Tuesday, 27 February 2018

রেলরক্তঋণ


কথা হচ্ছে, রেলরক্ত বলিতে কি বুঝায় ? এটা কি রেলের শারীরবৃত্তীয় কিছু, কিন্তু জড়ের তো শরীর বা মন থাকে বলে সচরাচর মান্য করা হয় না। তবে কি কথাটা অধিকরণ বা করণকারক গোছের, যেমন, রেলে রক্ত বা রেল দ্বারা রক্তপাত ? দু’টোই বড় ভয়াবহ ব্যাপার বলে মালুম হয়, এবং সে সব ঘটনা থেকে মুখ ঘুরিয়ে থাকাই শ্রেয়। তবে অন্যতর অর্থ ধরলে, শিরায় উপশিরায় যা সতত প্রবাহিত হয়ে দেহকান্ডকারখানা সচল রাখে তা বিচার করলে নিশ্চিত রেলরক্ত হল দৈনন্দিন রেলাচারী মানবকুল। এ বিচারের পিছনে পোক্ত অর্থনৈতিক যুক্তিও সহজলভ্য, যে লাইনে প্যাসেঞ্জার কম সেই লাইনকে রক্তাল্পতায় ভোগা ‘রুগ্ন’ বলে ধরা হয়, এবং অর্থবিদ্যার নিষ্ঠুর যুক্তিতে অলাভজনক বিনিয়োগ হিসেবে প্রতিপন্ন হয়ে জনমোহিনী রাজনীতি বলে গণ্য হয়। শারীরবৃত্তীয় নিয়মেই এ রেলরক্তস্রোতের অনিবার্য পরম্পরা আছে, এক অচ্ছেদ্য ধারাবাহিকতা আছে। তিরিশ বছর রেলযাপনের পর অবসর নেওয়ার আগেই ঐতিহ্যধ্বজাবাহী উত্তরাধিকার আপন নিয়মেই সৃষ্টি হয়ে যায়। তা পরিসংখ্যানগত ভাবে দেখা যাচ্ছে, এ হেন ‘রেলরক্ত’ সচরাচর ‘নীল’ হয় না, কারণ অবিতর্কিত ‘নীলরক্ত’-ধারীরা এদেশে সাধারণত উন্মার্গগামী ও বায়ূচর হয়ে থাকেন (বিদেশে শুনেছি ঘটনাটা ঠিক উলটো)। এখন পৃথিবীর বৃহত্তম সরকারি সংস্থা ভারতীয় রেল কেবল নামকাওয়াস্তে ভারতীয় অর্থনীতির জীবনরেখা হয়েই থাকবে, সমাজের সুস্বাস্থ্যের দিকে নজর দেবে না, তা কি সম্ভব ? তাই ছেলেবেলা থেকেই শিয়ালদহ মেইন লাইনে রেলের কামরায় রবীন্দ্রজয়ন্তী দেখেছি (একবার তাতে ‘এবার আমায় ডাকলে দূরে’-র সঙ্গে তবলা সঙ্গতও করেছিলাম, ক্লাস সিক্সে), দেখেছি স্টেশানের উপর ম্যারাপ বেঁধে রক্তদান শিবির। এমনই একটি রক্তদান শিবিরে রক্তদান না করেও (মাত্তর বারো বছর বয়েস তখন, আট স্টেশান দূরের ইস্কুল থেকে আমায় আনতে যেতেন যিনি সেই কাকা সেখানে তাঁর বন্ধুদের ডাকে সাড়া দিয়ে রক্ত দিলেন) রক্তপরীক্ষায় জানতে পারি, আমার রক্তের গ্রুপ এ-নেগেটিভ। বোঝাই যাচ্ছে, গপ্পটার এইখানে ‘গরু’ এক চক্কর ‘শ্মশানে’ এসে পড়বে, অর্থাৎ রেল ভানতে ঈষৎ রক্তের গীত গাওয়া হবে। কি আর করা, আমি নাচার।
আমার রক্তের গ্রুপ এ-নেগেটিভ, জানলেন! এই নেগেটিভ-পজিটিভের ব্যাপারটা ইস্কুলে পড়তে জীবনবিজ্ঞানের জিজি স্যার শেখাননি। ভালই করেছেন, এমনিতেই যে ইস্কুলে পড়তাম সেখানে পরীক্ষায় অনেকসময় নেগেটিভ মার্কিং থাকত ফলে জন্মগত এই বিয়োগান্ত ব্যাপারটা সেই কাঁচা বয়সে জানা হয়ে হ’লে সেই অতিরিক্ত নেগেটিভিটির চক্করে তা অহেতূক মানসিক বৈকল্য ডেকে আনলেও আনতে পারত। তা না করে উনি দায়িত্ব নিয়ে শিখিয়ে দিয়েছিলেন – মানবের রক্ত চার  প্রকার, এ, বি, ও আর এবি। এদের মধ্যে ‘ও’-রা খুব দেবতুল্য কারণ তারা নাকি সকলকে দরকার-অদরকারে রক্ত দিতে পারে, সর্বজনীন দাতা; আর ‘এবি’-রা হ্যাংলা টাইপ, সর্বজনীন গ্রহীতা, এদের কোন বাছবিচার নেই, ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়-বৈশ্য-শুদ্র ম্লেচ্ছ-টেলেচ্ছ যার তার কাছে হাত (থুড়ি, শিরা) পেতে রক্ত নিতে এদের কোনো লজ্জা নেই। বাকি দুই গোষ্ঠী ভারী ‘নিজের বেলা আঁটিসুঁটি, পরের বেলা দাঁতকপাটি’-মার্কা, ‘আম্মো আমার তুম্মো তোমার’- শ্রেণী এরা, নিজের পার্টির ছাড়া আর কারো রক্তে এদের কাজ চলে না ! তবে হ্যাঁ, আরেকটা ব্যাপার স্যার অল্প বলেছিলেন ক্লাসে (ওনার কাছে প্রাইভেটে, অর্থাৎ নোটমূল্যে যারা পড়তে যেত, তারা সে ব্যাপারের সবটুকু নোটাকারে শিখেছিল) যে মানুষের রক্তে রিস্যাস ফ্যাক্টর বলে একটা জিনিস থাকে, সেটা নাকি রিস্যাস গোত্রের বাঁদরদের থেকে পাওয়া। রক্তদাতা আর গ্রহীতার রক্তের গ্রুপ ছাড়াও সেইটে মিলে যাওয়া নাকি একান্ত আবশ্যক (বোঝাই যায়, অসম্পূর্ণ শিক্ষার ফলে জীবনবিজ্ঞান পরীক্ষাটা বেটার দিয়ে লেটার পাওয়া আমার হয়ে ওঠেনি)। তা সে আর আশ্চর্য কি, আমরা এককালে যে গাছগাছালিতেই বেড়ে বসবাস করতাম সেকথা তো আগেই শুনেছি। বাড়িতেও ভাইকে ছেলেবেলায় বাবা মাঝে মাঝে আদর করে ‘শাখামৃগ’ বলে ডাকতেন, এটা যে ‘চামারের নাম কৃপাসিন্ধু’-মার্কা ঠাট্টা তা আমি বুঝতেই পারতাম। আর সহোদর ভাই যার শাখামৃগ, সে আর কি করে বিপিনবিহারী বা নভেন্দুশেখর হবে বলুন দেখি!
                                                                   *****


-     সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না ? অসভ্যের মত গায়ে পড়ছেন ?  
সুতীক্ষ্ণ তীরের মত প্রশ্নটায় মুখ তুলে দেখি একটি বছর আঠেরোর মেয়ে। সোমবার। রাত সাতটা পঞ্চাশের শান্তিপুর লোক্যাল, শিয়ালদা থেকে ছেড়েছে দশ মিনিট দেরিতে। রোজ ওই ট্রেনে আর কিছু না হোক, যেটা অবধারিতভাবে হয়েই থাকে সেটা হল ধুন্ধুমার ভীড়। এই সাতটা থেকে আটটা/সাড়ে আটটা অবধি আরেকটা জিনিসও হয়ে থাকে সেটা আমি বয়েসকালে উপলব্ধি করেছিলাম, সেটা হচ্ছে মানুষের মেজাজের তিরিক্ষিতম শৃঙ্গারোহণ। ঠিক সন্ধ্যের মুখে রেলচরদের মধ্যে কেমন একটা চনমনে ফূর্তির ভাব লক্ষ্য করা যায়, পারস্পরিক দ্বন্দ্বগুলো মূলতঃ ইয়ার্কি দিয়ে মেটানো হয় এবং সাধারণত বেশ একটা হাস্যঘনতা দিয়ে ব্যাপারগুলো শেষ হয়। সন্ধ্যে গড়িয়ে যত রাত বাড়ে, ঘরে ফেরবার তাড়া বাড়ে, বাড়ে অধৈর্য্যতা ও তৎসঞ্জাত বিরক্তি। মনে ধিকিধিকি ছাইচাপা আগুন নিয়ে মানুষ উদভ্রান্তের মত প্ল্যাটফর্মে অপেক্ষারত কামরাগুলোর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই সময়টায় তাই সামান্যতম ঠোক্করে অগ্নিস্ফুলিঙ্গ ঠিকরে ওঠা অতি স্বাভাবিক ঘটনা। তারপর যত রাত বাড়ে, সব আগুনই নিভু-নিভু হয়, আবেগের শীর্ষ স্পর্শ করবার পর মানুষের মধ্যে একটা নৈর্ব্যক্তিক নিষ্পৃহতা আসে, ক্লান্তিময় ক্ষমাসৌন্দর্য্যে মস্তিষ্কে ঘুম দানা বাঁধতে শুরু করে।
-     কি করব বলুন, বড্ড ভীড় যে...সোজা হয়ে দাঁড়াতেই তো পারছি না।
আজ মাসের আট তারিখ। ওকে বলা যায় ? ওকে কি বলা যায় যে আমার চাকরিটা গতমাসের ঊনিশ তারিখে চলে গেছে ? আমি এখন পঁয়ত্রিশ, আমি এখন বেকার। বউ জানে, তাকে যে বলতেই হত। শিশুরা নাকি দেবদূত হয়, তাই আমার দু’বছরের বাচ্চাছেলেটা জানে কিনা ঠিক জানিনা। আর কেউ জানে না, সকালে উঠে ডেইলি প্যাসেঞ্জারের টাইমে ভাত খেয়ে সিডিউলড ট্রেনই ধরি, কামরায় চেনা মুখগুলোর সঙ্গে চেনা ইয়ার্কিতে অটুট রাখি আমার চেনা অবয়ব। তারপর শিয়ালদায় নেমে কোলকাতাময় চক্কর লাগাই একটা যেমনতেমন চাকরির খোঁজে। চ্যাটার্জি ইন্টারন্যাশান্যালের তেরো তলায় ধূপকাঠির এক্সপোর্ট ফার্মে এক্সপোর্ট-ম্যানেজারি, বন্ডেল রোডে ছবিওয়ালা ইংরেজি সংক্ষিপ্ত বিশ্বকোষের সেলসবয়, স্ট্র্যান্ড রোডে মাড়োয়াড়ির গদিতে স্টেনোগ্রাফি (হিন্দিতে ডিক্টেশান শুনে ইংরেজিতে চিঠিপত্তর লিখে দেওয়ার কাজ) – যা পাওয়া যায়। কোনো-কোনোদিন কার্জন পার্ক, বা ইডেন বা কলেজ স্কোয়ারের বেঞ্চে ঘন্টার পর ঘন্টা অলস বসে চারপাশের চলমান কর্মস্রোত দেখি। এ মাসটা খুব ভাইটাল, জোটাতে হবেই একটা কিছু। ঊনিশ দিনের মাইনে আর সামান্য জমা নিয়ে মোট হাজার পনেরো টাকায় চল্লিশ দিনের বেশি চলবে না কোনোমতেই। সারাটাদিন এই করে ঠিক ডেইলি প্যাসেঞ্জারদের সময়েই ট্রেন ধরে বাড়ি ফিরি, ভান বজায় থাকে বাইরের লোকের কাছে। শরীরের ক্লান্তির চেয়ে মনেরটা অনেক অনেক বেশি, তাই সাতটা পঞ্চাশের লোক্যালে প্রায়ই চোখ জুড়ে আসে। পরপর কয়েকটা সাড়ম্বর ঢেউ ভাঙ্গবার পর পাড়ের কাছে সাগরের জল যেমন কয়েক লহমার জন্যে মিছিমিছি শান্ত হবার ভান করে, তেমনই জুড়ে-আসা চোখের সঙ্গে একটুক্ষণের জন্য হলেও জুড়িয়ে আসে উথালপাথাল মনের ঢেউ, ছোট্টবেলার আম-কুড়োনোর মত ছোট-ছোট ভাললাগাগুলো মনের পর্দায় ভেসে ওঠে।  
*****
বেড়ে ওঠার কালে বঙ্গদেশ ব্যাপী বহুবিধ নতুনতর ঘটনার আমি সাক্ষী হয়েছিলাম। যথা, মামার বাড়ি যাওয়ার সময় শিয়ালদহ স্টেশানের বাইরে আকাশ দিয়ে গাড়ি চলাচল দেখলাম, বাবা বললেন, ওটাকে ফ্লাইওভার, বাংলায় উড়ালপুল বলে। ‘ছাত্রজীবনের দায়িত্ব ও কর্তব্য’ এবং ‘বিজ্ঞান অভিশাপ না আশির্বাদ’ বিষয়ে রচনা লেখা শিখেও বাংলার পরীক্ষার আগে নিশ্চিন্ত হওয়ার দিন শেষ হল, ‘মানবজীবনে কম্পিউটারের প্রাদুর্ভাব ও তার কুফল’ উপর প্রবন্ধও মুখস্থ করবার চাপ পড়ল। যে ইতিহাসটা আগে তিনঘন্টার যাত্রাপালা দেখে ছবির মত শিখতাম, যেমন ‘বাদশা ঔলমগীর’, ‘রক্তপিপাসু চেঙ্গিজ খাঁ’, ‘পলাশীর প্রান্তরে’, ‘বিদ্রোহী ভগৎ সিং’, এমনকি ‘হেলেন অব ট্রয়’ অবধি, এইবার পঁয়তাল্লিশ মিনিটের একাঙ্ক নাটক আজকের টিটোয়েন্টি ক্রিকেটের মত দুদ্দাড় করে এসে আমাদের ভাসিয়ে নিয়ে গেল, আরো বড় বড় জিনিস জানতে শুরু করলাম, কেন ‘রক্তাক্ত রোডেশিয়া’, কেনই বা ‘বাস্তিল ভাঙ্গছে’, আর কেনই বা কিছুদিন আগেও আমাদের প্রদেশের ‘বাতাসে বারুদের গন্ধ’-এ দম আটকে আসতো স’বার। এইরকম একটা সন্ধিক্ষণে বাংলা জুড়ে কেবা আগে প্রাণ (অর্থাৎ, রক্ত) করিবেক দান, তার লাগি’ হুড়োহুড়ি পড়ল। বাংলার আকাশে বাতাসে তখন শহীদস্মরণে আপন মরণে রক্তঋণ শুধবার উদাত্ত আহবান মাইকে মাইকে ছড়িয়ে পড়েছে। সেই ঋণেরই একাংশ শোধ করবার মানসে বাংলার আনাচে কানাচে স্বেচ্ছায় রক্তদান শিবির আয়োজনের হিড়িক। তাই কলেজে উঠে এক ধূ-ধূ দৃষ্টির মদিরেক্ষণা স্বেচ্ছাসেবিকার (কলেজে সিনিয়র) উপরোধে জীবনে প্রথম রক্ত দিয়েই ফেললাম। এক অগ্নিময় ছাত্রনেতা-দাদা “কত রক্ত লাগবে, বুকের রক্ত ঢেলে দেব” হুহুঙ্কার ছেড়ে পাশের বেডে শুয়ে পড়ে রক্ত নেবার লম্বা সূঁচ দেখে জ্ঞান হারিয়ে ফেলল, ফুটন্ত বিপ্লবের এহেন অকালনির্বাপনও দেখে গেলাম চুপচাপ। এমনকি রক্ত দিয়ে তাপবিদ্যুৎ উৎপাদন করবার অঙ্গীকারও প্রায়শঃই শোনা যাচ্ছিল যা নিয়ে বেয়াদব আনন্দময় বাজার ‘বাঙালীবাচ্চার রক্তের তেজ’ বলে ব্যঙ্গাত্মক রসিকতা করে বসল এবং, সেইসময়েই একটি ভারী আশ্চর্য কথা জানতে পারলাম, এই রক্ত জিনিসটা নাকি মানবশরীর ছাড়া অন্য কোনো ফ্যাক্টরিতে উৎপাদিত হয়না ! বুঝুন কান্ড ! একদিকে শোনা যাচ্ছে, ক্যাপিট্যালিজম নাকি এত মাল বানিয়ে ফেলেছে যে সেই পাহাড়প্রমাণ ভোগ্যপণ্য কেনবার লোক নেই, তাই ক্যাপিট্যালিজম নিজে বাড়তে বাড়তে সেই উদ্বৃত্তের চাপে চাপা পড়ে নিজেকেই খতম করবার রাস্তা তৈরি করে ফেলেছে দুনিয়াজুড়ে, আর অন্যদিকে কিনা রক্ত বানাবার জন্য একটা যেমনতেমন কারখানাও সে এখনো তৈরি করে উঠতে পারেনি !! অপদার্থতা আর কাকে বলে ? ডাউন ডাউন ক্যাপিট্যালিজম !  
আমার মনে আরো প্রশ্ন জড় হতে থাকে, প্রশ্ন জমা করবারই তো বয়েস তখন! (আজ যেমন বুঝি, সারা জীবনজুড়ে প্রশ্ন জড় করাটা মানবের একটা খেলা, ছেলেবেলার ঝুলন সাজাবার মত; তা সে প্রশ্নমালার বেশীর ভাগের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই গোটা জীবন চলে যায়। অল্প কিছুর উত্তর যদি বা পাওয়া যায়, তাই নিয়েই সব-পেয়েছির ভানটা অন্যের সামনে কত বিশ্বাসযোগ্য করে তোলা যায়, তার অনুশীলন সেই চিতাতে শেষ হয়।) আচ্ছা, রক্তদানের আগে বাড়তি একটা ‘স্বেচ্ছায়’ বসানো হয় কেন ? দান কি জোর করে হয় নাকি ? জোর করে তো রক্তপাত হতে পারে, দান কভূ নয়, তাহলে ওই ‘স্বেচ্ছা’-টা অধিকন্তু হয়ে যাচ্ছে না ? তবে কথায় আছে, অধিকন্তু ন দোষায়। আমরা মল-মুত্র-থুথু ইত্যাদিও তো স্বেচ্ছায় দিয়ে থাকি, সেটাকে কি দান বলা যায় ? না বোধহয়, ‘দান’ ব্যাপারটার মধ্যে একটা পরার্থপরতা, একটা রিসাইকেল অ্যান্ড রিইউজের মাত্রা সম্পৃক্ত আছে। অর্থাৎ একটা পারম্পর্য, একটা ধারাবাহিক স্রোত। বিশ্ববিদ্যালয়ে উঠেছি তখন সেকেন্ড ইয়ার। একদিন সকালে এক পরিজন এসে বললেন, ওঁর মাসীর নাতনীর এগারো মাস বয়েস, তার নাকি ওপেন হার্ট সার্জারি হবে বিড়লা হাসপাতালে। জনৈক দেবদূত ডা. দেবী শেঠী অপারেশান ফি নেবেন না, কিন্তু দু’ বোতল রক্ত যে লাগবেই। এবং, এ-নেগেটিভ রক্ত; ফলে, – “তুই চল, একটা এক বছরের বাচ্চার প্রাণ বাঁচবে, ভাব একবার!” ভাবলাম, এবং গেলাম। কাঁচের ঘরে নল-টল লাগানো বাচ্চাটাকে দূর থেকে এক ঝলক দেখলাম, মাথাভরা চুল আঁচড়ানো আর কপালের বাঁদিকে কাজলের একটা ছোট্ট মঙ্গলটিপ। রক্ত দেবার পর বাচ্চা মেয়েটির আবেগাপ্লুত ঠাকুমার কথাটা মনে আছে – “ও বড় হলে ওকে বলব বাবা, ওর শরীরে তোমার রক্ত বইছে!”, পাশে সজল চোখে মেয়েটির মা দাঁড়িয়ে। শুনে কেমন শিউরে উঠেছিলাম অজানা ভাললাগায়। ওই পারম্পর্য, নাকি একেই বলে রক্তের টান ? এমনিতে রক্ত দেওয়া-নেওয়ার দিক থেকে সেই সময়টা ভয়ানক, কি একটা রোগ মধ্যআফ্রিকার শিম্পাঞ্জীদের থেকে মানুষ নিজের দেহে ডেকে এনে কেলেঙ্কারী বাঁধিয়েছে যার পরিণাম অবধারিত মরণ। দুনিয়াজুড়ে (তখন অবধি মূলতঃ পশ্চিম-দুনিয়া) সেই অনিবার্যতা রক্তপথেই তার মারণ-পরম্পরা তৈরী করে চলেছে, ‘এইডস’ মহামারীর আতঙ্কে থরথর কাঁপতে শুরু করেছে তথাকথিত সভ্যদেশগুলো। শিয়ালদা মেইনলাইনে অবশ্য তার প্রভাব বিশেষ পড়েনি, কারণটা অবশ্যই সভ্যতার অভাব নয়। আসলে সেখানে মূলতঃ যে সকল রোগ নিয়ে চর্চা হয়ে থাকে (আজও) এবং ‘চলন্ত রেলপথে’ তার নিদান ইত্যাদি পেশ করা হয়ে থাকে সুলভে, তার প্রত্যেকটিই হয় প্রাতঃস্মরণীয় ডা. বিধানচন্দ্র রায়, নয় ডা. নীলরতন সরকার মহোদয়ের রেফারেন্সে। এবং ওঁদের কালে এই ‘এইডস’ কেচ্ছাটির জন্ম হয়নি। বরং রক্ত নিয়ে যে সমস্ত অ্যাকাডেমিক ডিসকোর্স রোজকার রেল-কামরায় চলে, তাতে অনেক বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে নানান ইন্টারেস্টিং বিষয় উত্থাপিত ও আলোচিত হয়। যথা, সমাজগ্রাহ্য বৈবাহিক সম্পর্ক ও তজ্জনিত রক্তের মিশ্রণ। অনুলোম-প্রতিলোম, স্ববর্ণ-অসবর্ণ ছুঁয়ে আলোচনাটা –“চ্যাটার্জি-চ্যাটার্জিতে হয় না, ব্যানার্জি-ব্যানার্জিতেও হয় না; কিন্তু বোসে-বোসে হয়, আবার ঘোষে-ঘোষেও হয়” অবধি চলে যায়। জ্ঞানবন্ত রেলাচারীদের অর্বাচীন সহযাত্রী হয়ে বসে-বসে বা ঘষে-ঘষে যতটা শেখা যায়, নীরব শ্রোতা হয়ে ততটা শেখবার চেষ্টা করি।

*****
-     স্কাউন্ড্রেল, মেয়ে দেখলেই গায়ে গা ঘষতে ইচ্ছে করে না ? বারবার বলছি, তবু –
আমার চটকার পাতলা কুয়াশার মত আস্তরণটা কর্কশ শব্দে ছিঁড়ে ফালাফালা হয়ে যায়। আমার দিকে ছোঁড়া সুতীক্ষ্ণ তীরটা আশেপাশে অনেকেরই বুকে বিঁধে গেল – “লেডিস থাকতে জেনারেলে কেন ম্যাডাম ?...”, “দিদিভাই, এত নাজুক হলে লেডিসে যান না...”, “দেখছেন এই ভীড়, তার উপর আগের নৈহাটীটা ক্যানসেল...”, “আরে বাবাকে বলুন, প্রাইভেট কার কিনে দিতে...”; চটকা ভেঙ্গে উঠে আমি সমস্বর সমর্থকদের থামাই গলা তুলে।
-     ছেড়ে দিন না মশাই, আমারই ভুল। শরীরটা খারাপ, হয়তো ট্রেনের ঝাঁকানিতে ওর গায়ে গা লেগে গেছে। হতেই পারে। আপনারা প্লিজ চুপ করুন”।
আমার কথায় জনতার সমব্যথার বুদ্বুদগুলোর হাওয়া খানিক চুপসে গেলেও বাতাসে ভর করে সেগুলো ভেসে রইল ভীড়াক্রান্ত কামরার এদিকওদিকে, আরো খানিকক্ষণ। আরো দু’চারটে ফেটেও গেল, যদিও তার শব্দ তত জোরালো নয়। আমি মেয়েটির দিকে ভালো করে চাইলাম এবার। লম্বা, ফর্সা মেয়েটির গড়নই বলে দেয় ওর মা-বাবা-ভাই-বোন-দাদু-ঠাকুরমা সব্বাই ওকে খুব আদরে রাখেন। একদিন কোনো কারণে বৃষ্টি ভিজে বাড়ি ফিরলে মা নিজে ওর চুল মুছিয়ে দেন। তার পরেও যদি দু’বার হাঁচি দিয়ে ফেলে ও, ওর বাপী তৎক্ষণাৎ উদভ্রান্ত হয়ে ফ্যামিলি-ডাক্তারকে তিনবার ফোন করে ফেলেন। যে স্টেশানে ও নামবে, তার ঠিক বাইরেটায় নির্ঘাত ওর দাদা বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ওকে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে। এমন মেয়ের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, নাকের পাটা ফুলে উঠেছে, দাঁতে চেপে ধরেছে থরথরানো ঠোঁট, চোখে ঘেন্না, রাগ আর ভয়। কোনটা কতটা ঠিক বুঝতে পারলাম না। বদ্ধ ঘরে আটকা পড়ে কুঁকড়ে যাওয়া বেড়ালের মত দ্রুত ওঠানামা করছে বুক, উত্তেজিত শ্বাসের শব্দ জোর করে চেপে রাখতে চাইছে যেন। দু’ হাতে সজোরে আঁকড়ে ধরেছে কাঁধ থেকে আড়াআড়ি ঝোলা স্লিং ব্যাগটার স্ট্র্যাপ। এত জোরে চেপে ধরেছে যেন ওটাই ওর রক্ষাকবচ, ওর অস্ত্র, আর তাতে ওর কবজির শিরাগুলো বাড়তি রক্তসঞ্চালনে ফুলে উঠেছে সবুজ হয়ে।  
*****
ট্রেন হঠাৎ গতি কমিয়েছে, বোঝা গেল সোদপুর এল বলে। আগরপাড়া – সোদপুরের মাঝে সিগন্যালিং-এর কি কাজ চলছে আজ প্রায় দিন দশেক হল। দরজার ধারে জালে লটকানো আংটায় ঝোলানো অফিস ব্যাগ থেকে বাজারের থলি বার করে নিয়ে নামবার জন্য কোমর বাঁধছেন দুঁদে রেলচর। খোঁচা খোঁচা একগাল দাড়ি ক্ষয়াটে চেহারার লেবু-লজেন্সওয়ালার চোখে এক রাশ শূণ্যতা, একটা লজেন্সও এই কামরায় বিক্কিরি হয়নি। শসাওয়ালা ঝুড়ি মাথায় তুলে একমনে কি বিড়বিড় করছে কে জানে, হয়তো আজ সারাদিনের আয়পয় মুখে মুখে হিসেব করছে। যে অন্ধ ভিখিরি মহিলা তার গানের শেষ কলিটা গেয়ে ( - আমি যে গান গেয়েছিলেম জীর্ণ পাতা ঝরার বেলায় মনে রেখো) তার বালিকাকন্যার হাতের মুঠি থেকে খুচরো পয়সা তুলে রাখছে কাঁধের ঝোলা ব্যাগে, ওর বসন্তের দাগওয়ালা মুখে সব সময় একটা হালকা হাসি আঁকা থাকে কেন কে জানে! ট্রেন থামা মাত্র ভাটার স্রোতের মত ওরা সব্বাই হুড়মুড়িয়ে নেমে গেল, উঠে এল ব্যাকপ্যাক পিঠে কানে মোবাইল ওষুধ কোম্পানীর সেলসবয়, উঠে এল টিউশান-পালানো টিনএজ লাভার-জুটি। উঠে এল ‘বচ্চন’কন্ঠী সল্টেড বাদামওয়ালা –আচ্ছা এই যে এসে গেছি, স্বপনের-”স্বপন নিজেই ব্র্যান্ড, তাই স্বপনের কি, তা আর উচ্চারণের দরকারই হয়না ওর, ডেইলি প্যাসেঞ্জারেরা কোনো সাধাসাধি ছাড়াই নিজে নিজে হাত বাড়িয়ে সল্টেড বাদাম নিতে থাকেন ওর থেকে। রেল অবলীলায় তার পরম্পরা বজায় রাখে, তার ‘রক্তস্রোতে’ ভাটা পড়ে না। তার কোনো ‘রক্তঋণ’ অনাদায়ী পড়ে থাকে না।  
আমি নিভে-আসা চোখের আলোয় মেয়েটির মুখে কি দেখতে পাই, কি দেখতে চাই ? আমার নির্লজ্জ তাকিয়ে থাকায় ও অস্বস্তি বোধ করছে বেশ বুঝতে পারি। কিন্তু কি করব, সতেরোটা বছর পেরিয়ে গেলেও রক্ত যে এখনো জলের চেয়ে গাঢ়!
ও মেয়ে, ঐ শিরার সব রক্তই বুঝি তোর বাপ-মায়ের ? কিন্তু তাহলে কেন তোর কথাগুলো শঙ্করমাছের চাবুকের মত শুধু মানসম্মান নয়, স্থানিক অবস্থিতি নয়, আমার অন্য কোনোখানে আঘাত করে তোর মুখের দিকে অপলক তাকিয়ে থাকতে বলছে ? আর তোর মুখের দিকে তাকিয়ে আমার এমন লাগছে কেন ? এ তো যৌনতা নয়, ওটার অলিগলি আমার জানা, এ একদম অন্য একটা টানের কষ্ট। সুঁচ ফুটিয়ে আড়াইশো মিলিলিটার রক্ত বার করে নিয়ে শিরার ফুটোটায় গোল একটা ব্যান্ডএইড লাগিয়ে রাখলে পরের দু’ ঘন্টাটাক যেমন চিনচিনে ব্যথাময় ভাললাগার রেশ থেকে যায়, এ অনুভূতিটাও যেন খানিকটা তেমন। আমি অপলক, মেয়েটির কপালের বাঁদিকে সব বাধাবিপত্তি আর নজর-লাগা দূর করা কাজলের ছোট্ট একটা মঙ্গলটিপ খুঁজি, খুঁজতেই থাকি।

(পার্থ পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত শারদীয়া "ট্রৈনিক" ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত)

Monday, 16 May 2016

একত্রে ধোত্রে

ধোত্রে থেকে 'ঘুমন্ত তথাগত'
কত লোকে উত্তরাধিকারসুত্রে কত কি পায় – তা সে একেবারে শিলাইদহ-পতিসর না হোক, মুর্শিদাবাদের দিকে ধরা যাক একশো বিঘা ধানী জমি, বর্ধমানে সুপুরিগাছ-ঘেরা চারটে টলটলে পুকুর যাকে সরোবর বলে আর বাঁশঝাড়, সোনারপুর-বারুইপুরের দিকে একটা পেল্লায় বাগানবাড়ি উইকএন্ডে উইথ বিয়ার মাছ-ধরতে যাবার জন্য, শান্তিনিকেতনের পূব বা রতনপল্লীতে মেরামতির প্রতীক্ষায় পাঁচিল-ঘেরা একটা চারপাঁচ-কামরা-হালকা-ব্যালকনি সমন্বিত দোতলা বাড়ি, নিদেনপক্ষে নিউটাউনে বা গড়িয়ার দিকে একখানা তিন কামরার ফ্ল্যাট যেটা গত পনেরো বচ্ছরে টাকাটাকে মিনিমাম পনেরোগুণ করে দিয়েছে ; কেউ উত্তরাধিকারে গোটা দেশ পায়, কেউ বা অ্যালুমিনিয়ামের সানকি। তা আমিও সৌভাগ্যে রাজাধিরাজ জানলেন, জন্মসুত্রে আমিও পেয়েছি এক-রাত্তির দূরের হিমপাহাড়ে নিঝুম নিরালা একটা গোটা মখমলী বন – পরনে তার নীলসবুজ জামদানি, গলায় নাম-না-জানা জঙ্গলিফুলের মালা। তার মাথায় বিশ্বসুন্দরীর তাজের মত পরানো আছে পৃথিবীর সুন্দরতম তুষারপর্বতের মুকুট। ভোরে কুসুমরঙা সূর্যের জলটিপ কপালে পরে শিশিরে স্নান করে উঠেও কেমন ঘুমজড়ানো চোখে সে আমার দিকে মদির তাকায় আর বলে, - আজই চলে যাবে ? থেকে যাও না আর দুটো দিন আমার কাছে ?
নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশানে গাড়ির বন্দোবস্ত ছিল পথ নেহাত কম নয়, প্রায় একশো-পাঁচ কিলোমিটারের সামান্য এদিকওদিক হবে। দার্জিলিং-এর রাস্তা ধরে ঘুম অবধি গিয়ে বাঁয়ে বেঁকে লেপচাজগত হয়ে সুখিয়াপোখরি। সুখিয়া বাজারে টি-ব্রেক নিয়ে সতেরো কিলোমিটার মানেভঞ্জন। সেইখানে সান্দাকফুর রাস্তা ভাগ হয়ে আবার বাঁ পাশে খাড়াই পাহাড় চড়া শুরু করবে আর রিম্বিকের পথ বেঁকে যাবে ডানদিকে নির্জন অনিন্দ্যসুন্দর পালমাজুয়া ফরেস্টের মধ্যেদেখতে দেখতে পাঁচ হাজার ফিটের উপর উঠে আসা গেছে, রাস্তা চড়াই হবে উত্তরোত্তর আর তারপর এক জায়গায় হঠাৎ বন পাতলা হয়ে গিয়ে যে পাহাড় বেয়ে চলেছি তার গা দেখা যাবে, রোদ পাওয়া যাবে, আর তক্ষুণি বুঝবো আমি ‘আমার’ মখমলী বনের গ্রাম ধোত্রে এসে পৌঁছলাম আবার। পথ অবশ্য আয়েসী ধোত্রেকে ফেলে গড়িয়ে যাবে রিম্বিকের দিকে (আরো ২৩/২৪ কিমি)। শিলিগুড়ি থেকে আরেকটা রাস্তাও আছে, গাড়িধুরা থেকে শুকনা ফরেস্টের মধ্যে দিয়ে রোহিনী হয়ে মিরিক। মিরিক লেকের পাড়ে কফি ও মোমো ভক্ষণ, তারপর যেন অফুরান থার্বো টি-এস্টেটের মধ্যে দিয়ে গুটিগুটি এগিয়ে পশুপতিনগরের (নেপালের প্রবেশপথ) বিখ্যাত (বা, কুখ্যাত) বিদেশী জিনিসের বাজারকে বাঁ ফেলে ঘন বনের ছায়ায় ছায়ায় সীমানা গ্রাম। সীমানায় মিনিট পনেরোর হল্ট হতেই পারে কারণ সে হল প্রথম পূর্ণদর্শনের ভিউপয়েন্ট, যদিও আমার মনে হয় এর মানে হয় না কোনো, পুরো পথটাই তো দর্শনীয়। এইবারের যাত্রায় দেখলাম এই সীমানা বাজার থেকে হুড়মুড়িয়ে নীচে নেমে গেছে সদ্য-তৈরী-হওয়া একটা রোগা পিচরাস্তা। সাহস করে ওতে গিয়ে দেখলাম সুখিয়ার ভিড় বাইপাস করে সরাসরি মানেভঞ্জন পৌঁছে গেছি মিনিট পনেরোর মধ্যে, এই শর্টকাটে সময় বাঁচলো তা প্রায় চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিটতবে যেদিক দিয়েই যাওয়া যাক, দূরত্ব হরেদরে একই, সময়ও লাগবে হরে দরে ওই চার থেকে সাড়ে চার ঘন্টা। আমার প্রেস্ক্রিপশান সহজ - মিরিক হয়ে যাওয়া আর লেপচাজগত-ঘুম হয়ে নামা।
পাহাড়ের পূব ঢালে এলিয়ে ধোত্রে গ্রাম 
ধোত্রে গ্রাম পাহাড়ের পূবঢালে গড়িয়ে গেছে অল্প নীচ অবধি, ভোরে সূর্য উঠলেই তাই গ্রামের ঘরগুলোর টিনের চাল আলোয় ঝকমক করে ওঠে  বছর দশেক আগেও সান্দাকফু-ফালুট-ফেরতা ট্রেকারদল রিম্বিক থেকে গাড়ি চড়ে সদ্য সমাপ্ত ট্রেকিংস্টোরির বীররস নিয়ে জাবর কাটতে কাটতে কখন ধোত্রে পেরিয়ে যেতেন টেরও পেতেন না। এখন অবশ্য ধোত্রেতে রাতে-থাকবার কয়েকটি জায়গা তৈরী হয়েছে, এবং গত চার বছরে দেখছি তার সংখ্যা বেশ হুড়মুড়িয়েই বাড়ছে। সেরাটা অবশ্য চিনজু শেরপার শেরপা লজ। ঐ চিনজু ‘মাসীমা’-র বাড়িতে আমার ঘর আছে, আর সে কি যেমনতেমন ঘর ? তার পূবের জানলায় সূর্য ওঠে আর পশ্চিমের জানালায় সে মায়াবী আলোয় নিলাজ স্নান করে আমার জন্মের প্রেমিকা রাজনন্দিনী কাঞ্চনজঙ্ঘা। নানা ক্যালকুলেশান করে কেউ কেউ যেমন শেয়ার বাছে, দার্জিলিং-এ হোটেল বাছে আলুপোস্ত পাওয়া যাবে কিনা দেখে নিয়ে, আমি অবশ্য এক্ষেত্রে তেমন কিছু গিন-চুনকে চিনজুর বাড়ি বাছিনি। আমি প্রথম যখন ধোত্রে যাই, সেখানে ওই একটিই রাতে-থাকবার জায়গা ছিল। গাঁয়ের শেষপ্রান্তে উঁচু শিরার উপর বাড়ি থেকে সিঁড়ি দিয়ে দশ পা নেমে পিচরাস্তা (রিম্বিক গেছে), সে রাস্তা পেরিয়ে উল্টোদিকে শিবমন্দিরের পাশ দিয়ে একশো দিনের কাজে তৈরী চারফুটের পাথর-বাঁধানো পথ ধরে দশ মিনিটের চড়াই-এ ধোত্রে-ভিউপয়েন্ট।
চিনজুর বাড়ি আর রাজনন্দিনী

ধোত্রে ভিউ পয়েন্ট
সেখানে আগে শুধু ছিল গায়ে-মন্ত্র-লেখা পাশাপাশি দু’টি স্মৃতিবেদী আর একটি নড়বড়ে রেলিং গোছের ব্যাপার, এবারে দেখলাম তৈরী হচ্ছে ওয়াচটাওয়ার আর কংক্রিটের বড় ছাতা, বসবার জায়গা। সেখান থেকে কি দেখা যায় ? ভাষায় বর্ণনা দিতে যেদিন পারব, মনে করব আমি আমার রাজনন্দিনীর উপযুক্ত হয়ে উঠতে পেরেছি। ঐ ভিউপয়েন্ট থেকে সামনে একশো-আশি ডিগ্রি বিছিয়ে আয়েস করে শুয়ে আছেন ভগবান তথাগত, মুখমন্ডল যাঁর কুম্ভকর্ণ পর্বত, উদর হল কাঞ্চনজঙ্ঘার মূল শৃঙ্গ (সাউথ পিক; তিনটে মোট, আমরা এত দূর থেকে আর এই দিক থেকে কেবল একটিই দেখতে পাই, এমন জায়গাও আছে যেখান থেকে নজর করলে দু’ নম্বর শৃঙ্গটিও দেখা যায়), আর পদযুগল মাউন্ট পান্ডিম। ‘স্লিপিং বুদ্ধা’-কে নিশ্চিন্তে শায়িত রেখে উল্টোদিকে মুখ ঘোরান, সুর্য আড়াল করতে চোখের উপর হাতের কার্নিস তৈরী করুন, আর দেখুন মুঠো-ভর্তি ধোত্রে কেমন টুক করে ফুরিয়ে গেল আমার সেই মখমলী বনে। ভিউপয়েন্টের উচ্চতা থেকে পাখীর চোখে দেখে নিয়েছেন ধোত্রেকে, তাই আপনি এখন জানেন চিনজুর বাড়ির পাশ দিয়েই পায়ে চলা পথ হারিয়ে গেছে গভীর সে মখমলী বনে। এইবার তবে বুদ্ধকে ঘুমন্ত রেখে ভিউপয়েন্ট থেকে নেমে এসে ঠিক উল্টোদিকে আবার চিনজুর বাড়ির পাশ দিয়ে ঢুকে পড়া যাক মখমল বনে। একটু এগোলেই ধোত্রে প্রাইমারি ইস্কুল, সবুজ টিনের চাল, হলদেটে কাঠের ঘর; খাদের দিকে লোহার জাল দিয়ে ঘেরা ছোট্ট খেলার মাঠ, খুদে গোলপোস্ট
ইস্কুলের পাশে মখমল বন শুরু
মাঠভর্তি ধুলো, পড়ুয়ারা বেশ দাপিয়ে খেলে বোঝা যায়, তাই ঘাস নেই মাঠে। মাঠ পেরিয়ে এগোই, পাথরে বাঁধানো হাঁটাপথ ওই ইস্কুল পেরোলেই ধীরে ধীরে পাহাড় চড়া শুরু করে। একটা চর্তেন, পাহাড়ি নিয়ম মেনে তাকে ডাইনে রেখে এগিয়ে চলি আর আমার দু’ পাশে ঘন হয়ে আসে মখমলী সিঙালীলা ফরেস্ট। এই পথ গিয়েছে টংলু, মাত্র সাড়ে পাঁচ কিলোমিটার ধোত্রে থেকে, দেদার আরামদায়ক গড়ানে পথ, শেষ এক কিলোমিটার কেবল সামান্য কষ্টকর চড়াই। টংলু থেকে চেনা রাস্তায় তুমলিং-গৈরিবাস-কালিপোখরি-বিখেভঞ্জন হয়ে সান্দাকফু। কিন্তু এ যাত্রায় কেবল ধোত্রেরই গল্প হোক। পরিচিত সান্দাকফু-ফালুট ট্রেইলে এই ধোত্রে থেকে টংলু পথটি তুলনায় নতুন (নতুনই বা বলি কি করি, এ পথেও সিরিয়াস পাহাড়প্রেমী হাঁটছেন আজ প্রায় বিশ বছর হল), আর সহজ। সৌন্দর্যের তুলনাটা কুরুচিকর, তাই ওতে যাচ্ছি না। 

মখমল বনের গাছেরা
এটুকু বলাই যায়, মার্চের শেষ বা এপ্রিলে এ পথে অন্তত দশ-পনেরোরকম রোডোডেনড্রন (সিঙালীলা জাতীয় উদ্যানে মোট ২০/২২ রকম রোডোডেনড্রন পাওয়া যায়) ও অন্যান্য নাম-না-জানা ফুলের ম্যাহফিলে উপস্থিত হলে মুখর কবি কোন রূপবৈভবের সম্মোহনে নীরব হতে চাইবেন তা উপলব্ধি করতে আমার অন্তত অসুবিধে হয়নিগাছ – এরা কি শুধুই গাছ ? পাহাড়ি বাঁশ, ম্যাগনোলিয়া, ওক, সিলভার ফার, হেমলক, জুনিপার, ভুর্জপত্র – এ কোন অপার্থিব রেশমী সাজে সেজে রিনরিনে হাওয়ার বাঁশি বাজায় সারাদিন ? মখমলে মোড়া এ রূপসীর বসনপ্রান্তে বাহারি কুচির মত থরে থরে ফুটে থাকে জেরেনিয়াম, প্রিমুলা।  সাদা আর পিচরঙা ম্যাগনোলিয়া ফুলভারে মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানায়। একমাত্র ওখানে গেলেই আমার তীব্র আফশোস হতে থাকে, অর্থশাস্ত্রে ফেঁসে গিয়ে আহা কেন যে বটানি বা জুলজি পড়লাম না ! এবারের সঙ্গী প্রাণীবিদ্যার মেধাবী ছাত্র ও অধ্যাপক দেবাশিস গাছ-ফুল-পাখী কয়েকটা চেনালো। হিমালয়ান কোবরা লিলি আমি আগেই চিনতাম, ও ফুলে বিষ আছে (Arisaema), টংলু ছাড়িয়ে আরো উপরে সান্দাকফুর (পশ্চিমবঙ্গের উচ্চতম স্থান, ৩৬৩০ মিটার) দুই কিমি আগে বিখেভঞ্জনের নামেই “বিখে” এরই জন্য (বিখে – বিষাক্ত, ভঞ্জন - উপত্যকা)সিঙালীলা জাতীয় উদ্যানের শিরোপা লাভ করেছে ১৯৯২ সনে, এবং এ হল বিলীয়মান রেড পান্ডার আঁতুড়ঘর। ধোত্রে থেকে টংলুর পথ প্রায় পুরোটাই ঘন জঙ্গল, পোর্টার ছোকরাগুলো ভারি ফক্কড়, নরমসরম নভিস ট্রেকার দেখলেই ভয় দেখায়, সাব ইধার রুকিয়েগা মৎ, জঙ্গলমে লেপার্ড হ্যায়। - ‘হ্যায়’ তো মালুম হ্যায় বচ্চে, লেকিন তাদের এক-আধ ঝলক দেখা দিতে এত লজ্জা পেলে চলে কি করে ? ক্লাউডেড লেপার্ড না হোক নিদেন পক্ষে লেপার্ড ক্যাট একখানা পথের বাঁকে যদি দর্শন দেয় সেই আশা বুকে চেপে ক্রমাগত উঠতে থাকি টংলুর দিকে। দেবাশিস কানে কানে ফিসফিস করে বলে যায়, দাদা এ জঙ্গলে ছোট ভালুক (ব্ল্যাক বিয়ার), প্যানথার, কাকর হরিণ, প্যাঙ্গোলিনও আছে। বলতে বলতে একটা খোলা জায়গায় এসে পড়ি, ছায়াময় হিমেল পথের পরে আহা রোদ্দুর তুমি রোদ্দুর – গা এলিয়ে দিই ঘাসের নরম রেশমী কার্পেটে (কোনো মরমানুষের সাধ্য কি অমন কার্পেট বোনে), হাত দু’টো ভাঁজ করে রাখি মাথার নীচে, কারণ আমার এই স্বর্গীয় বেডরুমের সামনেই সুনীল আকাশজুড়ে ফ্রেমহীন টাঙানো আছে আমার রাজনন্দিনী কাঞ্চনজঙ্ঘার হীরে-ঝকমক ছবি। আমি মনে মনে কথা কইতে শুরু করি ওর সাথে, - কেন বারবার তোমার কাছে ফিরে ফিরে আসি বোঝো না, আর “কেমনে প্রকাশি’ কব কত ভালোবাসি”...আচ্ছা বরং থাক, এ জীবনে থাক না, -  “কেহ জানিবে না মোর গভীর প্রণয়, কেহ দেখিবে না মোর অশ্রূবারিচয়” ... এমন সময় – “দাদা দাদা, চটপট ওঠো ক্যামেরা নাও, গোল্ডেন ঈগল -”; গাঢ় নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে রাজার মত পাখা মেলে দুই সাথী মাথার উপরে চক্কর দিচ্ছে খুব বেশি হলে চল্লিশ-পঞ্চাশ ফুট উঁচুতে, উজ্জ্বল বাদামী ডানার প্রান্তে সূর্যের আলো পড়ে ঝিকমিকিয়ে উঠছে – হ্যাঁ সোনার ঈগলই বটে। এ ছাড়াও আমার এ রেশমী দরবারে রোজ ব্লাড ফেজ্যান্ট আর ট্র্যাঙ্গোপ্যানের নাচিয়ে দল নেচে যায়, গান গেয়ে যায় গোল্ডেন বুশ রবিন আর ব্যাবলারের ঝাঁক, নাচগানে তাল দেয় হিমালয়ান উডপেকার আর সিংদরোজায় ঘাড় বেঁকিয়ে পাহারা দেয় আমুর বাজপাখী। কমবেশি আড়াই শো রকমের পাখী দেখতে পাওয়া যায় এ চত্বরে, তাদের রূপবৈচিত্র্য বর্ণনা করবার মত বিদ্যে আর ভাষা কোনোটাই আমার আয়ত্বে নেই, তবে তাতে অপার মুগ্ধতায় স্তব্ধ হওয়া ঠেকাচ্ছে কে ?
টংলু টপের ঠিক নীচে সেই প্রশস্ত বুগিয়াল
তা ওই যে শুরুতেই বলেছি, এ মখমলী বন আমার জন্মসুত্রে পাওয়া, সে কথাটা আরেকটু ভেঙ্গে বলে লজ্জাহীন এই প্রেমকাহিনী শেষ করি। ভেঙ্গে বলাটা জরূরী। এই এলাকায় অনেক লোক আসছেন ইদানীং, গ্রামের লোকে হোমস্টে না কি যেন বলে, আসলে স্রেফ হোটেল, তাও খুলছে একটার পর একটা; গাঁয়ে ইলেকট্রিসিটি এসে গেছে (আগেরবার ২০১২-র ডিসেম্বরে ছিল না)।  ধোত্রে থেকে টংলুর মায়াবী পথে টংলু টপের পাঁচ-সাতশো ফুট নীচে আছে ওই সাড়ে পাঁচ-ছয় হাজার ফিট উঁচুতে অবাক-করা অতি প্রশস্ত এক বুগিয়াল। রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে তাতে পা মেলে বসেছি, সঙ্গে আনা কমলালেবুর খোসা ছাড়াচ্ছি। সঙ্গী পার্থর স্ত্রী সমর্পিতা আলতো গলায় গান ধরেছে – এই আকাশে আমার মুক্তি আলোয় আলোয়, আকাশে খুব নীচে তখনও উড়ছে সেই গোল্ডেন ঈগল দম্পতি (ওরা নির্ঘাৎ তাই !)। এমন সময় দেখি – ওরে বাবা দেখো চেয়ে কত সেনা চলেছে সমরে – সমস্ত অত্যাধুনিক ট্রেকিং গ্যাজেটে সজ্জিত প্রায় চল্লিশ জনের একটি দল ধোত্রের দিকের জঙ্গল ফুঁড়ে উদয় হল। মুহুর্তে যেকোনো মেট্রোপলিটানের বড় শপিং মলের বিরক্তিকর কলকাকলিতে ভরে উঠল সেই অনাঘ্রাত প্রাঙ্গণের অনাবিল বাতাসকিছুক্ষণ হুল্লোড়ময় বিশ্রাম সেরে তারা আবার এগোলো টংলুর শেষ চড়াই ধরে টংলুর দিকে। আমি ও আমার সঙ্গী চারজন বিষন্ন হাতে কুড়িয়ে আনলাম ছেঁড়া পটেটো চিপসের প্যাকেট, ক্যাডবেরির র‍্যাপার। পকেটে ভরে নিচে নিয়ে যাব এই সমতলিক পাপ। পাপ লুকোতে পারলাম, তবে দুশ্চিন্তা নয়। মনে হল, আমি খানিক আগে জন্মাবার উত্তরাধিকারে এই রেশমী বন পেয়েছি বটে, পুত্রকে হাতে ধরে এখানে এনে দেখিয়েছি তার বংশানুক্রমে প্রাপ্ত ঐশ্বর্যরাজি; কিন্তু আমার ঊনতিরিশ বছর পরে জন্মানো আমার সন্তানের কপালে বোধহয় সে সৌভাগ্য আর নেই। সে যদি কোনোদিন তার সন্তানকে ধোত্রে নিয়ে এসে তার পিতার ফেলে-যাওয়া পদচিহ্ন খুঁজতে যায়, হয়তো যারপরনাই হতাশ হবে। ধোত্রেতে তখন হয়তো পাঁচতলা হোটেল, এসি ব্যাঙ্কোয়েট হল, বাথরুমে রানিং হট ওয়াটার, খাবার টেবিলে কন্টিনেন্টাল ডিশ – শুধু ময়ূরকন্ঠী রঙের বুক, ছোট্ট সেই থ্রাশ পাখীটি তার সমস্ত পরিবারপরিজন নিয়ে চিরতরে মুছে যাবে এই মখমলী বন থেকে, যেমন প্রায় মুছেই গেছে লাজুক রেড পান্ডার দল। পাকা রাস্তা রিম্বিক ছাড়িয়ে রাজাপীর, শেপি গ্রাম টপকে প্রায় শ্রীখোলা অবধি চলে গিয়েছে, দু’ ধারে পোঁতা হচ্ছে ইলেকট্রিকের খুঁটি। পাহাড়ের গায়ে গাছের পোশাক ফেলে দিয়ে পরিয়ে দেওয়া হচ্ছে কংক্রিটের জামা। কবিতা তো হিয়েরোগ্লিফিক্স, বটানি জুলজির রোমান্টিকতাও মুছে গেছে, আজ ভবিতব্য নির্ধারণ করে আমার অর্থনীতি। পর্যটক বাড়বে, বাড়বে আয়। স্থিতিশীল উন্নয়ন সোনার পাথরবাটি হয়ে উঠবে দিন-কে-দিন। আর শ্রীখোলা- রাম্মামখোলা নিরুপায় চেয়ে চেয়ে দেখবে কেবল। 
ধোত্রে থেকে রাজনন্দিনী কাঞ্চনজঙ্ঘার উদ্ধত অহংকার
(ড. হরিসাধন দে অধিকারী সম্পাদিত "গন্ডীছুট" পত্রিকায় ১ লা বৈশাখ ১৪২২ সংখ্যায় প্রকাশিত)

Friday, 16 October 2015

ভাসান


মাগো, সকলকে ভাল রাখিস মা, বিজুকে ভাল রাখিস। আমি দূর বিদেশ চললাম, আর কোনোদিন বোধহয় ফেরা হবে না। তবে বিজু তো বলল ওদেশেও নাকি পুজো হয়, এয়ো মেয়েরা ভাসানের দিন সিঁদুরও খেলে। বিজুটা ভাসানের দিন গঙ্গার ঘাট থেকে ভাসান দেখে সন্ধ্যে-সন্ধ্যে ফিরে পাড়ার বাড়ি-বাড়ি বিজয়া করতে ঘুরত; একা নয়, দস্যিগুলোর পাঁচ-সাতজনের দলই ছিল একটা। কত আর হবে, সব ক’টার বয়েস সাত থেকে দশ, সব ক’টার হাতে প্লাস্টিকের থলি। বাড়ি বাড়ি ঢুকে বড়দের ঢিপ ঢিপ করে প্রণাম ঠুকেই বিজয়ার কদমা-বাতাসা-বীরখন্ডি আর নাড়ু সটান চালান সেই থলিতে। চৌধুরীবাড়িতে অবশ্য লুচি হত, বিজু তো তাও একবার গোটা দু’য়েক পাকিয়ে রোলের মত করে সেই প্লাস্টিকের থলি ভরে বাড়ি নিয়ে এসেছিল, বলে কি – ‘মা, কাল সক্কালে তোমার ঘুগনি দিয়ে খাব’। আর ওই ঘুগনি, যেখানে যাই হোক, যে বাড়িতে যাই খেয়ে আসুক, বিজয়ার দিন বিজুর বাড়িতে মায়ের বানানো ঘুগনি চাই-ই চাই। আগে থেকে তোড়জোড় করে নারকেল পাড়িয়ে রাখতে হত, ছোটবেলা থেকেই ওনার আবার জিভে স্বাদ আছে, যেমনতেমন হলে মুখে তোলেন না বাবু। সে অবশ্য ওর বাপেরই ধারা। রাত আটটায় অফিসফেরতা এক কাঁড়ি আমোদি মাছ নিয়ে এসে লজ্জা লজ্জা মুখ করে অজুহাত দিত না বিজুর বাবা ? – ‘রেলবাজারের নিরঞ্জন জোর করে গছালো, এক কাজ কর জয়া, তুমি একটু ধুয়ে রাখো আমি জামাকাপড় ছেড়ে এসেই কুটে দিচ্ছি। জমিয়ে ঝাল কর দেখি, কাল তো রোববার, একটু রাত করে খেলে কিচ্ছু হবে না’। আর ইলিশ ? সে তো ছিল এক পরব। আজকাল তো ঘটা করে কিসব ইলিশ উৎসব হয়টয় শুনেছি, বিনয়ের ইলিশ কেনা মানেই ছিল উৎসব। মাছওয়ালাকে কাটতে দিতেন না, বাড়ি ফিরে ছেলে-বৌকে দেখিয়ে বাহাদুরি নিতে হবে না ? গামছা পরে চাতালে বঁটি আর ছাই নিয়ে বসে পরিপাটি সে মাছ কোটা দেখে কাজের মিনতি পর্যন্ত মুখে আঁচল চাপা দিয়ে হাসত, বলত – ‘বৌদি, দাদা গত জন্মে মেয়েছেলে ছিল গো !’ বাপ-কা-বেটা বিজুটাও হোমটাস্ক চুলোয় দিয়ে সামনে উবু হয়ে বসে বাপের ইলিশ কোটা দেখত। একেকদিন রাগ দেখাতাম –‘আক্কেল বটে তোমার, কাজের লোকের সামনে বাইরের চাতালে বসে পুরুষমানুষ মাছ কুটছো!’ ইলিশে মগ্ন বিনয় মুখ না তুলেই হাসতেন, বিজুটা আবার জিজ্ঞেস করত – ‘মা, মাছ কি খালি মেয়েরাই কাটে, ছেলেদের কাটতে নেই ?’ এইবার ধরতাই পেয়ে বিনয় বলে উঠতেন –‘নাও, এইবার উত্তর দাও দিকি ?’ আর বিজু যেদিন জয়েন্টে ইঞ্জিনীয়ারিং-এ চান্স পেয়ে যাদবপুর হোস্টেলে চলে যাবে তার আগের দিন ? মনটা কেমন ভার-ভার আনন্দে ভরে ছিল, চোখে জল আসছিল বারবার। সেকি শুধু বিজুটা বুক খালি করে বাড়ি ছেড়ে হোস্টেলে চলে যাবে সেইজন্য নাকি, সরষের ঝাঁঝেও তো বার বার চোখ মুছতে হচ্ছিল। ওফ, সেদিনটা বিনয় ইলিশের ধুন্দুমার বাঁধিয়ে ছেড়েছিলেন, প্রথমে ইলিশের তেল দিয়ে গরম ভাত মেখে সঙ্গে ইলিশভাজা, তারপর ভাপা, তারপর দইইলিশ, আর শেষপাতে ইলিশের ডিম দিয়ে টক! বিজুটা অত পারেনি একবারে খেতে, দু’ বেলা ধরে খেয়েছিল। বলেছিল, -‘কাল থেকে হোস্টেলে ট্যালট্যালে ঝোলভাত খাবো বলে মা একদিনে ছ’ মাসের খাওয়া খাইয়ে দিল! আরে আমি প্রতি শনি-রোববার বাড়ি আসবো তো নাকি?’ রাতে শোবার পর অন্ধকারে বিনয়কে না ছুঁয়েই বুঝেছিলাম, ওর বুকটা স্বাভাবিক শ্বাসপ্রশ্বাসের চেয়ে অন্যরকম কেমন একটা আটকে-আটকে যাওয়া ছন্দে ওঠানামা করছে । এমনিতে ও খুব লম্বা আর গভীর করে শ্বাস নিত, ও ঘুমিয়ে পড়লে আমি চেষ্টা করে দেখেছি, ওর শ্বাসের সঙ্গে তাল মেলাতে পারতাম না। এত ধীরে আর এত লম্বা ওর শ্বাস যে আমার দম আটকে আসত। তাই সেদিন ওর গালের কাছটাতে আলতো আঙুল বুলোতেই, যা ভেবেছি তাই, কাল ছেলে চলে যাবে বলে বাপের বুক রাতের একলা অন্ধকারের আড়ালে জানালার শার্সির মত ফাটছে। সারাটাদিন হৈ হৈ ছেলেমানুষি ফূর্তি দিয়ে সেই ব্যথা মাটি চাপা দিয়ে রাখা খালি! সেই থরথরানো বুকে হাত রাখতেই বুঁজে আসা গলায় মানুষটা বলেছিল, -‘নাড়ি পুরোপুরি ছিঁড়ে গেল জয়া, এইবার ছেলেটা সত্যিসত্যি বড় হয়ে গেল গো’। জুলাই মাসের গরমে সেদিন রাতে হঠাৎ হঠাৎ দখিনা দমকা বাতাস দিচ্ছিল, পাশের ঘরে খুব চাপা আওয়াজে বিজু ডেক-এ গান শুনছিল, কি গানটা যেন ? আর অন্ধকারে আমায় আঁকড়ে ধরে কানের কাছে বিজুর বাবা ফিসফিসে মন্ত্র পড়বার মত করে গাইছিল – বাজে অসীম নভ মাঝে অনাদি রব, জাগে অনন্য রবিচন্দ্রতারা, বহে নিরন্তর অনন্ত আনন্দধারা, আর তার ভাঙা সুর দমকা বাতাসের সঙ্গে মিলেমিশে ভাললাগার বেড়া দেওয়া সেই বুকভাঙ্গা কষ্টটাকে মশারির বাইরে রাখতে চেষ্টা করছিল প্রাণপণ। আমি বললাম –‘কেন, তুমিই তো ছেলেকে বলতে, তুই আমার ঘড়ি, তুই যত বড় হ’বি, আমরা তত বুড়ো হ’ব !’ এইবার হেসে ফেলে বিজুর বাবা বলেছিল, -‘তা এরপর তো দেখতে দেখতে ছেলের পাত্রীটাত্রী দেখবার সময়ও হয়ে যাবে, কি বল ?’ আমিও হেসে বললাম – ‘হ্যাঁ, ওই আশাতেই থাকো, এখনকার ছেলে, দেখো ফাইন্যাল ইয়ারের আগেই এসে বলবে, মা আমার ওই মেয়েকে পছন্দ, বাপিকে বলে রেখো’। ও মাঝে মাঝেই এক একটা এমন কথা বলত যে বুকে কাঁপন ধরত আমার, কিন্তু কথাগুলো ভাল লাগুক না লাগুক, ফেলতেও পারতাম না। সেদিনও আমার ওইকথায় বড় করে একটা শ্বাস ফেলে ও বলল –‘হ্যাঁ, ঠিকই বলেছ, বড় করে পাত পেতে বসে রইলেই তো হয়না, যে দেয় সে তার মাপ মতই দেয়!’     
তবু তারপর বাড়িটা খালিই হয়ে গেল। বিজুর বাবা অফিস চলে গেলে ওই খালি বাড়িতে প্রথম প্রথম সারাটাদিন এ ঘর ও ঘর করে অযথাই ঘর গোছাতাম, বিজুর ঘরটা গুছিয়ে রাখতাম। ভারি এলোমেলো করে রাখত সব, এই ব্যাপারে ব্যাটা বাপের উল্টো। তিনটে লোকের রান্নাতে আর কত সময়ই বা লাগতো, শ্বাশুড়ি তো বেশিরভাগ দিনই রাতে দুধ-খই খেতেন। ওঁর লাগানো লাউগাছ, আমার লাগানো লঙ্কা আর পাতিলেবু গাছগুলোয় নিয়ম করে জল দিতাম। সন্ধ্যেবেলায় শাশুড়িমায়ের সঙ্গে বসে টিভিতে ‘উড়নচন্ডী’ সিরিয়ালটা দেখতাম, ওর নায়ক ছেলেটা নাকি পরে মারা গেছে শুনেছি, আহা ভারী মিষ্টি দেখতে ছিল ছেলেটাকে। শ্বাশুড়ি টিভির সামনে সারা সন্ধ্যেই বসে থাকতেন, কোনো কাজ নেই তাই আমিও, যতক্ষণ বিনয় বাড়ি না ফিরতো। বিনয় ফিরলে ওকে চা করে দিয়ে সংসারের টুকিটাকি এ-কথা সে-কথা, তখন আর অতটা একলা লাগতো না। সেকেন্ড ইয়ার থেকেই বিজুটা প্রতি সপ্তাহে বাড়ি আসা বন্ধ করে দিল, ওর বাবা বলল, -‘পড়ার চাপ বাড়ছে বুঝলে, এ তো আর তোমার পাসকোর্সে আর্টস পড়া নয়’। কি এমন পড়ার চাপ রে বাবা, যার জন্যে সপ্তাহে একটা দিন বাড়ি আসা যায় না ? একবার পর-পর দু’ সপ্তাহ বাড়ি এলো না ছেলে, তখন পাড়ায় টেলিফোন ছিল কেবল চৌধুরীবাড়িতে। ওখানে ফোন করে বলে দিল, -‘মা’কে বলে দিও ফোর্থ সেম-এর প্রোজেক্টের কাজে ভীষণ ব্যস্ত তাই বাড়ি যেতে পারছি না’। বিজুর বাবা তার মধ্যে একদিন অফিসফেরতা ওর হোস্টেলে গিয়েছিল, গিয়ে দেখে ছেলে ঘরেই নেই। পরের রোববার বাড়ি এলে জিজ্ঞেস করতেই বিজুটা কেমন তেড়িয়া হয়ে বলল,-‘কেন আমায় না জানিয়ে হোস্টেলে গিয়েছিল কেন বাপি ? আমার উপর স্পাইং করতে ? পড়ছি কিনা দেখতে ?’ আমি বললাম, অত রেগে যাচ্ছিস কেন বিজু, তুই দশ-বারোদিন বাড়ি আসিসনি, বাপির তো তোকে দেখতেও ইচ্ছে করে, নাকি ? তক্ষুনি ব্যাটা আবার গলে জল, আমায় জড়িয়ে ধরে বলে কি, -‘খালি বাপির কেন, তোমার আমায় দেখতে ইচ্ছে করেনা বুঝি ?’ দেখতে ইচ্ছে করলেই কি চলে রে বাবা, তুই এখন বড় হয়ে গেছিস, কত পড়ার চাপ, প্রোজেক্টের চাপ, তাই চেপেচুপে থাকি। বিজু বলেছিল, - ‘ফোর্থ সেমটা দিয়ে একবার দু’-তিনদিনের জন্য বেড়াতে যাবে মা ? তুমি, বাপি আর আমি, সেই মাধ্যমিকের পর আর একসাথে কোত্থাও তো যাইনি, এরপর তো আরোই যাওয়া হবে না’। এই পনেরোদিনের মধ্যে কোথায় যাওয়া ঠিক করা যাবে বল ? এখন তো ষাট দিন আগে ট্রেনের টিকিট কাটতে হয় বলে শুনি। -‘আরে ধুর, ও রকম না, চল একটা গাড়ি ভাড়া করে মুকুটমণিপুর বা ওইরকম কোনোখানে দু’রাতের জন্য ঘুরে আসি, তার বেশি থাকাও যাবে না, ফিফথ সেমের ক্লাস শুরু হয়ে যাবে’। কিন্তু সে যাওয়া আর হয়নি। বিজুর সেমেস্টারের পরীক্ষা চলছে তখন, আরো একটা না দু’টো পেপার বাকি, ভোররাতে বিজুর ঠাকুমা বাথরুমে পড়ে গেলেন। কি অসম্ভব জল ঘাঁটার বাতিক ছিল মহিলার ! আগে চাতালের টাইমের কলে জল আসতে না আসতে শীত নেই গ্রীষ্ম নেই বর্ষা নেই, তিনবেলা গামছা পরে চান করতেন। বিজুর বাবা কতবার বকেছে, উনি কানে তুললে তো ? তখন তো ঘরের মধ্যেই বাথরুম হয়েছে অ্যাটাচড, সেখানেও সেই একই জিনিস। ভোর পাঁচটায় জল আসতে পারত না, উনি স্নান করা শুরু করে দিতেন। পই পই করে বারণ করেছি, মা এই বয়সে পড়েটড়ে গিয়ে হাত-পা বা কোমর ভাঙ্গলে কি হবে, কে শোনে কার কথা। সেই পড়া পড়লেন, আমি রোজকার মত সাড়ে পাঁচটায় উঠে চা করতে করতে শুনি বাথরুমে ছড়ছড় করে কল থেকে জল পড়েই যাচ্ছে। সন্দেহ হতে ছুটে গিয়ে দেখি, মাথাটা বাইরে, শরীর তখনো বাথরুমের ভেতরে, পড়ে আছেন, মুখ দিয়ে গ্যাঁজলা উঠছে। বিজুর বাবাকে ডাকলাম দৌড়ে গিয়ে। তারপর হাসপাতাল, পরের টানা তিনটে দিন উনি কোমায়, মানুষ চিনতে পারছিলেন না। চারদিনের মাথায় যেদিন বিজুর বাবা অফিস গেল, আর্নলিভগুলো সব খরচ হয়ে যাচ্ছিল, আর দেড় বছরের মধ্যেই তো রিটায়ার, তাই বলল সই করেই চলে আসবে, বিজুর বাবাও অফিসে বেরোলো আর সেইদিনই সকাল দশটায় উনি চলে গেলেন।    
তার পর-পরই গেলেন শ্যামলবাবু। শ্যামলদার যাওয়াটা বিনয়ের খুব লেগেছিল। শ্যামলদা বিনয়ের ইশকুলের বন্ধু ছিল, এক সঙ্গে ওপারের খুলনা থেকে এসেছিল দু’টো পরিবার, একসাথে এই বাদা জঙ্গলে ভর্তি হালিসহরে জমি কিনে বাড়ি করেছিলেন শ্বশুরমশাই আর শ্যামলদার বাবা। সেই সাতষট্টি-আটষট্টিতে বেহালাও তখন প্রায় এঁদো গাঁ-ই বলা চলে, তবুও বিয়ের পরে পরে, এদের বাড়ির বাইরে পুকুরপাড়ের দিকে কোনোমতে নীচু দর্মার দেওয়ালে আবডাল-করা চৌবাচ্চা, চানের জায়গা আর পায়খানা, তার পাশে কয়লা আর চেলাকাঠের ঢিপি, মাটি-নিকোনো উনুনে চেলাকাঠ আর ঘুঁটেতে রান্না, সন্ধ্যে হলেই চারদিকে ভুতুড়ে অন্ধকারে টিমটিমে হ্যারিকেনের আলো, বাড়িতে একটা রেডিও অবধি নেই – কেমন দম আটকে আসতো যেন। বিনয় অবশ্য চেষ্টার ত্রুটি করেনি, সপ্তাহ-ভর ওভারটাইম করে এসেও ছুটির একটা দিন রোববার, নতুন বিয়ে-করা বউকে কি করে একটু আনন্দ দেওয়া যায়, চেষ্টার ত্রুটি রাখেনি কোনোদিন। যখন একটা সিনেমা দেখতে গেলেও ট্রেন ধরে নৈহাটি, সেই সময় বিনয় আমায় নিয়ে কোলকাতায় শম্ভু মিত্রর রাজা অয়দিপাউস দেখিয়েছে, নিউ মার্কেট ঘুরিয়েছে কত। ঝলমলে দোকানপাট ঘুরে ঘুরে দেখতাম দু’জনে, কিছু কেনবার ক্ষমতা ছিল না, শুদ্ধু দেখে যাওয়া। কিছু না হলে অন্তত হালিসহরের গঙ্গার পাড়, নদী দেখতে বিনয় ভারী ভালোবাসতো। ওর দেখাদেখি আমারও নদী দেখার অভ্যেস হয়ে গেছিল, ছোট্ট ছোট্ট ঢেউ তুলে বয়ে যেত গঙ্গা, মাছধরা ডিঙিগুলো ভেসে যেত ভাটির টানে আর আস্তে আস্তে দক্ষিণ-পশ্চিমে আকাশটাকে পলাশের মত লাল রঙে রাঙিয়ে সুর্য অস্ত যেত, আমি আর বিনয় পাশাপাশি পাড়ে বসে সেই অস্ত-যাওয়ার রঙের মায়ায় মুগ্ধ হতাম। সেইখানেও মাঝে মাঝে অদ্ভুত অদ্ভুত কথা বলে ফেলতো ও। একদিন দেখি সুর্য ডুবছে আর ওর দু’চোখ ভরে জল। আমি তাড়াতাড়ি বলতে গেছি কি হ’ল, কি হ’ল, ও বলল, -‘আরেকটা দিন চলে গেল জয়া, নদীর যে জলের কণা দেখো ঘাট ছুঁয়ে চলে গেল সাগরের দিকে সে যেমন আর কোনোদিন ফিরবে না, তেমনই এইদিনটা আমাদের জীবনে আর কোনোদিন ফিরে আসবে না’। এক-একদিন বিনয় গান ধরতো নীচু গলায়, নীড় ছোট ক্ষতি নেই আকাশ তো বড় বা দিনের শেষে ঘুমের দেশে। কি ভরাট গলা ছিল ওর, অথচ অভাবের সংসারে কোনোদিন গান শিখতে পারেনি। বিজু হ’বার পরে অবশ্য বেরোনোটা বলতে গেলে বন্ধই হয়ে গেল, শ্বাশুড়িমা বাচ্চা রাখতে পারবেন না। তারপর চারদিক খোলা বাড়ি, সন্ধ্যে হতে না হতে শেয়াল ঘুরছে, মাগো ! বিনয় তাও দু’একদিন বলতো, -‘নৈহাটিতে দাদার কীর্তি এসেছে, যাবে নাকি ? ম্যাটিনিতেই চল না, সন্ধ্যে আগেই ফিরে আসা যাবে’। ততদিনে আমি নতুন খেলনা পেয়ে গেছি, বিজুটা ছিল গোলগাল ফর্সা তুলতুলে পুতুলের মত, যে দেখতো সে-ই বলতো, আহা যেন সাহেবের বাচ্চা। লম্বা চুল ছিল বিজুর, বিনুনী বেঁধে দিতাম। সেই চুল কাটা হলো তো অন্নপ্রাশনেরও পরে, একটা বিনুনী-ওয়ালা ছবি ছিল বিজুর, সাদাকালো, মুখ তুলে ব্যাটা হাঁ করে ফোকলা হাসি হাসছে। সেই বাড়ি, কত পরে বিজু তখন সবে মাধ্যমিক দিল, বিজুর বাবা পিএফ থেকে লোন তুলে আর পুকুরের ওপারের ছ’ কাঠা জমি বেচে দিয়ে পেছনে আরো দু’টো ঘর, রান্নাঘর আর অ্যাটাচড বাথরুম বানালো। মেঝেতে মোজাইক, বাথরুমে শাওয়ার লাগালো আর ছেলেটার পড়ার একটা আলাদা ঘর হল এতদিন পরে। মাধ্যমিক অবধি একটা ঘরে সব কিছু, লোকজন কেউ এলে পড়া নষ্ট, একটা টিচার অবধি রাখতে পারিনি, তাও তো ছেলেটা স্টার পেল। সেই বাড়ি, লাউগাছ দড়ি দিয়ে তুলে দিয়েছি ছাদে, ফনফনিয়ে বেড়ে গিয়ে কি সুন্দর গোলগোল লাউ হলো, বিজুর বাবা একটু ঘ্যানঘ্যান যে করেনি তা নয়, নতুন ছাদ ড্যাম্প পড়ে নষ্ট হ’বার ভয়। বিনয়ের তো পাড়াবেড়ানো ছিল না কোনোকালে, ওই শ্যামলদার মত দু’ একজন ছাড়া কারুর সঙ্গে মিশতেই পারতো না মানুষটা। শুধু অফিস আর বাড়ি। আর বাড়ি মানে ছেলে। শ্যামলদা ছিল ভারী মজাদার লোক, আমায় বৌঠান বলে ডাকতো। কোনোদিন সন্ধ্যেবেলায় বাড়িতে আসলে বেড়ার বাইরে থেকেই হাঁক – “আরে বিনুবাবু-উ-উ-উ বাড়ি আছেন নিকি, অ বৌঠান গুড় দিয়া চা কইর‍্যা ফ্যালেন দেখি” আর সঙ্গে সেই খি-খি-খি করে হাসিটা যেন এখনো কানে বাজে। স্থানীয় সঙ্ঘের পুজো প্যান্ডেলে প্রতিবার অষ্টমীর রাতে তার সে কি ধুনুচি নাচ, একবার ঢাকি তাল কাটায় তেড়ে ধমক দিল – অরে অসুর, এই বাজনে কি নাচন যায় ? শ্যামলদার কথায় হাসতে হাসতে পেটে খিল ধরে যেত। রোগা লিকপিকে, গায়ের রঙ ছিল বেশ কালো, একবার রেলের টিকিট কাটার লাইনে ধাক্কাধাক্কি হচ্ছে, আমি বিজুকে নিয়ে বেহালা যাচ্ছি শ্যামলদার সঙ্গ ধরে, শ্যামলদার অফিস ছিল নিজাম প্যালেসে, বিজুর বাবা যেতে পারেনি, শ্যামলদা আমাদের শিয়ালদা থেকে বেহালার বাসে তুলে দেবে। লাইনে ধাক্কা খেয়ে সপাটে ঘুরে দাঁড়িয়ে শ্যামলদা পেছনের ভদ্রলোককে বলে কি – ইউ ডাঁর্টি নিগার ! সে ভদ্রলোকও সঙ্গে সঙ্গে মুখ বেঁকিয়ে বললেন, - ‘ইঃ, আমি ডাঁর্টি নিগার ? বাড়ি গিয়ে আয়নায় নিজের মুখটা দেখুন একবার!’ শুনে শ্যামলদার সেই খি-খি করে হাসি, আমি হাসবো না কি করবো বুঝে উঠতে পারছিলাম না। এই রকম মজার মানুষ ছিল শ্যামলদা, হাঁপানি তো কতলোকেরই থাকে, কিন্তু শ্যামলদা হঠাৎ করেই চলে গেল, অকালেই। আর অফিসের খুব বন্ধু ছিল অজয়দা, কিন্তু সেও তো দিল্লী ট্রান্সফার হয়ে গেল বিজু তখন সিক্সে না সেভেনে যেন। আর ছিল মানসদা, মানসদা যখন যাদবপুর এইট বি-র কাছে ফ্ল্যাট নিল, আমায় কতবার ধরেছিল, -‘জয়া বি.কে-কে বলো আমাদের হাউসিং-এ একটা ফ্ল্যাট নিয়ে রাখতে, জানি ও এখন হালিসহর ছেড়ে নড়বে না, অন্তত মাসীমা যতদিন আছেন। কিন্তু মাসীমা চলে গেলে বা রিটায়ারের পরে বি.কে হালিসহরে টিঁকতে পারবে না বলে দিলাম’। আমিও বেশ কয়েকবার বলেছিলাম ওকে, মানসদা এত করে বলছে, নিয়ে রাখো না। ফ্ল্যাট নিলেই তো এক্ষুণি উঠে যেতে হচ্ছে না, ছেলেটা নাইনে উঠলো সবে, ও বড় হলে ওরও তো লাগতে পারে, না লাগলে তখন না হয় বেচে দেবে। তুমি তো এখানে কোথাও মেলামেশাই করতে পারো না, রিটায়ার করে ওখানে তবু মানসদাদের মত সমমনস্ক দু’-চারজনকে আশেপাশে পাবে কথা বলবার জন্য। প্রথম-প্রথম তো এক্কেবারে পাত্তাই দিত না, আমি কিছুদিন ঘ্যানঘ্যান করাতে তারপর তুলতো টাকার কথা, -‘আর তো ছ’-সাত বছর মাত্র চাকরি আছে, লোন শোধ করবো কি করে ?’ সেই লোক শ্যামলদার শ্মশান থেকে ফিরে এসে নিমপাতা মুখে নিয়ে লোহা-আগুন ছুঁয়ে ঘরে ঢুকতে ঢুকতেই আমায় কেমন ধরে-আসা গলায় বলল, - ‘আমাদের জেনারেশানেও হাত পড়ে গেল জয়া’। বুকটা দুলে উঠেছিল ওর অচেনা গলার স্বরে। রাতে মানুষটাকে বললাম, কেন আজেবাজে চিন্তা করো বলো তো, শ্যামলদার তো কবে থেকেই অ্যাজমা ছিল। গত তিন-চারমাস বাড়ি থেকেই বেরোতে পারতো না। উত্তরে বিনয় ওর গভীর আর লম্বা শ্বাস ছেড়ে বলল, -‘বাড়িটা এবার তাহলে বেচেই দি’, কি বলো ?’ সেই বেচা বেচলো, শ্যামলদা চলে যাবার ছয় মাসের মধ্যে। সাড়ে চার কাঠার উপর দোতলা বাড়ি মাত্র বারো লাখে। বিজুর ফিফথ সেম চলছে তখন, তার মধ্যেই হালিসহরের পাট তুলে সেলিমপুরের তিন-কামরার ফ্ল্যাটে উঠে এলাম। মানসদাই দেখে দিয়েছিল ফ্ল্যাটটা, গলির একটু ভেতরের দিকে, কিন্তু পূব আর উত্তর দু’দিকে দু’টো ব্যালকনি, তিনটের মধ্যে দু’টো ঘর তো বেশ বড়, আর দু’টো বাথরুম। আমার তো বেশ পছন্দ হয়েছিল। তবে বাড়ি-বেচা টাকার সঙ্গে বিনয়ের বাকি পিএফ আর গ্রাচুইটির প্রায় পুরোটাই চলে গেল কোলকাতায় নতুন করে সংসার পাততে। পাকাপাকিভাবে চলে যাবার আগের রাতে, খাট-তোষক সব ফ্ল্যাটে চলে গেছে, আমরা দু’জন কোনোরকমে শতরঞ্চি পেতে আর করুণাবৌদিদের থেকে দু’টো বালিশ আর মশারি চেয়ে এনে রাতে শোব, বিজু তো হোস্টেলে। রাত ক’টা হবে, এগারোটা সাড়ে এগারোটা, করুণাবৌদির কাছে রাতের খাওয়াদাওয়া করে ছাদে উঠল বিনয়, আমায় বলল এসো। গেলাম, কি যে হচ্ছিল বুকের মধ্যে বলে বোঝানো যাবে না। খারাপ লাগছিল ? না তো, আমি তো এসব ছেড়েছুড়ে আমাদের শেষজীবনটা কলকাতায় বিজু আর বিনয়কে দেখাশোনা করে জীবনে প্রথমবার নিজেদের মত করে থাকতেই চেয়েছিলাম। তাহলে কেন চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়েছিল সে দিন সেই রাতে ? আশ্চর্য, সেদিন বিনয় হাসছিল, -‘কাঁদছ জয়া ? কিন্তু কেন কাঁদছ জানো ? আকাশে ডানা মেলতে কার না ভালো লাগে বলো, তবু গভীরের শিকড় উপড়ে উড়ে যেতে ব্যথা যে লাগেই’। একফালি চাঁদের আলোয় সুপুরি আর নারকেলগাছের ছায়ামাখা ছাদে তখন কি হাওয়ার মাতামাতি, ওরা নাকি আমাদের উজানগাঙ্গে নৌকার পালে হাওয়া দিচ্ছে, বিনয় বলেছিল।     
কি অদ্ভুত কাল রাতটা ! নিজের বাড়ি থেকে নয়, নিজের শহরের নবমীর রাত হোটেলের চারতলার জানলা দিয়ে কেমন লাগে, দেখলাম। এই প্রথম, আর এই শেষবার। ফুটপাতে আনন্দে উচ্ছল মানুষের স্রোত বাঁশের বেড়া দিয়ে বাঁধা, আর রাস্তার মাঝখানে গাড়িগুলো যেন নতুন বৌয়ের প্রথম শ্বশুরবাড়িতে ঢোকার মত লাজুক এক পা, দু’ পা করে এগোচ্ছে। আগেও, বিজু যখন ছোট, পুজোয় দু’-একবার বেহালায় থেকে ঠাকুর দেখতে বেরিয়েছি, ভীড় তখনো ছিল। বিনয় এমনিতে ভীড়ভাট্টা সহ্য করতে পারত না এক্কেবারে, কিন্তু পুজোর চারটে দিন ঐ ভীড় ঠেলে আমাদের প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে ঘোরাতো, আমি কতবার জিজ্ঞেস করেছি, তুমি তো এই হুড়ুমধুড়ুম ভীড় পছন্দ করো না, তাও বেরোও কেন ? ও বলতো, -‘জয়া, এই ক’টা দিন বাঙালীদের সব্বাইকে কেমন সুন্দর দেখায়, সব্বাই কেমন সেজেগুজে হৈ হৈ করে বেরিয়ে পড়ে, যেন কোত্থাও কোনো শোকদুঃখ রোগতাপ কিচ্ছু নেই – সারাটা বছরের মধ্যে এই চারটে দিন আমার এই আনন্দিত ভীড় ভীষণ ভালো লাগে গো’। আমার মামাবাড়ি মোমিনপুরে পুজো হত, সে কি ধুমধাম। রাস্তার একপাশে মামাবাড়ি, উল্টোদিকে মাসীর বাড়ি, দু’ বাড়িতেই পুজো হত, মাসীর বাড়িতে তো নবমীতে বলির চল ছিল, মেসোমশাই মারা যাবার পর সব বন্ধ হয়ে গেল। ওই দু’টো বাড়িতেই আমার ছেলেবেলার অনেকটা সময় কেটেছে, কত স্মৃতি। সেই দু’টো বাড়িরই আজ ভূতের দশা, দেখলে কান্না পায়। বড়মামার মেজ-সেজ ছেলে দু’জনেই বিদেশে, থাকার মধ্যে বড় কানুদা খালি সেই বিরাট চারতলা বাড়ির একতলায় টিমটিম করে টিঁকে আছে। মাসীর মেয়ে রান্তুদি হোসুরে সেটেলড, বাকি মিন্তু বিয়ের পর থেকেই ক্যানাডায় আর বোকনদা অ্যামেরিকায়। বোকনদার ছেলে অপু আর বিজুর জন্ম পনেরোদিন এদিকওদিক, বহুকাল দেশে আসেনা ওরা, যোগাযোগও নেই। মাসীর বাড়িটা তো শুনি প্রোমোটারকে দিয়েই দিয়েছে, ফ্ল্যাট উঠে গেছে, কত বছর হয়ে গেল ও পাড়ায় পা রাখিনি।
গতবার ষষ্ঠীতেই তো। বিকেলে ভারতের ক্রিকেটখেলা টিভিতে দেখতে দেখতে বিনয়, কথা নেই বার্তা নেই,  হঠাৎ সোফা থেকে গড়িয়ে পড়ে গেল। ওরই অর্ডারি চা নিয়ে আসছিলাম, বুকটা ভীষণ কেঁপে উঠল। হাত থেকে ছিটকে গেল চায়ের কাপ। পড়িমড়ি ওর কাছে এসে দেখি, ঠোঁটটা বাঁ দিকে বেঁকে গেছে, বাঁ হাতের আঙুলগুলো সোজা করা যাচ্ছে না ! অসাড় মুখ থেকে লালা গড়িয়ে গেঞ্জির কাঁধের কাছটা ভিজে যাচ্ছে, আর একটা অস্ফুট গোঙানি – আমি দৌড়ে বেরিয়ে পাশের ফ্ল্যাটের জয়সোয়ালদের ডাকলাম। ওর দুই ছেলেই বাড়ি ছিল, সঙ্গে সঙ্গে ছেলেগুলো অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে নিয়ে গেল ‘আমরি’তে। এমারজেন্সির ডাক্তার বলল – সেরিব্রাল। খুব সময়ে নিয়ে এসেছেন, আরেকটু দেরি হলেই হয়েছিল আরকি। তবে বাহাত্তর ঘন্টা না কাটলে কিছু বলা যাবে না। স্থানুর মত বসে রইলাম আইসিসিইউর বাইরে। জয়সোয়ালদের ছেলে দু’টো বারবার বলেছিল, ‘আন্টি, ঘর ওয়াপস চলিয়ে, ইধার ঠ্যাহরনেসে কোই ফয়দা নেহি। হম হ্যায় না, আপকা কোই চিন্তা নেহি’। যাওয়া যায় ? বিনয়কে এখানে, ওই যন্ত্রপাতীতে ভর্তি মরণমাখা সাদা ঘরটায় রেখে ঘরে ফিরে যাওয়া যায় ? পুজোটা আইসিসিইউতে কাটল। বিজু খবর পেয়ে গিয়েছিল সেইদিনই। আমিই তৎক্ষণাৎ আসতে বারণ করেছিলাম, এপাড়া ওপাড়া বা দিল্লী-বোম্বে তো নয়, সে-ই লন্ডন। তবু চারদিনের মাথাতেই বিজুকে আসতে হল, বাপের মুখাগ্নি একমাত্র ছেলে ছাড়া আর কে করবে, প্রায় বাইশ ঘন্টা বিনয় বিনা বাক্যব্যয়ে পিসহাভেনে শুয়ে ছেলের অপেক্ষা করল। নবমী পুরে দশমী পড়তে না পড়তে রাত বারোটা বেজে পাঁচ মিনিটে বিনয় কোনোদিন যা করেনি, জীবনে প্রথম আর শেষবার তাই করেছিল যে - আমায় ভীড়ের মধ্যে একা ফেলে রেখে চিরকালের মত পাড়ি দিল কোনোদিন-না-ফেরার দেশে। বিজু কাজ করলো, বিনয়ের অফিসের সব বন্ধুই কাজের দিন এসেছিল, যারা বেঁচে আছে সব্বাই - মানসদা, অজয়দা, কাজলদা; অজয়দার অবস্থা তো সবচেয়ে সঙ্গীন দেখলাম, একটামাত্র মেয়ে নিজের পছন্দে বিয়ে করে আহমেদাবাদে আছে, বুড়ো বাপ-মা’র দিকে ফিরেও দেখেনা। অজয়দাই বিজুকে বললো, -‘মা’কে এবার তোমার সঙ্গে করে লন্ডন নিয়েই যাও। বি.কে চলে গেল, আমরাও তো যাবার পথে এক পা বাড়িয়েই আছি, বুড়ো বয়েসে কে কাকে দ্যাখে, বল ?’ বিজু তখন সবে বাবার কাজ করে উঠেছে, বললো, - ‘হ্যাঁ কাকু, বাপি থাকতে অনেকবার দু’জনকেই নিয়ে যাব ভেবেছি, কিন্তু বাপি তো এখান থেকে নড়তেই চাইত না। একটা বার পনের-কুড়িদিনের জন্যে বেড়াতে অবধি নিয়ে যেতে পারলাম না আমার ওখানে। আমি এবার যে চার-পাঁচদিন আছি, তার মধ্যেই এই ফ্ল্যাটের বিক্রির বন্দোবস্ত দেখছি, তোমরাও একটু হেলপ কোরো, দ্যাখো তোমাদের চেনাজানার মধ্যে কেউ কিনতে চায় কিনা। আমি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব মা’কে নিয়ে যাব আমার কাছে’। হ্যাঁ, আমায় নিয়েই চল বিজু, আর কি পড়ে রইল এখানে ? আমার তো লতার মত জড়ানো জীবন, তোকে আর তোর বাপিকে আঁকড়ে জড়িয়ে কেমন করে যে কেটে গেল, কবে যে বুড়ি হ’লাম টেরও পেলাম না। প্রায় বারোটা বছর এই ফ্ল্যাটে কাটলো, তার আগে পঁয়ত্রিশ বছর হালিসহরে, শেষটা না হয় তোর কাছে বিদেশেই হবে, মায়ের কাছে ছেলের ঘর কি বিদেশ হয় কোনোদিন ? সেই বিক্রি ঠিক হল মাসখানেক আগে, ফার্নিচারটার শুদ্ধু মোটামুটি ভাল দামই পেল বিজু – প্রায় তিরিশ লাখের মত পেয়েছে বলল, ফ্ল্যাটটা কিনল আরেক মাড়োয়াড়ি, কি শ্রীবাস্তব না কি যেন নাম। বিজু এসেছিল প্রায় কুড়িদিন আগে, ফ্ল্যাটের হাতবদল আরো কি কি সব আইন-টাইনের কাজ মেটালো একাই। তরশু আবার মানসদারা সবাই এসেছিল আমাদের গুডবাই করতে, বিনয়ের সঙ্গে যাদের অত হৈ হুল্লোড় করতে দেখেছি এককালে, সব্বাই কেমন টাকফাক পড়ে থুতনি-ঝুলে যাওয়া নেতিয়ে পড়া থুত্থুড়ে বুড়ো হয়ে গেছে এখন। বিনয় কিন্তু যাবার আগের দিনও টানটান ছিল, চুল সব সাদা হয়ে গেছিল ঠিকই, কিন্তু একটা চুলও পড়েনি, ঝকঝকে দাঁত সব অটুট, মানসদা তো ইয়ার্কি করে প্রায়ই বলতো, বি.কে চাইলে আরেকটা বিয়েও করতে পারে। গতকাল ব্যাগট্যাগ সব গুছিয়ে চাবি শ্রীবাস্তবদের দিয়ে হোটেলে এসে উঠলাম বিজুর সঙ্গে। এয়ারপোর্টের কাছাকাছি একটা হোটেল, এসি ঘর। জামাকাপড় বিশেষ কিছু আর নিলাম না, দু’টো সোয়েটার আর শাল, বিজু বলল, ওখানে যা ঠান্ডা পড়ে এসবে শানাবে না। পৌঁছে গরমজামাটামা কিনে দেবে। আর শাড়িকাপড় যা ছিল, সব দিয়ে দিয়েছি স্বপ্নার মা’কে, বিনয় যাবার পর থেকে রান্নাবাড়া, বাসনমাজা, ঘরদোর মোছা একা হাতে সামলেছে মেয়েটা গত একটা বচ্ছর। বিজুকে বলিনি, কেবল বিনয়ের একটা মাংকিক্যাপ ব্যাগে ঢুকিয়ে নিয়েছি। আর নিয়েছি ওর চশমাটা, আর হাতে লেখা একটা মাসকাবারি হিসেবের খাতা, আহা মুক্তোর মত হাতের লেখা ছিল ওর, বিজুটারও হাতের লেখা ভাল, কিন্তু বাপের ছাঁদ পায়নি। আরেকটা জিনিসও নিয়েছি, ওখানে গিয়ে আমার ঘরের দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখব আমার শেষদিন অবধি - বিজুর সেই বিনুনী-করা হাঁ করে ফোকলা হাসি-হাসা সাদাকালো ছবিটা, অন্নপ্রাশনের দিন যেটা শ্যামলদা তুলে দিয়েছিল।  
- মে আই হেলপ ইউ ম্যা’ম ? ইউ আর সিটিং হেয়ার অ্যালোন ফর লঙ...
কিসের হেলপ ?...‘লঙ’...মানে ?
- আস্ক ইন বেঙ্গলি না !
- ম্যাডাম, আপনি অনেকক্ষণ একা বসে আছেন, কোথায় যাবেন ? আপনার ফ্লাইট কখন, সঙ্গে কে আছে ?
অ্যাঁ...অনেকক্ষণ...মানে ? কতক্ষণ ?
হাতঘড়িতে নজর করে স্তম্ভিত হয়ে যাই, সব্বোনাশ! সত্যিই তো – বিজুটা যে গেছে তো গেছেই। সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে যে প্রায় তিনঘন্টা হতে চলল! বিজুই তো তাড়া দিল, বলল, দশমীর ভীড়ে রাস্তাঘাট জ্যাম হয়ে গেলে মুশকিল হবে। তা কাল নবমীর সন্ধ্যেরাতেই রাস্তায় যা ভীড় দেখেছি, দশমীতে যে লোকে পাগল হয়ে যাবে সে আর আশ্চর্য কথা কি। তাই সন্ধ্যে হতে না হতে হালকা কিছু মুখে দিয়েই বেরিয়ে পড়া হয়েছিল। স্টেডিয়াম-লাগোয়া হোটেলটা থেকে এয়ারপোর্ট কতটাই বা, জোর তিন-চার কিলোমিটার। সেটুকু পেরোতেই তো একঘন্টা লেগে গেল, এয়ারপোর্টে পৌঁছে ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে হাঁফ ছেড়ে বিজু বলল, - ‘যাক পৌঁছে গেছি বাবা। এখন সবে সাতটা বাজছে, প্লেন ন’টায়, হাতে ভাল সময় আছে’। আমি বলেছিলাম, - ‘তা এত আগে এলি কেন রে ?’ - ‘অনেক কাজ আছে মা, এ তো আর দিল্লী-বোম্বে যাওয়া নয়, একেবারে হিথরো, লন্ডন। প্রায় তেরো ঘন্টা, মাঝে শুধু আবুধাবিতে স্টপ-ওভার। ইমিগ্রেশানে ভিসা-পাসপোর্ট চেক, লাগেজ তোলা – হাজার ঝামেলা’, বিজু বলেছিল।  লাগেজ বলতে আমার হাতব্যাগ ছাড়া একটা সুটকেস আর একটা বড় ব্যাগ, আর বিজু দেশে এসেছিল যে স্যুটকেসটা নিয়ে, সেটা। আমার লাগেজসহ আমায় এইখানটায় বসিয়ে বিজু উল্টোদিকের স্টল থেকে কাগজের গ্লাসে কোকাকোলা নিয়ে এল, খেলাম। তারপর বিজু ওর সুটকেসটা নিয়ে উঠল, বলল যে কাউন্টারে পাসপোর্ট-ভিসা দেখিয়ে বোর্ডিং পাস তুলে এসে তারপর লাগেজ চেকে পাঠাবে।
- হুইচ ফ্লাইট, স্যরি, কোন ফ্লাইটে যাবার কথা আপনাদের ম্যাডাম ?
- ফ্লাইট ? কোন ফ্লাইট...মানে লন্ডনে যাবার যে প্লেন...ন’টায় ছাড়বার কথা ছিল...
- আ, মোস্ট প্রোব্যাবলি সি ইজ ইন্ডিকেটিং দ্যাট ইতিহাদ ফ্লাইট অ্যাট এইট ফর্টি...আচ্ছা ম্যাডাম আপনার ছেলের নাম কি ?
- ছেলের নাম ?...বিজিত...বিজিত বসু...
কি বলল মেয়েটা ? প্লেন আটটা চল্লিশে ছিল ? না, না বিজু তো বলেছিল প্লেন ন’টায়...
- এগজ্যাক্টলি ন’টায় তো লন্ডনের কোনো ফ্লাইট নেই ম্যাডাম। একটা ছিল আটটা চল্লিশে, সেটা তো প্রায় আধ ঘন্টা হ’ল বেরিয়ে গেছে ইন টাইম। আবার আরেকটা আছে রাত বারোটা কুড়িতে বৃটিশ এয়ারওয়েজের...এই স্মিতা, চেক দ্য প্যাসেঞ্জার্স লিস্ট অফ ইতিহাদ ফ্লাইট না...চেক ফর বিজিত বাসু...
কে বিজিত ? বিজিত বসু কে ? বিজিতই কি আমার বিজু ? বিজু কোথায় ? ও তো বলে গেল, পাসপোর্ট-টোট টিকিট কাউন্টারে দেখিয়ে আসছে...তারপর লাগেজ তুলে দেবে...আমি আবার বললাম, রাত্তিরে খাবি কি ? ও বলল, কেন শুকনো কিছু কিনে এখানেই খেয়ে নিয়ে প্লেনে উঠবো, মাঝরাতে আবুধাবি এয়ারপোর্টে নেমে আরো কিছু কিনে নেবো’খন...প্লেনে ফ্রুটজুস পাওয়া যায় আর চকলেট, তোমার তো সুগার নেই...সকাল দশটার মধ্যে লন্ডনে নেমে দুপুরে খাওয়ার আগেই তো বাড়ি পৌঁছে যাব...
- ইয়াহ, দেয়ার ইজ দ্য নেম বিজিত বাসু, বোর্ডিং পাস ইস্যুড সিট নাম্বার ই-টোয়েন্টিওয়ান ডাব্লিউ, বোয়িং সেভেন ফর্টি সেভেন ইতিহাদ...বাট ওহ মাই গুডনেস, দেয়ার ইজ নো জয়া বাসু ইন দ্য লিস্ট...উনি কি আপনার টিকেট কাটেননি ম্যাডাম ? প্যাসেঞ্জার্স লিস্টে তো কোনো জয়া বাসু নেই...আপনার টিকেট কোথায় ?
টিকিট ?...আমার টিকিট ? সে সবই তো বিজুর কাছে, আমায় যে বলল জানালার ধারের সিট, প্লেন ওড়ার সময় তুলো গুটলি পাকিয়ে কানে দিয়ে রাখলে কানে ব্যথা হবে না...বিজুর মাধ্যমিকের পরে নেপাল বেড়াতে গিয়ে ফেরবার সময় প্লেনে আমার কানে কি ব্যথা...কাল দিনের বেলা সমুদ্র দেখা যাবে...
- ইউ টেল হার, আই সিম্পলি কান্ট...বিলিভ মি আমার কেমন সিক লাগছে, নিজের মা’কে এখানে বসিয়ে রেখে ছেলে বেমালুম লান্ডান হাওয়া হয়ে গেল ! হি সিম্পলি অ্যাবানডন্ড হার !!
- বল, ডাম্পট হার ! শুনলি না, ফ্ল্যাট-ট্যাট বেচে দিয়ে টাকাপয়সা সব নিয়ে হাওয়া...আর মা আজ রাতে কোথায় যাবে তার ঠিক নেই, ফিউচারের কথা তো ছেড়েই দিলাম...
- ইয়ে ম্যাডাম...মাসীমা, মাসীমা...
কি বলবে আমায় তোমরা ? কি সুন্দর ফুটফুটে মেয়েগুলো, কি বলবে আমায় তোমরা ? এয়ারপোর্টটা অনেকটা ভিতরে, এখানে সব কিছু কাঁচে ঢাকা। বাইরের শব্দ আসেনা। আমাদের হালিসহরের বাড়ির পাশে স্থানীয় সঙ্ঘের ঢাকের আওয়াজ পাওয়া যেত পঞ্চমী থেকেই। আর সেলিমপুরের ফ্ল্যাটবাড়িটার পূব-দেওয়াল ঘেঁষেই তো প্যান্ডেল, ওখানে গত ক’বছর হয়ে গেল ঢাকি আনেনা, ক্যানেস্তারা পেটানোর মত ক্যাটর ক্যাটর করে কি যে বাজায় লোকগুলো। বিজুর তখন কতই বা বয়েস, প্রাইমারি পেরিয়েছে কেবল। গঙ্গার ঘাট থেকে ভাসান দেখে রিক্সা চেপে ফেরবার সময় স্থানীয় সঙ্ঘের অন্ধকার শূণ্য প্যান্ডেলে জ্বলছিল একটামাত্র প্রদীপদূরে শোনা যাচ্ছিল বিসর্জনের ঢাকের বোল। ও মা, ছেলেটা দেখি হঠাৎ ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ওর মাথাটা তাড়াতাড়ি বুকে চেপে ধরলাম, আর বিজু বলল, - ভাসানের ঢাকের অমন কান্না কান্না আওয়াজ কেন হয় মা ?   
- কাকে কল করছিস ? পুলিশ ?
- আমার কাকাকে। আমাদের ওখানে পাটুলিতে একটা ওল্ড এন্ড ডিসেবেলদের ওয়েলফেয়ার সোসাইটি আছে, কাকা তার সেক্রেটারি। ওরা যদি কোনো ব্যবস্থা করতে পারে ভদ্রমহিলার...দেখ আমার হাত-পা কাঁপছে, ইটস নো লেস দ্যান এ মার্ডার...দ্যাট গাই ইজ এ ব্রুট...
- কন্ট্রোল ইয়োরসেলফ স্মিতা...কন্ট্রোল...সোসাইটিতে এরকম কত হোয়াইট ক্রিমিন্যাল ঘুরে বেড়াচ্ছে তুই জানিস ?
- লুক অ্যাট হার, সি ইজ ইন অ্যাবসোলিউট স্টুপর, উনি কথা বলবার শক্তিও হারিয়ে ফেলেছেন...
ঢাকের আওয়াজ শুনতে পাচ্ছ না তোমরা, তাই না ? বিসর্জনের সেই কান্নাকান্না বোল ? আজ যে বিজয়া...বিজু ওর মা’কে ভাসান দিয়ে গেছে গো মেয়েরা...
বিজু, কি করছিস এখন ? খেয়েছিলি তো ? এখানকার ডাক্তার যে বলল লিভারটা বেড়েছে তোর, সেই প্রাইমারিতে পড়বার সময় হেপাটাইটিস হয়েছিল, মাসখানেক কি যমে-মানুষে টানাটানি। তোর বাবা পাগলের মত এ ডাক্তার সে ডাক্তার...সেই থেকেই লিভারটা দুর্বল তোর। ওষুধটা নিয়ম করে খাস কিন্তু। আর, ভাল থাকিস বাবা।
*****

চোখ বুঁজে আরামের শেষ চুমুকে কফিটা শেষ করে কান থেকে হেডফোন নামিয়ে ল্যাপটপটা খুললেন বিজিত বাসু। সেলিমপুরের ফ্ল্যাট বিক্রির পুরো চল্লিশ লাখ টাকার এনআরও অ্যাকাউন্ট ট্রানজ্যাকশান সাকসেসফুল দেখিয়েছে সকালেই আইসিআইসিআই গোলপার্ক। মেইলটার পিডিএফ সেভ করে রাখতে হচ্ছে। কাল হিথরো নেমে ডাভডেল অ্যাাভেনিউর অ্যাপার্টমেন্টে যাওয়ার আগে একবার ঘুরে অক্সফোর্ড স্ট্রীটে হ্যালিফ্যাক্স ব্যাঙ্ক হয়ে যেতেই হবে, একটু রাউন্ড-অ্যাবাউট হয়ে যাবে, যাক। কিন্তু পাউন্ড কনভার্সানে কত চার্জ কাটবে কে জানে, ফাইন্যাল অ্যাকাউন্ট ব্যালান্সটা একেবারে আপডেট করে নিয়ে গেলে ঝামেলা মিটে যায়, শান্তি।    

 (পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত “ট্রৈনিক” শারদ সংখ্যা ১৪২২ এ প্রকাশিত)
 

Saturday, 22 August 2015

লালু, ব্রজ ও আরো কয়েকজন

The Cycles of Heaven in twenty centuries
Leading us farther from God and
Nearer to Dust. (T. S Eliot)


।। ব্রজ ও বিজন ।।

বিজন এইরকম জায়গাতেই পড়েছিল। হয় এইখানটাতেই, না হয় দু-চার ফুট এদিকসেদিক। এটা বিলের পূবপাড়কমবেশি পনেরো-বিশ হাজার একরের ভাকুড়িয়া বিল পশ্চিমে ভাগীরথীর সঙ্গে জোড়া ছিল এককালে, বহুদিন হলো তার নাড়ি ছিঁড়ে গেছে। উত্তর-পশ্চিমদিকটায় তবু জল বেশ গভীর; পিয়ারগঞ্জ, গড় ভক্তপুর আর চরডাঙার বাসিন্দারা নৌকায় পারাপার করে। চরডাঙা তো চরই, কুমড়ো আর ফুটি ফলে ভাল। ঘোড়ার নালের মত বেঁকে বিল এসেছে পূবে, আর এ দিকটায় এসে প্রায় মজে গেছে।  বিল এদিকটায় নামেই, আসলে জলাজঙ্গুলে বাদা। কাটা-গোবিন্দপুরের কাটাকেষ্টর মন্দিরের পর দু’ দশ ঘর পাখমারা থাকে, তারপর বিলকুল ফাঁকা, জনমনিষ্যির বাস নেই। চুমরির খাল ফি বর্ষায় উপচানো ভাগীরথীর জল বাঁওড়ে এনে ফেলে উত্তর-দক্ষিণে এলিয়ে থাকা ৩৪ নং জাতীয় সড়ক ডুবিয়ে দিয়ে কেলেঙ্কারী বাঁধাতো বছর পাঁচেক আগেও। তারপর একশো দিনের কাজে তৈরী হল দীঘলকাটীর মাটির বাঁধ, গ্রাম-সড়ক যোজনায় ব্রজবাবুর জেলা পরিষদ টাকা দিল জাতীয় সড়ক থেকে ওই বাঁধ অবধি তিন কিলোমিটার পাকা রাস্তা বানাবার। শীতে নানান ভিনদেশী পাখী আসে বিলের পূবদিকটাতে; বহরমপুর তো বটেই, পাকা রাস্তাটা হয়ে যাওয়ার পর কোলকাতা থেকেও গত কয় বছর গাড়ি করে লোকজন আসা অনেক বেড়েছে শীতকালে পাখপাখালীর ছবি তুলতে, পিকনিক করতে। পাখমারাদের পাখী-ধরার ব্যবসা উঠে গেছে কবেই, পাখমারারা  এখন বহরমপুর, মুর্শিদাবাদ, জিয়াগঞ্জ, সাগরদিঘি, ডোমকলে ইমারতির রমরমা কারবারে যোগালের কাজ করতে যায়  বছরে দশ মাস আর শীতকালে অগভীর জলে লগি ঠেলে ঠেলে ডিঙি ভরে শহরের বাবুদের পাখী চেনাতে-চেনাতে বিল ঘোরায়, ঘন্টায় ছ’শো টাকা।  ব্রজবাবুর জেলাপরিষদ  এই বাবুদের বিলের পাড়ে দীঘলকাটী বাঁধের উপরে রাতে থাকবার জন্য চার-কামরার অতিথিনিবাস বানানোর কাজে হাত দিয়েছিল গত বৈশাখে, বন্যানিয়ন্ত্রণ দপ্তরের ইঞ্জিনিয়াররাও অনেকদিন বিলের কাছাকাছি একটা ভদ্রগোছের থাকবার জায়গার জন্য ঘ্যানঘ্যান করছিল। শিলান্যাস করতে জেলা সভাপতির সঙ্গে কলকাতা থেকে পর্যটনমন্ত্রীকেও নিয়ে এসেছিল গোবিন্দ।  ‘পাখীর বাসা’ নামটাও ভারি শখ করে রেখেছিলেন ব্রজবাবু। সেই অতিথিনিবাস লিনটেল অবধি উঠে যাওয়ার পরেই তো ঘটনাটা ঘটলো, বিজন পড়ে রইল ওই অতিথিনিবাসের পূব কোণে ইঁটের পাঁজার পাশে। ভোর-ভোর মাঠে যেতে গিয়ে যারা প্রথম দেখেছিল তারা পরে ব্রজকে বলেছিল, গাছের ফাঁক দিয়ে প্রথম আষাঢ়ের মেঘভাঙ্গা ভোরাই সুর্যের আলো তেরচা হয়ে পড়েছিল বিজনের মুখে, আর বুকের কাছে জমাট রক্তে ভনভন করছিল মাছি।

।। লালু ও ব্রজ ও গোবিন্দ ।।

লালু ব্রজর পিছন পিছন ঠিক এই জায়গাটায় এসে রোজই কয়েকবার ঘুরপাক খায় কোন একটা অদৃশ্য কেন্দ্রের পরিধি ধরে। প্রথম প্রথম ব্রজ অতটা খেয়াল করেননি।  লালু বিজনকে পছন্দ করতো  সেটা ব্রজর বেশ মনে আছে, বিজনের বাড়ি নিয়মিতই যাতায়ত ছিল লালুর। বিজনের বউ ইন্দ্রানী আর মেয়ে সুজাতাও লালুকে ভালোই খাতির করতো সেটা ব্রজ নিজের চোখেই দেখেছেন। গত পাঁচই জুন পরিবেশ দিবসে বিজনের ইস্কুলের অনুষ্ঠানে চিফ গেস্ট হয়ে গিয়েও ব্রজ দেখেছিলেন, স্টাফরুমের সিঁড়িতেই লালু অনুগত দেহভাষা নিয়ে দন্ডায়মান। এমনকি  ব্রজর দেওয়া নাম ধরে বিজন ডাক দিলেও লালু একই রকম বশংবদ চোখে ফিরে তাকাতো সেটাও ব্রজর পরিষ্কার মনে পড়ে। তা প্রতিদিন ভোরে ব্রজর সঙ্গে ব্রজর পিছন পিছন মর্নিং ওয়াকে বেরিয়ে অতিথিনিবাসের পূব কোণে ইঁটের পাঁজার কাছে ঠিক এই জায়গাটায় লালু রোজই থমকে দাঁড়ায় একটিবার, মুখ নামিয়ে মাটিতে কি যেন শোঁকে, ঘন ঘন ল্যাজ নাড়ে আর মুখে অস্ফুট কুঁইকুঁই শব্দ করে। জায়গাটাকে বেড় দিয়ে ঘুরপাক খায় দু’-চার বার।
যুধিষ্ঠিরের স্বর্গারোহণের সঙ্গী তো ছিলেন একমাত্র সারমেয়বেশী যমরাজ, তা ব্রজ এই ব্যাপারে যুধিষ্ঠিরকে দশ গোল মেরেছেন। তল্লাটের প্রায় সমস্ত কুলশীল ও অজ্ঞাতকুলশীল কুকুরই বংশানুক্রমে ব্রজর অনুগামী। পশুপাখী ব্রজ অল্পবয়েস থেকেই ভালোবাসেন, আর এতটাই তাঁর সারমেয়প্রেম যে বিয়ের পর-পর অনিমা তো একদিন ভালোবেসে বলেই ফেলেছিলেন, ‘তোমার গায়ে কেমন যেন কুকুর-কুকুর গন্ধ’। সেই সময় ব্রজর ঠাকুরদার তৈরী সাতাশটা ঘরের দোতলা চকমিলান বাড়িতে  নিজের পোষা দেশী-বিদেশী মিলিয়ে ছ’-ছটা কুকুর, তার মধ্যে সেরাটি একখানা দশাসই ল্যাব্রেডর হাউন্ড যার পূর্বপুরুষ সাক্ষাৎ  নেকড়েআজ পঞ্চাশ বছর পরে সেই রমরমা আর নেই, কলসীর জমানো জল কেবল গড়িয়ে নিয়ে খেতে থাকলে ফুরিয়েই আসে। কাটছাঁট হয়েছে ব্রজর কমবয়েসের অনেক কিছুই, ঝাউ আর মরশুমী ফুলের কেয়ারি-করা দশ কাঠার উঠোন ঘিরে ইংরেজি ইউ আকৃতির সেই প্রাসাদের চার-পাঁচটা বাদে সাতাশটা ঘরের বিশ-বাইশটাই রঙ করা হয়ে ওঠে না গত চল্লিশ বছর। মালিরা সবাই বিদায় নিয়েছে, ঝাড়বাতিও নিভে গেছে কবেই, তবু কড়িবরগা থেকে ঝুলন্ত তার ঝুলপড়া শরীর এখনো এ বংশের নীলরক্তের নীরব অভিজ্ঞান।  বাজার-সরকার কাম ম্যানেজার বৃদ্ধ শ্রীপতিবাবু, ব্রজর খাস চাকর কালিপদ আর গোটা দুই চাকরবাকর কেবল টিঁকে রয়েছে কোনোমতে। ব্রজ সক্রিয় পলিটিক্সে নেমেছেন বছর পাঁচেক হ’ল অনিমার ঘোর আপত্তি সত্ত্বেও। বলতে গেলে বিজনই তাঁকে ধরে বেঁধে প্রথমে ওদের স্কুলের সেক্রেটারি করে আর তারপর ধীরে ধীরে ব্রজর মাথায় সুপ্ত দেশোদ্ধারের বীজে জল দিয়ে দিয়ে চারাগাছ ফুটিয়ে তোলে। তবে যতই বাধ্যতামূলক সাশ্রয়জনিত হিসেবিয়ানা এসে পড়ুক, সেটার মধ্যে দাঁড়িয়েও ব্রজর সারমেয়প্রেমে কোন ঘাটতি পড়েনি। ওদের নামকরণে  ব্রজ একটি সরল পদ্ধতি তৈরি করে নিয়েছেন সেই ছেলেবেলা থেকে; সাদা রঙ হলে ধলু (পুং) বা ধলা (স্ত্রী), লাল-খয়েরি হলে লালু আর লালি, কালো হলে সেই একই নিয়মে কালু আর কালি। এবং প্রায় প্রতিটি প্রজন্মেই একাধিক ধলু বা লালু বা কালি পাওয়া যায়, এই প্রত্যন্ত মফস্বলে জন্মনিয়ন্ত্রণ ও নাশবন্দীকরণ কর্মসূচী মনুষ্যসমাজেই এখনো তেমন প্রচলিত নয়। একই প্রজন্মের একাধিক সমবর্ণ সারমেয়র নামকরণে ব্রজ ঈষৎ হাইর‍্যার্কি মেইনটেন করেন। প্রথম লালটির নাম দেন লালু, তারপর আবার কোন লাল পুরুষ সারমেয়র জন্ম হলে স্বাভাবিকভাবেই তার নাম দেন লালুর ভাই, পরেরটির নাম হয় লালুর ছোটভাই, যেটা ডাকার সময় শুধু লালু বা শুধু ছোটভাই হয়ে দাঁড়ালেও ও তরফে থেকে সাড়া পেতে আজ পর্যন্ত কোনোদিন দেরি দেখেননি ব্রজ। আজও বহরমপুরে লোক পাঠিয়ে কুকুরের ওষুধ আনান ব্রজ, বাড়িতে নাই বা রইল, এই তল্লাটে তাঁর অনুগামী সারমেয়দের সংখ্যা বংশপরম্পরাক্রমে প্রচুর। ওদের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কাটিয়ে, ওদের ভালোবেসে ওদের অনেক কিছু স্বাভাবিক ভাবেই ব্রজ জেনে ফেলেছেন গত ষাট বছরে। ব্রজ জেনেছেন, কুকুর সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি ও একই সঙ্গে সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হচ্ছে প্রভুভক্তি, এ ব্যাপারে ওরা একেবারেই বহুগামী নয়। প্রভুহীন কুকুরের দুঃখ ভারি এবং এ দেশে বেশির ভাগ কুকুরই বেওয়ারিশ। ব্রজর স্পষ্ট মনে আছে, বছর দু’য়েক আগে গোবিন্দর সঙ্গে কলকাতায় পার্টির সদর দফতরে যেদিন প্রথম গিয়েছিলেন, যেদিনই ঠিক হয় জেলা থেকে একমাত্র মন্ত্রী শ্যামাচরণ বিশ্বাস নন, জেলাপরিষদের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী তিনিই হবেন, সেদিন বাড়ি থেকে বেরোনোর সময়েই সেই প্রজন্মের এক নাছোড় লালু তাঁর গাড়ির (গাড়ির মালিক গোবিন্দ) পিছু নিয়েছিল। বড় রাস্তায় পড়ে তিনি বাধ্য হয়ে গাড়ি থামাতে বলেন, নেমে ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলেন, ‘যা বাড়ি ফিরে যা, বড় রাস্তায় গাড়ি চাপা পড়ে মরবি তো; আমি সন্ধ্যের মধ্যে ফিরে আসব রে’তা সেইদিন সন্ধ্যেতে তাঁর আর ফেরা হয়নি, প্রার্থীপদ পাকা হওয়ায় গোবিন্দসহ আরো দু’চার জন উমেদারের ফূর্তির ঝুলোঝুলিতে তিনি সে রাতে কলকাতার এক হোটেলে থেকে গিয়েছিলেন। পরেরদিন দুপুর নাগাদ বড় রাস্তার মোড়ে ব্রজর গাড়ি পৌঁছতে তাঁকে স্বাগত ও অভিনন্দন জানাতে জড় হওয়া জনা পঞ্চাশ নানাবয়েসী পতাকাধারী পার্টিকর্মীর পুরোভাগে তিনি লালুকে দেখতে পান। গাড়ি থেকে নেমে আবার ওর মাথায় হাত বুলোচ্ছেন যখন, তখন ভীড়ের মধ্যে থেকে কে যেন বলেছিল, ‘কাল সেই যে আপনি গেলেন সার, সেই থেকে ব্যাটা মোড়ের বটতলায় শুয়ে আছে, আমরা কত ডাকাডাকি করলাম, তাও উঠল না। আজ যেই আপনার গাড়ির আওয়াজ পেল অমনি তড়াক করে উঠে চলে এল’! সেইখানেই হাতমাইকে গোবিন্দ ব্রজর জন্য চটজলদি স্বাগতভাষণ দিয়েছিল। গোবিন্দ ভাষণটা রপ্ত করেছে ভাল, যদিও তাতে যুক্তির আঁটসাটের চেয়ে পার্টিলাইনভিত্তিক আবেগের হাঁকডাক থাকে বেশি, এ প্রত্যন্ত গাঁ-গঞ্জে সেইটেই ‘খায়’ মানুষে। সেদিনও ভাষণে বেশ খানিক আবেগের লেবু কচলে লালুর প্রভুভক্তির রেফারেন্স টেনে গোবিন্দ বলল, দীর্ঘদিনের অপশাসন ঘুঁচিয়ে উন্নয়নের জোয়ার আনতে দলীয় কোঁদল ভুলে সব্বাই এক হয়ে  ব্রজকে ভোটে জেতাতে লালুর মতই জান কবুল করে মাঠে নামতে হবে আজ থেকেইবক্তৃতার শেষে জনা পঞ্চাশেকের জটলায় যখন হাততালির ফটাফট আওয়াজ, লালু তখন ব্রজর পায়ের কাছে শুয়ে নিবিষ্ট মনে  তাঁর কোলাপুরি চপ্পল শুঁকছিল।
একই রকম স্পষ্ট মনে আছে, গোবিন্দর মোটরবাইকের ফটফট শব্দ দূর থেকে শুনলেই লালু কেমন ছিলা-ছেঁড়া ধনুকের মত সিধে হয়ে যায়, গোবিন্দ ঠোঁটে আহবানসূচক চুঃ-চুঃ করলেও ব্যাটা পিছিয়ে গিয়ে দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে কেমন যেন সিঁটিয়ে দাঁড়ায়। গোবিন্দ অবশ্য চিরকালই কাজের মানুষ, ওর অত নজর করবার সময় কোনোকালেই ছিল না। সামান্য পোস্টমাস্টারের ছয় ছেলেমেয়ের তৃতীয় সন্তান হয়েও বাকি ভাইবোনেদের মত সাদামাটা মেঠো জীবন কাটায়নি গোবিন্দ। ভারী করিৎকর্মা সে, তেরো-চোদ্দ বছর বয়েসেই বহরমপুরে কোন কনস্ট্রাকশান ফার্মে মালিকের ফাইফরমায়েশ খাটতে ঢুকে আজ বিশ বচ্ছর পর নিজেরই বেশ কয়েক কোটি টাকার বিরাট ইমারতি কারবার, কার্ড ছাপিয়ে ব্রজকেও দিয়েছে একটা, তাতে লেখা “শ্রীমা কনস্ট্রাকশানস, বিল্ডার্স এন্ড প্রোমোটার্স, চিফ প্রোপ্রাইটার – গোবিন্দ ধাড়া, সিটি অফিস কোর্টপাড়া বহরমপুর”। ব্রজ শুনেছেন গোবিন্দর নাকি বহরমপুর শহরে দু’-দুটো ফ্ল্যাট, একটি রক্ষিতা আর একটি সেকেন্ড হ্যান্ড কোয়ালিস গাড়িও আছে। বছর দেড়েক বছর হল পারিবারিক ভিটেতে গোবিন্দ বেশ খোলতাই একটা দোতলা বাড়ি হাঁকিয়েছে, গৃহপ্রবেশে জেলা পরিষদের সব সদস্যেরই পরিবারসহ নেমন্তন্ন ছিল, গাঁয়ের লোক তো ছিলই, সবশুদ্ধু প্রায় হাজার দু’য়েক হবে। যদিও ব্রজ কোনকালে অর্থোপার্জনের চেষ্টা করেননি, তাঁর বংশে তিনি অবধি কেউই করেননি, মানে করবার প্রয়োজনই হয়নি, তবুও তাঁর বুঝতে কোন অসুবিধে হয়না যে, গোবিন্দর উন্নতির এ হেন উর্ধ্বশ্বাসগতি ঠিক সরল স্বাভাবিক নয়। কিন্তু গোবিন্দ যে ভারী করিৎকর্মা ছেলে তা ব্রজ বোঝেন। পলিটিক্সে নামার সময় জেলা নেতৃত্বের চোখে ওজনদার হয়ে উঠতে সামান্য যে লাখ ত্রিশেক টাকা লগ্নী করতে হয়েছিল ব্রজকে, সেটা তাঁদের পিয়ারগঞ্জের বিশ বিঘা পতিত জমি বিক্রির বন্দোবস্ত করে বলতে গেলে হাতে করে তুলে দিয়েছিল ওই গোবিন্দই।

।। জমি ও শিল্প ।।

ওই জমিজমা নিয়েই গোলটা বেঁধেছিল। সে অবশ্য ব্রজর পৈতৃক জমি নয়, ভাকুড়িয়া বিলের দক্ষিণ-পূবের মজে আসা অংশে জাতীয় সড়ক লাগোয়া দু’ হাজার একর জমি সরকার অধিগ্রহণ করবেন বলে গত বছর মাঘ মাসে নোটিশ পাঠালেন জেলা পরিষদে। কানাঘুষো আগেই শোনা যাচ্ছিল, তবে নোটিশেই সরকারি ভাবে জানা গেল যে সে জমি নিয়ে সরকার তুলে দেবেন জয়কিষেন এন্ড পান্সারি গ্রূপ অব কোম্পানীর হাতে, তারা সেখানে সিমেন্ট, নানারকম রাসায়নিক রঙ থেকে শুরু করে মশলাপাতি-আচার অবধি বানাবার রকমারি কারখানা তৈরি করবে, যাকে আজকাল কাগজে-পত্রিকায় বলা হয় শিল্পপার্ক। মুখ্যমন্ত্রী নিজে সে শিল্প-পার্কের নামকরণ করলেন মাস্টারদা সূর্য সেন শিল্পপার্ক।  স্বাধীনতার পর এতো বড় বেসরকারি উদ্যোগ রাজ্যে আর আসেনি কখনো, ফলে শিল্পমন্ত্রী তো বটেই, গোটা মন্ত্রীসভার দু’-আনা চার-আনার সদস্যরাও কথায় কথায় গত তিন বছরে উদ্যোগী মুখ্যমন্ত্রীর অনুপ্রেরণায় রাজ্যে শিল্পের জোয়ার এসেছে জানাতে গিয়ে প্রস্তাবিত এই সূর্য সেন শিল্পপার্কের প্রসঙ্গ টেনে আনা শুরু করে দিয়েছিলেন। খবরের কাগজগুলোও মেতে উঠলো, নানা সমীক্ষার কথা ছাপা হতে লাগলো যেগুলোতে রঙীন ছবিটবি ও আঁকিবুকি কেটে বেশ জলবৎতরলং করে বোঝানো হচ্ছিল যে, এই বিরাট বেসরকারি পুঁজির লগ্নী জেলা তো কোন ছার, গোটা রাজ্যের শিল্প-ভবিষ্যৎই পালটে দেবে। মানে বড়বড় রাস্তাঘাট-দোকানপাট, ঘরে ঘরে চাকরি, পাকা বাড়িঘর, মা-বোনের হাসিখুশি মুখ, আজ পর্যন্ত খালি পায়ে টইটই-ঘোরা ন্যাংটো বাচ্চাকাচ্চার ইস্কুলে যাওয়া – সোজা কথায়, পুরো শহুরে ছবির মত ব্যাপারস্যাপারএখন সে ছবি দেওয়ালে টাঙ্গালে প্লাস্টারের চিড় ঢাকা পড়ে ঠিকই, কিন্তু সক্কল আমজনতার চিঁড়ে যে ভিজবেই তা তো নিশ্চয় করে বলা যায় না, তাই অবধারিতভাবে ঘোঁট পাকল। প্রথমদিকে বহরমপুর থেকে কিছু কলেজপড়ুয়ার দল এসে ভাকুড়িয়া বিলের প্রাকৃতিক পরিবেশ ধ্বংসের ছবি এঁকে স্থানীয় স্কুলগুলোতে শিল্পপার্কের বিরোধিতা করে প্রচার চালাতে শুরু করল। স্থানীয় দু’চারটে পাতি পত্রপত্রিকায় সে বিষয়ে লেখা-ছবি বেরোতে এদের দল দ্রুত আরো ভারি হয়ে কলকাতার কলেজ-ইউনিভার্সিটির বেশ কিছু ছাত্রছাত্রীও এসে জুটল আর তারা সরকারের জমি-অধিগ্রহণের সিদ্ধান্তের বিরোধিতায় বহরমপুর শহরের নানা জায়গায় পথনাটক আর পোস্টার প্রদর্শনীর বন্দোবস্ত করল।  নেচে গেয়ে ছবি এঁকে সেই ছোকরার দল মানুষকে বোঝাতে চাইল, ভাকুড়িয়া বিলের দু’হাজার একরে ওই শিল্পপার্ক হলে সাধারণ মানুষের লাভের চেয়ে ক্ষতি অনেক বেশি – লাভের গুড় নিয়ে যাবে বড় ব্যবসাদার, কেবল উচ্ছিষ্ট পড়ে থাকবে স্থানীয় মানুষের জন্য আর পড়ে থাকবে দূষিত ভাকুড়িয়া বিল, যেখানে মাছ-গুগলি-শামুক জন্মাবে না, শালুক-শাপলা ফুটবে না, পাখপাখালী আর এসে ডিম পাড়বে না।  ভিটেমাটি থেকে উচ্ছেদ হওয়া গাঁয়ের মানুষের আমও যাবে, ছালাও যাবে। এদের উপেক্ষা করলেও হয়তো চলতো কিন্তু ব্রজ খবর পেলেন, বিজনের নেতৃত্বে তাঁর পার্টিরই দু’চারজন ওই ছেলেমেয়েগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বিল-লাগোয়া গাঁয়ে গাঁয়ে ক্যাম্পেন করছে। তিনি পত্রপাঠ বিজনকে ডেকে পাঠান তাঁর বাড়ির একতলায় তাঁর দপ্তরে। বিজন এলো, কিন্তু একা নয়।  বহরমপুরের হাইস্কুল আর কলেজের আরো তিন-চারজন শিক্ষক আর ওই ছেলেমেয়েগুলোর কয়েকজনকে সঙ্গে করে একদিন সন্ধ্যায় ব্রজর দপ্তরে এলো বিজন। পরিচয়পর্ব শেষ হতে ব্রজকে বিজন বললো, ‘দাদা, জানি আপনি কেন আমায় ডেকেছেন। আমি পার্টিবিরোধী কাজ করছি বলে আপনার কাছে খবর এসেছে, আমি জানি। আমার মনে হয় দাদা আপনি ইস্যুটা একবার এঁর কাছে ভালো করে শুনুন’বিজনের কথায় একমাথা পাকাচুল চোখে ভারী চশমা যাঁকে ব্রজ আগে দেখেছেন বিজনের ইস্কুলের পরিবেশদিবসের অনুষ্ঠানে, বহরমপুর কলেজের প্রাণিবিদ্যার সেই প্রবীণ অধ্যাপক ডক্টর রাহা একবার গলা খাকরানি দিয়ে শ্লেষ্মাবিজড়িত স্বর পরিষ্কার করে নিলেন আর তারপর একনাগাড়ে মিনিট দশেক ধরে ব্রজকে বোঝালেন যে, এই মূলধননিবিড় শিল্প পার্কে অদক্ষ শ্রমিকের কোন চাহিদা নেই, তারা কেবল পাহারাদার, সাফাইওয়ালার কাজ পেতে পারে। আর করতে পারে দু’ চারটে খাবারের দোকান, বা ধার করে কিনতে পারে মোটর-বসানো ভ্যানো, যাতে চেপে বাসরাস্তা থেকে তিন কিলোমিটার পথ পেরিয়ে শিল্পপার্কে আসবে প্রশিক্ষিত শহুরে কর্মীর দল। কিন্তু তাতে ভাকুড়িয়া বিলের উপর প্রত্যক্ষতঃ নির্ভরশীল পাঁচটি গ্রামের সাড়ে তিন থেকে চার হাজার পরিবারের অন্নসংস্থান হওয়া পারতপক্ষে অসম্ভব। তিনি নানা পত্রপত্রিকার কাটিং দেখালেন, এই জয়কিষেণ এন্ড পান্সারি শিল্পগোষ্ঠীর পরিবেশসংক্রান্ত বিষয়ে অতীত রেকর্ড অন্যান্য প্রদেশে অতি সন্দেহজনক, তারা টাকা ছড়িয়ে প্রশাসনের মাথা আর বিচারব্যবস্থাকে কিনে রাখে, দরকার পড়লে পেশিশক্তির ব্যবহারেও পেছপা হয় না।  উত্তরপ্রদেশে এক তরুণ আইএএস অফিসার এদের চক্ষুশূল হওয়ায় গত কয়েকমাস ধরে নিরুদ্দেশ হয়ে গিয়েছে, পুলিশ নিরুদ্দেশ বলে ডাইরি লিখেই ক্ষান্ত দিয়েছে, কোর্ট মামলা নেয়নিমোট কথা, এ তল্লাটের মানুষের জীবনজীবিকার উপর, স্থানীয় প্রাকৃতিক পরিবেশের দীর্ঘকালীন সুস্থিতির উপর এ প্রস্তাবিত শিল্পপার্ক এক চরম অনিশ্চয়তার ভয়াবহ ঝড় টেনে আনতে পারে। উপস্থিত ছোকরার দলের মধ্যে প্যান্টের উপর পাঞ্জাবি-পরা একটি মেয়ে সটান ব্রজকে বলে বসে, ‘আঙ্কেল, আপনি তো লার্নেড পার্সন, আপনি সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্টের ব্যাপারটা জানেন নিশ্চয়ই ? এটা আজ বা কালের চটজলদি লাভের বিষয় নয়, এটা ইন্টার-জেনারেশান্যাল ইকুইটির প্রশ্ন’  বিজন এইবার বলে, ‘দাদা, আমরা কেউ এলাকার উন্নয়নের বিরোধী নই, কিন্তু যেভাবে বিষয়টা লোককে বোঝানো হচ্ছে, ব্যাপারটা অত সোজা নয় দাদা। এই ভাকুড়িয়া বিল এখানকার কলিজা, সিমেন্ট বা রাসায়নিক ফ্যাক্টরি হলে এটা মরে যাবে দাদা। তার চে’ দু-চারটে মোটরগাড়ি কম চলুক না, বরং আমরা পার্টিকে আরো চিন্তাভাবনা করে এমন কিছু শিল্পের কথা ভাবতে বলি যেখানে আমাদের এই এলাকার লোকগুলো সারাবছর ধরে সত্যি করেই কাজের মত কাজ পায় আর বিলটাও বাঁচে ? এটা আপনি জেলায় তুলুন দাদা, দরকার পড়লে আমরাও আপনার সঙ্গে যাব, কলকাতায় যাব, তবু এলাকাটাকে বাঁচান’  ব্রজ বিপদে পড়েন, বিষয়টা তিনি যে একেবারে বোঝেননি তা নয়, ডক্টর রাহা বেশ জলবৎ বুঝিয়েছেন।  কিন্তু তা সত্ত্বেও ধন্ধ যে পুরোপুরি কাটে না; তাহলে কতকাল স্রেফ মাছ ধরে, লগি ঠেলে আর গেঁড়ি-গুগলি-কলমী শাক খেয়ে মানুষগুলোর দিন চলবে ?  জমি না পেলে শিল্প কি আকাশে হবে ? আর শিল্প না হলে উন্নয়ন আসবে কোন পথে ? সেদিনের মিটিং অ্যাডজর্ন হয়ে গেল, ব্রজ বিজনকে পরেরদিন জোনাল পার্টী অফিসে আসতে বললেন।
জোনাল অফিসে তো এক কান্ডই হয়ে গেল। একদিকে গোবিন্দ সহ প্রায় পুরো পার্টি, অন্যদিকে বিজনের নেতৃত্বে জনা ক’য় মাত্র। বিজনদের সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট বনাম গোবিন্দদের ‘উন্নয়নের জোয়ার’, এমনকি বেশ কয়েকজন সাস্টেইনেবল ডেভেলাপমেন্ট জিনিসটা খায় না মাথায় দেয়, সে প্রশ্নও তুলে ফেললো। একদিকে একটা আবছা ভয়-ভয় মার্কা যুক্তি, অন্যদিকে প্রধান শিল্প, অনুসারী শিল্প, এলাকার সামগ্রিক উন্নয়ন, হাজারো কাজ, হাসপাতাল-স্কুল-কলেজ বাঁধানো রাস্তাঘাট, শপিং মল, সবার গায়ে চকচকে কাপড়জামা আরো কত কি, যার স্পষ্ট ছবি টিভিতে পার্টির এমপি দীপকুমার অভিনীত ‘আমি তোর স্বামী’ বা ‘শ্বশুর যখন অসুর’ সিনেমায় বা যেকোনো বাংলা বা হিন্দি সিরিয়ালে রোজ সন্ধ্যেবেলায় দেখা যায়। সোজা কথায়, বিজনদের স্থিতিশীল উন্নয়নের যুক্তি কেমন সব ভারিক্কী শব্দে ভরা, ভাসাভাসা, আর তাতে কিন্তু-যদি-হয়তোর ছড়াছড়ি, সাদাকথায় দুর্বোধ্য; তুলনায় গোবিন্দদেরটা অনেক সোজাসাপটা, সাধারণলোকে সহজে বোঝে, মেঠো কথায় মাইকে ফুঁকলে গাঁ-গঞ্জের মানুষ টিভিতে-সিনেমাতে দেখার সঙ্গে মিলিয়ে নিয়ে  চট করে ‘খাবে’ গোছের। দাঁড়িপাল্লায় কোনদিক ভারী ? ব্রজ বিরাট আতান্তরে পড়েন, তাঁর সকলকে নিয়ে চলবার অভিভাবকসুলভ নেতৃত্ব চরম চাপের মধ্যে পড়ে যখন ব্যাপারটা ব্যক্তি-আক্রমণের চেহারা নেয়। গোবিন্দদের দলবল বিজনের সঙ্গে বিরোধী পার্টির যোগসাজশের প্রমাণ হিসেবে একটি ফোটো দাখিল করে যেখানে বিজন বহরমপুর শহরে এক বিরোধী নেতার বাড়িতে তাঁর ছেলের বৌভাতে সপরিবার নেমতন্ন খাচ্ছে বলে দেখা যায়। ‘দলবিরোধী ধান্দাবাজ বিজন দত্ত দূর হটো’- ধাঁচের শ্লোগান উঠি-উঠি করছে এমন সময় বিজন তার হাতব্যাগ থেকে একটি কাগজ বার করে উঁচু করে ধরে সকলের চোখের সামনে।  সেটা দেখা যায় একটি চিঠির ফোটোকপি। বিজন সোচ্চারে বলে চলে, ‘মন্ত্রী শ্যামাচরণ বিশ্বাস তাঁর নিজের প্যাডে ভূমিরাজস্ব সচিবকে এই কথা লিখলে সেটা দলবিরোধী কাজ হয়না ?  শিল্পপার্কের জন্য জমি তৈরী করতে কাদের কাদের টেন্ডার-ফেন্ডার ছাড়াই বরাত দিতে হবে তার জন্য শ্যামাদা রেকমেন্ড করছেন !! কেন ? কোন স্বার্থে ? কাদের স্বার্থে ?  জলা ভরাট করা, বাউন্ডারী ওয়াল তোলা, রাস্তা বড় করা শুদ্ধু প্রায় ২০০ কোটি টাকার বরাত দিতে হবে ওনার রেকমেন্ড করা এই চারজন কন্ট্র্যাক্টরকে ? এতে তিননম্বর নামটা কার একবার দেখবেন ব্রজদা’ ? শ্যামা বিশ্বাসের রেকমেন্ডেশানের চিঠিতে তিননম্বরে গোবিন্দ ধাড়ার নামটা বোমার মত ফেটে পড়ে পার্টি অফিসে। বোমা ফাটলে বিশৃঙ্খলা তো হয়ই, এখানেও দু’ পক্ষে হাতাহাতি হ’বার উপক্রম হলো।  নিরূপায় ব্রজ পার্টি থেকে পদত্যাগ করবার হুমকি দিয়ে তা ঠান্ডা করতে বাধ্য হলেন।  দু’ পক্ষের থেকে ছবি আর চিঠির কপি জমা রাখলেন, আর বললেন বিষয়টি নিয়ে পার্টির উঁচু মহলে তিনি কথা বলবেন, ততদিন দু’ পক্ষকেই শান্তি বজায় রেখে পার্টির অনুগত সদস্যের কর্তব্য করে যেতে আদেশ করলেন। তবে যাই বলুন, গোবিন্দ তার অনুগামীদের নিয়ে পার্টি অফিস ছেড়ে বেরোবার আগে বিজনের দিকে যে একটা হিংস্র হাসি হেসে গেল, সেটা ব্রজর নজর এড়ায় না।

।। ব্রজ ও একটি লাশ ।।

এর পরের ঘটনাগুলো এক্সপ্রেস ট্রেনের জানালা দিয়ে দেখা দৃশ্যপ্রবাহের মত দ্রুত ঘটে চললোমন্ত্রী শ্যামা বিশ্বাস জেলা পরিষদে ব্রজর অফিসে এসে ওনার সেই বিতর্কিত চিঠিটি বিরোধী রাজনৈতিক দলের ষড়যন্ত্রে বিজন জাল করেছে এই অভিযোগে বিজনকে পার্টি থেকে সাসপেন্ড করবার দাবী তুললেনব্রজ কেমন করে সে জাল চিঠি বিবেচনার জন্য গ্রহণ করলেন সে কথা কলকাতায় পার্টির  হেড অফিসে বড় মাথাদের কাছে তুলবেন বলে জানিয়ে পিছনে সশব্দে দরজা বন্ধ করে ঘা-খাওয়া নেকড়ের মত ব্রজর অফিস ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। শ্যামা বিশ্বাসের দাবীটাবিগুলো প্রকাশ্য মিটিং-এই ধমকের মত শোনায়, ব্রজর এসি চেম্বারে তা যে নির্ভেজাল হুমকির মত শোনাবে তা আর আশ্চর্য কি ?  ব্রজ সবদিক থেকেই স্থানু হয়ে কেমন জড়ভরত হয়ে পড়েন।  এ জগত তাঁর অচেনা, তিনি ছেলেবেলা থেকেই তাঁদের কাছারিবাড়িতে লোককে হত্যে দিয়ে অনুনয়-বিনয় করতে দেখেছেন। সে সব জমিদারীর দিন না হয় অতীত, তবু আজ অবধি সকলেই তাঁর সামনে সসম্ভ্রমে তাঁর সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করেছে  পার্টি করা ইস্তক বহু অসংস্কৃত সদস্যের সঙ্গে তাঁকে খানিকটা বাধ্য হয়েই মেলামেশা করতে হয়েছে, তারা তো বটেই এমনকি গোবিন্দদের মত আঙুল-ফুলে-কলাগাছেরাও তাঁকে সরাসরি অপমান তো দূরের কথা, কণামাত্র অবজ্ঞাও তাঁর সামনে দেখাতে সাহস করেনি আজ পর্যন্ত  তাই ঈষৎ বিধ্বস্ত হয়ে দুপুরে বাড়ি ফেরেন ব্রজ। ফিরেই খবর পেলেন বিজন এসেছিল। একটা হাতচিঠি রেখে গেছে যাতে জানা গেল আজ একটু আগে ক্যুরিয়ারে বিজনের বাড়িতে একটা সাদা থান কাপড় এসেছে, প্যাকেটের উপরে লেখা ‘বিজন দত্তর বিধবা ইন্দ্রানীর জন্য’। এর তিন দিন পরেই বহরমপুর শহরে কলেজের রাস্তায় দিনদুপুরে বিজনের মেয়ে সুজাতার ওড়না কেড়ে নিল দু’টো মোটরবাইকে চেপে আসা চার যুবক; খবরটা  জানামাত্র বিজনকে মোবাইলে ধরবার চেষ্টা করলেন ব্রজ, বিজন ফোন ধরেনি, ধরল ওর বউ ইন্দ্রানী। স্তিমিত ভয়ার্ত স্বরে বলল, ওরা মেয়েটাকে বলে গেছে বাপ লাইনে না এলে ওকে রেপ করে লাশটা ভাকুড়িয়ার বাদায় পুঁতে দেবে। ব্রজ গোবিন্দকে ডেকে পাঠান, ওকে বেশ ডেঁটে বলেন, ‘এ সব কি হচ্ছে গোবিন্দ’ ? গোবিন্দ আকাশ থেকে পড়ে, ‘কি বলছেন দাদা, আমি ? ছি ছি, একথা আপনি ভাবতে পারলেন ? পার্টি অফিসে সেদিন মিটিং-এর পরেই কত লোকে বিজনকে ধরতে চেয়েছিল আপনি জানেন ? তাদের কে ঠেকিয়েছে দাদা ? হ্যাঁ, বিজন এলাকার উন্নয়নে হিড়িক দিচ্ছে সেটা জেনে অনেকেই ওর উপর হেভি ক্ষেপে গেছে সেটা ঠিক, তবে আমি কথা দিচ্ছি আপনাকে, আমি নিজে ব্যাপারটা খোঁজ নেবো, আপনার কোনো চিন্তা নেই’। ব্রজ তবু নানা চিন্তা করতেই থাকেন – কারখানা, এলাকার উন্নয়ন, ভাকুড়িয়া বিল... বিজনের কথাগুলো অবেলার অম্বলের মত মনে পড়ে। চোঁয়া ঢেকুর তুলিয়ে মুখে বিশ্রি স্বাদ আনে। এই চিন্তার মেঘেই আবার বিদ্যুৎ হানে হপ্তা দু’য়েক পরে শ্যামা বিশ্বাসের ফোনে গর্জন, বিজন নাকি এইবার কোলকাতার বিখ্যাত পরিবেশকর্মী ও আইনজীবী সুহাস দাসকে দিয়ে ভাকুড়িয়া বিলের জমি অধিগ্রহণের বিরূদ্ধে হাইকোর্টে মামলা করেছে। এ তো সোজাসুজি সরকারের নীতির বিরোধিতা, পার্টির বিরোধিতা, মাননীয় মুখ্যমন্ত্রীর উন্নয়নের স্বপ্নের বিরোধিতা ! পার্টির মহাসচিব এবার নড়েচড়ে বসেছেন,  ব্রজ যদি এই মুহূর্তে বিজনকে পার্টি থেকে বরখাস্ত না করেন তো সরাসরি মুখ্যমন্ত্রীর রোষের মুখে পড়বেন।  সেই সন্ধ্যেয় ব্রজ পার্টি অফিসে মন্ত্রী শ্যামাচরণ ও লোক্যাল কমিটির বাকি সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে বিজন দত্তর পার্টি-সদস্যপদ খারিজের সিদ্ধান্তে অনুমোদন দিলেন। চিঠিটা তৈরী হয়ে টাইপ হয়ে এল এবং প্রেসিডেন্ট ব্রজ, ভাইস-প্রেসিডেন্ট শ্যামাচরণ ও লোক্যাল কমিটির সম্পাদক তাতে সই করলেন এবং সে সব চুকিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে রাত সাড়ে আটটা বাজলো ব্রজর তবে সে বরখাস্তের চিঠি বিজনকে হাতে আর ধরানো গেল না, পরেরদিন সকালেই বিজন লাশ হয়ে পড়ে রইল দীঘলকাটীর বাঁধের উপর নির্মীয়মাণ ব্রজর সাধের সেই “পাখীর বাসা” অতিথিনিবাসের পূব কোণে ইঁটের পাঁজার পাশে।  প্রথম যারা দেখেছিল তারা বলেছিল, গাছের ফাঁক দিয়ে প্রথম আষাঢ়ের মেঘভাঙ্গা ভোরাই সুর্যের আলো তেরচা হয়ে পড়েছিল বিজনের মুখে, আর বুকের কাছে জমাট রক্তে ভনভন করছিল মাছি।

।। লালু ও শৃঙ্খলিত সুশীল কুকুরগুলো ।।

নিজের পার্টির ছেলে বলে নয়, এমনিতেই বিজনকে ওর ছেলেবেলা থেকেই বেশ ভালো চোখে দেখতেন ব্রজ রায়, ফলে ঘটনাটা তাঁকে ব্যথাই দিয়েছিল। তার উপর ঘটনাটার মধ্যে দলীয় গোষ্ঠীদ্বন্ধের প্রবল গন্ধ তাঁকে আরো উদাস করে তুলেছিল। ইন্দ্রাণী মেয়ে সুজাতাকে নিয়ে তারপরে একদিন ব্রজর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর বাড়িতে এল, তার পরণে বৈধব্যের সাদা থান নয়, আর গলাও সেই রাতের ভয়-পাওয়া পাখীর মত নয়। সুতীক্ষ্ণ স্বরে মা-মেয়ে ব্রজকে জানিয়ে গেল, তারা কোর্টে গোবিন্দ আর মন্ত্রী শ্যামাচরণের নামে খুনের মামলা দায়ের করছে, সুজাতা বলল, ‘জেঠু সবই তো গেছে, এখন আমরা ভয়ডরের উপরে উঠে গেছি। রেপ করবে, করুক। তবু বাবার খুনীদের শেষ দেখে ছাড়বো’।  ব্রজর সান্ত্বনাবাক্যের অপেক্ষা না রেখেই মা-মেয়ে উঠে পড়ে, দৃপ্ত পায়ে ব্রজর বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যায় সহায় সম্বলহীন, অজানা কোনো এক অনন্ত কুরুক্ষেত্রের দিকে।
মাস খানেক পর একদিন দুপুর-দুপুর জেলা পরিষদের অফিসে বসে ফোনে ব্রজ খবর পেলেন জমি অধিগ্রহণ দপ্তরের চুড়ান্ত নোটিশ ইস্যু হয়ে গিয়েছে, জেলা পরিষদ অফিসে পৌঁছতে সন্ধ্যে হয়ে যাবে। তখন রাত প্রায় ন’টা বাজে, ব্রজ বাড়ির একতলায় তাঁর দপ্তরে বসে এ চিঠি ও চিঠি দেখছেন, উপর থেকে রাতের খাবারের ডাক আসলো বলে এমন সময় গোবিন্দ সে নোটিশের ফোটোকপি হাতে বাইক ফটফটিয়ে ব্রজর বাড়ি এসে উপস্থিত, একা নয় সঙ্গে চার-পাঁচটি বাইকারূঢ় আরো আট-দশজনা পার্টিকর্মী।  ‘ব্রজদা, এসে গেছে, আপনার নেতৃত্বেই এই এলাকার মানুষ সত্যিকার সুদিন দেখতে চলেছে, ওরে ব্রজদাকে মিষ্টি খাওয়া’একটি বালা-পরা পুরুষের হাত বিরাটাকায় এক রসগোল্লার হাঁড়ি এনে ব্রজর সামনে টেবিলে রাখে, ‘নিন দাদা, এমন শুভদিনে একটু মিষ্টিমুখ না করলে চলে’ ? ‘সবচেয়ে বড় কথা দাদা’, গোবিন্দ বলে, ‘ওই জলার ধারে যে দু’-দশ ঘর মানুষকে শিল্পপার্কের কাজ শুরু হ’বার আগে উঠে যেতে হবে, তাদের জন্যে ক্ষতিপূরণ বাবদ সরকার একলপ্তে পাঁচ লাখ টাকা করে দেবেন বলে ঠিক হয়েছে।  ভাবুন তো, ওই টাকার লাখ দুয়েকে একটা দোকান-টোকান করে বাকি টাকা পোস্টাপিসে এমআইএস করে রাখলে মাস গেলে হাতে বেফালতু দেড়-দু’ হাজার করে পাবে লোকগুলো, ওদিকে দোকানটা তো রইলই’এই সময় আনন্দের আতিশয্যে এক অত্যুৎসাহী পার্টিকর্মী যুবক ব্রজর সামনেই গোবিন্দকে বলে ফেলে,  ‘গুরু, পোস্টাপিসে কোন আবুইদ্যা টাকা রাখবে, শ্লা তোমার ইঁটভাটায় লাগালে দু’ বছরে ডবল ফেরত পাবে, বলো ওস্তাদ’ ? গোবিন্দ মাছি তাড়াবার ভঙ্গীতে কথাটা বাতাসেই উড়িয়ে দেয়। বরিষ্ঠ পার্টিনেতা ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যানের মিস্টিমুখ করানো হচ্ছে মার্কা ছবিও তোলা হয় মোবাইলে, ফলে ফেলে-ছড়িয়েও এই অবেলায় ব্রজকে চার-পাঁচটা পেল্লায় সাইজের রাজভোগ গলাঃধকরণ করতে হয়। উদ্দীপিত ছেলেছোকরার দল ব্রজর দপ্তরে আর কতক্ষণ শুকনো গলায় বসে থাকবে এই উল্লাসী সন্ধ্যেয় ? তাদের লিডার গোছের একজনকে একপাশে টেনে নিয়ে গোবিন্দ কি যেন বলে এবং তারা মুখ্যমন্ত্রীর নামে, জেলার একমাত্র মন্ত্রী শ্যামাচরণ বিশ্বাসের নামে, ব্রজর নামে, আর গোবিন্দর নামে জয়ধ্বনি দিতে দিতে বেরিয়ে যায়।  উচ্ছ্বাস, হৈ হট্টগোল কমলে গোবিন্দ ব্রজকে বলে, ‘ল্যান্ড অ্যাকুইজিশান ডিপার্টমেন্টের অফিসাররা সামনের সপ্তাহেই সার্ভেতে আসবে বলে আমাকে বলেছেন মন্ত্রী, তারপর সামনে শুধু কাজ আর কাজকাল বিকেল পাঁচটায় কোর্টমোড়ে একটা মিটিং ডেকে দিয়েছি দাদা, সুখবরটা আপনিই সারা জেলার লোককে জানাবেন কাল, শ্যামাদার কাল মন্ত্রীসভার মিটিং আছে, আমার সঙ্গে কথা হয়ে গেছে, ওনার আসতে একটু দেরি হবে; টিভির লোক, কাগজের লোক সব আসছে, আমি হোটেল অক্সিজেনে বলে রেখেছি, ওখানেই ফুডিং-লজিং-এর ব্যবস্থা থাকছে আর মিটিং-এর পর আপনি ওখানেই প্রেস-কে মিট করবেন’ব্রজ তারিফের চোখে গোবিন্দর দিকে তাকান - নাঃ, উন্নতি গোবিন্দ করবেই ! ঘরে বাদবাকি দু’পাঁচজন যা ছিল, তাদের গোবিন্দ বলে, ‘চলুন চলুন, রাত হ’ল, এবার দাদাকে খেয়েদেয়ে বিশ্রাম নিতে দিন, কাল অনেক কাজ দাদার’। আর ব্রজকে বলে, ‘কাল সকাল সকাল রেডি থাকবেন দাদা, আমি ন’টা নাগাদ গাড়ি পাঠিয়ে দেবো, সোজা জেলা অফিস। দুপুরে ওখানেই ব্যবস্থা হচ্ছে, সেখান থেকে মিটিং করে হোটেল অক্সিজেনে প্রেস কনফারেন্সের পর ডিনার সেরে আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দেব। আজ তাহলে আসি দাদা’।
গোবিন্দদের বাকি পাঁচ-সাতজন বেরিয়ে যেতে খাস চাকর কালিপদকে হাঁক দিয়ে সদর দরজা বন্ধ করতে বলে বেশ পরিতৃপ্তির ধীর পায়ে নিজের দপ্তরের দিকে ফেরেন ব্রজ। ঘরের দরজার কাছে পৌঁছতেই তাঁর নজর পড়ে আলোআঁধারির মধ্যে দু’পায়ের ফাঁকে লেজ গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে লালু, বোধহয় গোবিন্দদের দলবলের সঙ্গেই উঠোনে ঢুকে পড়েছিল, কেউ খেয়াল করেনি। বেশ ভরাট মেজাজ আজ ব্রজর, তিনি সস্নেহে লালুকে ডাক দেন, ভাবেন কালিপদকে বলবেন বাড়তি রুটি-ফুটি যা আছে লালুর জন্যে এনে দিতে।  ব্রজর ডাক শুনে লালু কেমন যেন দ্বিধাগ্রস্ত পায়ে কয়েক ফুট এগিয়ে এসে ব্রজর ঘরের দেওয়ালে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে, কাছে আসেনাব্রজর ডাক শুনেও লালুর এই ব্যবহার কিঞ্চিৎ অস্বাভাবিক, তাই ব্রজই এগিয়ে যান তার দিকে। ব্রজকে এগোতে দেখে লালু আরো সিঁটিয়ে যায়, কাছাকাছি যেতে ব্রজ লালুর গলায় অস্ফুট একটা ঘড়ঘড়ানি শব্দ শুনতে পান যেন। অসুখবিসুখ করলো নাকি, ব্রজ আরো কাছে এগিয়ে যান। লালু মুখ তুলে দু’বার সপাটে ডেকে ওঠে, শাসনের ধমক দেন ব্রজ, ওর মাথায় পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে যান।  ব্রজ এখন লালুর এতটা কাছে যেখান থেকে উনি লালুর চোখের চাহনিও স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছেন। ওর তাকানোটা ব্রজর অদ্ভুত মনে হয়, এটা আনুগত্যের চাহনি নয়, এমনকি রাগের চাহনি নয়, ক্ষিদের চাহনি নয়, ব্যথার চাহনিও নয়।  এ চাহনি ব্রজর সম্পূর্ণ অচেনা, লালুর চোখে তো বটেই, আজ অবধি কোনো মানুষ তাঁর সামনে অমন চাহনি নিয়ে কখনো দাঁড়ায়নি। ব্রজর বেশ অস্বস্তি হয়, ‘কিরে লালু, কি হয়েছে তোর ?’ । কালিপদ কয়েকটা বাসী রুটি লালুর জন্যে নিয়ে আসে আর ব্রজকে বলে, ‘বাবু, উপরে যান, মা খাবার বেড়েছেন’। ব্রজ মনে একটু খচখচানি নিয়েই সিঁড়ির দিকে এগোন, লালু ও এলাকার যাবতীয় কালু-লালু-ধলুদের প্রতি তাঁর অযাচিত স্নেহের জন্যেই জন্মচেনা লালুর চোখে এহেন অচেনা চাহনি তাঁকে ঈষৎ বিব্রত করে। সিঁড়ি বেয়ে দোতলায় উঠতে উঠতেই অবশ্য সে অস্বস্তি মরে আসে, কারণ ততক্ষণে মর্মচক্ষে আগামীকালের সভার শেষে নিজেকে মাল্যভূষিত ও আবীরমন্ডিত দেখতে পাচ্ছেন  তিনি। শুধু লালুর চোখে কেন, কোন মানুষের চোখেও ওই চাহনি আজ অবধি ব্রজ নজর করেননি, তাই চিনবেন কি করে ? ভাগ্যিস। সে চাহনি চিনলে বা তার মানে বুঝলে তাঁর মনের অস্বস্তির বুদবুদ এত সহজে তাঁকে ছাড় দিতো না, বরং সুনামির ঢেউ হয়ে কেউটের ছোবলের মত তাঁর সত্ত্বাকে, তাঁর অস্তিত্ত্বকে গ্রাস করতে উদ্যত হতো।  গত শীতকালে ভাকুড়িয়ার ধারে পিকনিক করতে কোলকাতা থেকে দু’-তিনটে বড় বড় গাড়ি করে একদল মানুষ এসেছিল, সঙ্গে বহু শখে বহু শৌখিনতায় লালন করা জাঁদরেল এক কুকুর। খাবারের লোভে জড় হওয়া লোক্যাল কালু-ধলুরা সে খানদানি কুকুর গাড়ি থেকে নামতেই চিল চিল্লানো চিল্লিয়েছিল, আর ব্রজ রায়ের পেয়ারের লালু সেই বাহারি বকলেস-পরা, দামী চামড়ার ফিতেয় বাঁধা তার স্বজাতীয়ের দিকে আজকে রাতের এই ঘৃণামিশ্রিত অনুকম্পার চাহনিতেই তাকিয়েছিল নির্নিমেষ।  
*****
(পার্থপ্রতিম পাল ও মুনির হোসেন সম্পাদিত "ট্রৈনিক" পত্রিকার বর্ষা ১৪২২ সংখ্যায় প্রকাশিত)