিন্তু পাকিস্তানের চেয়ে সামান্য হ’লেও খারাপ;  ভারতের ক্ষেত্রে জলরিক্ততা সূচকের মান ৫৩.২ এবং পাকিস্তানের ৫৭.৮ (সূচকটির মান ০ থেকে ১০০-এর মধ্যে থাকে)! পাশাপাশি দেখা যাচ্ছে, ৯০-এর দশকের গোড়া থেকে বিশ্বায়নের স্রোতে গা ভাসিয়ে ভারতে শক্তির চাহিদা বেড়েছে ২০০% এরও বেশি যা কোনভাবেই চিরাচরিত উৎসগুলি থেকে যোগান দেওয়া সম্ভব নয়। এমনিতেই বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়নবিরোধী প্রচার, সচেতনতা ও আন্দোলনের মুখে গড় বার্ষিক কার্বন নিঃসরণমাত্রার নিরিখে চিনের পরেই সেকেন্ড বয় হিসেবে ভারত ইতোমধ্যেই যথেষ্ট আন্তর্জাতিক চাপে আছে, কেননা, ভারতের গড় বার্ষিক নিঃসরিত কার্বনের আশিভাগই চিরাচরিত উৎস কয়লা ও পেট্রোলিয়ামের দহনসঞ্জাত। উন্নয়ন প্রক্রিয়া সচল রাখতে শক্তির অচিরাচরিত উৎসগুলির দিকে তাই নজর ফেরানো উত্তরোত্তর বাধ্যতামূলক হয়ে উঠছে। শিরঃপীড়ার কারণ আরো আছে। খোদ কাশ্মীরেই বিদ্যুৎ-এর চাহিদা ও যোগানের বিপুল ফারাক হেতূ উপত্যকাবাসীর অসন্তোষ উত্তরোত্তর ধূমায়িত হচ্ছে, ২৫% মানুষের কাছে বিদ্যুৎ এখনো সম্পূর্ণ অধরা এবং বাকি ৭৫% মানুষও কেবল আংশিক সময়ের জন্য বিদ্যুৎ পান। কাশ্মীর শিল্প ও বাণিজ্য সংঘের সভাপতি শাকিল কালান্দার বলছেন, সিন্ধু, ঝিলম ও চেনাব – কেবল এই তিনটি নদী থেকেই উপত্যকায় ৩০,০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব এবং উপত্যকাবাসীর মোট ঘরোয়া ও শিল্পগত (Domestic & Industrial) চাহিদা ২৫০০-৩০০০ মেগাওয়াট (২০১১) মাত্র। উপত্যকাবাসীর চাহিদা মেটাতে কেন্দ্রীয় গ্রিড থেকে গড়ে ১৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কিনতে রাজ্যের রাজস্বভান্ডারে অহেতূক চাপ পড়ছে, যখন উপত্যকার নদনদীগুলি থেকেই চাহিদার দশগুণ জলবিদ্যুৎ উৎপাদন প্রাযুক্তিক দিক থেকে খুব বেশি করেই সম্ভব। এই অবস্থায় জম্মু-কাশ্মীরে জলবিদ্যুৎ-উৎস হিসেবে প্রবল সম্ভবনাময় নদনদীগুলির নিয়ন্ত্রণ ভারত ত্যাগ করে কি করে ? দু’ পক্ষের এই স্বার্থসিদ্ধির সংগ্রামে উপত্যকাবাসী তার আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন, তার দীর্ঘকালের আর্থ-সামাজিক বঞ্চনাজনিত পুঞ্জীভূত ক্ষোভ নিয়ে নিছকই ক্রীড়ানক মাত্র। কাশ্মীরবাসীর আর্থ-সামাজিক অনুন্নয়ন বা তাঁদের আহত ভাবাবেগ এ সংগ্রামে সুকৌশলে ব্যবহৃত হচ্ছে কেবল। বিষয়টির অন্য আরেকটি মাত্রা তলিয়ে দেখা যেতে পারে।

ভারত ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমারেখা নির্দ্ধারণের জন্য পাকিস্তান সেই ১৯৫০ সাল থেকেই “চেনাব সুত্র”-টির উপর জোর দিয়ে এসেছে। ১৯৫০ সালে রাষ্ট্রপুঞ্জ নিয়োজিত প্রতিনিধি স্যার ওয়েন ডিক্সনের (Owen Dixon) মস্তিষ্কপ্রসূত ‘ডিক্সন প্ল্যান’ হ’ল এই চেনাব সুত্রের মূল ভিত্তি। চেনাব সুত্রে চেনাব নদীর গতিপথকে জম্মু-কাশ্মীরে ভারত ও পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সীমারেখা হিসাবে প্রস্তাবিত হয়েছে। এই সুত্র অনুযায়ী পাক-অধিকৃত কাশ্মীর, গিলগিট-বালটিস্তান ও শ্রীনগর সহ কাশ্মীর উপত্যকার বড় অংশ এবং জম্মুর কয়েকটি অঞ্চল পাকিস্তানের অন্তর্ভুক্ত করবার প্রস্তাব আছে, লাদাখ সহ জম্মুর বাকি অংশ ভারতের অঙ্গীভূত হবে। এই বিভাজন চেনাবের গতিপথ বরাবর হ’লেও তা মোটের উপর আঞ্চলিক জনগোষ্ঠীর ধর্মভিত্তিক ভৌগোলিক বিন্যাসকে মান্য করে। পাকিস্তান বহুবার বহুপ্রকারে এই চেনাব সুত্র অনুসারে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান চেয়েছে; বিস্তারিত ব্যাখ্যায় প্রবেশ করবার আগেই অনুধাবন করা শক্ত নয় যে ভারতের পক্ষে এ প্রস্তাব সরাসরি নাকচ করবারই কথা। এবং নাকচ করবার প্রাথমিক কারণ এই যে, এই প্রস্তাবে সায় দিলে লাদাখ ও অধিকৃত (পাক ও চিন) কাশ্মীর বাদে জম্মু-কাশ্মীরের প্রায় ৫৭% জায়গা অর্থাৎ প্রায় ৩২,০০০ বর্গ কিমি এলাকা পাকিস্তানকে ছেড়ে দিতে হয়। অন্যদিকে পাকিস্তানের চেনাব সুত্রে অতি আগ্রহের কারণ স্পষ্ট করে বুঝতে হ’লে চেনাব সুত্রে একটি কাল্পনিক পরিবর্তন ধরে নিয়ে এগোনো যেতে পারে। ধরে নেওয়া যাক সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকাই পাকিস্তানকে প্রত্যর্পিত হ’ল এবং জম্মুর গোটাটাই রইল ভারতে। সেক্ষেত্রে সিন্ধু চুক্তির আর কোন যৌক্তিকতাই বেঁচে রইল না – পাকিস্তান সিন্ধু ও ঝিলম সহ তাদের কয়েকটি উপনদীর জলে সম্পূর্ণ অধিকার লাভ করলো এবং বাকি চেনাব, বিয়াস, রাভি আর শতদ্রুর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ পড়লো ভারতের ভাগে। ভারতে (এবং পাকিস্তানে) বহুল প্রচলিত জনপ্রিয় ধারণা অনুযায়ী এই (কাল্পনিক) ব্যবস্থায় কাশ্মীর উপত্যকাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের পঁয়ষট্টি বছরের ভারতবিরোধী ক্রিয়াকলাপের পরিসমাপ্তি ঘটবার কথা, কারণ এতদ্বারা ভূস্বর্গ কাশ্মীর পাকিস্তানেরই অঙ্গীভূত হ’ল। লড়াই-ঝগড়ার দিন পিছনে ফেলে দুই প্রতিবেশী এইবার আত্মীয়তা আর সৌহার্দ্রের বন্ধনে আবদ্ধ হ’তেই পারে বলে মনে হওয়াই স্বাভাবিক। বাস্তব কিন্তু ঠিক উল্টো কথা বলে। পাকিস্তান এই ব্যবস্থাটি কোনমতেই মেনে নিতে পারেনা। কারণ এই বিভাজন মেনে নিলে পাকিস্তানকে তার অন্যতম প্রধান নদী চেনাবের জলসম্পদে অধিকার সম্পূর্ণরূপে হারাতে হয়। হিমাচল প্রদেশ থেকে পাঞ্জাব-জম্মুর সীমানা দিয়ে বয়ে যাওয়া রাভি নদীর থেকে চেনাবের দূরত্ব মাত্র ৫০ কিমি এবং ‘মারহু” টানেল মারফত চেনাবের জলধারাকে রাভির দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া ভারতের পক্ষে প্রাযুক্তিক দিক থেকে ভীষণ ভাবে সম্ভব। এর অর্থ, পাকিস্তানে সিন্ধু নদীব্যবস্থায় প্রায় ৩০ বিলিয়ন কিউবিক-মিটার বা ১৭% জলহ্রাস, কারণ ঝিলম আর চেনাব সিন্ধুর দু’টি প্রধানতম উপনদী। ইতোমধ্যেই পাকিস্তানী পাঞ্জাবে সেচ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে সিন্ধু ও ঝিলমের জলসম্পদ সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগিয়ে ফেলা হয়েছে। পাকিস্তানের আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজ্য হ’ল সিন্ধ, যেখানকার চাষবাস একান্তভাবে সিন্ধু নদের জলপ্রবাহের উপর নির্ভরশীল। পূবের নদীগুলি যথা ঝিলম-চেনাব-রাভি ও শতদ্রুর মিলিত জলধারা সিন্ধ প্রদেশে প্রবেশের ঠিক আগে সিন্ধুতে এসে মিলেছে। এখন যদি এই (কাল্পনিক) ব্যবস্থাপনায় চেনাবকে সম্পূর্ণ হারাতে হয় তবে অপেক্ষাকৃত উচ্চতর অববাহিকায় অবস্থানের কারণে পাকিস্তানী পাঞ্জাব যদি বা সিন্ধু ও ঝিলমের জলে কোনক্রমে টিঁকেও যায়, নিম্ন অববাহিকায় অবস্থিত সিন্ধ প্রদেশ স্রেফ মরুভূমিতে পরিণত হবে। এবং এর অনিবার্য ফলশ্রুতি হ’ল পাকিস্থানের আভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বহু প্রাচীন পাঞ্জাব-সিন্ধু রেষারেষিতে নতুন ইন্ধনের যোগান ও ঘোর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও বিপর্যয়। এতেই শেষ নয়, গোদের উপর বিষফোঁড়ার মত রইবে নতুন পাওয়া কাশ্মীর উপত্যকা, তার সমস্ত পাওয়া-না-পাওয়ার ক্ষোভ, দাবীদাওয়া আর আশা-আকাঙ্খার ঝুলি নিয়ে। সে দাবীদাওয়া আর প্রত্যাশার ন্যুনতম অংশও যদি পূরণ করতে হয় তবে ইতোমধ্যেই মৌলবাদ-উগ্রবাদে ত্রস্ত, বিদেশী-সাহায্যনির্ভর অর্থনীতি এবং জল ও খাদ্যে চুড়ান্ত সংকটে জর্জরিত পাকিস্তানের নুন আনতে পান্তা যে ফুরোবেই তা নিয়ে পাকিস্তানী বিশেষজ্ঞরাও দ্বিমত পোষণ করেন না। এ এক ‘শ্যাম রাখি না কুল রাখি’ অবস্থা। অর্থাৎ আদতে যে স্বার্থসিদ্ধির লক্ষ্যে পাকিস্তানের কাশ্মীর নিয়ে এই অর্ধশতাব্দীর ধারাবাহিক সংগ্রাম, জম্মুর সুনির্দিষ্ট একাংশ বাদ দিয়ে সমগ্র কাশ্মীর উপত্যকা পাকিস্তানের হাতে তুলে দিলেও তা পূরণ হওয়ার কোন সম্ভবনা নেই। ধর্মীয় ভাবাবেগ উস্কে দিয়ে কাশ্মীরি জনগণের বঞ্চনা-বেদনায় যতই কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জিত হোক না কেন, তা কেবলই মুখোস, যার আড়ালে লুকোনো মুখ কিন্তু সম্পূর্ণ অন্য কথা বলে। ‘মুখ’ তাই কাশ্মীর সমস্যার একমাত্র গ্রহণযোগ্য সমাধান হিসাবে অপরিবর্তিত ‘চেনাব সুত্রের’ কথা বলে, যাতে ঝিলম ও চেনাবের উপর নিরঙ্কুশ কর্তৃত্ব বজায় রাখা যায় এবং ফলতঃ নিম্ন অববাহিকায় সিন্ধু নদের জলসিঞ্চন অক্ষুন্ন থাকে। এবং সে ক্ষেত্রেও কাশ্মীর ও জম্মুর বেশ কিছু অংশ নিয়ে যে নতুন ভৌগোলিক অঞ্চলের রাজনৈতিক সীমা পুনর্বিন্যস্ত হবে, সেই অঞ্চলটিকে অঙ্গরাজ্য হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে সেই নবলব্ধ অঙ্গরাজ্যের আর্থ-সামাজিক দায়িত্বগ্রহণ পাকিস্তানের পক্ষে কার্যত অসম্ভব। চেনাব সুত্র মেনে বিভাজন ঘটলে পাকিস্তানের প্রকৃত স্বার্থসিদ্ধি পশ্চিমবাহিনী নদীগুলির উপর নিয়ন্ত্রণলাভ, এবং তার জন্য এই নতুন অঞ্চলটি পাকিস্তানের আশ্রিত ও অনুগৃহিত স্বাধীন রাজ্য হিসাবে (যেমন ভূটান রয়েছে ভারতের) থাকলেই বরং পাকিস্তানের দু’ কুল রক্ষা হয়।

‘চেনাব সুত্র’ নিয়ে ভারতের অবস্থান ব্যাখ্যা করা সহজতর। চেনাব সুত্রে ভারতকে ভূস্বর্গ কাশ্মীরের অধিকার ছাড়তে হবে তাই তা ভারতের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী, এ স্রেফ পোষাকী ব্যাখ্যা। চেনাব সুত্র মেনে নিলে ভারতকে লাদাখ বাদে জম্মু-কাশ্মীরের অনন্তনাগ, বারামুলা, বাদগাম, ডোডা, কুপওয়ারা, পুলওয়ামা, পুঞ্চ, রাজৌরি, শ্রীনগর এবং উধমপুর জেলার গুল-গুলাবগড় ও রিয়াসী তহসিলগুলি পরিত্যাগ করতে হয় যা সরাসরি পাকিস্তানের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণে চলে যাবে। এর ফলে জম্মুর আখনুর অঞ্চলও হারাতে হবে যা পুঞ্চ উপত্যকা ও লাদাখের সঙ্গে সব মরশুমে স্থলপথে যোগাযোগের মূল সেতূ। উল্ল্যেখ করা যেতে পারে যে, এই আখনুরের দক্ষিণে আছে একফালি শীর্ণ ভূখন্ড, সেনা-পরিভাষায় যার নাম ‘Chicken’s Neck’। ১৯৬৫ ও ১৯৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তান এই Chicken’s Neck দখল করতে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিল এবং চেনাবের উপর আখনুর সেতূ প্রায় দখল করেও ফেলেছিল। পরে অবশ্য ভারতীয় সেনা আখনুর পুনর্দখল করে। আখনুর পাকিস্তানের অধিকারে চলে যাওয়ার অর্থ সেই মুরগীর গর্দান পাকিস্তানের কব্জায় চলে যাওয়া এবং সেক্ষেত্রে লাদাখ সহ জম্মু-কাশ্মীরের বাকি যে অংশ ভারতের অধিকারে থাকবে তার সঙ্গে ভারতের মূল ভূখন্ডের যোগাযোগ রক্ষা সম্পুর্ণভাবে পাকিস্তানের ইচ্ছাধীন হয়ে পড়া একরকম সুনিশ্চিত। কেবল লাদাখই নয়, সমগ্র উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত রক্ষায় আখনুর এলাকার গুরুত্ব তাই যুদ্ধনীতির আঙ্গিকে অপরিসীম। তাই সামরিক প্রকৌশলের দৃষ্টিকোণ থেকে চেনাব সুত্র মেনে চেনাবের গতিপথকে আন্তর্জাতিক সীমানা হিসাবে মান্যতা দিয়ে আখনুরের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া করতে ভারতের আপত্তি অত্যন্ত স্বাভাবিক। তদুপরি, চেনাব সুত্র মেনে নিয়ে ভারতের অংশ হিসাবে পরিগণিত লাদাখ সহ জম্মুর বাকি জেলাগুলি যথা, কাঠুয়া, কারগিল ও উধমপুরের বাকি অঞ্চলগুলির ভবিষ্যৎ উন্নয়নের স্বার্থে চেনাবের জলের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ হারানোও ভারতের পক্ষে হজম করা প্রকারান্তরে অসম্ভব। অতঃপর পড়ে কি রইল ? একদিকে চেনাব ও আখনুরের নিয়ন্ত্রণ বাদে কাশ্মীর পাকিস্তানের কাম্য নয়, অন্যদিকে চেনাব সুত্র প্রয়োগে পাকিস্তান মাত্রাতিরিক্ত উৎসাহ দেখালে ভারত সর্বশেষ পন্থা হিসাবে সমরসজ্জা নিতেও দ্বিধা করবে না। অর্থাৎ, কাশ্মীর নিয়ে শত দর-কষাকষি, শত কুম্ভীরাশ্রু বিসর্জন, শত জিহাদ, আজাদির হুঙ্কার, ‘সার্বভৌমত্ব গেল-গেল’ রব, সবই মুখোসের নানা আঁকিবুঁকি। আসলে, দুই দেশের মধ্যে জল-দখলের লড়াই অনিশ্চয়তা ও দুর্যোগের ঘন অন্ধকারে আচ্ছন্ন করে রেখেছে ভূস্বর্গকে।
মুম্বই-এর স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ গ্রুপ কাশ্মীর সমস্যার এই প্রকৃত চরিত্রটি মাথায় রেখে সমস্যাটির সুষ্ঠু সমাধানের জন্য এক সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির (Holistic approach) অপরিহার্যতার পক্ষে সওয়াল করেছেন । এঁরা গোটা বিষয়টিকে ওই সামগ্রিকতার কাঠামোয় ফেলে দু’ পক্ষের জন্যই গেম থিওরির পরিভাষায় একটি ‘win – win’ সমাধান প্রস্তাব করেছিলেন (২০০৫)। এ প্রস্তাবের নির্য্যাস হ’ল জম্মু-কাশ্মীরের পশ্চিমবাহিনী নদনদীগুলির জলসম্পদের যৌথ ও স্থিতিশীল ব্যবস্থাপনা। এ ব্যবস্থাপনায় নদনদীগুলির উপরে ভারত ও পাকিস্তানের যৌথ উদ্যোগে নানা প্রকল্প গড়ে তোলবার প্রস্তাব করা হয়েছে। পাকিস্তান ও জম্মু-কাশ্মীরের প্রয়োজন অনুসারে যৌথ তদারকিতে জলসম্পদ বন্টিত হবে। প্রকল্পগুলির নজরদারি ও রক্ষণাবেক্ষণও এই যৌথ উদ্যোগের আওতায় আসবে। স্ট্র্যাটেজিক রিসার্চ গ্রূপের এ হেন প্রস্তাবনাটি যে দুই দেশের ধারাবাহিক বিদ্বেষ ও শত্রুতার বাতাবরণে চমৎকার এক প্রশান্তির প্রলেপ প্রদান করে তাতে কোন সন্দেহ নেই, যদিও এই প্রস্তাবের বাস্তব প্রয়োগ  সম্পর্কে স্বভাবতঃই ঘোর সংশয় থেকে যায়। এই ‘সামগ্রিক’, ‘স্থিতিশীল’ জল-ব্যবস্থাপনাটি যৌথ উদ্যোগে সফলভাবে রূপায়ণ করতে হ’লে দু’ দেশের মধ্যে অর্ধ শতাব্দী প্রাচীন সন্দেহ আর বিদ্বেষের মেঘ সরিয়ে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার রোদ ওঠা প্রাথমিকভাবে একান্ত প্রয়োজন। এবং সে রোদ আনতে হ’লে তো ব্রিটিশ ভারতের ধর্মভিত্তিক বিভাজন ও তৎ-পরবর্তী রাজনীতির সম্পূর্ণ উল্টো স্রোতে চলবার শপথ নিতে হয় দুই দেশের রাজনৈতিক দলগুলিকে, সীমানার এপার-ওপারে সাধারণ জনমানসে দীর্ঘদিন ধরে শিকড় গেড়ে বসা পারস্পরিক বৈরিতার আমূল পরিবর্তনের সামাজিক-মনস্তাত্ত্বিক প্রক্রিয়ায় কোমর কষে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয়। এ বোধহয় দু’ দেশেরই রাজনৈতিক দলগুলির পক্ষে মুখে আওড়াবার বুলি হিসেবে অত্যন্ত ভালো, কিন্তু কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ বড্ড ঝুঁকির ব্যাপার হয়ে যাবে। তাই এই সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রস্তাবনাটির অলীক আকাশকুসুম হয়ে অনির্দিষ্টতার বাতাসে প্রলম্বিত থাকাই স্বাভাবিক পরিণতি।

মোদ্দা কথায়, একদিকে কাশ্মীরবাসীর সমস্যা, অভাব-অভিযোগ, বঞ্চনা-বেদনা, তার দীর্ঘকালের রক্তক্ষরণ ও বিচ্ছিন্নতা, সময়-সময় ভারতবিদ্বেষ এবং অন্যদিকে স্বাধীনতার পর থেকেই পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সম্পর্কের যে অস্থিরতা, এই দু’টি চরিত্রগতভাবে পৃথক বিষয় হ’লেও অর্ধশতাব্দী ধরে বহু গভীরে শিকড়বাকড় ছড়িয়ে এরা একে অন্যকে এমনভাবে আকঁড়ে ধরেছে যে কাশ্মীরবাসীর ন্যায্য অধিকারের দাবীতে যেকোন আন্দোলনেও সরকার অবধারিত পাকিস্তানের হাত দেখতে পান এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় মাত্রায় হিংস্র দমননীতি প্রয়োগ করে থাকেন। প্রায় যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সেনাসঞ্চরণ সুরু হয়ে যায় উপত্যকা জুড়ে। দীর্ঘদিন ধরে অবদমিত মানবতা সেনাবাহিনীর ভারী বুটের তলায় দলিত হয় বারংবার। সেই আহত মননে নতুন করে জমে ভারতবিদ্বেষ আর সে বিষাক্ত মনোজগতে আফজল গুরু-রা শহীদের মর্যাদা পেতে থাকেন, অনেকটা আমাদের দেশের ভগৎ সিংহ বা ক্ষুদিরাম বোসের মত। সীমানার ওপার থেকে পাকিস্তানও নিজের স্বার্থে উপত্যকার সে ক্ষতস্থানে মলম দিতে চেষ্টার কসুর করে না। উপত্যকার আনাচেকানাচে বিদেশী পতাকার বাতাসে ডানা মেলা, আচমকা ছিটকে আসা বুলেট বা গ্রেনেডের বিস্ফোরণ ভারতের অন্যান্য প্রদেশে কাশ্মীরবাসী ও মূলতঃ ইসলাম-ধর্মাবলম্বী কাশ্মীরবাসীর সম্পর্কে কেমন একটি ভীতিপ্রদ, ঘৃণামিশ্রিত ইমেজারি সৃষ্টি করে, যা আবার জাতীয়তাবাদ ও অন্যান্য ‘ইজম’-এর মোড়কে ভারতের নানা অঞ্চলে নানা ধরণের রাজনৈতিক স্বার্থে হাতে-গরম ইস্যু হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আর ডাল লেকের জলে দিনের শেষ রক্তিমাভা মাখিয়ে দিয়ে সুর্য বরফে মোড়া হিমালয়পর্বতের ওপারে অস্ত যায়, ভূস্বর্গের অপার্থিব সুন্দর নৈসর্গ্য নিদ্রার কোলে ঢলে পড়ে, আবার একটি বিক্ষুব্ধ ভোরে জেগে উঠবে বলে।


Wednesday, 31 July 2013

(গুরু) দেব দয়া কর দীনজনে (ট্রেনজনে)

(পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত দৈনিক রেলবিহারীদের একমাত্র সাময়িকী “ট্রৈনিক”-এর বর্ষা-সংখ্যায় প্রকাশিত)

অগ্রজপ্রতিম সম্পাদক ট্রৈনিকের বর্ষা সংখ্যার জন্য একখানি সিক্ত গোছের লেখা হুকুম করেছেন এবং যথারীতি আমি বিপদে পড়েছি। একে আমার রোজকার চারণক্ষেত্রটি সাহিত্যের সততঃ উর্ব্বরা আদিগন্ত সুধাশ্যামলিম প্রান্তর তো নয়ই,  বরং তা থেকে শতেক যোজন তফাতে, তায় নৈকট্য যে দৃষ্টির সামগ্রিকতার অন্তরায় তা বন্ধুজন নিশ্চয় মানবেন। আসলে ট্রেন, বিশেষ করে শিয়ালদহ মেইন লাইনের লোক্যাল ট্রেন আমার জীবনের পরতে পরতে এমন ভাবে জড়িয়ে আছে যে সে বিজড়িত বিড়ম্বনার ‘ছাড়ালে-না-ছাড়ে-কি-করিব-তারে’-জাতীয় বন্ধন কিঞ্চিত আলগা না হ’লে এর সম্পর্কে সুস্থির হয়ে কিছু বলা বা লেখা (যাতে ট্রেনজনে লেখাটিতে নেকনজর না দিন, একেবারে নেগলেক্ট না করেন) স্রেফ আবেগের কারণেই আমার পক্ষে ভারি শক্ত। সম্পাদককে তাই বিনয়াবনত হয়ে আমার রিটায়ার করা পর্যন্ত আর মাত্র পনেরো বছর অপেক্ষা করতে বলাতেই উনি মার-মার করে উঠে বললেন, বড্ড ফাজিল হয়েছিস দেখছি ; আমি ‘ফাজিল’ কথাটার আরবী অর্থ ধরে নিয়ে বুঝলাম বিপদ এ যাত্রায় এড়ানো অসম্ভব। আবেগে চোখে জল চলে এল ফলে লেখাটা সিক্ত করবার চাপ থেকে অন্তত মুক্তি পেলাম।
        সেই ছোটবেলায় পড়তে হয়েছিল অল রোডস লিড টু রোম (কাঁচরাপাড়া অফিসারর্স কলোনি থেকে আগত আমার একটি অতি আদুরে সহপাঠিনী জিভের দোষে ‘র’-কে ‘ল’ বলতো ফলে বাক্যবন্ধটির অর্থের সামান্য যেটুকু হেরফের হ’ত তার ব্যঞ্জনা আমি অনুধাবন করি আরো বছর পনেরো পর থেকে), এবং আরো ছোট্টবেলায় মনে করতাম অল ট্রেনস লিড টু শিয়ালদা। তা যাই হোক, সেই সারল্যময় সময় থেকেই জেনে এসেছি, দীনজনের অযাচিত স্পর্শ বাঁচিয়ে ট্রেনপথের শুচিতা বজায় রাখেন ওই কালোকোট পরা কাকু। কিছুকাল পরে উনিই, প্রথমে বড়দা এবং আরো পরে শুধু দাদা হিসেবে আমার জীবনট্রেনে অটুট সিংহাসনে আসীন হ’ন। আমি গাঁয়ের ছেলে, কোটপ্যান্ট নামক খানদানি বস্তুটি আমি সেই কাকুর বরাঙ্গেই সর্বপ্রথম দর্শন করি, চলতি ট্রেনপথে ওনার মুখেই সর্বপ্রথম সাহেবদের ভাষা শ্রবণ করি (পরবর্তীকালে অবশ্য আরো শুনেছি, যথা, কনস্টিপেশান ইজ দ্য মাদার অফ থার্টিটু ডিজিজেস)। সে আমলে রাম বা অযোধ্যা মোটেও ছিল না বটে কিন্তু টিকিট চাইতে গিয়ে তেনারা অনেকসময়েই বলতেন – টিকিট প্লিজ। তারপর, কি দাপট তাঁর, টিকিটহীন দীনজন কেমন সুড়সুড় করে ট্রেন থেকে নেমে যেত কামরায় ওনার শিখাগ্র প্রদর্শনের উপক্রম হ’লেই। কামরায় তাঁর প্রবেশ যেন শার্দুল জারাকখান বা রক্তপিপাসু চেংগিজ খানের মত (১, ২ – যাত্রা দু’টি আমি দেখেছি, কিন্তু কোন-কোন অপেরা তা ভুলে গেছি এতকাল পরে)। আর সে কি অন্তর্দৃষ্টি ! একশোয় পঁচানব্বইটা ক্ষেত্রেই তিনি সঠিক চিনে নিতে পারেন কার পকেটে ‘যাইবার পাস’ নেই (ইদানীং অবশ্য আমাদের রাজ্যে এক মহীয়সী  জামাকাপড় বা গায়ের রঙ দেখেই মাওবাদী স্যব্যস্ত করতে পারছেন, আমি স্বাভাবিকভাবেই এতে চমৎকৃত হ’তে পারছি না কারণ শিয়ালদা মেইন লাইনে বহুকাল আগেই আমার অন্তর্দৃষ্টির গুরুকুল দর্শন হয়ে গেছে)। অনেক পরে আমি অবাক হয়ে বহু ভেবেছি, ‘তুমি কেমন করে গান(!) কর হে গুণী’, এবং রেল কর্তৃপক্ষ কি জাতীয় স্ক্রিনিং টেস্টের দ্বারা এই দেবদূতদের নির্বাচন করেন! বুঝতেই পারছেন, ভক্তিমৌসুমীবায়ূর প্রভাবে আমার আবেগ ক্রমশঃ ঘনীভূত হচ্ছে, সামান্য শীতলতার স্পর্শেই বারিধারাপাত আসন্ন।
স্কুলে পড়বার কালে, এ হেন এক প্রবাদপ্রতিম দেবদর্শনের সৌভাগ্য হয়েছিল। তিনি কর্মনিষ্ঠার স্বীকৃতি হিসেবে কর্তৃপক্ষের পুরস্কারপ্রাপ্ত, তবে দৈনিক রেলাচারী জনতাজনার্দনের আশির্বাদে বেশ কয়েকবার হাসপাতালদর্শন করেছিলেন বলেও শুনেছি। বস্তুত, হাসপাতালের সযত্ন আপ্যায়ণচিহ্ন মোটামুটি নিয়মিতই তাঁর মুখমন্ডলে (‘নিরস তরুবর’ দীর্ঘ সেই কোটপ্যান্টাবৃত শরীরে আর কিই বা দৃশ্যমান ছিল ?) শোভা পেত। সেই সব যত্নআত্তি নিয়েই অনলস তিনি চার-চারটি প্ল্যাটফর্মব্যাপী বাজপাখীর ক্ষিপ্রতায় উড়ে বেড়াতেন এবং তাঁর সুতীব্র অন্তর্ভেদী দৃষ্টি শত মানুষের ভিড়েও চা’য়ের স্টলের আড়ালে আলগোছে দাঁড়িয়ে থাকা দীনজন খুঁজে নিত। অনেককে সসম্ভ্রমে বলতেও শুনেছি, সত্যি লোকটা এত প্যাঁদানি খায়, তবু ছাড়েনা; কষ আছে মাইরি। সেই অপরিণত বয়েসে গভীর বিস্ময়ে ভাবতাম, আচ্ছা উনি তো ওনার কাজটা মন দিয়ে করেন, তাহলে লোকে ওনাকে হেনস্থা করে কেন ? তাহলে এই যে স্কুলে দেববাবু পড়ালেন, চিত্ত যেথা ভয়শূন্য / উচ্চ যেথা শির, তা কি কেবল কথার কথা ? অনেক পরে সরকারি চাকরিতে ঢুকে রসস্থ হয়ে বুঝেছি, কাজে কখনো মন দিতে নেই অথবা উল্টোটা, মনকে কখনো কাজের নিগড়ে বাঁধতে নেই, কারণ এ শিবঠাকুরের একান্ত আপন দেশ। এখানে জৈন না বৌদ্ধ কোন গুরু যেন শিখিয়েছিলেন ‘মঝঝিম পন্থা’, অর্থাৎ ডাইনে নয়, বামে তো নয়ই, এক্কেবারে মাঝামাঝি - তাই শিরোধার্য। এ দেশে নিস্কাম কর্ম বা নিঃস্বার্থ সমাজসেবার নেশা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই শেষমেষ জনগণেশের গুঁতোয় বিদূরিত হয়, অতএব সাধু সাবধান।
আমার বন্ধু ছোটনের আবার এই দেবসান্নিধ্যের আকর্ষণ বড্ড বাড়াবাড়ি রকমের তীব্র ছিল। সে তখন সদ্য এল.আই.সি-র এজেন্ট বনেছে আর আমি তখনও বেকার এবং নাচার ফলে ছোটনের হাতে ভাগ্য সঁপে দিয়ে চলেছি ম্যাটিনিতে কি এক সিনেমা দেখতে। যথারীতি ওভারব্রিজের মাঝখানে সেই অন্তর্দৃষ্টির এক্সরে-তে আমি ধরা পড়ে গেলাম। সৌম্য চেহারার (কাকু বলে ডেকে ফেলেছিলাম প্রায়, এ আর বেশি কথা কি, চেনাজানা শ্বশুরমশাইকেও লোকে প্রথম-প্রথম কাকুই ডাকে) কালোকোট-পরিহিত মানুষটি স্নিগ্ধস্বরে আমার কাছে টিকিট চাইতে আমি ছটফটিয়ে এদিক-সেদিক তাকিয়ে দেখি, ছোটন টিকিট-পরীক্ষাবৃত্তের বাইরে ব্রিজের শেষধাপে এক পা রেখে দাঁড়িয়ে যেখান থেকে সহজেই এক লাফে স্টেশানের একেবারে বাইরে চলে যাওয়া যায়। আমি আর্তকন্ঠে বললাম, ভাই টিকিটটা দেখা...ছোটন ওইখানেই দাঁড়িয়ে ভয়ঙ্কর ভারিক্কী চালে আমায় ডেকে বললো, বঙ্কু, তুমি এক কাজ কর, তুমি বরং কাকাকে ছেড়ে দাও ! কালোকোটের ভিতরে কাকাটি শিউরে উঠে বললেন, বলেন কি মশাই, উনি আমাকে ছাড়বেন কি, ওনাকেই তো আমি ধরেছি ! এই ঘটনার বেশ কিছুকাল পরে টিকিটবলে বলীয়ান আমি সদর্পে সেই একই ওভারব্রিজ পেরিয়ে যেতে যেতে ওভারব্রিজের প্রান্তে কাকাদের কক্ষে গদি-আঁটা সরকারি চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসে ছোটনকে খবরের কাগজ পড়তে দেখি। দরজায় ঈষৎ থমকাতেই কাগজ থেকে চোখ তুলে ছোটন আমায় বলল, আরে বঙ্কু, আয় আয়। বিস্ময়ে নয়, স্রেফ চক্ষুলজ্জায় আমি জানতে চাই, তুই এই ঘরে কি করছিস ? ঘরের মধ্যে দু’-চারজন কালোকোট কাকাকে দেখিয়ে ছোটন জবাব দিল, আর কি করব, এই এঁরা সঙ্গে করে নিয়ে এলেন, এখন ডিসিসান নিতে ডিলে করছেন, তাই হোয়াট ক্যান ডু, বসে বসে  নিউজ-পেপারটা একটু দেখছি। এই ছোটনকেই দেখেছি, লাইন টপকে দু’নম্বর থেকে এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে আসা এক কালোকোটধারীকে একান্ত সহমর্মিতার গলায় বলতে, যখন তখন লাইন টপকে আসাযাওয়া করতে হয়, বুঝি জব হ্যাজার্ড, কোনদিন মিসহ্যাপ হয়ে যাবেন; আমার কাছে একটা এল.আই.সি করে রাখুন কাজে লাগবে। আর একদিন, বেলা এগারোটার পিক আওয়ারে শিয়ালদা পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মের অফিস-কলেজমুখী জনস্রোত দেখি কোলাপ্সিবল গেটের কাছে একটা ছোট মানববৃত্তে একবারটি হ’লেও উঁকি মেরে যাচ্ছে। আমআকর্ষণ আমি এড়াই কি করে তাই আমিও উঁকি দিলাম। দেখলাম বৃত্তের কেন্দ্রে টিকিটপরীক্ষক ও সোনালি ফ্রেমের ফলস চশমা-চোখে বুশশার্ট পরিহিত যাকে বলে সুটেড-বুটেড আমার বন্ধু ছোটন। টিকিটপরীক্ষক ভুল করে ছোটনের কাছে টিকিট চেয়ে ফেলেছেন, এবং সেই অপরাধে ছোটন তাঁকে তোড়ে ইংরেজি শোনাচ্ছে। ব্যাপারটা কতক্ষণ ধরে চলছিল জানিনা, তবে ভদ্রলোকের ধৈর্য্য এবং কর্মনিষ্ঠা ছিল বলতেই হবে, কারণ  ছোটনীয় ইংরেজির সে হারিকেন ঝড়ের মুখেও তিনি টিকিটের মায়া কাটাতে পারেননি। শেষকালে চশমা, কলম, মানিব্যাগ, ও ফিল্টার উইলস সিগারেটের প্যাকেট (একান্তভাবে ক্লায়েন্টদের জন্য ছোটন পকেটে রাখত) সেই ভদ্রলোকের হাতে দিয়ে, হাতের অ্যাটাচিকেস তাঁর জিম্মায় রেখে সমবেত জনতাকে হতবাক করে ছোটন কান ধরে ওঠবোস করতে শুরু করল। ভদ্রলোক হাঁ-হাঁ করে উঠলেন, আহা, আহা করেন কি করেন কি, সামান্য একটা টিকিট, কাটলেই তো ঝামেলা মিটে যেত; কয়েকবার ওঠবোস করে উঠে হাঁপাতে হাঁপাতে ছোটন বললো, আপনার ভাগ্য ভাল আজ ছেড়ে দিলাম, পরেরবার ধরলে পুরো পাঁচ নম্বর প্ল্যাটফর্মটার এ মাথা থেকে ও মাথা নাকখত দেবো বলে দিলাম, সামলাবেন তখন! হতভম্ব মানুষটার হাত থেকে নিজের জিনিসপত্র নিজেই তুলে নিয়ে অ্যাটাচিকেস বাগিয়ে ছোটন বীরদর্পে গেট পেরিয়ে বিবি গাঙ্গুলি স্ট্রীটের ভীড়ে বিলীন হ’ল। শতখানেক লোকের কৌতুক-মাখা চাহনির সামনে দানবের (নেহাতই আলাদা করে উল্ল্যেখ করবার জন্য বলা, আসলে ছোটনও দেবতা, সে দীন জনগণদেবতার প্রতিভূ) হাতে দেবতার এই লাঞ্ছনার কথা ভাবলে আজও চোখে জল আসে।  
দেবদানব আখ্যানে আরেকজনের কথা বলি। পিংকি ব্যানার্জী (পুং) সে বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার দু’ ক্লাসের জুনিয়ার, স্প্যানিশ গিটারে বড় সরেস হাতখানি তার। আমি এম.এ পাস দিয়ে সিকিম ভ্রমণে যাব জেনে দার্জিলিং মেল ছাড়বার মুখে পিঠে গিটার ঝুলিয়ে সটান প্ল্যাটফর্মে এসে হাজির, বলে গুরু আমিও যাব। আমি বলি, যাবি কি রে, টিকিট ? সে  বললো, ও ব্যাপারে তুমি টেনশান নিও না, আমার জীবনের একটাই স্বপ্ন, বিনা টিকিটে ভারতদর্শন করবো। এ হেন হবু স্বামী বিবেকানন্দকে নিরস্ত করা আমার কম্ম নয়। এইখানে পিংকির পরিচ্ছদের (ওটা কোনভাবেই পোষাক নয়, অথবা ওটা পোষাক হ’লে, আমি যা পরেছিলাম সেটা পোষাক নয়, অন্যকিছু। পরে জেনেছিলাম ওটা পিংকির নিজের ডিজাইন করা) একটা যেমনতেমন বর্ণনা না দিলেই নয়। উর্ধাঙ্গে একখানি জ্যালজ্যালে সাদা ধরণের গোলগলা গেঞ্জি যার পিঠে একটি বৃহৎ কালো পদচিহ্ন আঁকা নীচে লেখা “ড্যাডস” (অর্থ হ’ল, বাবা হতাশ হয়ে লাথি মেরে বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছেন)। রঙচটা মলিন জিন্সের দু’ হাঁটুতে দু’খানি তাপ্পি, যার একটাতে ডটপেনে লেখা “এটা কি ?” আর অন্য হাঁটুতে লেখা “এটা কিছু নয়” (অর্থ জানিনা, পিংকিও বলেনি)। তা যাই হোক, আমার থ্রি-টিয়ার লোয়ার বার্থটিতে গ্যাঁট হয়ে বসে পিংকি গিটার ধরল। ঘন্টা দেড়েক পর নিয়মমাফিক দেবাবির্ভাব। আমি কম্পিত হস্তে একখানা (আমার) টিকিট দেখালাম, উনি তাতে সন্তুষ্ট না হয়ে (কি করে হবেন, আমরা যে প্রমাণ সাইজের দু’-দু’জন, তা তো উনি সাদা চোখে দেখতেই পাচ্ছেন) গিটারসাধনরত পিংকিকে বললেন, এই যে ভাই, টিকিট ? মুখ না তুলেই পিংকি বললো – মিছিল আছে। কার মিছিল, কোথায় মিছিল ? না, কাল শিলিগুড়িতে এসইউসি-র মিছিল আছে আর ইনি তাতে গিটার হাতে পিট সিগারের ভূমিকায় নামতে চলেছেন, ওঁকে বিরক্ত না করলে আখেরে সমাজের মঙ্গল। কালোকোটদেব হাজার হ’লেও সামাজিক জীব, তাই মানে মানে পরের বার্থের শরণাপন্ন হলেন। রাত বয়ে ভোর হ’ল, গাড়ি লেটে যাচ্ছে। এমন সময় শুনলাম, গাড়িতে ভিজিল্যান্স উঠেছে। এও শোনা গেল, ডালখোলার আগে ভিজিল্যান্স ধরলে নাকি কাটিহারে চালান করে দেয়। আমি পিংকিকে ঘুম থেকে জাগিয়ে বললাম, শিগগির বাথরুমে গিয়ে লুকো, ধরা পড়লে কাটিহার চালান করে দেবে। হাই তুলে পিংকি বললো, ফালতু টেনশান খাচ্ছো গুরু, আমি গ্যাংটকও যাইনি কাটিহারও যাইনি। ধরলে কাটিহার ঘুরে আসব কি আছে! এর পর, বোঝাই যায়, আমার বাথরুমে লুকোবার পালা এল। সেকালে নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশান থেকে বেরোবার একটিমাত্র ওভারব্রিজ ছিল আর তার মাঝামাঝি জায়গায় দেবতারা নিয়ম করে (অর্থাৎ, স্টেশানে ট্রেন ঢুকলেই) দর্শন দিতেন। যাকে বলে পুরো নিশ্ছিদ্র বন্দোবস্ত। পিংকিকে বললাম, ভাই তুই স্টেশান ঢোকবার আগে গাড়ী স্লো হ’লে নেমে যা। ও বললো, (টেনশান খেও না) তোমার টিকিটটা একবার দাও। দিলাম। নিয়ে টিকিটটার পেছনে কি সব গিটারের নোটেশান-ফোটেশান লিখে আমায় ফেরত দিয়ে বললো, তুমি চেকারকে টিকিটটা দিয়ে আগে বেরিয়ে যেও। - আর তুই ?; (টেনশান খেও না) ও আমি ঠিক বেরিয়ে যাব দেখো। পাহাড়ে গিয়ে তোমার সবকথা শুনে চলবো গুরু । কি আর করি, আমি শ্লথগতিতে আমার ব্যাগটা টেনে ব্রিজে উঠে চেকারকে টিকিট দিয়ে স্টেশান ছেড়ে বেরোনোর মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম, যেখান থেকে ব্রিজের উপরটা দেখা যায়। মিনিট কয়েক পর দেখি গিটার ঘাড়ে পিট সিগার দুলকি চালে টিকিটচেকারের সামনে এসে দাঁড়ালো এবং দাঁড়ালোই। ক্রমে চারপাশে ভীড় জমতে জমতে গিটার-চেকার সব ঢেকে দিল। আমি আর থাকতে না পেরে আবার ফিরে ব্রিজে উঠে ব্যাপারখানা কি দেখতে যেতে বাধ্য হলাম। দেখি পিংকি সজোরে চিৎকার করে সমবেত জনতাকে বলছে, আমি ওনাকে টিকিট দিলাম, তাও উনি আমার কাছে একশো টাকা ঘুষ চাইছেন; ওনাকে বারবার বলছি আমি দুঃস্থ সঙ্গীতশিল্পী পকেটে একটা পয়সা নেই, প্রোগ্রামে বাজাতে এসেছি অরগানাইজাররা টিকিট করে দিয়েছিল; ওই দেখুননা ওনার হাতে আমার টিকিট, পেছনে গিটারের নোট লেখা আছে...দেখুন আপনারা দেশের কি অবস্থা...(ইত্যাদি)। নব্বই দশকের প্রথমভাগে মানুষ তখনো নারকীয় রকমের উগ্র হয়ে ওঠেনি বলে সে যাত্রা সেই টিকিট-পরীক্ষকের রেললীলা সেইদিনই সাঙ্গ হয়ে যায়নি।
এ কাহিনী অনিঃশেষ, তবু আপাততঃ ইতি টানবার সময় এসেছে। আমি নেহাতই নশ্বর মানব, দেবদানবে অচলা ভক্তি আমার পাথেয়। কে কাকে টেক্কা দেবেন, কার জোর বেশি, এ জাতীয় কুতর্কে আর যাই হোক, বস্তু মিলায় না। তাই তাঁদের খুরে-খুরে দণ্ডবৎ হয়ে প্রণতি জানাই, তাঁদের সমুদ্রমন্থনসঞ্জাত অমৃতের প্রসাদকণিকামাত্র আমার এ অকিঞ্চিতকর দীনহীন রেলায়িত জীবন সততঃ ধন্য করেছে। অথঃ দেবদানবনামাস্য প্রথমো সর্গঃ সমাপ্ত।


Sunday, 7 July 2013

বাকি কাজ

সাতসাগরের পারে আর যাওয়া হ’ল কই
তেরো নদী পার হ’তেই বিষম হইচই।
**********
একা-একাই গাইতে গেলাম পাহাড়িয়া ধুন
বাঁশিতে লাগল ছেঁকে নাছোড়বান্দা ঘুণ
গলাতেও লাগল কখন ঠান্ডা ভিজে হাওয়া
নানা কথায় ডুবে গেল সাধের সে গান গাওয়া...
*********
তেরো নদী পেরিয়ে এসে সমে পড়ল যতি
ভালোবাসা সরিয়ে রেখে মেনে নিলাম নতি
অন্তবিহীন বয়ে চলে ঝোড়ো শীতল হাওয়া
রইল বাকি এখন শুধু আগুন জ্বেলে যাওয়া।
*********
তেরো নদীর পার হ’তেই বিষম হইচই
আগুন জ্বেলে নদীর পারে একলা বসে রই।।

Monday, 3 June 2013

ঋতুপর্ণ এবং



বড় আচম্বিতে ঋতুপর্ণ ঘোষ চলে গেলেন। ভালো কাজ করছিলেন, আমি অবশ্য মনে করতাম ওনার সেরা কাজ is yet to comeহঠাৎই দাঁড়ি পড়ে গেল যেহেতূ তাই ঋতুপর্ণর প্রতিভার সেরা দ্যূতি আমার দেখা হল না। আমার দেখা ওনার সেরা ছবি দু’টি হল, শুভ মহরৎ এবং হীরের আংটিকারোর সঙ্গে এ ব্যাপারে একমত হওয়ার কোনো দায় আমার নেই। ওনার সাক্ষাৎকার বা অন্য প্রোগ্রাম যেমন ‘এবং ঋতুপর্ণ’ টিভিতে দেখতে ভালো লাগত, শীলিত শিক্ষিত বাঙালী দেখলেই আমার ভীষণ ভালো লাগে। কথায় বার্তায় ঠিকরে বেরোত ওনার শানিত বুদ্ধি, প্রশংসনীয় পড়াশোনা আর স্নিগ্ধ রুচিএই সব গুণই আমায় ওনার প্রতি আকৃষ্ট করে এবং এই সব ক’টি গুণকেই আমি হিংসে করি, যার যা নেই তাতে তার হিংসে হওয়াটা নিন্দনীয় হ’লেও জাগতিক ব্যাপার। সৃষ্টিশীল মানুষ শারীরিকভাবে সক্ষম না থাকলে কি বেদনাময় ঘটনা ঘটে তা বাংলা সাহিত্য ও কলাশিল্প জগত ভালোই জানে। তাই মনে করি, ঋতুপর্ণ আরো বছর বিশেক অন্তত থাকতেই পারতেন, চলে যাওয়ায় ক্ষতির মাত্রাটা তাই আরো দুঃসহ ঠেকে।

আশির দশকের শেষ ও নব্বই দশকের প্রথমভাগে বাংলা ছবির এক চরম দুঃসময়ে ঋতুপর্ণর কাজ এক নতুন বাঁক নির্দ্দেশ করে সন্দেহ নেই, যে পথে বর্তমানে বাংলা ছবি বেশ গড়গড়িয়ে ছুটছে। সেই সময়কার প্রতিষ্ঠিত চলচ্চিত্রকার বুদ্ধদেব-গৌতম-অপর্ণা গুটিকয়কে মনে রেখেও বলা যায়, এঁরা একদিক থেকে বড় বেশি সত্যজিৎ-ঘরানার (আমার পিতা বাদে যে পুরুষটি আমায় সবচেয়ে আকর্ষণ করেন, তিনি সত্যজিৎ রায়), জনপ্রিয়তার আগে উৎকর্ষতার সাধনা যাঁর ঘোষিত অভিজ্ঞানআগে উৎকৃষ্ট হোক, তারপর যদি তা জনপ্রিয়ও হয়, তবে তো কথাই নেই (পথের পাঁচালী হয়েছিলো, কাঞ্চনজঙ্ঘা এবং আরো কয়েকটি হয়নি) । জনপ্রিয়তাকে সত্যজিৎ মান্যতা দেননি একথা বলবার মত বুরবক আমি নই, তবে সত্যজিৎ নিজে জানতেন  তাঁর ছবি বাংলার আমজনতা সাধারণভাবে দেখতে পছন্দ করে না, তাঁর ছবির একটি ছোট সুনির্দিষ্ট দর্শকমন্ডলী আছে। তাঁর সাক্ষাৎকারে একথা তিনি বেশ কয়েকবার বলেছেন, সঙ্গে বোধহয় ঈষৎ আক্ষেপের সঙ্গে বলেছেন, তাঁর ছবি ফ্রান্সে সমাদৃত হয় বেশি। অসম্ভব পরিমিতি (প্রথম ছবি তৈরি করতে অর্থসংকুলানে বিপুল ঝক্কি থেকে সঞ্জাত নয় তো ? কি জানি), মেদহীনতা, মেলোড্রামা জাতীয় আবেগের বিস্ফোরণ থেকে শত হস্ত দূরে থাকা, নিখুঁত ডিটেলিং, না-বলা কথায় কেবল ছবির ফ্রেমে কথা বলে দেওয়া সত্যজিৎ-এর জগতখ্যাত সিগনেচার মার্ক। দুর্গার মৃত্যুর পরে চুরি করা হারটা খুঁজে পেয়ে সেটা পানাপুকুরে অপু ছুঁড়ে ফেললো, পানা সরিয়ে হার ডুবে গেল, জলের সামান্য ঢেউ মিলিয়ে যেতেই আবার পানা এসে ছেয়ে ফেললো, বোঝাবার উপায় রইলো না দুর্গা হারিয়ে গেল চিরতরে। অথবা, মুখর ও মদির জলসাঘরে পানপাত্রে ডুবে যেতে যেতে আলোর পোকার ডানা ঝাপটানো দেখে বুঝতে হবে যে একটু পরেই জমিদারের স্ত্রী ও নাবালক পুত্রের মাতুলালয়ে যাওয়ার পথে নৌকাডুবিতে প্রাণ হারানোর খবর আসবে এবং জমিদারের জীবনে ঘনাবে শেষের শুরু, ওষুধের বশে যুদ্ধবাজ শুন্ডীরাজা ওষুধ না খেলে অরিগ্যামি করে সাদা কাগজের পায়রা কেন বানান – এই সব দেখেই আমরা সত্যি করে সিনেমা দেখা শিখেছি। যে সব ছবির প্রকৃত রসাস্বাদন দাবী করে নিবিঢ় দর্শন মারফত এই সব মননশীল অধ্যয়ন, তা মাঠে ঘাটে ইয়ার্কি মারতে মারতে দেখবার তো নয়, এবং তাই সেগুলো আমজনগণেশের আশির্বাদ যে সব সময় পাবে না তা বলাই বাহুল্য। আমি যেটা বলতে চাইছি, তা সোজা কথায়, সত্যজিৎ ও তাঁর ঘরানার মূল প্রণোদনা ছিলো ভালো ছবি বানানো, তাতে ক্যাপটিভ অডিয়েন্স যত ছোটই হোক না কেন, ছবির মানের প্রশ্নে আপস নৈব নৈব চ। সত্যজিৎ বোধকরি এত দ্বারা বাঙালী দর্শকের চলচ্চিত্র শিক্ষার বুনিয়াদ তৈরী করে দিয়ে গিয়েছেন। মান ও জনপ্রিয়তা দু’টো মিশলে খুবই ভালো, তবে সংঘাতের ক্ষেত্রে উৎকৃষ্টের পক্ষে স্বভাবতঃ দাঁড়াতেন বলেই বোধহয় একটা সাধারণ ধারণা বাংলা শিল্পসাহিত্য জগতে ছড়িয়ে পড়ে যে, জনপ্রিয় বস্তু মাত্রেই শস্তা রুচির, খেলো ব্যাপার। কিন্তু আমি যে অস্বীকার করতে পারবো না, আমার ব্যাটলশিপ পোটেমকিনের চেয়ে দ্য গ্রেট ডিক্টেটর দেখতে বেশি ভালো লাগে, কি করবো, সেই ছোটবেলা থেকে ভূগোল বইএ আফ্রিকার ভূপ্রকৃতি পড়বার চেয়ে চাঁদের পাহাড় বেশি ভালো লেগে এসেছে যে। পৃথিবীতে চার্লি চ্যাপলিনের নাম শুনেছেন এমন লোকের সংখ্যা আইজেনস্টাইনের নাম শুনেছেন যাঁরা, নিঃসন্দেহে তাঁদের কয়েক শো গুণ বেশি। সূক্ষ্ম কন্টেন্টের সবচেয়ে ধারালো বাহক যথাযোগ্য ফর্ম, শিল্প বুঝি সেই মহামিলনেই হাতিয়ার হয়ে ওঠে। যাঁদের সম্পর্কে বলছি, তাঁরা মানবেন বলে মনে হয় না, তবে আমার মনে হয়ে এসেছে, তাঁরা বড্ড কন্টেন্ট সচেতন, ফর্মের পরীক্ষা নিরীক্ষা তাঁরা একেবারে করেননি একথা বলা স্রেফ মিথ্যে কথা হয়ে যাবে, তবে এ কথাও ঠিক যে, ফর্ম বাছতে গিয়ে তাঁরা তাঁদের মাথা থেকে সেই ছোট্ট টার্গেট অডিয়েন্সের চাহিদার কথা পুরোপুরি ঝেড়ে ফেলতে পারেননি। মৃণাল সেনের কোরাস দেখা আছে ? অথবা মহাপৃথিবী ? অথবা খন্ডহর ? ওগুলোর চেয়ে ভুবন সোম, বা আকাশকুসুম বা আকালের সন্ধানে ঢের আনন্দদায়ক অভিজ্ঞতা নয় কি ? কোরাস বা কলকাতা ৭১-এর চেয়ে জনঅরণ্য বা অন্তহীন দেখতে বেশি ভালো লাগে না ? আমার অত্যন্ত হতাশ লাগে যখন ভাবি বুদ্ধদেব দাশগুপ্তের উত্তরা ছবিটির শেষ দৃশ্য যেখানে সন্ধ্যের নিমীলিত আলোয় ঢেউ খেলানো দিগন্তের দিকে মিলিয়ে যাওয়া মালগাড়ির বামন রেলগার্ড আর্ত মেয়েটিকে বলছে, “আমার গাঁয়ে যাবে ? সেখানে কেউ কাউকে মারে না” – আহা এমন একটি দৃশ্য আমার দেশের বেশির ভাগ মানুষ দেখলো না, ফলে কিছুই বুঝলো না! 
   
এ বিষয়ে আলোচনায় উৎসাহী উৎপল দত্তের চায়ের ধোঁয়া বইটিতে জনপ্রিয়তা ও আলমগীর নামক অসামান্য পরিচ্ছেদটি পড়ে দেখতে পারেন। সত্তর-আশির দশক জুড়ে এ ধারা এমনই হাড়ে মজ্জায় ঢুকে যায় যে লোকে ভুলেই গেল, এ জিনিস সার্থকভাবে প্রয়োগের পিছনে কি অপরিমাণ অনুশীলন, পড়াশোনা ও বীক্ষণ প্রয়োজন। সেগুলো আয়ত্ত্ব করাবার কঠিন কাজটা এড়িয়ে বাঙালী স্বভাবগুণেই সহজতর পথটা নিলো, হুড়মুড়িয়ে নেমে পড়লো সত্যজিৎ হতে। অযোগ্য হাতে পড়ে পুরো ব্যাপারটাই হয়ে দাঁড়ালো এক আরোপিত দুর্বোধ্যতার চর্চা।  সর্বব্যাপী এই ‘আর্ট ফর আর্টস শেক’ -এর ফলে হরেদরে ব্যাপারটা দাঁড়িয়ে গেল যে বাজার না পেলেই বাঙালী তার সত্যজিৎীয় উত্তরাধিকারে নাক সিঁটকিয়ে বলা শুরু করলো, আমার কাজ তো সকলের জন্য নয়, ও জিনিস বুঝতে গেলে মাথা লাগে। আমজনতা আমার তুলনায় অল্পশিক্ষিত, তুলনায় বোধবুদ্ধিহীন তাই যেন অস্পৃশ্য, তার ছোঁয়া কতটা বাঁচিয়ে চলা গেলো সেটাই শিল্পকর্মের মান যাচাই-এর নিরিখ। ছবি চলবে কেবল মিনার-বিজলি-ছবিঘর চেইনে, যদি বাই এনি চান্স তা কমলপুরের কমলা হলে সাতদিন টেনে দেয়, তো ছ্যাঃ, সে নেহাতই পাতলা ছবি। প্রোডিউসার অবশ্য কমলার সাতদিনের দান সযত্নে গুণে গেঁথে রাখে। ক্রাইসিসটা বাংলা সিনেমা, বাংলা কবিতা এবং কিছুটা হ’লেও বাংলা নাটকে দারুণ ভাবে ছড়িয়ে পড়লো। মান তার মানদন্ড হারিয়ে স্বেচ্ছাকৃত দুর্বোধ্যতার ঘেরাটোপে নিজেকে বন্দী করলো এক শ্রেণীর পণ্ডিতম্মন্য মানুষের মদতে।

কিন্তু বাজার তো পড়ে থাকে না, বাংলার মফঃস্বলে-গ্রামে এই সময়েই ব্যাঙের ছাতার মত খুলে গেল ভিডিও হল, সেখানে শুরুর দিকে বেশির ভাগ সময়েই কি জিনিস প্রদর্শিত হতো সে সবাই জানে (আমি দু’চার বার ঢুকে দেখে এসেছি, সদ্য সাবালক হিসেবে খুব খারাপ লেগেছিল বলতে পারবো না)আর ক্রমে ক্রমে হৈ হৈ করে এসে পড়লো শত্রু, নবাব, বেদের মেয়ে জ্যোৎস্না। উন্নাসিকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বাংলা জুড়ে রমরমিয়ে ব্যবসা দিতে লাগলো এরা। প্রোডিউসারকুল তো উশখুশ করছিলেনই, এইবার রাস্তা পেয়েই সটকে পড়লেন। সেচের জল শুকিয়ে যেতেই ঈষৎ গভীর ধরণের বাংলা চলচ্চিত্র যা সত্যি করে মানুষকে ভাবাতে পারে, মনোভূমির উর্ব্বরাশক্তি বৃদ্ধি করতে পারে, তার ক্ষীণ ধারাটিও মরুপথে বিলীন হয়ে গেলো। বাংলা ছবিতে অগ্রগতির স্বার্থে একান্ত জরূরী পরীক্ষানিরীক্ষার পথ রুদ্ধ করে দিলো নিদারুণ অর্থাভাব।  

ঋতুপর্ণকে বুঝতে হবে এই সংকটকালের প্রেক্ষাপটে। ঋতুপর্ণর আকস্মিক প্রয়াণে শোকার্ত অনেক সেলেব্রিটির স্নেহসিক্ত বা শ্রদ্ধাবনত বক্তব্য ও লেখাপত্তর দেখলাম। ঋতুপর্ণর স্মরণে কেউ বলছেন, হি রিডিফাইন্ড বেঙ্গলী সিনেমা (আমি দেখেছি, আবেগ প্রবল হ’লে বাঙ্গালীরা অনেকসময়েই মাতৃভাষাটা সাময়িক বলতে ভুলে যান), উনি বাংলা ছবির চরম দুঃসময়ে হাল ধরে বাংলা ছবিকে বাঁচিয়ে দিয়েছেন। ইদানীং বাংলায় সব বিষয়েই যিনি প্রথম ও শেষ কথাটি বলেন (ভাগ্যিস বলেন) তিনি বলেছেন, ‘স্বর্ণযুগের স্বর্ণশিল্পী’-র অকালপ্রয়াণে তিনি শোক জানাবার ভাষা পাচ্ছেন না (পেলে খারাপ হতো না, আমরা জানতে পারতাম ঋতুপর্ণ সোনার কাজ ছাড়া আর কি কি পারতেন)। ঋতুপর্ণর কাজ বাংলা চলচ্চিত্রের মনোযোগী গবেষক মন দিয়ে ঘাঁটবেন এই জন্য যে তিনি ওই দুঃসময়ে ভালো ছবির ফর্ম নিয়ে সাহসী পরীক্ষানিরীক্ষা তো চালিয়েইছেন, এবং তার জন্য তাঁর অর্থানুকুল্যের অভাব ঘটতেও দেননি। নিঃসন্দেহে বলতে পারি, ঋতুপর্ণ ছবি তৈরির অর্থনীতিটা সমকালীন অনেক চিত্রপরিচালকের চেয়ে ঢের পরিষ্কার করে বুঝতেন। প্রযোজকের লগ্নীকৃত পয়সা ফেরত দেওয়া যে পরিচালকের পক্ষে পরের পরীক্ষাটি চালাবার জন্য একান্ত আবশ্যক একথা তিনি মাথা থেকে উবে যেতে দেননি কখনো, স্তাবকতা আর নিন্দার হড়কা বানের মধ্যেও না। এর জন্য বড় স্টার কাস্ট করা থেকে শুরু করে বিবিধ তথাকথিত জনপ্রিয়তা লাভের প্রকরণ প্রয়োগ করতেও পিছপা হ’ননি। আমি কোনমতেই বিশ্বাস করতে রাজি নই যে, প্রসেনজিত বা ঐশ্বর্য রাই বা অভিষেক বচ্চন বা জ্যাকি শ্রফ বা বিপাশা বসু তাঁর ছবিতে যে যে চরিত্রে আবির্ভূত হয়েছেন সেই সব চরিত্রে তাঁরা যাকে বলে অটোম্যাটিক চয়েস ছিলেন। কিরণ খের অভিনীত বাড়িউলির চরিত্র অন্য বঙ্গভাষী কেউ করলে কি ক্ষতি হ’ত ? বা অর্জুন রামপালের জায়গায় তুলনায় অল্প পরিচিত বাংলা গ্রুপ থিয়েটারের কেউ ? এমন কি অমিতাভ বচ্চনকেও কি লাস্ট লিয়ারে অপরিহার্য বলে মনে হয় ? যেমন অপরিহার্য মনে হয় মগনলাল হিসেবে উৎপল দত্তকে ? বা জটায়ু হিসেবে সন্তোষ দত্তকে ? বা ওই সন্তোষ দত্তই জনঅরণ্যে একটা ছোট্ট দালালের চরিত্রে ছিলেন, লিফটে যাঁর সংগে প্রদীপের আলাপ হয়েছিল, সেই একটি দৃশ্যে সন্তোষের কেবল অ্যাপিয়ারেন্সে নয়, দালালসুলভ চাহনিতেই স্পষ্ট কেন ওই চরিত্রে অন্য কেউ নন। যেমন নায়কে উত্তমকুমার, তাই অটোগ্রাফে প্রসেনজিত আসবেনই। কাঞ্চনজঙ্ঘায় ছবি বিশ্বাসের জায়গায় কষ্ট করেও কমল মিত্তিরকে ভাবা যাবে কি ? অথবা অরণ্যের দিনরাত্রিতে রবি ঘোষের জায়গায় অন্য কেউ ? (খুঁটিয়ে যদি কেউ এ লেখা এ পর্যন্ত পড়ে থাকেন, তিনি এইখানে নির্ঘাত ভাবছেন, ব্যাপারটা কি, এখনো এ ব্যাটা সৌমিত্রের নাম করে না কেন ? সৌমিত্র আমার বিচারে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিনেতা গত ত্রিশ বছর ধরে, কিন্তু সত্যজিৎ-এর ‘ডিরেক্টরস অ্যাক্টর’-কে আমার অপুর সংসারের অপু এবং দু’টি ফেলুকাহিনীতে ফেলুদা বাদে সত্যজিৎ-এর বাকি যে বারোটি ছবিতে উনি অভিনয় করেছেন, তার কোনোটিতে একান্ত অপরিহার্য বলে মনে হয়নি। এ অনুভবের সঙ্গে সৌমিত্রের অভ্রংলিহ অভিনয়দক্ষতার কোনো সম্পর্ক নেই। বরং আমার হুইলচেয়ারে ওনাকে অপরিহার্য বলে মনে হয়েছে। আশা করি আমি ঠিক কি বলতে চাইছি তা বোঝাতে পেরেছি।) আবার প্রসঙ্গে ফিরে আসি। এই সমস্ত কারুকার্য করে ঋতুপর্ণ  তাঁর চিন্তাশীল দর্শকমন্ডলীর খোরাক যেমন জুগিয়েছেন, একই সঙ্গে টার্গেট অডিয়েন্সের কুসুমের বাইরেও একটা বেশ পুরু গোছের দর্শকস্তর তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলেন যাদের দর্শনেন্দ্রিয়ের সঙ্গে অন্যান্য ইন্দ্রিয়ের যোগ যত প্রবল, মস্তিষ্কের সংযোগ ততটা নয়। এ বড় সহজ কাজ নয়। ফলতঃ ঋতুপর্ণ গালি কম খাননি, তথাকথিত ‘শস্তা’ প্রকরণ ব্যবহারের জন্য নাক-উচুঁরা তাঁকে মোটেও ছেড়ে কথা বলেননি। কৌশলী ঋতুপর্ণ সমালোচনাকেও তাঁর ছবির বিপণনে কাজে লাগিয়ে দিয়েছেন তাঁর মিডিয়ার বন্ধুদের হাত করে, তাঁর একমাত্র উদ্দেশ্য ছিলো, ছবি করা চালিয়ে যাওয়া; ভালো ছবি, তাঁর বিশ্বাস ও রুচিমত ভালো ছবির ভাষার অন্বেষণ তাঁর চলচ্চিত্র পরিক্রমার সর্বাংগে। তাঁর সঙ্গে একমত নাই বা হলাম, কিন্তু মানতে কোনো অসুবিধা হওয়ার কথা নয়, যে তাঁর পথ ধরেই শুকিয়ে আসা সিরিয়াস বাংলা ছবির ধারাটি নতুন করে সঞ্জীবনীসুধা লাভ  করেছে ; শত্রু-মিত্র, সেজবউ-মেজবউ, নবাব-মস্তান বা বেদের মেয়ে-টেয়েরা ইদানীং বেশ কোনঠাসা হয়ে পড়েছে দেখাই যাচ্ছে। ঋতুপর্ণ আগে না ঘটে গেলে অটোগ্রাফ বা অন্তহীন বা ব্যোমকেশ বা হালের শব্দ ফোরাম-আইনক্স জাতীয় মাল্টিপ্লেক্সে পর্দা পেত কিনা ঘোর সন্দেহ আছে এবং সাধারণ লোকে এসব দেখবার কথা ভুলেও ভাবতো নাকি ? আমার মনে হয় ঋতুপর্ণর আসল অবদান হচ্ছে, পুতুপুতু ন্যাকা-ন্যাকা, ন্যাংটো হবো ইচ্ছে আছে, কিন্তু ওমা-কেউ-দেখলে-হবো-না-যাও-মার্কা ভিক্টোরিয়ান প্রুডারি-মোড়া বঙ্গ ছায়াছবির জগতে তিনি সাবালকত্ব আমদানি করবার চেষ্টা করেছিলেন সোচ্চারে ও সদর্পে। বিষয় নির্বাচন থেকে নরনারীর সম্পর্কের জটিলতম টানাপোড়েনে খোঁজবার চেষ্টা করেছিলেন বাংলায় এ তাবৎকালে অদর্শিত চলচ্চিত্রের নুতনতর ও আধুনিকতর ভাষা। দহনে স্ত্রীকে স্বামীর ধর্ষণ দৃশ্য এর ক্ল্যাসিক উদাহরণ। এই দৃশ্যে স্বামীর সংলাপেও রেপ কথাটার উল্ল্যেখ আছে। তাঁর কাজে এ রকম উদাহরণ ভুরি-ভুরি। মুশকিল হচ্ছে, এখানেও সেই শীলন, সেই মননশীলতা, সেই রুচিবোধ অপরিহার্য, না হ’লে রঁদ্যা আর বটতলা এক হয়ে যেতে পারে। এবং গেলোও খানিকটা তাই। হঠাৎ করে বড় হওয়ার মুক্তির স্বাদ, বা দীর্ঘদিনের অবদমিত স্পৃহা শিয়ালদহ সাউথের ফটাস-জলের মতো বোতলমুক্ত হতে লাগলো। প্রবল হাওয়ায় দুলতে শুরু করলো বাংলা সিনেমা এবং সাহিত্য, মূলতঃ বাংলা গল্প-উপন্যাস। ঠিক আগেরবারের মতই এবারেও বুড়িচাঁদ বেনোজলে ভেসে যাবার উপক্রম হলো। এই অন্ধকারে কোন কারণটারণ ছাড়া নারীপুরুষের ধস্তাধস্তি দেখতে (বা পড়তে) যাঁরা রাজি হবেন না, তাঁরা চিহ্নিত হবেন ব্যাকডেটেড বলে। কোনো নির্দিষ্ট ছবির নাম করতে চাই না তবে সাহসের নামে আদতে বিনা কারণে কথায় কথায় নরনারীর অশ্লীল ক্কুকুরপ্রতিম যৌনতা প্রদর্শনই মূল চালিকাশক্তি হয়ে উঠলো। পোস্ট এন্ড টেলিগ্রাফে চাকুরিরত আমার বন্ধু ছোটু এই ধরণের ছবির নামই দিয়ে ফেললো আর্ট ফিল্ম। এবং এই আর্ট ফিল্মেরও একটা ক্ষুদ্র বাজার সৃষ্টি হয়ে গেলো যা ডিভিডির কল্যাণে বহুগুনিত হ’তে থাকলো খানিকটা যেন অলক্ষ্যেই । অনেকটা চুটকি ট্যাবলয়েডের মত, যেগুলো শিক্ষিত বাঙ্গালীর বসবার ঘরের চায়ের টেবিলে পড়ে থাকলে গৃহস্থের শ্লাঘা ও পারিপার্শ্বিকে তাঁর মর্যাদাবৃদ্ধি হয় এবং নিভৃত সময়ে অন্য কর্মেও কাজে লাগে। অবশ্যই এর দায় ঋতুপর্ণর নয়। না হ’লে চিৎকৃত বিকৃত উচ্চারণে গাওয়া বাংলা ব্যান্ডের (সবগুলো অবশ্যই নয়, তবে বেশির ভাগ, যাদের অনেকেই বেশ জনপ্রিয় হয়েছেন ইদানীং) কৃতকর্মের দায় সলিল চৌধুরী, কবীর সুমন বা তাঁরও আগে গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের উপর বর্তায়।

১৯৯২তে প্রথম ছবি হীরের আংটি দিয়ে আত্মপ্রকাশ করে গত একুশ বছরে ঋতুপর্ণ নয়-নয় করে একুশটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি পরিচালনা করেছেন, যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন বলতেই হবে। (প্রসঙ্গতঃ, সত্যজিৎ ১৯৫৫-এ পথের পাঁচালী মুক্তি পাওয়ার পরে ১৯৯২ পর্যন্ত সাঁইত্রিশ বছরে আঠাশটি পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি করেছেন।) বিষয়ের বৈচিত্র্যে তিনি বিশেষ আলোচনার দাবী রাখেন, তবে একটি কথা এ প্রসঙ্গে না বলে থাকতে পারছি না যে, মানবের নানা স্তরের সম্পর্কের বিশ্লেষণে তাঁর যত আগ্রহ তাঁর ছবিতে দেখা গেছে, সমকালীন দেশ ও সমাজের আর্থ-রাজনৈতিক অস্থিরতার উত্তাপের বিশেষ কোনো আঁচ তাঁর ছবিতে আমি লক্ষ্য করিনি। ব্যষ্টিস্বত্তা বিশ্লেষণে তাঁর দক্ষতা ছিলো প্রশ্নাতীত, কিন্তু বোধহয় সচেতনভাবেই সে দক্ষতা তিনি সমষ্টির চেতনজগতের ক্ষেত্রটি তলিয়ে দেখতে প্রসারিত করেননি। তাঁর ব্যতিক্রমী জীবনাচরণ, বেশভূষা বা বাচনশৈলী নিয়ে কোন আলোচনায় আমার প্রবৃত্তি নেই, কারণ তা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের পরিপন্থী। ঋতুপর্ণের স্মরণে বাঙ্গালী আরেকটু সাবালকত্ব দেখালে, যেখানেই থাকুন, ঋতুপর্ণ নিজেই বেশি খুশী হতেন বলে আমার ধারণা।       

Wednesday, 29 May 2013

লুসি গ্রে


(একটি অক্ষম অনুবাদ) উইলিয়াম ওয়ার্ডসওয়ার্থের লুসি গ্রে অবলম্বনে, যেখানে কবির লুসি একটি প্রাণোচ্ছল গ্রাম্য বালিকা, যে এক তুষারঝড়ের রাতে বনপথে শহর-ফিরতি তার মা’কে খুঁজতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি...

প্রায়শঃই শুনি আমি লুসির স্বর
দূর-দূর পাহাড়ের বনের ‘পর
একদিন দৈবাৎ মিলেছিল দেখা
বনপথে চলেছে লুসি গ্রে একা।
বন্ধু ছিল না কোনো, সখিরাও পর,
নির্জন প্রান্তরে ছিল তার ঘর।
সাথে নিয়ে স্বর্গের একঝাঁক খুশি,
পৃথিবীতে এসেছিল সুন্দরী লুসি।
হলদে হরিণী নাচে নীল বনছায়ে,
সাদা খরগোশ ছোটে চঞ্চল পায়ে
লাল প্রজাপতি দেয় বুক ভরা প্রীতি
লুসি আজ নেই, শুধু রয়ে গেছে স্মৃতি।।
*************
“ওরে লুসি, লন্ঠন হাতে নিয়ে যা রে
হিম-হিম হাওয়া আর অঝোর তুষারে
মা তোর বুঝি হায় হারিয়েছে দিশা,
(উঃ), আজ যে কি ভয়ানক দুর্যোগের নিশা”!
“ওঃ বাবা, নিশ্চই যাব আমি ছুটে,
এখনো আকাশে চাঁদ আছে ফুটফুটে
বাজল কেবল ছ’টা, সময় আছে মেলা
হোক না যতই ঝড়, ভর সন্ধ্যবেলা”!
“ওরে সোনামণি তুই”, বাবা ভারি খুশি,
লন্ঠন হাতে নিয়ে পথে নামে লুসি।
বাবা ফের তড়িঘড়ি মন দেন কাজে,
গির্জের ঘড়িটিতে ঠিক ছ’টা বাজে।
*********
ঝিরঝির ঝরছেই হিমেল তুষার,
একা লুসি চলে সুনসান চারিধার
পাখীরাও জবুথবু গাইছে না গান,
নিশ্চুপ চরাচর বরফে শয়ান।
নির্জন বনমাঝে পথ গেছে বেঁকে
ঘোর কালো ঝোড়ো মেঘ চাঁদ দিলো ঢেকে
কোত্থাও কেউ নেই পথ বাতলাতে,
লুসি মা’কে খুঁজে ফেরে সেই হিম রাতে।
কত পথ উঁচু নীচু, লুসি ওঠে নামে,
শহরটা কোন দিকে, ডাইনে, না বামে ?
ঠিক এই অসময়ে ঝড় হ’ল শুরু
বিদ্যুৎ আর বাজ ডাকে গুরু-গুরু;
দুর্যোগ বেড়ে গেলো এককাঠি আরো –
লন্ঠন শিখা ভয়ে কাঁপে থরোথরো...
**********
লুসি ফিরছে না দেখে বাবা ভেবে সারা,
মা তো একা ফিরে এল, লুসি পথহারা ?
বাপে-মায়ে মেয়েটিকে খোঁজে একসাথে
কোথায়ই বা পাবে তাকে, এই ঘন রাতে ?
ঝোড়োরাত উদাসীন নিকষ আঁধার,
তুষারেই মুছে গেছে পদরেখা তার...
পূবাকাশে দেখা দেয় ভোর-ভোর আলো
বেদনায় কেঁপে উঠে তারা থমকালো !
এক ফার্লং দূরে ঝড়ে ভাঙ্গা সেতূ
বলে দেয় লুসি গ্রে-র না-ফেরার হেতূ।
নির্বাক বাপ-মা’র আর্ত বিষাদ,
সামনেই অতল এক নিঃসীম খাদ।
শোকাহত বাপ-মা’র বিদীর্ণ আশা,
দুই চোখ ভরে নামে শেষ ভালবাসা।
*********
আজো আমি সেই বনপথে শুনি যেন –
বাতাসেরা শিস দিয়ে বলে যায় কেন,
দিশাহীনা একাকিনী শেষতম সুরে
গান গেয়ে মা’কে খোঁজে কোন মায়াপুরে!