কথা হচ্ছে, রেলরক্ত বলিতে কি বুঝায় ? এটা কি রেলের শারীরবৃত্তীয় কিছু, কিন্তু
জড়ের তো শরীর বা মন থাকে বলে সচরাচর মান্য করা হয় না। তবে কি কথাটা অধিকরণ বা
করণকারক গোছের, যেমন, রেলে রক্ত বা রেল দ্বারা রক্তপাত ? দু’টোই বড় ভয়াবহ ব্যাপার
বলে মালুম হয়, এবং সে সব ঘটনা থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকাই শ্রেয়। তবে অন্যতর অর্থ ধরলে,
শিরায় উপশিরায় যা সতত প্রবাহিত হয়ে দেহকান্ডকারখানা সচল রাখে তা বিচার করলে নিশ্চিত
রেলরক্ত হল দৈনন্দিন রেলাচারী মানবকুল। এ বিচারের পিছনে পোক্ত অর্থনৈতিক যুক্তিও
সহজলভ্য, যে লাইনে প্যাসেঞ্জার কম সেই লাইনকে রক্তাল্পতায় ভোগা ‘রুগ্ন’ বলে ধরা
হয়, এবং অর্থবিদ্যার নিষ্ঠুর যুক্তিতে অলাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়ে জনমোহিনী
রাজনীতি বলে গণ্য হয়। শারীরবৃত্তীয় নিয়মেই এ রেলরক্তস্রোতের অনিবার্য পরম্পরা আছে,
এক অচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতা আছে। তিরিশ বছর রেলযাপনের পর অবসর নেওয়ার আগেই ঐতিহ্যধ্বজাবাহী
উত্তরাধিকার আপন নিয়মেই সৃষ্টি হয়ে যায়। তা পরিসংখ্যানগত ভাবে দেখা যাচ্ছে, এ হেন
‘রেলরক্ত’ সচরাচর ‘নীল’ হয় না, কারণ অবিতর্কিত ‘নীলরক্ত’-ধারীরা এদেশে সাধারণত
উন্মার্গগামী ও বায়ূচর হয়ে থাকেন (বিদেশে শুনেছি ঘটনাটা ঠিক উলটো)। এখন পৃথিবীর
বৃহত্তম সরকারি সংস্থা ভারতীয় রেল কেবল নামকাওয়াস্তে ভারতীয় অর্থনীতির জীবনরেখা হয়েই
থাকবে, সমাজের সুস্বাস্থ্যের দিকে নজর দেবে না, তা কি সম্ভব ? তাই ছেলেবেলা থেকেই
শিয়ালদহ মেইন লাইনে রেলের কামরায় রবীন্দ্রজয়ন্তী দেখেছি (একবার তাতে ‘এবার আমায়
ডাকলে দূরে’-র সঙ্গে তবলা সঙ্গতও করেছিলাম, ক্লাস সিক্সে), দেখেছি স্টেশানের উপর
ম্যারাপ বেঁধে রক্তদান শিবির। এমনই একটি রক্তদান শিবিরে রক্তদান না করেও (মাত্তর বারো
বছর বয়েস তখন, আট স্টেশান দূরের ইস্কুল থেকে আমায় আনতে যেতেন যিনি সেই কাকা সেখানে
তাঁর বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে রক্ত দিলেন) রক্তপরীক্ষায় জানতে পারি, আমার রক্তের
গ্রুপ এ-নেগেটিভ। বোঝাই যাচ্ছে, গপ্পটার এইখানে ‘গরু’ এক চক্কর ‘শ্মশানে’ এসে পড়বে,
অর্থাৎ রেল ভানতে ঈষৎ রক্তের গীত গাওয়া হবে। কি আর করা, আমি নাচার।
আমার রক্তের গ্রুপ এ-নেগেটিভ, জানলেন! এই নেগেটিভ-পজিটিভের ব্যাপারটা ইস্কুলে
পড়তে জীবনবিজ্ঞানের জিজি স্যার শেখাননি। ভালই করেছেন, এমনিতেই যে ইস্কুলে পড়তাম
সেখানে পরীক্ষায় অনেকসময় নেগেটিভ মার্কিং থাকত ফলে জন্মগত এই বিয়োগান্ত ব্যাপারটা
সেই কাঁচা বয়সে জানা হয়ে হ’লে সেই অতিরিক্ত নেগেটিভিটির চক্করে তা অহেতূক মানসিক
বৈকল্য ডেকে আনলেও আনতে পারত। তা না করে উনি দায়িত্ব নিয়ে শিখিয়ে দিয়েছিলেন –
মানবের রক্ত চার প্রকার, এ, বি, ও আর এবি।
এদের মধ্যে ‘ও’-রা খুব দেবতুল্য কারণ তারা নাকি সকলকে দরকার-অদরকারে রক্ত দিতে
পারে, সর্বজনীন দাতা; আর ‘এবি’-রা হ্যাংলা টাইপ, সর্বজনীন গ্রহীতা, এদের কোন
বাছবিচার নেই, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শুদ্র ম্লেচ্ছ-টেলেচ্ছ যার তার কাছে হাত
(থুড়ি, শিরা) পেতে রক্ত নিতে এদের কোনো লজ্জা নেই। বাকি দুই গোষ্ঠী ভারী ‘নিজের
বেলা আঁটিসুঁটি, পরের বেলা দাঁতকপাটি’-মার্কা, ‘আম্মো আমার তুম্মো তোমার’- শ্রেণী
এরা, নিজের পার্টির ছাড়া আর কারো রক্তে এদের কাজ চলে না ! তবে হ্যাঁ, আরেকটা
ব্যাপার স্যার অল্প বলেছিলেন ক্লাসে (ওনার কাছে প্রাইভেটে, অর্থাৎ নোটমূল্যে যারা
পড়তে যেত, তারা সে ব্যাপারের সবটুকু নোটাকারে শিখেছিল) যে মানুষের রক্তে রিস্যাস
ফ্যাক্টর বলে একটা জিনিস থাকে, সেটা নাকি রিস্যাস গোত্রের বাঁদরদের থেকে পাওয়া। রক্তদাতা
আর গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ছাড়াও সেইটে মিলে যাওয়া নাকি একান্ত আবশ্যক (বোঝাই যায়,
অসম্পূর্ণ শিক্ষার ফলে জীবনবিজ্ঞান পরীক্ষাটা বেটার দিয়ে লেটার পাওয়া আমার হয়ে
ওঠেনি)। তা সে আর আশ্চর্য কি, আমরা এককালে যে গাছগাছালিতেই বেড়ে বসবাস করতাম সেকথা
তো আগেই শুনেছি। বাড়িতেও ভাইকে ছেলেবেলায় বাবা মাঝে মাঝে আদর করে ‘শাখামৃগ’ বলে
ডাকতেন, এটা যে ‘চামারের নাম কৃপাসিন্ধু’-মার্কা ঠাট্টা তা আমি বুঝতেই পারতাম। আর
সহোদর ভাই যার শাখামৃগ, সে আর কি করে বিপিনবিহারী বা নভেন্দুশেখর হবে বলুন দেখি!
*****
- সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না ?
অসভ্যের মত গায়ে পড়ছেন ?
সুতীক্ষ্ণ তীরের মত প্রশ্নটায় মুখ তুলে দেখি একটি বছর
আঠেরোর মেয়ে। সোমবার। রাত সাতটা পঞ্চাশের শান্তিপুর লোক্যাল, শিয়ালদা থেকে ছেড়েছে
দশ মিনিট দেরিতে। রোজ ওই ট্রেনে আর কিছু না হোক, যেটা অবধারিতভাবে হয়েই থাকে সেটা
হল ধুন্ধুমার ভীড়। এই সাতটা থেকে আটটা/সাড়ে আটটা অবধি আরেকটা জিনিসও হয়ে থাকে সেটা
আমি বয়েসকালে উপলব্ধি করেছিলাম, সেটা হচ্ছে মানুষের মেজাজের তিরিক্ষিতম
শৃঙ্গারোহণ। ঠিক সন্ধ্যের মুখে রেলচরদের মধ্যে কেমন একটা চনমনে ফূর্তির ভাব লক্ষ্য
করা যায়, পারস্পরিক দ্বন্দ্বগুলো মূলতঃ ইয়ার্কি দিয়ে মেটানো হয় এবং সাধারণত বেশ
একটা হাস্যঘনতা দিয়ে ব্যাপারগুলো শেষ হয়। সন্ধ্যে গড়িয়ে যত রাত বাড়ে, ঘরে ফেরবার
তাড়া বাড়ে, বাড়ে অধৈর্য্যতা ও তৎসঞ্জাত বিরক্তি। মনে ধিকিধিকি ছাইচাপা আগুন নিয়ে
মানুষ উদভ্রান্তের মত প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষারত কামরাগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই
সময়টায় তাই সামান্যতম ঠোক্করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঠিকরে ওঠা অতি স্বাভাবিক ঘটনা। তারপর
যত রাত বাড়ে, সব আগুনই নিভু-নিভু হয়, আবেগের শীর্ষ স্পর্শ করবার পর মানুষের মধ্যে
একটা নৈর্ব্যক্তিক নিষ্পৃহতা আসে, ক্লান্তিময় ক্ষমাসৌন্দর্য্যে মস্তিষ্কে ঘুম দানা
বাঁধতে শুরু করে।
- কি করব বলুন, বড্ড ভীড় যে...সোজা
হয়ে দাঁড়াতেই তো পারছি না।
আজ মাসের আট তারিখ। ওকে বলা যায় ? ওকে কি বলা যায় যে
আমার চাকরিটা গতমাসের ঊনিশ তারিখে চলে গেছে ? আমি এখন পঁয়ত্রিশ, আমি এখন বেকার। বউ
জানে, তাকে যে বলতেই হত। শিশুরা নাকি দেবদূত হয়, তাই আমার দু’বছরের বাচ্চাছেলেটা
জানে কিনা ঠিক জানিনা। আর কেউ জানে না, সকালে উঠে ডেইলি প্যাসেঞ্জারের টাইমে ভাত
খেয়ে সিডিউলড ট্রেনই ধরি, কামরায় চেনা মুখগুলোর সঙ্গে চেনা ইয়ার্কিতে অটুট রাখি
আমার চেনা অবয়ব। তারপর শিয়ালদায় নেমে কোলকাতাময় চক্কর লাগাই একটা যেমনতেমন চাকরির
খোঁজে। চ্যাটার্জি ইন্টারন্যাশান্যালের তেরো তলায় ধূপকাঠির এক্সপোর্ট ফার্মে
এক্সপোর্ট-ম্যানেজারি, বন্ডেল রোডে ছবিওয়ালা ইংরেজি সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষের সেলসবয়,
স্ট্র্যান্ড রোডে মাড়োয়াড়ির গদিতে স্টেনোগ্রাফি (হিন্দিতে ডিক্টেশান শুনে ইংরেজিতে
চিঠিপত্তর লিখে দেওয়ার কাজ) – যা পাওয়া যায়। কোনো-কোনোদিন কার্জন পার্ক, বা ইডেন
বা কলেজ স্কোয়ারের বেঞ্চে ঘন্টার পর ঘন্টা অলস বসে চারপাশের চলমান কর্মস্রোত দেখি। এ মাসটা খুব ভাইটাল, জোটাতে হবেই একটা
কিছু। ঊনিশ দিনের মাইনে আর সামান্য জমা নিয়ে মোট হাজার পনেরো টাকায় চল্লিশ দিনের
বেশি চলবে না কোনোমতেই। সারাটাদিন এই করে ঠিক ডেইলি প্যাসেঞ্জারদের সময়েই ট্রেন
ধরে বাড়ি ফিরি, ভান বজায় থাকে বাইরের লোকের কাছে। শরীরের ক্লান্তির চেয়ে মনেরটা অনেক
অনেক বেশি, তাই সাতটা পঞ্চাশের লোক্যালে প্রায়ই চোখ জুড়ে আসে। পরপর কয়েকটা সাড়ম্বর
ঢেউ ভাঙ্গবার পর পাড়ের কাছে সাগরের জল যেমন কয়েক লহমার জন্যে মিছিমিছি শান্ত হবার
ভান করে, তেমনই জুড়ে-আসা চোখের সঙ্গে একটুক্ষণের জন্য হলেও জুড়িয়ে আসে উথালপাথাল মনের
ঢেউ, ছোট্টবেলার আম-কুড়োনোর মত ছোট-ছোট ভাললাগাগুলো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে।
*****
বেড়ে ওঠার কালে বঙ্গদেশ ব্যাপী বহুবিধ নতুনতর ঘটনার আমি সাক্ষী হয়েছিলাম। যথা,
মামার বাড়ি যাওয়ার সময় শিয়ালদহ স্টেশানের বাইরে আকাশ দিয়ে গাড়ি চলাচল দেখলাম, বাবা
বললেন, ওটাকে ফ্লাইওভার, বাংলায় উড়ালপুল বলে। ‘ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ এবং
‘বিজ্ঞান অভিশাপ না আশির্বাদ’ বিষয়ে রচনা লেখা শিখেও বাংলার পরীক্ষার আগে
নিশ্চিন্ত হওয়ার দিন শেষ হল, ‘মানবজীবনে কম্পিউটারের প্রাদুর্ভাব ও তার কুফল’ উপর
প্রবন্ধও মুখস্থ করবার চাপ পড়ল। যে ইতিহাসটা আগে তিনঘন্টার যাত্রাপালা দেখে ছবির
মত শিখতাম, যেমন ‘বাদশা ঔলমগীর’, ‘রক্তপিপাসু চেঙ্গিজ খাঁ’, ‘পলাশীর প্রান্তরে’, ‘বিদ্রোহী
ভগৎ সিং’, এমনকি ‘হেলেন অব ট্রয়’ অবধি, এইবার পঁয়তাল্লিশ মিনিটের একাঙ্ক নাটক আজকের
টিটোয়েন্টি ক্রিকেটের মত দুদ্দাড় করে এসে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেল, আরো বড় বড় জিনিস
জানতে শুরু করলাম, কেন ‘রক্তাক্ত রোডেশিয়া’, কেনই বা ‘বাস্তিল ভাঙ্গছে’, আর কেনই
বা কিছুদিন আগেও আমাদের প্রদেশের ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’-এ দম আটকে আসতো স’বার।
এইরকম একটা সন্ধিক্ষণে বাংলা জুড়ে কেবা আগে প্রাণ (অর্থাৎ, রক্ত) করিবেক দান, তার
লাগি’ হুড়োহুড়ি পড়ল। বাংলার আকাশে বাতাসে তখন শহীদস্মরণে আপন মরণে রক্তঋণ শুধবার
উদাত্ত আহবান মাইকে মাইকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ঋণেরই একাংশ শোধ করবার মানসে বাংলার
আনাচে কানাচে স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির আয়োজনের হিড়িক। তাই কলেজে উঠে এক ধূ-ধূ
দৃষ্টির মদিরেক্ষণা স্বেচ্ছাসেবিকার (কলেজে সিনিয়র) উপরোধে জীবনে প্রথম রক্ত দিয়েই
ফেললাম। এক অগ্নিময় ছাত্রনেতা-দাদা “কত রক্ত লাগবে, বুকের রক্ত ঢেলে দেব” হুহুঙ্কার
ছেড়ে পাশের বেডে শুয়ে পড়ে রক্ত নেবার লম্বা সূঁচ দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল, ফুটন্ত
বিপ্লবের এহেন অকালনির্বাপনও দেখে গেলাম চুপচাপ। এমনকি রক্ত দিয়ে তাপবিদ্যুৎ
উৎপাদন করবার অঙ্গীকারও প্রায়শঃই শোনা যাচ্ছিল যা নিয়ে বেয়াদব আনন্দময় বাজার
‘বাঙালীবাচ্চার রক্তের তেজ’ বলে ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা করে বসল এবং, সেইসময়েই একটি
ভারী আশ্চর্য কথা জানতে পারলাম, এই রক্ত জিনিসটা নাকি মানবশরীর ছাড়া অন্য কোনো
ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত হয়না ! বুঝুন কান্ড ! একদিকে শোনা যাচ্ছে, ক্যাপিট্যালিজম
নাকি এত মাল বানিয়ে ফেলেছে যে সেই পাহাড়প্রমাণ ভোগ্যপণ্য কেনবার লোক নেই, তাই
ক্যাপিট্যালিজম নিজে বাড়তে বাড়তে সেই উদ্বৃত্তের চাপে চাপা পড়ে নিজেকেই খতম করবার
রাস্তা তৈরি করে ফেলেছে দুনিয়াজুড়ে, আর অন্যদিকে কিনা রক্ত বানাবার জন্য একটা যেমনতেমন
কারখানাও সে এখনো তৈরি করে উঠতে পারেনি !! অপদার্থতা আর কাকে বলে ? ডাউন ডাউন
ক্যাপিট্যালিজম !
আমার মনে আরো প্রশ্ন জড় হতে থাকে, প্রশ্ন জমা করবারই তো বয়েস তখন! (আজ যেমন
বুঝি, সারা জীবনজুড়ে প্রশ্ন জড় করাটা মানবের একটা খেলা, ছেলেবেলার ঝুলন সাজাবার মত;
তা সে প্রশ্নমালার বেশীর ভাগের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই গোটা জীবন চলে যায়। অল্প
কিছুর উত্তর যদি বা পাওয়া যায়, তাই নিয়েই সব-পেয়েছির ভানটা অন্যের সামনে কত
বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়, তার অনুশীলন সেই চিতাতে শেষ হয়।) আচ্ছা, রক্তদানের আগে
বাড়তি একটা ‘স্বেচ্ছায়’ বসানো হয় কেন ? দান কি জোর করে হয় নাকি ? জোর করে তো
রক্তপাত হতে পারে, দান কভূ নয়, তাহলে ওই ‘স্বেচ্ছা’-টা অধিকন্তু হয়ে যাচ্ছে না ?
তবে কথায় আছে, অধিকন্তু ন দোষায়। আমরা মল-মুত্র-থুথু ইত্যাদিও তো স্বেচ্ছায় দিয়ে
থাকি, সেটাকে কি দান বলা যায় ? না বোধহয়, ‘দান’ ব্যাপারটার মধ্যে একটা পরার্থপরতা,
একটা রিসাইকেল অ্যান্ড রিইউজের মাত্রা সম্পৃক্ত আছে। অর্থাৎ একটা পারম্পর্য, একটা
ধারাবাহিক স্রোত। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছি তখন সেকেন্ড ইয়ার। একদিন সকালে এক পরিজন
এসে বললেন, ওঁর মাসীর নাতনীর এগারো মাস বয়েস, তার নাকি ওপেন হার্ট সার্জারি হবে
বিড়লা হাসপাতালে। জনৈক দেবদূত ডা. দেবী শেঠী অপারেশান ফি নেবেন না, কিন্তু দু’
বোতল রক্ত যে লাগবেই। এবং, এ-নেগেটিভ রক্ত; ফলে, – “তুই চল, একটা এক বছরের বাচ্চার
প্রাণ বাঁচবে, ভাব একবার!” ভাবলাম, এবং গেলাম। কাঁচের ঘরে নল-টল লাগানো বাচ্চাটাকে
দূর থেকে এক ঝলক দেখলাম, মাথাভরা চুল আঁচড়ানো আর কপালের বাঁদিকে কাজলের একটা ছোট্ট
মঙ্গলটিপ। রক্ত দেবার পর বাচ্চা মেয়েটির আবেগাপ্লুত ঠাকুমার কথাটা মনে আছে – “ও বড়
হলে ওকে বলব বাবা, ওর শরীরে তোমার রক্ত বইছে!”, পাশে সজল চোখে মেয়েটির মা দাঁড়িয়ে।
শুনে কেমন শিউরে উঠেছিলাম অজানা ভাললাগায়। ওই পারম্পর্য, নাকি একেই বলে রক্তের টান
? এমনিতে রক্ত দেওয়া-নেওয়ার দিক থেকে সেই সময়টা ভয়ানক, কি একটা রোগ মধ্যআফ্রিকার শিম্পাঞ্জীদের
থেকে মানুষ নিজের দেহে ডেকে এনে কেলেঙ্কারী বাঁধিয়েছে যার পরিণাম অবধারিত মরণ।
দুনিয়াজুড়ে (তখন অবধি মূলতঃ পশ্চিম-দুনিয়া) সেই অনিবার্যতা রক্তপথেই তার
মারণ-পরম্পরা তৈরী করে চলেছে, ‘এইডস’ মহামারীর আতঙ্কে থরথর কাঁপতে শুরু করেছে
তথাকথিত সভ্যদেশগুলো। শিয়ালদা মেইনলাইনে অবশ্য তার প্রভাব বিশেষ পড়েনি, কারণটা
অবশ্যই সভ্যতার অভাব নয়। আসলে সেখানে মূলতঃ যে সকল রোগ নিয়ে চর্চা হয়ে থাকে (আজও) এবং
‘চলন্ত রেলপথে’ তার নিদান ইত্যাদি পেশ করা হয়ে থাকে সুলভে, তার প্রত্যেকটিই হয় প্রাতঃস্মরণীয়
ডা. বিধানচন্দ্র রায়, নয় ডা. নীলরতন সরকার মহোদয়ের রেফারেন্সে। এবং ওঁদের কালে এই
‘এইডস’ কেচ্ছাটির জন্ম হয়নি। বরং রক্ত নিয়ে যে সমস্ত অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্স রোজকার রেল-কামরায়
চলে, তাতে অনেক বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে নানান ইন্টারেস্টিং বিষয় উত্থাপিত ও আলোচিত
হয়। যথা, সমাজগ্রাহ্য বৈবাহিক সম্পর্ক ও তজ্জনিত রক্তের মিশ্রণ। অনুলোম-প্রতিলোম,
স্ববর্ণ-অসবর্ণ ছুঁয়ে আলোচনাটা –“চ্যাটার্জি-চ্যাটার্জিতে হয় না,
ব্যানার্জি-ব্যানার্জিতেও হয় না; কিন্তু বোসে-বোসে হয়, আবার ঘোষে-ঘোষেও হয়” অবধি
চলে যায়। জ্ঞানবন্ত রেলাচারীদের অর্বাচীন সহযাত্রী হয়ে বসে-বসে বা ঘষে-ঘষে যতটা
শেখা যায়, নীরব শ্রোতা হয়ে ততটা শেখবার চেষ্টা করি।
*****
-
স্কাউন্ড্রেল,
মেয়ে দেখলেই গায়ে গা ঘষতে ইচ্ছে করে না ? বারবার বলছি, তবু –
আমার চটকার পাতলা কুয়াশার মত আস্তরণটা কর্কশ শব্দে
ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে যায়। আমার দিকে ছোঁড়া সুতীক্ষ্ণ তীরটা আশেপাশে অনেকেরই বুকে
বিঁধে গেল – “লেডিস থাকতে জেনারেলে কেন ম্যাডাম ?...”, “দিদিভাই, এত নাজুক হলে লেডিসে যান না...”,
“দেখছেন এই ভীড়, তার উপর আগের নৈহাটীটা ক্যানসেল...”, “আরে বাবাকে বলুন, প্রাইভেট
কার কিনে দিতে...”; চটকা ভেঙ্গে উঠে আমি সমস্বর সমর্থকদের থামাই গলা তুলে।
-
ছেড়ে দিন না মশাই, আমারই ভুল। শরীরটা খারাপ, হয়তো ট্রেনের ঝাঁকানিতে ওর গায়ে
গা লেগে গেছে। হতেই পারে। আপনারা প্লিজ চুপ করুন”।
আমার কথায় জনতার সমব্যথার বুদ্বুদগুলোর হাওয়া খানিক
চুপসে গেলেও বাতাসে ভর করে সেগুলো ভেসে রইল ভীড়াক্রান্ত কামরার এদিকওদিকে, আরো
খানিকক্ষণ। আরো দু’চারটে ফেটেও গেল, যদিও তার শব্দ তত জোরালো নয়। আমি মেয়েটির দিকে
ভালো করে চাইলাম এবার। লম্বা, ফর্সা মেয়েটির গড়নই বলে দেয় ওর মা-বাবা-ভাই-বোন-দাদু-ঠাকুরমা
সব্বাই ওকে খুব আদরে রাখেন। একদিন কোনো কারণে বৃষ্টি ভিজে বাড়ি ফিরলে মা নিজে ওর
চুল মুছিয়ে দেন। তার পরেও যদি দু’বার হাঁচি দিয়ে ফেলে ও, ওর বাপী তৎক্ষণাৎ উদভ্রান্ত
হয়ে ফ্যামিলি-ডাক্তারকে তিনবার ফোন করে ফেলেন। যে স্টেশানে ও নামবে, তার ঠিক
বাইরেটায় নির্ঘাত ওর দাদা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওকে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। এমন
মেয়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, দাঁতে চেপে ধরেছে থরথরানো
ঠোঁট, চোখে ঘেন্না, রাগ আর ভয়। কোনটা কতটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। বদ্ধ ঘরে আটকা পড়ে
কুঁকড়ে যাওয়া বেড়ালের মত দ্রুত
ওঠানামা করছে বুক, উত্তেজিত শ্বাসের শব্দ জোর করে চেপে রাখতে চাইছে যেন। দু’ হাতে
সজোরে আঁকড়ে ধরেছে কাঁধ থেকে আড়াআড়ি ঝোলা স্লিং ব্যাগটার স্ট্র্যাপ। এত জোরে চেপে
ধরেছে যেন ওটাই ওর রক্ষাকবচ, ওর অস্ত্র, আর তাতে ওর কবজির শিরাগুলো বাড়তি
রক্তসঞ্চালনে ফুলে উঠেছে সবুজ হয়ে।
*****
ট্রেন হঠাৎ গতি কমিয়েছে, বোঝা গেল সোদপুর এল বলে। আগরপাড়া – সোদপুরের মাঝে
সিগন্যালিং-এর কি কাজ চলছে আজ প্রায় দিন দশেক হল। দরজার ধারে জালে লটকানো আংটায়
ঝোলানো অফিস ব্যাগ থেকে বাজারের থলি বার করে নিয়ে নামবার জন্য কোমর বাঁধছেন দুঁদে
রেলচর। খোঁচা খোঁচা একগাল দাড়ি ক্ষয়াটে চেহারার লেবু-লজেন্সওয়ালার চোখে এক রাশ
শূণ্যতা, একটা লজেন্সও এই কামরায় বিক্কিরি হয়নি। শসাওয়ালা ঝুড়ি মাথায় তুলে একমনে কি
বিড়বিড় করছে কে জানে, হয়তো আজ সারাদিনের আয়পয় মুখে মুখে হিসেব করছে। যে অন্ধ ভিখিরি মহিলা তার গানের
শেষ কলিটা গেয়ে ( - আমি যে গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় মনে রেখো) তার
বালিকাকন্যার হাতের মুঠি থেকে খুচরো পয়সা তুলে রাখছে কাঁধের ঝোলা ব্যাগে, ওর বসন্তের
দাগওয়ালা মুখে সব সময় একটা হালকা হাসি আঁকা থাকে কেন কে জানে! ট্রেন থামা মাত্র
ভাটার স্রোতের মত ওরা সব্বাই হুড়মুড়িয়ে নেমে গেল, উঠে এল ব্যাকপ্যাক পিঠে কানে মোবাইল ওষুধ
কোম্পানীর সেলসবয়, উঠে এল টিউশান-পালানো টিনএজ লাভার-জুটি। উঠে এল ‘বচ্চন’কন্ঠী সল্টেড
বাদামওয়ালা – “আচ্ছা এই যে এসে গেছি, স্বপনের-”। স্বপন নিজেই ব্র্যান্ড, তাই স্বপনের কি, তা আর উচ্চারণের দরকারই হয়না ওর, ডেইলি
প্যাসেঞ্জারেরা কোনো সাধাসাধি ছাড়াই নিজে নিজে হাত বাড়িয়ে সল্টেড বাদাম নিতে থাকেন
ওর থেকে। রেল অবলীলায় তার পরম্পরা বজায় রাখে, তার ‘রক্তস্রোতে’ ভাটা পড়ে না। তার কোনো ‘রক্তঋণ’
অনাদায়ী পড়ে থাকে না।
আমি নিভে-আসা চোখের আলোয় মেয়েটির মুখে কি দেখতে পাই, কি দেখতে চাই ? আমার নির্লজ্জ তাকিয়ে থাকায় ও অস্বস্তি বোধ
করছে বেশ বুঝতে পারি। কিন্তু কি করব, সতেরোটা বছর পেরিয়ে গেলেও রক্ত যে এখনো জলের চেয়ে গাঢ়!
ও মেয়ে, ঐ শিরার সব রক্তই বুঝি তোর বাপ-মায়ের ? কিন্তু
তাহলে কেন তোর কথাগুলো শঙ্করমাছের চাবুকের মত শুধু মানসম্মান নয়, স্থানিক অবস্থিতি
নয়, আমার অন্য কোনোখানে আঘাত করে তোর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে বলছে ? আর তোর মুখের
দিকে তাকিয়ে আমার এমন লাগছে কেন ? এ তো যৌনতা নয়, ওটার অলিগলি আমার জানা, এ একদম
অন্য একটা টানের কষ্ট। সুঁচ ফুটিয়ে আড়াইশো মিলিলিটার রক্ত বার করে নিয়ে শিরার
ফুটোটায় গোল একটা ব্যান্ডএইড লাগিয়ে রাখলে পরের দু’ ঘন্টাটাক যেমন চিনচিনে ব্যথাময়
ভাললাগার রেশ থেকে যায়, এ অনুভূতিটাও যেন খানিকটা তেমন। আমি অপলক, মেয়েটির কপালের
বাঁদিকে সব বাধাবিপত্তি আর নজর-লাগা দূর
করা কাজলের ছোট্ট একটা মঙ্গলটিপ
খুঁজি, খুঁজতেই থাকি।
(পার্থ পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত শারদীয়া "ট্রৈনিক" ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)












